নিসর্গ

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (তৃতীয় পর্ব)

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (তৃতীয় পর্ব)- নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (দ্বিতীয় পর্ব)]

যত রকমের মন খারাপ হতে পারে, সব রকমের, সবটুকু মন খারাপ নিয়েই দিয়েই শুরু করছি! আরও যা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে বলতে পারছিনা, এই জন্য যে সেগুলো পাবলিক পোস্টে বলা সম্ভবনা আদৌ! মনে মনে বলছি আর লিখছি, তাতে যদি মনের ক্ষোভ আর আক্ষেপ কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়! যদিও হচ্ছেনা তবুও দিচ্ছি।

আচ্ছা আপনারা যারা অমানুষের মত যখন যা খুশি করছেন, আপনাদের কি কোন বিবেক বোধ নেই? আপানদের কি কোন দেশপ্রেম আছে? এই আপনাদের জন্যই আজকে দেশের কোথাও আর যেতে ইচ্ছা হয়না বুঝলেন। দেশের টাকা এখন অন্যদেশে চলে যাচ্ছে, আগামীতে আরও যাবে। তখন বসে বসে আঙ্গুল চুষবেন! চলুন কয়েকটা উদাহারন দিয়ে দেখি?

পুরো ভারতবর্ষে একটি টুরিস্ট গাড়ির ভাড়া ২৪০০-৩৩০০ রুপী ৫-১৪ জনের। বা ২৮০০-৩৮০০ টাকা। সারাদিন যতক্ষণ খুশি সেই গাড়িতে চড়া যায়। মত কথা যে কোন স্পটে গিয়ে যতখুশি বেরিয়ে আসা যায়। তাতে ড্রাইভার, গাড়ির মালিক বা এজেন্সিওর কিছুই যায় বা আসেনা।

সেখানে দীঘিনালা থেকে সাজেক যেতে আসতে আজকাল নাকি আপনারা ১০,০০০ টাকা করে নিচ্ছেন! কত কিলো দুরত্ত? কত সময় লাগে যেতে বা আসতে? কোন যুক্তিতে নিচ্ছেন এই অযৌক্তিক ভাড়া? বলতে পারবেন?

বান্দবান, থাকনচি থেকে নৌকা ভাড়াও আজকাল দেখি ৬০০০-৭০০০ হাজারের নিচে যায়না, আর গাইড নাকি আজকাল ১০০০-২০০০ করে নিচ্ছেন শুনছি! কি আজব দেশ আর সেই আজব দেশের আজগুবি মানুষ, ব্যবস্থাপক আর তাদেরকে সহয়তাকারী অমানুষের দল সব।

এইভাবে করছেন বলেই দেশের ভিতরে আর কোথাও যাইনা, অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। নিজেও যাইনা সাথে সাথে পরিচিত অন্যদেরকেও যেতে নিরুৎসাহিত করি প্রতিনিয়ত। যার সর্বশেষ উদাহারনটা দেই?

আমার পরিচিত কয়েকটা পরিবার সাজেক যাবে বলে রব তুলেছিল। আমার কাছে পরামর্শ আর গাইড লাইন চাইলো। আমি তাদেরকে বললাম পাগল নাকি আপনারা? জনপ্রতি ৫০০০-৬০০০ টাকা খরচ করে সাজেকের বস্তিতে গিয়ে কি করবেন?
সাজেক বস্তি শুনে আকাশ থেকে পরলেন! এবং জিজ্ঞাসা করলেন কিভাবে?

তাকে আমার তিনবারের সাজেক যাবার তিন ধরনের অভিজ্ঞতা শোনালাম। ২০১৩ সালে আমি প্রথম যেবার সাজেক যাই, সেদিন সাজেকে আমাদের একটা সিএনজি আর আমরা চারজন ছাড়া সেদিন আর কেউই ছিলোনা! সবমিলে আমাদের জনপ্রতি খরচ হয়েছি ২৩০০ টাকা! তাতে শুধু সাজেক না, সাথে আলুটিলা, রিছাং আর খাগড়াছড়ি শহরও অন্তর্ভুক্ত ছিল!

দ্বিতীয়বার ২০১৫ সালে যখন সাজেক যাই, তখন যে বাসায় থাকেছি সেই বাসার রাস্তার এপার থেকে অপার যেতে আমাকে ৩ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল, অসংখ্য গাড়ির দ্রুত গতিতে চলাচলের জন্য নিরাপত্তা স্বরূপ। যেখানে আর কয়েকদিন পরে মোড় নিতে বা রাস্তা পার হতে স্পীড ব্রেকার আর সিগন্যাল বসাতে হবে।

তারপর আগে যে বাসায় জনপ্রতি ১০০ টাকায় থেকেছিলাম, সেই বাসার মতই আর একটা বাসায় এক রাতের জন্য দুটো খাটের ভাড়া নিয়েছিল ১৫০০ টাকা! দেখে আমি পারলে সুইসাইড করি! এতটাই শক খেয়েছিলাম।

ভাইরে ভারত, নেপাল আর ভুটানে ১৫০০ টাকায় স্টার মানের রুম পাওয়া যায়, সাথে সকালের নাস্তাও থাকে!
এবার বুঝলেন সাজেক কিভাবে বস্তি আর গলাকাটা জায়গা? তারচেয়ে চলেন এই ৬০০০ টাকা দিয়েই ৪-৫ দিনের জন্য দার্জিলিং ঘুরে আসি?

আমার প্রস্তাব শুনে আমি যেভাবে আকাশ থেকে পড়েছি ওনাদের সাজেক যাওয়ার কথা শুনে, ওনারাও আকাশ থেকে পরলেন এই টাকাতেই দার্জিলিং যাবার কথা শুনে!

কি বলেন এইটা ৬০০০ টাকায় দার্জিলিং কিভাবে যাওয়া যাবে?

তাদেরকে আসস্থ করলাম, চলেন গিয়েই দেখাই নাহয়? এরপর খুশিতে আমাকে প্রস্তাব দিলেন ভাই ৬ হাজার না, আপনি যদি জনপ্রতি ৮ হাজারেও আমাদের দার্জিলিং ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারেন, তাহলে আপনার সব খরচ আমাদের! ব্যাস এখন সব চূড়ান্ত, শুধু আগামী ব্রেকের অপেক্ষায় দিন গুনছি!

আর আপনারা যারা এসব দেশের সম্পদ এভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন, সহয়তা করছেন তারা অপেক্ষা করেন, সেদিন আর বেশী দূরে নয়, যে আমাদের স্বপ্নের মত সাজেক, সুখের নীল সমুদ্র, পাহাড়ের প্রান বান্দরবান আর যাবেনা। একটা পাসপোর্ট করে ফেলতে পারলেই, আপনাদের অর্ধেক খরচে ভারত, নেপাল আর ভুটান বেড়াতে যাবে, আরাম, আপ্যায়ন আর নানা রকম বৈচিত্রও পাবে।

এবার আসা যাক, শুধু কি স্থানীয় জনগণ, ব্যবস্থাপনা আর ক্ষমতাবান মানুষ গুলোই কি এভাবে আমাদের সবচেয়ে সম্ভাবনার পর্যটনখাতে দিন দিন ধংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে? না মোটেই না। এই পর্যটন খাত ধংসের সাথে, আমাদের সাধারণ মানুষকে দেশে ভ্রমণে বিমুখ করতে এদের সাথে আমাদের ইভেন্ট ব্যাবসায়িরাও জড়িত!

অবাক হচ্ছেন, কিভাবে তারা জড়িত সেটা ভেবে? চলুন ভেবে দেখি আর তারপর……
যারা আপনারা যারা ইভেন্ট ব্যাবসা করছেন, তারা কি তাদের দায় মেটাচ্ছেন একটুও? আপনারা কি ব্যবসার বাইরে আর কিছু বোঝেন না?

তার মানে এই নয় যে আমি ইভেন্ট ব্যবসাকে অপছন্দ করছি। মোটেই সেটা নয়। আমি আপনাদের উদ্যেগ আর নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজের মত করে কিছু করে চলাটাকে অনেক সম্মান করি। শ্রদ্ধা করি। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন আপনাদের ব্যবসার ফাঁদে পরে, চাপে পিষ্ট হয়ে, সাধারণ, অল্প আয়ের, নিজ উদ্যেগে, কলেজ বা ভার্সিটির হাত খরচ বাচিয়ে যে ছেলে বা মেয়েটি বেড়াতে যেতে চায় বা চাইছে তাদের কি হবে?

নাহ ভাবেন নি। একদম ভাবেন নি। যদি ভাবতেন তাহলে পর্যটনের আজ এই দশা হতোনা কিছুতেই। কারন আপনারা বড়-বড় কর্পোরেট ট্যুর করে, বিশাল-বিশাল টিম নিয়ে যান, এক সাথে ৫০/৮০/১০০/২০০ জনের। তখন তো আপনাদের মত মালদার পার্টি দেখে, ৫০০০ টাকার চাদের গাড়ি ৮০০০ বা ১০০০০ হাজার টাকা চাইবেই। আর আপনি যেহেতু নিজের পকেট থেকে টাকা দিচ্ছেন না, নিচ্ছেন আপনার গ্রুপের সবার কাছ থেকে, তাই তাদেরও খুব একটা গায়ে লাগেনা দিতে। কারন ৫০ জনের টিমের মাথা প্রতি কতই বা আর আসবে?

কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু… যে ছেলেটি, মেয়েটি বা কলেজ-ভার্সিটির কয়েকজন বন্ধু মিলে সাজেক যেতে চাইছে বা গিয়ে জানতে পারছে, ৫০০০ টাকার গাড়ি এখন ১০০০০ টাকা চায়! তখন সে কি করবে? যে ছেলেটি একা একা গিয়েছে, কারো সাথে শেয়ারে যাবে ৪০০/৫০০ টাকা দিয়ে সে যখন জানে যে যেতে-আসতে ১০০০ টাকা লাগবে তখন তার কি হবে? সে তো আর যেতেই পারবেনা ভাই! কারণ,  তার তো সাকুল্যে বাজেটই ছিল ২৫০০/৩০০০ টাকা। এখন কি করবে?

ঠিক একই রকম চিত্র পার্বত্য এলাকায়, গাইড, নৌকা আর ঘর ভাড়ার ক্ষেত্রেও! কারা করেছে এটা? আপনারা, যারা কর্পোরেট ইভেন্ট ব্যাবসা করছেন নিয়মিত, বা বড় লোকের ছেলে মেয়েদের পাহাড়ে সেলফি তুলতে নিয়ে যাচ্ছেন আপনাদের লাভের ফাঁদে ফেলে! হ্যাঁ এই দায় আপনাদেরও কম নয়। কারন আপানাদের যা খুশি চাও, নাও, মনোভাব দেখেই স্থানীয় লোকজন ইচ্ছামত সবকিছুর দাম বাড়িয়েছে, ভাড়া বাড়িয়েছে, গাইডের রেট বাড়িয়েছে।

আপনি, আপনারা একবারও এমন ক্ষেত্রে কি বলেছেন যে না ভাই, আমরা আগের রেটে যাবো, আগের ভাড়ায় যাবো, আমাদের ইচ্ছামত যাকে খুশি তাকে নেব। কারো কোন ফালতু নিয়ম মানিনা? বলেছেন? বলে কেউ ফিরে এসেছেন? নাহ আসেননি!

একবার ফিরে আসতেন, দেখতেন নিজেদের পেটের ভাত জোটাতে ঠিক আগের যায়গায় ফিরে যেত, যেতে বাধ্য হত। কিন্তু আপনারা সেটা করেননি। যা চেয়েছে তাতেই সম্মতি দিয়েছেন, টাকা নিয়ে দিয়েছেন আপনার সদস্যদের কাছ থেকে! ব্যাস জব ডান। ক্লায়েন্ট খুশি! আর আপনিও। ব্যবসা তো হয়েছে। রেটে কি যায় আসে? কারন আপনার পকেট থেকে তো আর যায়নি একটা টাকাও। তাই আপনার মাথা ব্যাথাও নাই। স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে করে কার ক্ষতি হল, কাদের ক্ষতি হল, কতটা ক্ষতি হল? একবারও কি ভেবে দেখেছেন? নাহ দেখেন নি। কারন সেটার প্রয়োজন তো আপনার নাই।

আপনারা ওই ওদের মতই,
“পাইছেন টুরিস্ট, কামাইয়া লন!”

আর তাই যদি না হবে, যদি সত্যি দেশকে ভালোবেসে থাকেন, সত্যি যদি আপনাদের দেশপ্রেম থেকে থাকে, সত্যি যদি মনে প্রানে চান যে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত এগিয়ে যাক, দেশে টাকা দেশেই থাকুক, পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হোক।
আর সাধারণ মানুষ দেশের আনাচে-কানাচে নিজের ইচ্ছা মত অল্প খরচে ঘুরে বেড়াতে পারুক, তাহলে চলুন আপনাদের ঘোষিত কয়েকটি ইভেন্ট বন্ধ করে দিন। ওদেরকে জানিয়ে দিন আগের যায়গায় সবকিছু না গেলে আমরা আর যাবোনা। ইচ্ছা হলে গাইড নেব, না হলে নেবনা।

দেখুন ওরা কি করে, সবকিছু আপনার আমার মত করে করতে বাধ্য হবে। যেটা অন্য দেশের পর্যটন এলাকার মানুষরা করে, বেড়াতে যারা যায়, তাদের মত করে।

তা কি করবেন? সেই সাহস, সাধ্য, ইচ্ছা, সাধরন মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেম আর পর্যটনের প্রতি সত্যি কারের কোন টান আছে? চান কি মনে প্রানে যে আমাদের পর্যটনখাতও অন্যদের মত এগিয়ে যায়? তাহলে আসুন?

নাকি আপনিও এই দলে?
“পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই!”

Most Popular

To Top