নিসর্গ

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (দ্বিতীয় পর্ব)

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (দ্বিতীয় পর্ব)- Neon Aloy

[আগের পর্বঃ পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (প্রথম পর্ব)]

“পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই!” পড়ে যদি আমাকে বাংলাদেশ বিদ্বেষী, দেশপ্রেমহীন বা ভারত ঘেঁষা মনে হয় তবে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আসলে হয়েছে কি, সব কিছুতেই বিতর্ক না আনলে কিছু মানুষের ঠিক কেমন যেন আরাম হয়না। তাই না বুঝে, উপলব্ধি না করেই, একটু খোঁচা দেয়া আর তার টুপটুপে রস আস্বাদন করা কিছু মানুষের কাছে দারুণ বিনোদনের। তারা না বোঝে ট্যুরিজম, না বোঝে তার রক্ষণাবেক্ষণ আর না বোঝে সেসব নিয়ে সচেতনতা বা একটু বিবেককে জাগ্রত করা কোন লেখার মর্ম। তাই তাদের কাছে ক্ষমা চাই।

এবার যে প্রসঙ্গ নিয়ে লেখার জন্য মানসিক চাপ অনুভব করছি সেই প্রসঙ্গে আসি। তার আগে একটু নিজের বিজ্ঞাপন না দিলে মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতে ভাব থেকে যাবে, তাই নিজের তৃপ্তির জন্য একটু বিজ্ঞাপনের অবতারণা। সেটা হল আমি সাধারণত সমালোচনা বা তেমন একটা সচেতনতামূলক লেখা লিখিনা। লিখতে ইচ্ছা হলেও মনকে বেঁধে রাখি বেশ কষ্ট করেই। কারণ, সচেতনতামূলক লেখা লিখতে গেলে সভ্য আর মাধুর্যতাপূর্ণ ভাষায় সেটা লেখা আমায় দিয়ে হবেনা। কিছু অযাচিত, অগ্রহণযোগ্য আর হয়তো অশ্লীল শব্দের সংযোগও হতে পারে! কারণ আমি যা লিখি, যা-ই লিখিনা কেন, সেটা আমার একান্ত আবেগ আর অনুভূতির শব্দে প্রকাশ মাত্র। যারা আমার সেইসব ফালতু লেখা কমবেশি নিয়মিত পড়েন তারা সেটা জানেন। কারো আনন্দের জন্য আমি লিখিনা। এবার তবে মূল প্রসঙ্গে আসি।

আমাদের নীতিনির্ধারকরা, আমাদের পর্যটন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বা লোকজন, স্থানীয় জন-প্রতিনিধি, প্রশাসক, পর্যটন ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা, যারা শুধু ছবি তুলতে আর সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে লাইক পেতে বেড়াতে যাই, তারা কেউই আমাদের পর্যটনের স্থানগুলো নিয়ে ভাবিনা। দেশের প্রকৃতি রক্ষা, পর্যটনের জন্য উপযোগী পরিবেশ, স্থানীয় খাল-নদী-নালা-ঝিরি-পাহাড়-সমুদ্রতীর বা বীচ, অরণ্য এসবের কি হল, টিকে থাকলো কি না থাকলো সেসব নিয়ে আমাদের ভাবার সময় কই? না সেসব নিয়ে একটুও ভাবিনা কিন্তু এইসব সম্পদ দিয়ে কিভাবে আর কত দ্রুত কিছু কাঁচা পয়সা উপার্জন করে নিজের আখের গোছানো যায় সেসব নিয়েই আমরা মত্ত।
তার প্রমাণ, আমাদের প্রতিটি পর্যটন স্পট। চলুন একে একে উদাহারণ দেয়া যাক।

সুন্দরবন

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (দ্বিতীয় পর্ব)- নিয়ন আলোয়

পাশের দেশ ভারত যেখানে জীব-বৈচিত্র রক্ষা, আরও বেশী পর্যটন উপযোগী করার জন্য তাদের সুন্দরবনের পাশে তো দূরের কথা, আশেপাশেও দেশ, সমাজ আর প্রকৃতির জন্য নিদারুণ হুমকি হয়ে আসবে এমন কিছু করা থেকে বিরত, সেখানে আমরা আমাদের অসম্ভব সুন্দর আর অপার সম্ভাবনাময়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবার মত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে নিজ হাতে উজাড় করে দেবার জন্য বদ্ধ পরিকর! ওরা ওদের অরণ্যগুলোতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাউকে প্রবেশের অধিকারই দেয়না পরিবেশ আর পশু-পাখির ক্ষতি হবে বলে!

কক্সবাজার

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (দ্বিতীয় পর্ব)- নিয়ন আলোয়

যে দেশে এমন একটা সম্পদ আছে সেই দেশ কিভাবে এখনো পর্যটনে উন্নত না হয়ে পারে আমি ভাবতেই পারিনা। যে দেশে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত রয়েছে, রয়েছে কোটি কোটি স্বল্প মূল্যের জনবল, সাথে লাগোয়া পাহাড়, সেই দেশে কেন অন্য কোন দেশের চেয়ে পর্যটনে পিছিয়ে থাকবে? পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী পর্যটনের সম্ভাবনা বা সবচেয়ে বেশী পর্যটক আকর্ষণের কেন্দবিন্দু সমুদ্র! যে কোন তারকা বা বিশেষ ব্যক্তিরা বেড়াতে বা ছুটি কাটাতে গেলে সবার আগে কিন্তু সমুদ্রকেই বেছে নেয়! তাহলে আমরা কেন সেই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছিনা? অথচ আমাদের রয়েছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর সম্ভাবনাময় সমুদ্র সৈকত!

সেন্টমার্টিন

পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই! (দ্বিতীয় পর্ব)- নিয়ন আলোয়

এটাকে আমি বলি, আমাদের সোনার ডিম পাড়া হাঁস! নয়তো কি? প্রথম যখন সেন্টমার্টিন যাই সেই ২০০৬ বা ২০০৭ সালে, তখন ওর রূপ দেখে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। এতটাই আবেশে আপ্লুত হয়েছিলাম, যে, জাহাজে করে ফেরার সময় কান্না চলে এসেছিল! আর সেই সেন্টমার্টিনেই শেষবার ২০১৫ সালে যখন গেলাম তখন কান্না পেয়েছে, তবে আনন্দে আর উচ্ছ্বাসে নয়, মায়ার বাঁধন ছিড়ে ফিরে আসার কষ্টেও নয়, ওর দুর্দশা, দুস্থ, রুগ্ন, হতচ্ছাড়া চেহারা দেখে, ওখানে আর এক মুহূর্ত থেকে নিজের বিষাদ বাড়াতে ইচ্ছে হয়নি তাই। ওটাকে একটা বস্তি বানিয়ে ফেলেছি আমরা দেশপ্রেমিকরা! শতশত দোকান আর হাজার হাজার হোটেল, কটেজ, ঘর-বাড়ি দিয়ে!

বাকিগুলো, জাফলং-রাতারগুল-বিছানাকান্দি-লালাখাল-পাংথুমাই-টেকেরঘাট-লাউয়াছড়া-মাধবকুণ্ড আরও যেন কি কি আছে ওদিকে? এসবের বর্তমান অবস্থা নাহয় নিজেরা নিজেদের বিবেকের কাছে জিজ্ঞাসা করে নিন?

শেষ করি প্রিয় আর পরকীয়ার মত নিষিদ্ধ কিন্তু অসীম আকর্ষণের, সীমাহীন সৌন্দর্যের বান্দরবান দিয়ে? একসময় বান্দরবান যেতাম আহা, কি উচ্ছ্বাস আর আনন্দ নিয়ে, হাজারো রোমাঞ্চ আর অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বুঁদ হয়ে। আর এখন? সব রুট নাকি প্রায় বন্ধ! নিরাপত্তার সমস্যা! আপনার কি তাই মনে হয়? আমার কিন্তু তেমন মনে হয়না। এসবই সিন্ডিকেট, একটা ভয় আর নিষিদ্ধতা তৈরি করে মানুষের নিষিদ্ধতার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করা, যেন অনেক টাকার বিনিময় অল্প অল্প করে মানুষকে নিয়ে অবিরাম ব্যবসা করে ইচ্ছেমত মুনাফা লোটা যায়! যদি সত্যিই নিষিদ্ধ হত, তবে কেউ কেউ তো সেসব যায়গায় যাচ্ছে, তার আবার নিরাপদে ফিরেও আসছে, সেটা তাহলে কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? নাফাখুম যেতে নাকি আজকাল ১০,০০০ টাকা লাগে!! নৌকা ভাড়াতেই নাকি ৫/৬ হাজার টাকা চলে যায়! কিভাবে, কোন যুক্তিতে, কোন হিসেবে? বান্দরবান থেকে রুমা যেতে রিজার্ভ জীপভাড়া ৫/৬ হাজার টাকা লাগে! যেটা আমরা ১৫০০ টাকায় যেতাম! গাইডের ভাড়া নাকি ইচ্ছেমত নির্ধারিত হয় আর গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক! কি অরাজকতা! নদীর পাথর তুলে পর্যটনবান্ধব রাস্তা বানানো হচ্ছে!!! ছবিতে দেখি আর আহ আহ করি? গাড়িতেই যদি যাবেন তবে বান্দরবান কেন? রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি আর কক্সবাজার তো আছেই, সেখানেই যান না কেন?

কেন এই সীমাহীন সম্পদের ভরপুর, অসীম সৌন্দর্যের লীলাভূমি, অপার আকর্ষণের প্রিয়তমাকে ধর্ষণ করছেন আপনারা?
ভালো সহনশীল ভাষায় বলার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি, তাই বাধ্য হয়েই লেখার সমাপ্তি টানছি…

কারণ যাই লিখিনা কেন, আমাদের চরিত্র হল… “পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই!”

বলে, লিখে, কোন লাভ নেই, হবেওনা…
কারণ আপনাদের মনোভাব, “পাইছেন টুরিস্ট, কামাইয়া লন!”

(চলবে)

Most Popular

To Top