ফ্লাডলাইট

গলফ ক্লাবের সেই বল বয় আজ যখন দেশের গর্ব!

গলফ ক্লাবের সেই বল বয় আজ যখন দেশের গর্ব!- নিয়ন আলোয়

ক্রিকেট ছাড়া অন্যখুব কমসংখ্যক খেলাই বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরেছে। সেই খুব সংখ্যক খেলাটির মধ্যে একটি হচ্ছে গলফ। গলফ মূলত অভিজাতদের খেলা ,বড়লোকের ছুটির দিনে অবসর কাটায় এ খেলা খেলে এমনটাই ধারণা ছিল আমাদের দেশের মানুষের। কিন্তু আমাদের দেশের গলফের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন সিদ্দিকুর রহমান এ ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। রীতিমতো জীবনের সাথে যুদ্ধ করে তিনি আজকের সিদ্দিকুর হয়েছেন। জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজের জাত চিনিয়েছেন। পেশাদার গলফের দুনিয়ায় বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন। বাধ্য করেছেন বাংলাদেশের মানুষদের গলফ খেলার নিয়ম কানুন সম্পর্কে জানতে। শুধুমাত্র একক নৈপুণ্যে একটি খেলাকে বাংলাদেশের মানুষের সাথে পরিচিত করেছেন। বাংলাদেশে অন্য কোন খেলার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে বলে মনে হয় না।

আগেই যেমনটা বলা হয়েছে সিদ্দিকুর রহমানের পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো কিংবা তারকা বাবার তারকার সন্তান তিনি নন। স্পটলাইটে আসতে তাকে অনেক বেশী পরিশ্রম করতে হয়েছে। ১৯৮৪ সালের ২০ ই নভেম্বর অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক তেত্রিশ বছর আগে আজেকের এই দিনে মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা আফজাল হোসেন ও মাতা আনোয়ার বেগমের চতুর্থ সন্তান তিনি। জন্মের পর থেকেই সিদ্দিকুর অভাবের বেদনা বুঝতে পেরেছিলেন। আশির দশকে আফজাল হোসেন পরিবার সহ ঢাকায় চলেন আসেন। ঢাকা সেনানিবাসের কাছে অবস্থিত ধামালকোট বস্তিতে তারদীর ঠাই হয়। আফজাল হোসেন জীবিকার তাগিদে কখনও অটোরিক্সা ,কখনওবা চালিয়েছে ট্যাক্সি। এরই মধ্যে বেড়ে ওঠেন সিদ্দিকুর। সেই বস্তির পরিবেশে বখে যাওয়া , বিপথে যাওয়া খুব স্বাভাবিক ছিল কিন্তু সিদ্দিকুর পুথ হারাননি। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অভাবের সংসারে বাড়তি কিছু টাকা উপার্জনের আশায় কুর্মিটোলায় সেনাবাহিনীর গলফ ক্লাবে বল বয়ের কাজ শুরু করেন। সাথে সাথে খেলাটিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। ক্রমান্বয়ে বলবয় থেকে ক্যাডি তে প্রোমোশন পান। ততদিনে গলফ খেলার ভূত মাথায় বেশ ভালভাবেই ঢুকে গিয়েছে। গলফ ক্লাব কেনার সামর্থ্য ছিল না কিন্তু কামারের কাছ থেকে লোহা দিয়ে গলফ ক্লাব সদৃশ কিছু একটা তৈরী করেন।

২০০০ সালে একটি প্রতিযোগীতা মূলক গলফ আসর বসে বাংলাদেশ গলফ গলফ ফেডারেশনের আয়োজনে। সেখানে সুযোগ পান বলবয় থেকে ক্যাডি তে প্রোমোশন পাওয়া সিদ্দিকুর। সেই প্রথম কোচের অধীনে অনুশীলন করার সুযোগ পান তিনি। কোচের মতে সেই সময় সিদ্দিকুরের মত সিরিয়াস আর কেউ ছিল না । এই সিরিয়াসনেসের ফল হাতেনাতে পেতে শুরু করেন সিদ্দিকুর। একে একে ১২ টি অপেশাদার গলফ টুর্নামেন্টের শিরোপা বগলদাবা করেন।

এরপর দীর্ঘ আটবছর সিদ্দিকুর জাতীয় দলে ছিলেন। কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল প্রফেশনাল সার্কিটে যাওয়ার। সেজন্য প্রফেশনাল সার্কিটে জায়গা পেতে উঠেপড়ে লাগেন। প্রফেশনাল সার্কিটে ২০০৮ ও ২০০৯ এ তিনি গলফ ট্যুর অফ ইন্ডিয়াতে চারবার চ্যাম্পিয়ন হন। স্বাভাবিকভাবেই তার কনফিডেন্স লেভেলে অনেক বেড়ে যায়। এরপর নিজেকে যাচাইয়ের জন্য এশিয়ান ট্যুর কোয়ালিফাইং এ খেলতে যান কিন্তু বিধি বাম। এখানে আশানরূপ সাফল্য পেতে ব্যর্থ হন। তার জমানো টাকাও নিঃশেষ হয়ে যায়। সিদ্দিকুরের ভাষ্যমতে , “এই পর্যায়ে আমি আর্থিকভাবে একটা ধাক্কা খাই“। তারপর কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের পক্ষ থেকে তাকে তিনটি টুর্নামেন্টের রাউন্ডট্রিপ টিকিট দেওয়া হয়। যেখানে খেলে তিনি বেশ মোটা অংকের প্রাইজমানি পান। সিদ্দিকুরের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট শুরু হয় এখান থেকেই। ঐ বছরেই অর্থাৎ ২০১০ সালে ব্রুনাই ওপেনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে রীতিমতো সাড়া ফেলে দেন বিশ্ব গলফের দুনিয়ায়। তার একটু আঁচ এসে পড়ে দেশী মিডিয়াতেও। আমাদের দেশে সিদ্দিকুরের ব্রুনাই ওপেনের আগে গলফ নিয়ে সামান্যই নিউজ হতো কিন্তু সিদ্দিকুরের এহেন সাফল্যের পর পত্রিকায় পাতাজুড়ে গলফের নিউজ হতো, সিদ্দিকুরের সাফল্য নিয়ে ফীচার হতো।

২০১৬ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত রিও অলিম্পিক্কে তিনি ইতিহাস গড়েন। প্রথম বাংলাদেশী এথলেট হিসেবে সরাসরি অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। সেসময় সিদ্দিকুরের অভিব্যক্তি ছিল, “খবরটা শোনার পর রোমাঞ্চে শরীরটা শিউরে উঠেছিলো। অতীতে এত টুর্নামেন্ট জিতেছি কিন্তু কখনো এত আনন্দ হয়নি“।

সিদ্দিকুর রহমানের তেত্রিশতম জন্মদিনে নিয়ন পরিবারের পক্ষ থেকে তার জন্য প্রাণঢালা অভিনন্দন। আমরা আশা করি তার হাত ধরেই বাংলাদেশের গলফ উঠবে আরো উঁচুতে।

Most Popular

To Top