টুকিটাকি

জীবন আর মৃত্যুর মাঝে অভিজ্ঞতা আসলে কেমন?

জীবন আর মৃত্যুর মাঝে অভিজ্ঞতা আসলে কেমন?- নিয়ন আলোয়

লেখার শুরুতে আমার খুব কাছের এক মৃত্যুমুখী মানুষের অভিজ্ঞতা বলে রাখি। ঐ লোকটি বেশ কিছুদিন দুরারোগ্য প্যানক্রিয়াস এর সংক্রমণে ভুগছিল। এক পর্যায়ে তার কথা অনুযায়ী এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়, সে দেখে তিনজন মানুষের সাথে সে কথা বলছে যাদের তিনজন এর কাউকেই সে চেনে না। আশেপাশে আলো অনেকটা সকালের আলোর মতো তবে আরো মনোরম, আরো সুন্দর। তার মনে হয়েছিল জগতের কোনো দুঃখ, শঙ্কা কিছুই নেই। এক অনির্বচনীয় আনন্দে আছে সে। এরপর সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার পর বারেবারে সে যেতে চেয়েছে ওই জগতে। মজার কথা হলো এরপর সে ক্রমশ সেরে উঠেছিল। জীবনের প্রতি কিছুটা দার্শনিক হয়ে গিয়েছিল তবে কোনো জায়গায় মানে সামাজিক ভাবে ওটা বলে নি সে। তবে কারণ খুঁজে বেরিয়েছে, তার এই অভিজ্ঞতাই এই লেখার মূল পুঁজি ভাবতে পারেন।

পাশ্চাত্যের বহু জায়গায় বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা এই মানুষদের নিয়ে প্রচুর আলোচনা,গবেষণা বা নিবন্ধন হয়েছে। আমাদের দেশের এক প্রবাসী মানে অনাবাসী ভারতীয় অনিতা মুরজানী বলে এক ক্যান্সার এর চতুর্থ ধাপ থেকে ফিরে এসে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রচুর কিছু বলেছেন যা যথেষ্ট আগ্রহের বিষয় ও হয়েছে। এর উপর একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে আলোচনা করতেই এই লেখার সূত্রপাত।

এই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার অভিজ্ঞতা বলা হয় মানুষের ইতিহাসের মধ্যযুগ থেকেই হয়েছে কারোর মতে ওটা প্রাচীন ইতিহাসেও আছে তবে এর চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্মত তথ্য-বিবরণ পাওয়া গিয়েছে ১৮ শতকে এক ফরাসি চিকিৎসকের ধারণ করা এই ধরণের ৫০টি এই ধরণের মানুষের অভিজ্ঞতার রেকর্ড থেকে। এর প্রকাশ করে ফরাসি চিকিৎসা সংক্রান্ত জার্নাল Resuscitation। আর যদি আধুনিক যুগে এই আলোচনার সূত্রপাতের কথা ধরেন তা হলে ওটা শুরু হয় ১৯৭৫-এ রেমন্ড এ মুডির হাতে। এই দার্শনিক পরবর্তীতে মনস্তত্ববিদ প্রকাশ করেন ‘Life After Life’ বলে একটি বই যাতে নিজের ধারণার সাথে ৫০টির মতো এই ধরণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

এছাড়া আরো এই ধরনের জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হতে থাকে তার মধ্যে মারিয়া বলে এক মহিলার অভিজ্ঞতা যাতে সিয়াটেলের একটি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় দেহের বাইরের অবস্থান এবং অদেখা এক জানালায় একটি টেনিস সু দেখা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হতে থাকে- এই ক্ষেত্রেও মজার হলো মহিলা তার অভিজ্ঞতার বিবরন দেওয়ার বেশ কিছু দিন পর আর জনসমক্ষে আসেন নি এবং পরবর্তিতে ওই অদেখা বস্তুর দর্শন নিয়ে তার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখার সুযোগ দেন নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ তে Heaven Is for Real নামে একটি সিনেমা ৯১ মিলিয়ন ডলার এর ব্যবসা করে। কাহিনী ছিল একটি কিশোরের, ছেলেটি একটি জটিল সার্জারির সময় প্রায় মৃত্যুমুখে চলে যায় এবং তারপর সে চেতনায় এসে এক স্বর্গ দর্শনের কথা বলে। এর উপর লিখিত বই ১০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয় এবং বেস্ট সেলার হিসেবে প্রায় ২০৬ সপ্তাহ বাজারে চলে। এছাড়া ও উপরে যেমন বলেছি মুর্জানির কথা তার লেখা বই আজো বিক্রি হচ্ছে প্রচুর। উল্লেখযোগ্য হলো এই অভিজ্ঞতার উপরে ইডেন আলেকজান্ডার এর প্রুফ অফ হেভেন বা স্বর্গের প্রমান এবং মেরি সি নীল এর টু হেভেন এন্ড ব্যাক বই দুটি বেশ জনপ্রিয়। প্রথমজন মানে আলেকজান্ডার মেনিনজাইটিস এর কারণে নিকট মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন আর মেরি নৌকা চালানোর সময় দুর্ঘটনায় একই অবস্থায় পড়েছিলেন। মজার কথা হলো, প্রথমে বলা ওই বেস্ট সেলার (বইটির নাম The Boy Who Came Back From Heaven) ছাপা হয়েছিল ২০১০ সালে, আর সিনেমার মুখ্য চরিত্র ঐ কিশোরটি পরে স্বীকার করে ওই অভিজ্ঞতা তার মনের মাধুরী দিয়ে তৈরী ছিল। যাক সে কথা, আসুন এর উপর একটু বৈজ্ঞানিক খোঁচাখুঁচি করি।

এইরকম হাজার হাজার NDE বা মৃত্যুর মুখোমুখি জগতের অভিজ্ঞতার কথা ইউটিউব বা বিবিধ ওয়েবসাইট বা বই হিসেবে পাবেন। এর অভিজ্ঞতা গুলো কে যদি একটু সাজিয়ে নেন তবে দেখবেন, দেশ কালের ফারাকে এই কাহিনীগুলো পাল্টে গিয়েছে। মূলত যা কিছু গবেষণা হয়েছে তার অধিকাংশ হয়েছে প্রথম বিশ্বের মানুষদের উপর। তাদের অভিজ্ঞতা এই রকম :

১. এক উজ্জ্বল শ্বেতকায় আলো,এর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তাদের ভাষায় পুরো আসেপাশে আলোকজ্ব্ল হয়ে যাওয়া এবং এক স্বর্গীয় অনুভুতি– এই আলোর অভিজ্ঞতা আমার অতি পরিচিত লোকটিরও হয়েছিল।

২. দেহ ছেড়ে বাইরে বিচরন এবং পারিপার্শিক জগৎ দর্শন বা অবশেষে পুরো পৃথিবী বা এই মহাবিশ্বের সার্বিক দর্শন। যত্রতত্র যাওয়ার এক বাধাহীন ক্ষমতা, প্রসঙ্গত এই যত্রতত্র যাওয়ার অভিজ্ঞতা ঐ লোকটিও বলেছে তবে জগত দর্শন নিয়ে কিছু বলেনি।

৩. অন্য এক জগতে প্রবেশ। অনেকেই মানে অধিকাংশের এক স্বর্গের আর কিছু অল্প মানুষের নরক দর্শনের অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া মৃত পরিচিত স্বজন বা নিজের বয়জ্যেষ্ঠ অথবা কোনো সাহায্যকারী কাউকে পাওয়া। আমার ঐ পরিচিত লোকটি অপরিচিত তিনজন কে দেখেছে যাদের তার নিজের মনে হয়েছিল কিন্তু এর বেশি কিছু না।

৪. এক সুরঙ্গের মধ্যে দিয়ে যাওয়া যার অন্য প্রান্তে ওই উপরে বলা অপার্থিব আলোকের উপস্থিতি- এক অদ্ভুত ভালো লাগা, জগতের কোনো দুঃখ, গ্লানি, অবসাদ, ক্লেদ কিছুই নেই। এক বাঁধাহীন আনন্দের অবস্থা, এই অবস্থার কথা বলেছিল আমার পরিচিত লোকটি তবে ঐ সুরঙ্গ ইত্যাদি কিছু বলে নি।

৫. অপার্থিব যোগাযোগ মানে তাদের মতে কথা বলার দরকার হয় না, তবে এই অভিজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে তাদের বলা হয় তাদের সময় হয় নি অথবা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই অভিজ্ঞতার উপর বিশেষ করে বলেছেন অনাবাসী ভারতীয় অনিতা মুর্জানি। না,আমার পরিচিত ব্যক্তি এই অভিজ্ঞতার কথা বলে নি তবে ওই জায়গায় যাওয়ার জন্য কয়েকদিন অসংযত হয়েছে, এক পর্যায়ে তাকে হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল।

৬. পুরো জীবন কে পর্যালোচনার সুযোগ এর অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।

এছাড়া আরো অনেক বিস্তারিত বর্ণনা আছে, তাতে যাচ্ছি না তবে এর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষগুলো এই দর্শন বা অভিজ্ঞতাকে কোনো স্বপ্ন বলতে নারাজ। তাদের কাছে ওই অভিজ্ঞতা স্বপ্নের থেকে অনেক বেশি, বাস্তবের থেকেও বেশি বাস্তব। অনেকের এর পরের জীবন ভিন্ন হয়েছে, কেউ তার পেশা ছেড়ে দিয়েছে,কেউ তার সংসার আবার কেউ জীবন দর্শন এর পুরো ধারা পাল্টে ফেলেছে। এই অভিজ্ঞতা বা এর প্রচার কে বিজ্ঞানের নিরিখে দেখার ক্ষেত্রে মূলত কয়েকটি জিনিস কে দায়ী করা হয়েছে যেমন মস্তিষ্কে অক্সিজেন এর অভাব,এনেস্থেসিয়া মানে অপারেশন এর সময় অচেতন করার ওষুধের প্রয়োগের কোনো গরমিল অথবা শরীরের স্নায়বিক সমস্যা বা রাসায়নিক কোনো তারতম্যের কারণে হওয়া। অবশ্য এই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষেরা এই কারণগুলোকে মেনে নিতে রাজি নন।অপ্রাসঙ্গিক হয়ত হবে না তাই বলছি,আমার ওই পরিচিত ব্যক্তি প্রথমে এক বছর এক দোলাচলে ছিলেন পরে আবার যুক্তির পথে ফিরে এসেছিলেন।

বিজ্ঞান এই কর্মকান্ডকে স্বাভাবিক ভাবে নিজের ধারায় ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। স্যাম পার্নিয়া বা পিম ভ্যান যারা দুজনেই বিজ্ঞানী এবং সম্পৃক্ত বিষয়ে কাজ করছেন তারা তাদের গবেষণার কিছু ফলাফল প্রকাশ করেছেন। তারা চেষ্টা করেছেন এই মৃত্যকালীন বা জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার অবস্থা তৈরির চেষ্টা করে দেখতে আর দেখাতে চেয়েছেন ঠিক কি হয় এই অবস্থায়। এই কাজের জন্য তারা এই নিরীক্ষণ চালিয়েছিলেন ২০০০ হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের উপর।

তাদের এক কাজের দরকার ছিল কারন এই NDE বা মৃত্যুকালীন অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে উপরে বলা আলেকজান্ডার বা মেরি নীল অনেক বেশি চাঞ্চল্য তৈরী করেছিলেন যেহেতু তারা দুজনেই ছিলেন তাদের নিজের ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত দুই চিকিৎসক। মেরি ছিলেন সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদন্ডর শল্যচিকিৎসা বিভাগের প্রধান এবং পরবর্তীতে তিনি ব্যক্তিগত চিকিৎসক হয়ে যান। আরো আলোড়ন তৈরী করেন আলেকজান্ডার যিনি একজন স্নায়ু শল্যচিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ এবং ব্রিগহ্যাম বা হার্ভার্ড এর সাথে যুক্ত হয়েও এক অদ্ভুত তত্ব নিয়ে আসেন। তার নিজের কোমাতে যাওয়ার সময় তিনি এক গভীর অচেতনতায় মানে কোমায় চলে যাওয়ার দাবি করেন এবং তার ব্রেন অচল ছিল ওই দাবি করেন। তার দাবি ছিল তিনি দেহ ছেড়ে এসেছিলেন এবং এরপরে তার দাবি অনুযায়ী তার আত্মা ঈশ্বর,দেবদূত এবং এক অন্য ভুবনে বিচরনের দাবি করেন। এইখানেই বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীরা একটু সচল হয় বিষয়টি মানে এদের দাবির উপর একটু বেশি করে নিরীক্ষণ চালাতে আর এর ব্যাখ্যা করতে।

আলেকজান্ডার তার এই তত্ব বা দাবি নিয়ে কোনো সম্পৃক্ত বৈজ্ঞানিক জায়গায় মানে এই ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষদের কাছে তার এই বিষয়টি আলোচনার জন্য তুলে ধরেননি। পরবর্তীতে গবেষণাধর্মী জার্নাল এস্কয়ার এবং নাস্তিক বুদ্ধিজীবী এবং বিজ্ঞানবিদরা তার এই দাবির বিরুদ্ধে সরব হন। তাদের কাছে আলেকজান্ডার এর এই দাবি আর ওই উপরে বলা কিশোর এর গল্পে কোনো ফারাক ছিল না। এখন বিজ্ঞান একটু বেশি ফোকাস মানে লক্ষ্যস্থির করে অন্যভাবে,একটা বিষয় কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে ধাঁধা তৈরী করেছিল তা হলো ওই সময়ের মানুষের ওই অবস্থান এর কোনো তো কারণ থাকবে,ওটার কারণ খোজ শুরু হলো।

এই সন্ধিক্ষণে থাকা মানুষদের উপর কাজ করার সময় যুক্তিবাদী মানুষদের আরো কিছু সুবিধে হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির কারণে। মনে রাখবেন,এই জীবন ফিরে পাওয়া মানুষরা অধিকাংশই অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় ছিলেন ফলে প্রত্যেকটি ধাপ নিরীক্ষণের তথ্য আর ভিডিও পাওয়া গিয়েছে।এছাড়া মানুষকে অনেক বেশি পরিমানে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা গিয়েছে চিকিৎসাশাস্ত্রের নতুন নতুন প্রযুক্তির কারণে। যেমন ধরুন আজকাল প্রচুর মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা গেছে যাদের কোনো হৃদ্স্পন্দন বা নাড়ি পাওয়া যায় নি অথবা কোনো জটিল সার্জারির কারণে চিকিৎসক ওটা ইচ্ছা করেই করেছিলেন। এক্ষেত্রে কিন্তু ওই মৃতপ্রায় মানুষটির শরীরের তাপমান কমিয়ে নেওয়া হয়েছিল অত্যধিক কমে।

ঠিক এই রকম একটি সন্ধিক্ষণের বাস্তব চিত্র বিজ্ঞান পেয়ে গেল ১৯৯১ সালে। পাম রেনল্ডস বলে একজন আমেরিকান গায়িকার একটি জটিল অপারেশন হয় মস্তিষ্কের একটি টিউমার এর। অত্যন্ত সঙ্গিন অবস্থা ছিল পুরো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরন হওয়ার আশংকায় এক অসাধারন পদ্ধতি নেওয়া হয় যাতে মস্তিষ্কের পুরো রক্ত নিষ্কাশন করে দেওয়া হয়। তার মস্তিষ্ক আক্ষরিক অর্থে ৪৫ মিনিট মৃত অবস্থাতে রাখা হয়। এরপর অপারেশন শেষে আবার তাকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। জ্ঞান ফিরে এলে রেনল্ডস এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলেন, তিনি মৃত স্বজনের সাথে মিলিত হওয়া বা তার মস্তিষ্কের অপারেশনের মানে তার খুলি কাটার ড্রিল জাতীয় যন্ত্রের বর্ননা ও দেন। এছাড়া ও বলেন দেহ ছেড়ে থাকার কথা মানে আউট অফ বডি সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা।

বিজ্ঞান এর উপর কাজ করা শুরু করে,বিবিধ তথ্য উঠে আসে,আমরা জানতে পারি হৃদরোগের ক্ষেত্রে এই ধরণের অভিজ্ঞতার সংখ্যা প্রায় ১৮%, এগিয়ে আসে কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পৃক্ত বিভাগ। তাদের গবেষণায় তারা দেখায় এই ধরণের অভিজ্ঞতা অনেকটা আমাদের সাধারণ স্লিপিং ডিসঅর্ডার মানে ঘুমের কিছু অসামঞ্জস্য থাকায় যে অবস্থা হয়,তার একটি প্রতিরূপ মাত্র। এই পর্যায়ে হয় রেন্ডম আই মুভমেন্ট মানে চোখের ক্রমাগত ঘুর্নন অথচ ওই ব্যক্তি ওটা বুঝতে পারে না। আরো সোজা কথায় শারীরিক চেতনার আগে মস্তিস্ক জেগে ওঠে। ফলে তৈরী হয় এক স্বপ্নের সৃষ্টি। এই Rapid Eye Movement মানে REM হওয়ার জন্য দায়ী মস্তিষ্কের একটি অংশ যাকে বলে ব্রেন স্টেম। এই অংশ আমাদের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাথে মস্তিষ্কের বার্তা বিনিময় মানে সংযোগ রাখে এমন কি আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস থেকে শরীরের বিবিধ অঙ্গের সঞ্চালন ইত্যাদি করতে সাহায্য করে। মজার হলো এই কাজের জন্য আমাদের উচ্চতর মস্তিষ্কের অংশের কোনো সংযোগের দরকার হয় না। অর্থাৎ মস্তিষ্কের উচ্চতর অংশ যখন নিষ্ক্রিয় তখন এই অংশের কাজ চলা কোনো অস্বাভাবিক কাজ না।

এই সন্ধিক্ষণের একটা ব্যাখ্যা না হয় বিজ্ঞান দিলো কিন্তু ওই শরীর ছেড়ে থাকার অভিজ্ঞতা ?

হ্যাঁ, বিজ্ঞান আধাখ্যাঁচড়া কাজ করে না। বিজ্ঞানী এবং শরীরতত্ববিদরা এর উপর কাজ করতে গিয়ে দেখেন, অনেকসময় এই অভিজ্ঞতা ওই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা ছাড়াও হয়। অবশ্য এই আবিষ্কার হয়েছিল অনেকটাই হঠাৎ করে। এক মৃগী রোগীর চিকিৎসা করার সময় সুইস চিকিৎসক ডক্টর ওলফ রোগীর একটি ব্রেন ম্যাপিং করেন মানে তড়িৎ সংবেদনশীলতার খোঁজের জন্য ইলেক্ট্রোড স্থাপনা করেন রোগীর মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায়। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন মস্তিষ্কের কোন অংশ কি কাজ করে তার একটা পুরো হদিস বের করতে। এই ইলেক্ট্রোড হলো এক ধরণের বৈদ্যুতিন যন্ত্র যা দিয়ে তিনি এক একটা অংশ উত্তেজিত করে নিয়ন্ত্রনের খোঁজ নিচ্ছিলেন।এই অবস্থায় এক পর্যায়ে ওই মহিলা (রোগী ) ওলফকে বলেন তিনি উপরে বিচরণ করছেন মানে দেহ ছেড়ে উপর থেকে দেখার একটা অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

ডক্টর ওলফ খুঁজে বের করলেন মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ নাম angular gyrus (বাংলা করতে অক্ষম) যা উত্তেজিত করলে এই শরীর এর বাইরে থাকার এক অভিজ্ঞতা হয়। মজার কথা প্রতিবার এই অংশ কে উত্তেজিত করে একই ফলাফল এলো। আমরা আরো জানতে পারলাম এই অংশের মানে The temporoparietal junction তে আমাদের পরিবেশের বা বহিঃস্থ কোনো দৃশ্য,শব্দ ইত্যাদির গ্রহণ বা শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো অবস্থার তথ্য একই সাথে বিশ্লেষণ করে একটি চিত্র তুলে ধরার কাজ হয়। মানে আপনার সব দেখা শোনার বা অনুভূতির সংমিশ্রণ করে একটি নিজস্ব ছবি আপনাকে উপহার দেয় এই অংশ। পাঠক, আমরা অনেকেই ঘুমের মধ্যে আকাশে উড়ে বেড়ানোর সুখময় স্মৃতি নিয়ে থাকি, ওটা ও কিন্তু একই অংশের কর্ম !

শেষ হইয়া ও শেষ হইলো না !

কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয় আর ওলফ এর যুক্ত তত্ব আমাদের জানতে সাহায্য করেছে এই NDE মানে মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের সময় এই অপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার হয় কি করে কিন্তু ‘কেন’ হয় ওটা এখনো আমরা জানতে পারি নি। আমরা অপেক্ষা করছি স্নায়ুতন্ত্রের উপর আরো অনেক বেশি গবেষণার ফলাফলের উপর। হয়তো তারপর আমরা জানবো এই ‘কেন’ বিষয়টা। বিজ্ঞান এক বহতা নদীর মতো এবং মানুষ তার চরৈবতি বজায় রাখবে তার অস্তিত্ব যতদিন থাকবে। সবে তো কয়েকশো বছরের পথ চলা, হয়তো এই শতকের মধ্যেই এই রহস্য উন্মোচন হবে ততদিন এই অবগুন্ঠন থাকবে আমাদের বিস্ময় উৎপাদনের জন্য।

পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ ! আর হ্যাঁ, একদম শুরুতে যেই লোকটির বিষয়ে বলেছিলাম সেই লোকটি কিন্তু ধর্মীয় কোনো রাস্তায় হাটেনি বরং যুক্তির পথেই হেঁটেছে।

অবশেষে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি :

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

তথ্যসূত্রঃ

Most Popular

To Top