নাগরিক কথা

ক্যারিয়ার না সংসার?

ক্যারিয়ার না সংসার?

দৃশ্যপট এক
ফাইনাল পরীক্ষাটা শেষ করে মনে হচ্ছে বুক থেকে দশমণ ওজনের পাথর নেমে গেছে নাফিসার। এখন কয়েকটা মাস নিজের মত করে কাটিয়ে পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে হয় স্নাতকোত্তর এ ভর্তি হয়ে যাবে না হয় কোনো চাকরিতে ঢুকার চেষ্টা করবে। অলস বিকেলে বসে বসে গল্পের বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল সে, এমন সময় মা এসে নাস্তার জন্য ডেকে নিয়ে গেল তাকে। নাস্তার টেবিলে অফিস ফেরত বাবাও বসা। সাধারণ কিছু কথা বলার পরে নাফিসার মা গলা খাকারি দিয়ে নাফিসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলেন। নিজের কথা বলার পরে মা বাবা দুজনেই চোখাচোখি করে নিল। এরপরে বাবা বললেন, “দেখ মা, তুমি পড়ালেখা শেষ করেছ ভালো কথা, কিন্তু এখন কি একটু নিজের বিষয় নিয়ে ভাবা উচিত না?” এরপরে বাবা-মা মিলে যে কথাগুলো নাফিসাকে বললেন, তার সারমর্ম হচ্ছে উনারা এখন নাফিসার জন্য পাত্র দেখছেন কারণ এখন বিয়ের উপযুক্ত সময়, এখন বিয়ে না করলে তার বয়স চলে যাবে। আর নাফিসা যদি পড়ালেখা করতে চায় কিংবা চাকরি করতে চায় তবে তারা এমন ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন যে বিয়ের পরেও নাফিসার পড়ালেখা কিংবা চাকরি মেনে নেবে। সারাজীবন ধরে মেয়েকে পড়ালেখাসহ সমস্ত কিছুতে সাপোর্ট দেওয়া আধুনিকমনা মা-বাবার মুখ থেকে এসব কথা শুনে নাফিসা আজকে স্তব্ধ।

দৃশ্যপট দুই
নাফিসাদের সহপাঠী শাহেদের আজকে অনার্স ফাইনাল দেওয়া শেষ। নাফিসার মত সেও স্নাতকোত্তর কিংবা চাকরির কথা ভেবে রেখেছে। কিন্তু তার সাথে মা-বাবার যে কথোপকথনটুকু হয়েছে সেটি নাফিসার ঠিক উল্টোটা। সেখানে শাহেদকে তার মা-বাবা নিজের ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ দিতে বলেছেন এবং কোনো সাহায্য লাগলে তাদের জানানোর জন্যেও বলেছেন। শাহেদ এখন খুশিমনে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করছে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এইদুটি দৃশ্যপটের চিত্রায়ন অহরহ হয়।পাশ্চাত্যে মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়সের পরিবর্তে মেয়ের ক্যারিয়ার প্রাধান্য পেলেও আমাদের মত দেশে মেয়েদের ক্যারিয়ার নয় বরং বিয়েকেই বেশি মনোযোগ দিতে বলা হয়। তাইতো এদেশে মেয়েদেরকে নিয়ে প্রবাদ তৈরি হয়েছে যে “কুড়িতেই বুড়ি”। একটা ছেলে নিজের ক্যারিয়ার বানানোর জন্য তার পরিবার, সমাজ এবং স্ত্রীর কাছ থেকে যতটুকু সাহায্য পায়, তার অর্ধেক সাহায্যও একটা মেয়ে কল্পনা করতে পারেনা। আজকাল সরকারী চাকরির বয়স ত্রিশ হওয়ায় একটা ছেলে সাধারণত ত্রিশের মধ্যেই চাকরী নিয়ে নেয় এবং তারপরে পাত্রীর সন্ধান করতে থাকে। কিন্তু পাত্রী হিসেবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা খুজে ইন্টার পাস করা কিংবা ভারসিটির প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের কোনো ছাত্রী। আর বিয়ের আগে পড়ালেখা করতে দেওয়া হবে বললেও কয়েক বছরের মধ্যেই পাত্র কিংবা পাত্রপক্ষের পরিবার বলে যে পড়ালেখা বাদ দিয়ে এবার সংসার বাড়ানোর চিন্তা কর, ছেলের বয়স তো ত্রিশ পার হয়ে গিয়েছে, এরপরে কি বুড়োবয়সে সন্তান মানুষ করবে?

ব্যস, শিক্ষাজীবনে হয়তোবা স্বামীর চেয়েও তুলনামুলকভাবে ভালো ফলাফল করা মেয়েটির পড়ালেখার দরজা এখানেই বন্ধ হয়ে গেলো। তাকে হয়তোবা এখন থেকে গুনতে হবে বাচ্চার ন্যাপির সংখ্যা এবং সারাজীবন বেঁচে থাকতে হবে অতৃপ্তি নিয়ে। আর এই অতৃপ্তি কখনো স্বামীর দেওয়া দামী গয়না এবং শাড়ি দিয়ে দূর হবেনা। যে ত্রিশ পার হওয়া ছেলেটি একজন সদ্য বিশ-একুশ বছরের মেয়েকে বিয়ে করতে চায় তার কি উচিত না নিজের বয়সের সাথে মিলিয়ে পড়ালেখা শেষ করা কোনো উপযুক্ত বয়সের মেয়েকে বিয়ে করা? আর নিজের এই অনুচিত কাজকে জায়েজ করার জন্য সমাজ এর আরো একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ আছে এবং সেই প্রবন্ধের শিরোনাম হল “বেশি বয়সের মেয়েরা স্বামী বা শাশুড়ির কথা মানতে চায় না”।

কিছু পুরুষ আছেন শিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন শুধুমাত্র অন্যদের সামনে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য, ভাবটা হল এমন যে “এই দেখ,আমার বউ মাস্টার্স পাস”। সবার সামনে নিজেকে জাহির করা এই লোকটিই কিন্তু ঘরে এসে বউকে বলেন “তোমার চাকরির কি দরকার,আমার বেতনে কি তোমার চাহিদা পূরণ হচ্ছে না?” আবার এমনো অনেক মেয়ে আছেন যাদের বিয়ের পরে স্বামীর এবং পরিবারের মুখ রাখতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন নিয়ে গড়া ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। কারণ হয়তো তিনি স্বামীর চেয়ে বেশি উন্নতি করছেন চাকরিতে যা স্বামীর পুরুষালী অহমকায় আঘাত হানছে কিংবা স্বামী চান বউ চাকরি নয় বরং ঘর সংসার সামলাক।

আজকে যে পুরুষ আরেকটা মেয়েকে এভাবে বিয়ে করছে এবং স্ত্রীর ক্যারিয়ারের চারপাশে দেয়াল তুলে দিচ্ছে তার কি মনে হয়না যে হয়তোবা কোনো একদিন নিজের মেয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হবে। মা-বাবারা হয়তোবা মেয়ের অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বিয়ে নিয়ে পীড়াপীড়ি করেন। কিন্তু মেয়ে নিজে স্বাবলম্বী হয়ে যদি বিয়ে করে তাহলে মেয়ের যে “আমার টাকাই তো চলছ, নিজে তো সারাদিন বাসাতেই বসে থাক”, এই কথাটুকু আর শুনতে হয়না এটুকু কি তারা বুঝেন না?

যে পাত্র তাদের মেয়ের শিক্ষার অধিকার কিংবা ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে নিজের সম্পত্তি বলে মনে করে তার সাথে মেয়ে কতটূকু সুখী হবে সেটা কি চিন্তার বিষয় নয়? ২৫শে নভেম্বর নারীদের প্রতি সহিংসতা কিংবা নির্যাতন বন্ধের দিবস হিসেবে পালন করা হয়, কিন্তু প্রতিটা মেয়েকে যে জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরেই সমাজ এমনকি নিজের পরিবারের কাছ থেকেও ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা বাদ দিয়ে বিয়ে করার এবং স্বামীর ইচ্ছাকেই নিজের ক্যারিয়ারের ইচ্ছা ভাবার জন্য প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তার খবর কে রাখে? যেখানে মা-বাবাই মেয়ের উচ্চশিক্ষা কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত নন সেখানে অন্যের ছেলে যে মেয়েকে ক্যারিয়ার গড়া বা পড়ালেখায় সাহায্য করবে এটা তারা ভাবেন কিভাবে?

আমাদের নিজেদের ঘরেই এমন অনেক মা আছেন যারা নিজের উচ্চশিক্ষার ইচ্ছাকে স্বামী এবং সংসারের সুখের জন্য বিসর্জন দিয়ে স্বামীর ক্যারিয়ারের পদোন্নতির খবরে খুশি হওয়ার ফাঁকে নিজের কথা ভেবে দীর্ঘনিঃশ্বাস চাপা দেন। অনেকদিন আগে ভারতীয় একটা গহনার বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম,সেখানে বলা হয়েছিল যে সমাজের কথায়, বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে কিংবা বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে নয় বরং নিজে মানসিকভাবে প্রস্তুত হলেই তারপরে বিয়ে করুন”। কিন্তু এই গহনার বিজ্ঞাপনের কথাগুলো আমাদের সমাজে অচল। এখানে ক্যারিয়ার এবং বিয়ের মধ্য থেকে মেয়েকে বিয়েকে বেছে নিতেই বাধ্য করা হয়।

Most Popular

To Top