বিশেষ

সুখী মনেই বিষাদ নিয়ে খেলা করতেন মানুষটি!

বারী সিদ্দিকীর মৃত্যুতে একটা যুগের অবসান হলো। একটি প্রতিষ্ঠানের দুয়ার চিরতরে বন্ধ হলো। কিছু কিছু শিল্পী থাকেন যাদের গান তারা ছাড়া অন্য কারো গলায় মানায় না, বারী সিদ্দিকীও সেই অল্প কিছু শিল্পীর মধ্যে একজন ছিলেন। তার মত দরদভরা কন্ঠ আমরা আর শুনবো না।

বারী সিদ্দিকীর বিশালতা বুঝতে হলে তার গান সরাসরি শোনা উচিত। কিন্তু আমরা সে সুযোগ চিরতরে হারিয়েছি। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং ফোক গানের অপূর্ব সম্মিলন বাংলা গানের এ প্রজন্মের শ্রোতারা সর্বপ্রথম তার কন্ঠেই শুনেছে। আমাদের দেশের শিল্পীরা খুব অভাগা হন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলে না, মৃত্যুর পরে মাতম শুরু হয়। অথচ জীবদ্দশায় তাকে সম্মানিত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র তা ভুলে যায়। বারী সিদ্দিকীর ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র তার ভুলের ব্যতিক্রম করেনি। কিন্তু বারী সিদ্দিকীর সময়ই তাকে মূল্যায়ন করেছে। বারী সিদ্দিকী সময়কে বাধ্য করেছেন তাকে মূল্যায়নের জন্য। তিনি তার দর্শকদের বোধের জায়গাতে আঘাত করেছেন। দর্শককে নাড়া দিয়েছেন কন্ঠ দিয়ে। ভাবতে শিখিয়েছেন, সবচেয়ে বড় কথা তিনি দর্শকদের শ্রোতাদের কাঁদতে দিয়েছেন, তবে সেটি কোন সস্তা প্রক্রিয়ায় নয়।

সদ্যপ্রয়াত এই শিল্পীর প্রথম ধ্যান-জ্ঞান ছিল বাঁশি । এতটাই ভালবেসেছিলেন যন্ত্রকে যে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন টানা বারো-তেরো বছর নিয়ম করে প্রতিদিন দশ ঘণ্টা করে বাঁশি বাজিয়েছেন। বাঁশিও তার সাথে প্রতারণা করেনি। ১৯৯৯ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ফ্লুট ফেস্টিভ্যালে তিনি পুরো উপমহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। বাঁশিই তার সঙ্গী ছিল, অবশ্য সে সময় তিনি এখনকার মত এতটা প্রচারের আলো পাননি।

হুমায়ূন আহমেদের সিনেমার মাধ্যমে যে তার প্রচার পাওয়া শুরু তা অনেকেই জানেন। কিন্তু বারী সিদ্দিকীকে যখন হুমায়ূন আহমেদের আবিষ্কার বলা হয়, তখন বারী সিদ্দিকীর সাথে অবিচার করা হয়। হুমায়ূন আহমেদের ছবিতে গান গাওয়ার আগেই বারী সিদ্দিকী নিজের খরচায় “শুয়া চান পাখি এবং আমার গায়ের যত দুঃখ সয়”  গান দুটি রেকর্ড করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ তাকে প্ল্যাটফর্ম দিয়েছিলেন কিংবা অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সুতরাং বারী সিদ্দিকী নিজেই নিজের আবিষ্কারক ছিলেন। তিনি অবশ্য হুমায়ূন আহমেদের প্রস্তাবের পরও দোটানায় ভুগেছেন কারণ তখন তিনি বাঁশি নিয়ে পৃথিবীর এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটে বেড়িয়েছেন। গান নিয়ে চর্চা করলে তার এ চর্চা ব্যাহত হবে তিনি জানতেন। প্রকৃতপক্ষে হলোও তাই।  এ নিয়ে আক্ষেপও করেছেন। তাকে লোকসম্মুখে আনার জন্য হুমায়ূন আহমেদ ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

আমরা বারী সিদ্দিকীকে বিষণ্ণতার গানে যতোটা পেয়েছি ততটা পাইনি অন্য কোন গানে। তার গলায় যে আবেদন ছিল তাতে মন টানেনি এমন পাষাণ ব্যক্তি খুব কমই পাওয়া যাবে। স্বভাবতই আমরা ভেবে নিয়েছিলাম যেই মানুষটা এতটা এফোর্ট দিয়ে কষ্টের গান গায় তার জীবনে তাহলে অনেক দুঃখ। কিন্তু বারী সিদ্দিকী আমাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে বলেছেন কষ্ট তিনি পেতেন, কিন্তু জীবনকে বুঝতে শেখার পর থেকে তিনি কষ্ট পাননি। অর্থাৎ বোধের পাখা মেলবার পর থেকে তিনি কষ্টকে কষ্ট মনে করেননি। তার জীবন নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। এতটা না পেলেও তিনি সন্তুষ্ট হতেন। এখানে কিন্তু বারী সিদ্দিকীর জটিল মনস্তস্ত্বের একটা উদাহরণ পাওয়া যায়। বারী সিদ্দিকী গান করতেন ভেতর থেকে আর ভেতর থেকেই সেই কষ্টটাকে উপলব্ধি করতে হবে। যার জীবনে যিনি সন্তুষ্ট তিনি ভেতর থেকে কষ্ট উপলব্ধি করে গান গাইছেন এটা কিন্তু খুব একটা দেখা যায় না। জীবন দর্শনের সাথে সাথে অনেকসময় শিল্পীকে বুঝতে সুবিধা হয়। কিন্তু বারী সিদ্দিকী এই জায়গাটাতে ধাঁধা হয়ে আছেন। তার জীবন দর্শনের সাথে তাকে মেলাতে গেলে তাকে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

আমাদের লোকসংগীতের পথ প্রদর্শক আব্বাসউদ্দিন, আব্দুল আলীমের মৃত্যুর পরে ধারাটা থেমে যায়। সে ধারাটাতেই বারী সিদ্দিকী নবরূপ দান করেছেন। নবরূপ দন করেছেন বলতে গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে ফোক মিউজিক নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। এবং সেই এক্সপেরিমেন্টে দারূন ভাবে সফল তিনি। বারী সিদ্দিকী মূলত তো ক্লাসিকাল মিউজিকের মানুষ ছিলেন। তার জন্মস্থান নেত্রকোনায়। নেত্রকোনার একটা ছাপ সারাজীবন তার গানের মধ্যে ছিল। বারী সিদ্দিকী বলেছেন তার গানের জন্য তার অঞ্চল কিছুটা দায়ী। এই ক্লাসিকাল মিউজিক এবং ফোক দুইটার সমন্বয়েই বারী সিদ্দিকী তার আধ্যাত্বিকতার রসদ খুঁজে পেয়েছেন। বাংলা ফোক গানে অনেকেই ক্লাসিকাল মিউজিকের ব্যবহার করেছেন কিন্তু সেটা বারী সিদ্দিকীর মত সফলভাবে কেউ করতে পারেননি।

ব্যক্তিজীবনে জীবনে শুদ্ধতার প্রতি খুব খেয়ালী ছিলেন সদ্যপ্রয়াত বারী সিদ্দিকী। ভাল গান সৃষ্টির জন্য, মনে দোলা দেওয়া গান রচনার জন্য তিনি শুদ্ধতার পূজারী ছিলেন। গান যত ভালই হোক শিল্পীর মন যদি কলুষিত হয় তবে সে গান পাঠকের হৃদয় ছোঁবে না- এমনটাই বলতেন তিনি। সারাজীবন শুদ্ধতার চর্চাই করেছেন এ কারণে। তা নাহলে তার গলা দিয়ে যে আবেগ ঠিকরে ঠিকরে বাইরে আসে তা থেকে বঞ্চিত হতাম আমরা।

বারী সিদ্দিকীর বাঁশি নিয়ে খুব রোমান্টিসিজিম ছিলো। বাঁশি নিয়ে তিনি সাধনা কেন আরো করতে পারেননি অনেক সময়ই এই বিষয়টা তাকে পীড়া দিতো। অনেক ইন্টারভিউ তে বলেছেন তার খুব ইচ্ছা ছিল বাঁশি নিয়ে একক অনুষ্ঠান করার যেখানে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা বাঁশি বাজাবেন কিন্তু দেশে তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।  বিদেশে তার বাঁশির সুরের যথেষ্ট কদর ছিল জেনেভার ঘটনাটি দ্বারা আমরা এর প্রমাণ পাই।

ওপারে বারী সিদ্দিকী যেমনই থাকুক এপারে তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের অন্তরে, আমাদের বিষণ্ণতায়।

Most Popular

To Top