বিশেষ

পল ওয়াকারঃ গতিই যার কেড়ে নিল জীবন

পল ওয়াকারঃ গতিই যার কেড়ে নিল জীবন

কেউ মেনে নিতে পারে নি পল ওয়াকারের অকালে রোড এক্সিডন্টে মারা যাওয়ার ঘটনাটি। ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস-এর খ্যাতিমান এই অভিনেতা চলে যাওয়ার জন্য এ রকম এক ভয়াবহ যাত্রা বেছে নিলেন! সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল পুরো পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার ভক্তকুল। আজ ২৯শে নভেম্বর। তার ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী।

পুরো নাম চতুর্থ পল উইলিয়াম ওয়াকার। জন্ম ১৯৭৩ এর ১২ই সেপ্টেম্বর। জন্মস্থান আমেরিকার ক্যালেফোর্নিয়া স্টেট এর ভ্যালেন্সিয়ায়। তৃতীয় পল উইলিয়াম ওয়াকার এবং শেরিল ওয়াকারের ৫সন্তানের সবচেয়ে বড় পল। মা শেরিল ওয়াকার ছিলেন সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং ফ্যাশন মডেল। মায়ের জনপ্রিয়তার হাত ধরেই শো বিজনেসে তার আগমন। মাত্র ২বছর বয়সে প্যাম্পার ডায়পারের বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন পল।

প্যাম্পার এর বিজ্ঞাপনে পল

তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় সান ভেলি ভিলেজ ক্রিস্টিয়ান স্কুলে। ১৯৯১ সালে স্কুল থেকে পাশ করার পর কমিউনিটি কলেজে মেরিন বায়োলোজি নিয়ে পড়াশোনা করেন। জ্যাক ইয়েভিস কস্তো ছিলেন তার সবচেয়ে পছন্দের মেরিন বায়োলজিস্ট। অভিনয়ের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণ থাকার দরুন মেরিন বায়োলজি ছেড়ে অভিনয়কে প্রথম পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে ‘ইন টু দ্য ব্লু’ সিনেমার পর মেরিন বায়োলজির প্রতি টান আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তার এবং ২০০৬ সালে তিনি ফ্লোরিডার ‘বিলফিশ ফাউন্ডেশন’ এর পরিচালনা পরিষদে যোগদান করেন।

মা শেরিল ওয়াকারের সাথে পল

ছোটকাল থেকেই ছিলেন মায়ের মতই আত্মপ্রত্যয়ী এবং সুদর্শন। চলচ্চিত্রের জগতে জায়গা করে নেওয়ার জন্য এরচেয়ে বেশি আর কি লাগে? তাই ১৩ বছর বয়সেই পান প্রথম অভিনয়ের সুযোগ। ১৯৮৫সালে ‘মনস্টার ইন দ্যা ক্লোজেট’ মুভি দিয়ে তার সেলুলয়েডের দুনিয়ায় পথ চলা শুরু। এরপর অনেক ধারাবাহিক টিভি নাটকে অতিথী চরিত্রে অভিনয় করে অনেক সুনাম কামান।

‘মনস্টার ইন ক্লোজেট’ এ পল ওয়াকার

খুব অল্প বয়সে শো-বিজনেসে পদচারণা শুরু হলেও জনপ্রিয়তা পেতে খানিকটা সময় লেগেছিল তার। বেশ কিছু ধারাবাহিক নাটকে অতিথি শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। সেখানে অভিনয় করার পাশাপাশি কিছু সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভার্সিটি ব্লু’ ও ‘শি ইজ অল দ্যাট’ সিনেমা গুলোর মাধ্যমে প্রথম দর্শকদের নজরে আসেন পল। তবে সেটা ছিল মাত্র শুরু।

‘ভার্সিটি বুল’ সিনেমায় পল

২০০১ সাল থেকে শুরু হওয়া ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ছবিতে ব্রায়ান ও’কনর চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন। তার ‘রোল অফ লাইফটাইম’ ছিল সেই ব্রায়ান ও’কনর। ছবিতে গাড়ির বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক কসরত তিনি নিজেই সম্পন্ন করতেন।

‘দ্যা ফাস্ট এড দ্যা ফিউরিয়াস;সিরিজের প্রথম পর্বে পল

এ পর্যন্ত ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ছবিটির ছয়টি পর্ব বের হয়েছে। ছয় পর্বের প্রতিটিতেই তিনি সফলভাবে অভিনয় করেন। ২০০১ সালে ‘দ্য ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ সিনেমা দিয়ে নিজের জনপ্রিয়তার পাল্লা আরো ভারী করেন। বিশেষ করে তরুণ দর্শকদের মাঝে। ‘ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ সিরিজের প্রথম এই সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের। সিরিজের দ্বিতীয় সিনেমা ‘টু ফাস্ট টু ফিউরিয়াস’ হাজির হয় এর ঠিক দু’বছর পর। এবারে নায়ক পল ওয়াকার। পলের দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের ফলে আগের পর্বের ভিন ডিজেল ছাড়াই সিনেমাটি বক্স অফিসে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়। সমালোচকদের প্রশংসা না পেলেও ৭৬ মিলিয়ন ডলার বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি আয় করে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ডলার।

‘টু ফাস্ট টু ফিউরিয়াস’

২০০৬ সালে পল ওয়াকার এবং ভিন ডিজেলদের বাদ দিয়ে তৃতীয় সিনেমা মুক্তির পায়। পরবর্তীতে সিরিজের চতুর্থ সিনেমা ‘দ্য ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ এর মাধ্যমে ২০০৯ সালে তাদের দুজনকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে স্টুডিও। কারণ এই সিরিজের প্রাণ ছিল ওয়াকার আর ভিন ডিজেলের মধ্যকার কেমিস্ট্রি। তাই সিরিজের আগের সিনেমার গল্পের সাথে কিছু চরিত্র মিলিয়ে নতুন করে বানানো হয় ‘দ্য ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’।

২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্যা ফাস্ট এন্ড দ্যা ফিউরিতাস’ সিরিজের ৪র্থ পর্ব

এরপর ২০১১ সালে রিলিজ পায় সিরিজের ৫ম সিনেমা ‘ফাস্ট ফাইভ’। এই সিনেমায় তাদের সাথে যোগ দেন রেসলিং জগতের ‘দি রক’- খ্যাত ডোয়াইন জনসন। দর্শকের পাশাপাশি সমালোচকদেরও প্রসংশা কুড়িয়ে সিনেমাটি আয় করে ৬২৭মিলিয়ন ডলার।

‘ফাস্ট ফাইভ’

পরবর্তীতে ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিরিজের ৬ষ্ট পর্ব ‘ফিউরিয়াস সিক্স’ সমালোচকদের কাছে তেমন একটা সুনাম না পেলেও বক্স অফিসে ভালোই ব্যবসা করে।

ষষ্ঠ পর্ব ‘ফিউরিয়াস সিক্স’

মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি ৩০টি চলচ্চিত্র এবং ১১টি ধারাবাহিকে অভিনয় করেন। ২০০৩ সালে তিনি টু ফাস্ট টু ফিউরিয়াস ছবিটির জন্য ‘টিন চয়েস অ্যাওয়ার্ড’ পান। এ ছাড়া তিনি জো রাইড, ইনটু দি ব্লু এবং টাইম লাইন ছাড়াও আরও কয়েকটি ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে নিয়মিত বাণিজ্যিকধর্মী সিনেমায় কাজ করলেও ২০০৬ সালে ক্লিন্ট ইস্টউড পরিচালিত ‘ফ্ল্যাগস অব আওয়ার ফাদার’ এর মাধ্যমে  অভিনেতা হিসেবে নিজের দক্ষতার পরিসর দেখিয়ে দেন তিনি।

‘ফ্ল্যাগস অব আওয়ার ফাদার’ মুভিতে পল

ব্রিক ম্যানশনস ও ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ৭ ছবি দুটি নির্মাণাধীন ছিল। দুঃখের বিষয় সিনেমার কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান পল ওয়াকার। ৩০ নভেম্বর ২০১৩, টাইফুন হাইয়ানের শিকার মানুষদের জন্য গঠিত চ্যারিটি থেকে ফেরার সময় ভালেন্সিয়ায় তিনি এবং তাঁর বন্ধু রজার রোডাস এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। রোডাস গাড়িটি চালাচ্ছিলেন আর সেদিন তার পোরশের প্যাসেঞ্জার সিটে ছিলেন পল।

পোরশের এই গাড়ীর প্যাসেঞ্জার সিটেই ছিলেন পল

রাস্তার সর্বোচ্চ গতিসীমা ৭০কিলো/ঘন্টা থাকা সত্ত্বেও প্রায় দ্বিগুন গতিতে চলতে থাকা সেই গাড়িটি হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সেটি রাস্তার পাশের আইল্যান্ডের গাছের সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারলে বিকট বিস্ফোরণের পর গাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। সেই আগুনেই দ্বগ্ধ হয়ে অকালেই মারা যান পল আর তার বন্ধু। বিস্ফোরণের কারণে তাদের শরীর এতটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ছিল যে, তাদেরকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে কষ্ট হয়েছিল। পুলিশের তদন্ত থেকে জানা যায়, গাড়িতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। তাছাড়া অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় কিংবা ড্রাগের চিহ্নও পাওয়া যায়নি তাদের মৃতদেহে। রোডাস ছিলেন পলের ‘কার পারফরম্যান্স শপ’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

এক্সিডেন্টের পর গাড়ীর অবস্থা

অভিনয় ছাড়াও রেসিংয়ের প্রতি তার ছিল ব্যাপক আগ্রহ। বেশ দক্ষভাবে গাড়ি চালাতে পারতেন। শুটিংয়ের সময় প্রায়ই নিজের স্টান্টগুলো নিজেই করে নিতেন তিনি। তাছাড়া রেসিং ইভেন্টেও যোগ দিতেন মাঝে মধ্যে। আর তার এই শখের ব্যাপারটিই হয়ে দাঁড়াল তার অকালমৃত্যুর কারণ। তার মৃত্যুর পর ‘ফাস্ট এন্ড দি ফিউরিয়াস’ মুভিতে ব্যবহার করতে হয়েছিল চারজন বডি ডাবলকে। তার মধ্যে দুজন ছিলেন পলের আপন দুই ভাই কডি এবং ক্যালেব ওয়াকার।

Most Popular

To Top