ইতিহাস

মহারাজা জয় সিং, এবং তার ময়লাবাহী রোলস রয়েস!

অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার কতই না গল্প আমাদের জানা। আশেপাশের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেকের কাছে আমরা শুনেছি এইসব গল্প। কিন্তু ভদ্রভাবে কোন অপমানের প্রতিশোধের গল্প শুনুন আজ।

সময়টা ১৯২০ সাল। ১৭৫৭ সাল থেকে চলা ইংরেজ শাসনের দায়িত্বে তখন ছিলেন রানী ভিক্টোরিয়া। ইংরেজ সরকার চুটিয়ে শাসন ও শোষণ করছেন ভারত উপমহাদেশে। যদিও এতে ফয়দা শুধু ইংরেজ সরকারের। উপমহাদেশের জনগণ মোটেও খুশি ছিল না এহেন শাসনের। ভারতীয়দের প্রতি ইংরেজদের ব্যবহারেও ছিল অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। পদে পদে অপমানিত হয়েছে কত ভারতীয়! এমনি এক অপমানের ভদ্র প্রতিশোধ নিয়েছিলেন রাজা জয় সিং। তিনি ছিলেন আলওয়ার রাজ্যের রাজা এবং জাতে রাজপুত।

মহারাজা জয় সিং ১৯২০ সালে গেলেন ইংল্যান্ডে।  ভ্রমনের কোন এক বিকেলে একদিন সাধারণ পোশাকে রাজা জয় সিং হেটে যাচ্ছিলেন লন্ডনের চাকচিক্যময় পথ ধরে। পথিমধ্যে তিনি প্রবেশ করলেন তৎকালীন সময়ের বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোলস রয়েস এর শোরুমে। জানিয়ে রাখি, সে সময় রোলস রয়েস ছিল সবচাইতে অভিজাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান,যেকোন ধনকুবেরের একটি রোলস রয়েসের গাড়ী থাকা মানে অনেক মর্যাদা আর আভিজাত্যের ব্যাপার। তিনি ভাবলেন, দাম আর স্পেসিফিকেশন জিজ্ঞাসা করে আসবেন। কিন্তু সাধারণ পোশাকে থাকা মহারাজাকে সেলসম্যান পাত্তা দিলো না। গাড়ী টেস্ট ড্রাইভের কথা বলায় সেলসম্যান বললো, এই দরজা দিয়ে বের হয়ে যান। রাজা অপমান কাঁধে নিয়ে হোটেল কক্ষে গিয়ে তার কর্মচারিকে রোলস রয়েস শোরুমে সংবাদ দিয়ে পাঠালেন যে আলওয়ারের মহারাজা রোলস রয়েসের শোরুম ঘুরে দেখতে ইচ্ছুক। খবর শুনে শো-রুম কর্তৃপক্ষ রাজার সম্মানে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করলো। মহারাজা যখন রাজকীয় পোষাক পরিধান করে শো-রুমে উপস্থিত হলেন তখন তার জন্য রীতিমত রেডকার্পেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজা শো-রুমে থাকা ৬ টি গাড়িই কিনে ফেললেন। সাথে দিলেন ইন্ডিয়া পাঠানোর খরচ।

ইন্ডিয়া যখন গাড়ীগুলা পৌঁছালো, মহারাজা গাড়িগুলো শহর কর্তৃপক্ষকে দিয়ে বললেন, এগুলো শহরের ময়লা পরিষ্কারের কাজে লাগাও। বুঝতেই পারছেন রাজাকে অপমান যেনতেন ব্যাপার নয়। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে গেল সারাবিশ্বে, যে ভারতে রোলস রয়েসের গাড়িতে ময়লা আবর্জনা পরিবহন করা হয়। যেখানে রোলস রয়েসের গাড়ি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, সেখানে তখন থেকে পুর্ব থেকে পশ্চিম সবখানেই রোলস রয়েসের গাড়ি নিয়ে মানুষ ঠাট্টা করা আরম্ভ করল। বিশ্বের ১নম্বর গাড়ি রোলস রয়েসের মালিকের কানে যখন এই ময়লা টানার খবর গেল তিনি প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। আর সারা বিশ্বে রোলস রয়েস গাড়ির সুখ্যাতি ধুলিস্মাৎ হয়ে পড়ল। রোলস রয়েসের নাম উঠলেই “ভারতের ময়লা টানা গাড়ি” হিসেবে লোকের মুখে পরিচিতি পেতে লাগল।

ফলাফল খুবই ভয়ানক। সকলেই রোলস রয়েসের গাড়ি কেনা বন্ধ করে দিল, রোলস রয়েস পড়ে গেল মহাবিপদে,কারন তাদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। রোলস রয়েস কোম্পানী তাদের ভুল বুঝতে পেরে রাজা জয় সিংকে টেলিগ্রাম করে ক্ষমা চায় আর লন্ডনে আসার আমন্ত্রন জানায়। রাজা যথাসময়ে লন্ডনে গেলে রোলস রয়েসের সেই শো-রুম থেকে আরও ৬টি গাড়ি এবার বিনা মূল্যে মহারাজাকে দেওয়া হয়। মহারাজাও অবগত হলেন যে তারা অনুতপ্ত, তাই রাজাও রোলস রয়েসের গাড়িতে আবর্জনা পরিবহন বন্ধ করলেন। এটাই ছিল এক রাজার রাজকীয় প্রতিশোধ। অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার ভদ্র পদ্ধতি রাজা জয় সিং শেখালেন নাক উঁচু ইংরেজদের।

গল্পটা অনেক সুন্দর এবং যথেষ্ট মজার। কিন্তু এই গল্পের সত্যতা নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে। ইন্টারনেটে মহারাজা জয় সিং কে নিয়ে সার্চ করলে এইটা জানা যায় যে তিনি রোলস রয়েস গাড়ি ময়লা আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করেন। কিন্তু কেউ জানে না এই গল্পের সূচনা কীভাবে হয় এবং কয়জন আসল ঘটনা জানে? এই ঘটনার একটা ব্যাখ্যা হতে পারে সামনে ঝাড়ু লাগানো একটি রোলস রয়েসের ছবি।

এই গাড়িটি-ই হতে পারে সকল গুজবের উৎস!

গাড়ীর সামনের এই ২টি ঝাড়ু রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত হত। গাড়ীটি যে রোলস রয়েস তাতে কোন সদেহ নেই। কিন্তু রাস্তা পরিষ্কার করার ঘটনা কোন অপমানজনক কিছু না। ২য় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডনের রাস্তাঘাটে গাড়ি চলতো চাকার সামনে বাম্পারে দু’টো ঝাড়ু লাগিয়ে যেন জার্মান বোমার আঘাতে শহরের রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাঁচ আর সূঁচালো আবর্জনায় টায়ার পাংচার না হয়। আর এই ঝাড়ু লাগানো রোলস রয়েসের ছবিকেই যে কেউ মহারাজা জয় সিং-এর কাহিনী বানিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে না তার নিশ্চয়তা কি?

মহারাজার এই গল্প নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করে জানার চেয়ে এই গল্পটা বিশ্বাস করাটাই বেশি মজার। তাই এই গল্পের সত্যতার সঠিক যাচাই করার উদ্যোগ নেয়নি কেউ!

তথ্যসূত্রঃ দ্যা ভিনটেজ নিউজ।

Most Popular

To Top