ইতিহাস

মৃত্যু এসেছিলো নিঃশব্দে…

মৃত্যু এসেছিলো নিঃশব্দে...

শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে সভ্যতার চাকা গড়গড়িয়ে চলতে শুরু করেছে, সহজ হয়েছে জীবন। আর জীবনকে সহজ করে তোলা প্রতিটি অনুষঙ্গের পিছনে রয়েছে আমাদের নাম না জানা হাজারো কলকব্জা আর রাসায়নিকের কারিশমা। তবে এসব জাদুকরী মেশিনারিজ যে শুধু জীবনকে সহজ করছে তা-ই নয়, এসবের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হলে সামান্য ভুলে এগুলো হয়ে দাঁড়াতে পারে জীবন সংহারেরও কারণ!

৩৩ বছর আগে ভারতে এমন এক দুর্ঘটনা ঘটে যা আজও তাদের সকলের মনে তাজা। ক্ষতটা যেন এত বছরেও শুকোচ্ছে না। ১৯৮৪ সালের দোসরা থেকে তেসরা ডিসেম্বরের রাত্রে ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের ভোপাল শহরে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড এর কীটনাশক কারখানার ভূর্গভস্থ মজুত ট্যাংক ফেটে গেলে সেখান থেকে বের হতে শুরু করে ৪২ টন পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস মিথাইল আইসোসায়ানেট।

ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াই পি গোখেল জানান অতিরিক্ত চাপের মুখে ট্যাংকের একটি ভালভ্‌ ভেঙে গেলে ভেতর থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। নয় লক্ষাধিক বাসিন্দার ঘনবসতির শহর ভূপালের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী রাসায়নিকের মেঘ। প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ ওই গ্যাসের কবলে পড়ে। প্রাণ হারায় কয়েক হাজার মানুষ। নগরবাসী যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন তাদের নিরব ঘাতক পৌঁছে গেছে শহরের দ্বারে দ্বারে। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ববৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা।

চৌঠা ডিসেম্বর- হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষায় গ্যাস আক্রান্ত বহু মানুষ

অভিশপ্ত সেই রাতের পর কেটে গিয়েছে তেত্রিশটা বছর। কিন্তু এখনও অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে আজকের শিশুরা।

ভোপালে শিশুদের জন্মগত পঙ্গুত্বের হার তুলনামূলকভাবে খুবই বেশি

কেউ দৃষ্টিহীন, কারও হাত-পা এতই দুর্বল যে চলতে পারে না, কেউ আবার মানসিক প্রতিবন্ধী। ভোপালে বিষাক্ত গ্যাস পঙ্গু করে দিয়েছে পরপর তিনটে প্রজন্মকে। আজও তার ভয়াবহতা মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে।

ইউনিয়ন কার্বাইডের এই কারখানার ট্যাংক থেকে বেরতে শুরু করে বিষাক্ত গ্যাস

মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রতিষ্ঠানের ৫০.৯% শেয়ার ছিল মালিকদের হাতে আর বাকি ৪৯.১% ছিল ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে। যার একটা বড় অংশই ছিল ভারত সরকার। ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশনের ভারতীয় শাখা ইউসিল দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত ভোপাল কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে। এরপর থেকে চলছিল সেভিন নামধারী কীটনাশকটি উৎপাদন। যে প্রক্রিয়ায়, মাঝপথে মিথাইল আইসো-সায়ানেট বা এমআইসি নামক অতিশয় বিষাক্ত গ্যাসটি উৎপন্ন হয়। আর এই।গ্যাস জমা হত মাটির নিচের ট্যাংকে।

এই ট্যাংকের ভালভ্‌ ফেটেই শুরু হয় প্রচন্ড বিষাক্ত গ্যাসের নির্গমন

১৯৮৪ সালের ২রা ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঘটনার যখন শুরু তখন ভোপালের বেশিরভাগ বাসিন্দা গভীর ঘুমে। ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার পাঁচিলের বাইরে চালাঘরগুলোর বাসিন্দাদের জন্যও সে রাতটা ছিল আর পাঁচটা রাতের মতই। রাত যখন প্রায় ১টা তখন হঠাৎ কারখানা এলাকায় কিছু বস্তিবাসীর প্রথম নাকে আসে একটা দুর্গন্ধ- তাদের চোখ জ্বলতে শুরু করে। প্রথমে তারা ধারণা করে কেউ হয়তো আশেপাশে মরিচ পোড়াচ্ছে। কিন্তু অবস্থা আরো খারাপের দিকে মোড় নেয়। গন্ধ আরো জোরালো হয়ে ওঠে। মানুষ অল্পক্ষণের মধ্যেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কথা বলতে শুরু করে। অনেকে বমি করতে শুরু করে। শহর ও শহরতলিতে ভীতি ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। মানুষের দৌড়াদৌড়িতে অনেকেই হোঁচট খেয়ে পড়ছে। চোখ জ্বালা করার কারণে কেউ চোখ খোলা রাখতেই পারছে না। অনেকের আবার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। বিষাক্ত ওই গ্যাস ছিল বাতাসের থেকে ভারী- কাজেই মজুত ট্যাংক থেকে বেরন গ্যাসে ঘন মেঘের আস্তরণ তৈরি হয়।

গ্যাসের সংস্পর্শে প্রথমেই শুরু হয় প্রচন্ড চোখ জ্বালা এবং নিঃশ্বাসের কষ্ট

রাত আড়াইটার দিকে যখন কারখানার বিপদ সাইরেন বাজে তখন সকলে বুঝতে পারে যে কারখানা হতে গ্যাস লিক করেছে। ১৯৮৪-র ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর বিবিসিকে বলেন এলাকার বাসিন্দা আহমেদ খান,

”আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে- চোখ জ্বলতে থাকে। ঘন গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে তখন রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না, সাইরেনের শব্দে কান ফেটে যাচ্ছে- কোনইদকে দৌড়ব কিছুই আমরা বুঝে উঠতে পারছি না- সকলেই উদভ্রান্ত। মা জানে না তার সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, সন্তান জানে না তার মাকে সে হারিয়েছে। পুরুষরা জানে না তাদের গোটা পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।”

বিবিসির সংবাদদাতা মার্ক টালি তার রিপোর্টে বলেছিলেন,

”শহরের প্রধান হাসপাতাল মানুষের ভিড়ে উপচে পড়ছে, ক্রমাগত গ্যাস আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে আসা হচ্ছে। রাস্তার ওপর হাজার হাজার মরা বিড়াল, কুকুর, গরু এবং পাখির স্তুপ- শহরের মর্গ ভরে উঠছে মৃতদের ভিড়ে।”

এরপর নিহতের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে। ৭২ ঘন্টায় ৮০০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছে। এর পরের কয়েকমাসে আরো কয়েক হাজার প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু সরকার দাবি করেছে বিষাক্ত গ্যাসে মোট ৫,২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপর দিকে বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বিশ হাজারের বেশি।

দুর্ঘটনার কারণঃ

কেমিক্যাল প্ল্যান্টের পাইপলাইনে মাঝে মাঝে রাসায়নিক বর্জ্য জমা হয়। ইউনিয়ন কার্বাইডের প্ল্যান্টে অনুরূপ বর্জ্য পরিস্কার করার জন্য আলাদা পানির পাইপলাইন ছিল। দুর্ঘটনার প্রায় চার ঘন্টা আগে লাইনের বর্জ্য পরিস্কারের জন্য পাইপে পানি প্রবেশ করানো হয়। কিন্তু ট্যাংকে জমা মিথাইল আইসোসায়ানেট হচ্ছে পানির সাথে ভয়ঙ্কর বিক্রিয়া সৃষ্টিকারী একটি রাসায়নিক। নিয়ম অনুযায়ী লাইন পরিস্কার করতে হলে মিথাইল আইসোসায়ানেট এর ট্যাঙ্কের পথ অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে যেটি একটি সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। লাইন পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকা ব্যাক্তিটি সেইদিন এই ঝামেলাপূর্ণ কাজটি এড়িয়ে যায়। এদিকে পানি বেরিয়ে যাবার মুখটি রাসায়নিক বর্জ্যে পূর্ণ হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পানি বের হতে না পেরে তা সরাসরি ট্যাঙ্কের অভিমুখে রওনা দেয়। একসময় তা ট্যাঙ্কের ৪২ টন মিথাইল আইসোসায়ানেট এর রিজার্ভের সাথে বিনা বাধায় মিশে যায়।

সাথে সাথেই ট্যাঙ্কে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হবার কারনে ট্যাঙ্কের তাপমাত্রা হঠাৎ অনেক গুন বেড়ে যায়। আর এই উত্তাপের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতিও যায় বেড়ে। একসময় তাপমাত্রা ২০০ সেন্টিগ্রেডেরও বেশী হয়ে যায়। কিন্তু ট্যাঙ্কটি এত উত্তাপ সহ্য করার মত করে তৈরি করা হয়নি। তখন তা ট্যাঙ্কের জরুরী চাপ নির্গমন পথ দিয়ে বিষাক্ত গ্যাস উদ্গীরন করে শহরের বাতাসে ছড়িয়ে দিতে শুরু করে।

ঘটনা নিয়ে ভারত কর্তৃপক্ষ, ইউনিয়ন কার্বাইড সহ নানা সংস্থা তদন্ত করে। তদন্তের ফলাফলে কিছুটা ভিন্নতাও দেখা যায়। ইউনিয়ন কার্বাইড ঘটনাটিকে একটি নাশকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু অন্য সংস্থাগুলোর তদন্তে নাশকতার কোন সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।  অনেক তদন্তের পরে এই দুর্ঘটনার পিছনে কিছু কারন সনাক্ত করা হয়। সেগুলো হলো,

  • অপেক্ষাকৃত নিরাপদ রাসায়নিক ব্যাবহারের বদলে ঝুঁকিপূর্ণ মিথাইল আইসোসায়ানেট ব্যাবহার করা
  • বিপজ্জনক মিথাইল আইসোসায়ানেট ছোট ছোট ড্রামে সংরক্ষন করার বদলে এক সাথে বিশাল ট্যাঙ্কে সংরক্ষন করা।
  • ব্যবহৃত পাইপলাইনে মরচে ধরা।
  • ১৯৮০ সালে প্ল্যান্ট বন্ধ হবার পর তার ত্রুটিপূর্ণ রক্ষনাবেক্ষন ও গাফিলতি।
  • নিরাপত্তামূলক কোন ব্যবস্থা না থাকা ও এ ব্যাপারে ত্রুটিপূর্ণ আইন।
  • অর্থ বাঁচানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সেইফটি সুইচ বন্ধ রাখা। যেমন, মিথাইল আইসোসায়ানেট ট্যাঙ্কের রেফ্রিজারেশন সিস্টেম বন্ধ রাখা। শুধুমাত্র এই সিস্টেমটি চালু থাকলেই হয়ত এতবড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।

 

কারখানা এখন পরিত্যক্ত

সরকারী বাধ্যবাধকতার কারনে প্ল্যান্টের নকশা পরিবর্তন করেছিলেন ভারতীয় ইঞ্জিনিয়াররা। তার সাথে খরচ বাঁচানোর জোর প্রচেষ্টা এই দুর্ঘটনাটি ঘটতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল। প্ল্যান্টটি বসানো হয়েছিল ভোপালের মত এমন ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরে যেখানে ছিলনা কোন বিপর্যয় মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা আবার অর্থনৈতিক দিক থেকেও হতদরিদ্র অবস্থা। বিশ্লেষকরা এই দুর্ঘটনার জন্য যৌথভাবে ইউনিয়ন কারবাইড করপোরেশন ও ভারত সরকারকে দায়ী করেন। তাদের যথেষ্ট ব্যবস্থা না থাকার কারনেই ভোপালবাসীদের এমন ভয়ঙ্কর অবস্থায় পতিত হতে হয়েছিল।

ভোপাল দুর্ঘটনার এত বছর পরেও তাই সেখানকার মানুষের স্বজন হারানোর বেদনা আর রাসায়নিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম দুর্ভোগের শিকার হয়ে থাকাটা আমাদের একটা শিক্ষাই দেয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে। আর সেটা হলো- “SAFETY FIRST”! যেহেতু বাংলাদেশেও শিল্পাঞ্চলগুলো ঘিরে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, সেহেতু আমাদের শিল্পকারখানাগুলোর জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি-ই হতে হবে সর্বপ্রথম মাথাব্যথার কারণ, তারপরে প্রোডাকশন এবং মুনাফা।

Most Popular

To Top