ফ্লাডলাইট

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!- নিয়ন আলোয়

“মহিমান্বিত থেকে উপহাসে পরিনত হতে একটি ধাপই যথেষ্ট” – নেপোলিয়ন বেনপোর্ত।

১৮১২ সালে মস্কো থেকে তাকে পলায়নে বাধ্য করার সময় উক্তিটি করেন। লাইনটি পুরোপুরি মিলে যায় আরেকজন ভূপাতিত ফুটবল সম্রাট আদ্রিয়ানোর ক্ষেত্রেও। পুরো নাম আদ্রিয়ানো লেইতি রিবারিও। জন্ম ১৭ই ফেব্রুয়ারী ১৯৮২ সালে ভিলা ক্রজিরোতে।

ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন ফ্লেমিঙ্গর যুবক দলের হয়ে ১৯৯৯ সালে। ১ বছর পার না হতেই দূর্দান্ত পারফর্মেন্সে জায়গা করে নেন সিনিয়র দলে। তার প্রথম গোলটি ছিল বোটাফোগোর বিপক্ষে ২ফেব্রুয়ারী ২০০০ সালে। তার অসাধারন নৈপূন্যে চোখে পরেন ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর। ২বছরের কন্ট্রাক্ট থাকা সত্ত্বে ও ২০০০ সালের জুনে পাড়ি জমান ইন্টার মিলানে। ১৩.১৪৯ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে নাম লিখান এই ক্লাবের হয়ে। ক্লাবের হয়ে প্রথম গোলটি ছিল রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। তখনও কেউ বুঝে উঠতে পারেনি কি লুকিয়ে আছে এই ছেলেটির ভিতর। সেই বছরই তাকে ফিউরেন্তিনাতে লোনে পাঠানো হয়। পরে ৮.৮ মিলিয়নে আড়াই বছরের চুক্তি হয় ফার্মার সাথে। সেখানে উন্থান শুরু হয় আদ্রিয়ানোর। আদ্রিয়ান মটুর সাথে যুগলবন্দীতে সে তার যাদু দেখাতে শুরু করেন। যুগলবন্দীর বদৌলতে পান ৩৬ ম্যাচে ২২ গোল!

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!- নিয়ন আলোয়

আদ্রিয়ানো লেইতি রিবারিও

তার পাওয়ার শট এবং আশ্চর্যজনক টেকনিক্যাল পাওয়ার তাকে অনন্য একজন করে তুলেছিল। তিনি অচিরেই স্টারে পরিনত হন এবং ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো তাকে সাইন করতে মরিয়া হয়ে উঠে। তার শক্তিশালী স্প্রিন্টিং, চেলেঞ্জগুলোকে কাটিয়ে ওঠা এবং ডিফেন্ডারদের ভ্যাবাচেকা খাইয়ে দেওয়া তাকে স্পেশাল ক্যাটাগরির মধ্যেই ফেলেছিল। এটি অবিশ্বাস্য ছিল কারন যা অনেক বড় বড় স্ট্রারইকাররা করতে পারত না তা সে খুব সহজেই করে ফেলত। উত্তর ইতালিতে তার অবিশ্বাস্য যাদু দেখে আাবারও তার সেই ইন্টার মিলানে ডাক পাওয়া সময়ের ব্যাপার ছিল। ২৩ মিলিয়ন ইউরো এর চুক্তিতে সে আবার ইন্টারে ফেরত আসে এবং ৪ বছরের চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি।

বড় ক্লাবের সামনের সারির যোগ্য নয় বলে যে বালকটিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই এখন ইন্টারের আল্টিমেট সামনের সারির প্লেয়ার। বাম পায়ের অবিশ্বাস্য শট এখন আরও সবল, আর তার অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাসে প্রতিদিনই নতুন কিছু করতে থাকেন এবং অচিরেই দূর্ধর্ষ স্ট্রাইকারে পরিনত হন । ফ্যানরা তার নাম দেয় “The EMPEROR”

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!- নিয়ন আলোয়

২০০৪-২০০৫ সিজন দেশ ও ক্লাবের হয়ে অবিশ্বাস্য ৪২ গোল করেন তিনি । ২০০৪ সালে ব্রাজিলের হয়ে জিতেন কোপা আমেরিকা এবং তার অসাধারণ প্রদর্শনীতে সেই সিজনে গোল্ডেন বুট জিতেন। ২০০৫ সালে ইন্টারের হয়ে জিতেন কোপা ইতালিয়া। আদ্রিয়ানো যাদু এখানেই শেষ নয়। কনফেডারেশন কাপে তার অসাধারন নৈপুন্যে ব্রাজিল চাম্পিয়ন হয় এবং ছিনিয়ে নেন সেই বছরের কনফেডারেশন কাপের গোল্ডেন বুট। এই বছরই ছিল আদ্রিয়ানোর ক্যারিয়ারের সেরা বছর। বেতন বাড়িয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত চুক্তি করে নেয় ইন্টার মিলান। কেনই বা করবে না! যেখানে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো রেসে নেমেছিল এই সুপারস্টারকে দলে ভিড়াতে।

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!- নিয়ন আলোয়

কিন্তু, সেই ১২ মাস আর কখনই ফেরেনি আদ্রিয়ানোর জীবনে হঠাৎই হার্ট অ্যাটাকে মারা যায় তার বাবা। তার ক্যারিয়ারে নতুন মোড় নেয় ২০০৬ সালে।

“আদ্রিয়ানো আর তার বাবার সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। যেন এক আত্মা দুই প্রাণ! হঠাৎই একদিন ব্রাজিল থেকে ফোন আসে যে তার বাবা আর নেই। সে ফোনটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয় আর চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। তারপর থেকে আর কিছুই একছিল না। আমি শক্তিহীন ছিলাম। এখনও নিজেকে দোষ দিতে থাকি যে আমি কিছুই করতে পারিনি তখন” – জোভিয়ার জানোত্তি ( ক্যাপ্টেন ইন্টার মিলান এবং আদ্রিয়ানোর বন্ধু)।

যাকে মনে করা হত আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্টারইকার রোনালদোর কর্নধার সে হয়ে উঠল ফুটবলের ঝড়া পৃষ্ঠার কালো অংশ । অথচ ১বছর আগেই যার পায়ে বল দেখলেে ডিফান্ডারদের ঘাম ছুটত। অবনতি শুরু হতে লাগল তার খেলায়। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে এর প্রথম ছাপ দেখা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্মে ফর্মের তুঙ্গে থাকা স্টাইকারের খেলার ধরনের ছিটেফোঁটাও ছিলনা। ২টি গোল পেয়েছিলেন তিনি তাও আবার গ্রুপ স্টেজে। সেই বছর ফ্রান্সের সাথে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বাদ পরে ব্রাজিল।

কিছু মানুষ ছিল আদ্রিয়ানের এই অবনতি দেখে বিষ্মিত আবার পিতার সাথে তার যে সম্পর্ক ছিল, এতে কিছু মানুষ মোটেও বিষ্মিত হয়নি। পিতার মৃত্যুর পর ফুটবল তার জীবনে আর গুরুত্বপূর্ন বিষয় ছিলনা। মদই তার জীবনের সাথী হয়ে উঠেছিল। আর খেলার আগের রাতে পার্টি করা, খেলার পরের দিন পার্টি করা তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাড়িয়েছিল। আর ট্রেনিং এ না আসা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল তার।

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!- নিয়ন আলোয়

আদ্রিয়ানোর উশৃঙ্খল জীবনযাপন

“এটি দুঃখজনক “The EMPEROR” এর এই অবস্থা!” -ইতালিয়ান পত্রিকা গুলোর শিরোনামের অংশ ছিল।

ব্রাজিলের প্রাথমিক একাদশ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয় খুব শীঘ্রই ইন্টারের প্রাথমিক একাদশ থেকেও বাদ হয়ে যান তিনি। ফলে ২০০৬ সালে সাউ পাউলোতে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানেও তার খাম খেয়ালিপনা চোখে পড়ে। ট্রেনিং এ দেরিতে আসা, প্রতিপক্ষকে মাথা দিয়ে গুতো, ফটোগ্রাফারের সাথে ঝগড়া ইত্যাদি ঘটনা তার ক্যারিয়ারেরর ওপর আরও কালো দাগ ফেলে দেয়। কিন্তু ২০ ম্যাচে ১৪ গোল করে সে আবারও জোসে মোরিনহোর অধিনে উড়তে থাকা ইন্টারে ডাক পান এবং সিরিয়া, চাম্পিয়ন্সলীগে কিছু ম্যাচ জিতেন এবং ফামগুস্তোর বিপক্ষে ইন্টরের হয়ে ৭০তম গোলটি করেন । কিন্তু তার এই ফর্ম বেশিদিন টিকে নি। ফর্ম আরও নিম্নমুখী হতে থাকে এবং ইন্টার মিলান তাকে রিলিজ করে দেয়।

একটি ক্যারিয়ার যা বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল, আস্তে আস্তে তা নিভে যাচ্ছিল। পরিষ্কারভাবেই ফুটবলের প্রতি আদ্রিয়ানোর কোন ভালোবাসা অবশিষ্ট ছিলনা । একসময় যার প্রতিটি পদক্ষেপ বিজয়ের ধ্বনি মনে হচ্ছিল, স্বপ্ন ভ্রষ্ট ভগ্ন মানুষরূপে সে অবসর গ্রহন করেন। গোল, জীবনযাত্রা পরিশেষে টাকা পয়সা যেটি তার কষ্টের জীবনকে অন্যপথে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে সে বুঝতে পারে কেমন জীবননযাপন সে করছে এটি আসল ব্যাপার না। অবসরপ্রাপ্ত একজন মানুষ, যে কিছুদিন আগেও ছিল বিশ্বের সেরাদের সেরা, এখন ভিলা ক্রুজিরোতে তার ভালোবাসার মানুষগুলোর সাথে সাধারন জীবনযাপন করছে। তার ক্যারিয়ার যে এমনভাবে শেষ হবে কোনদিনও কেউ কল্পনাও করতে পারেনি!

এটি খুবই লজ্জাজনক যে তার মত সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত উপহার সম্বলিত মানুষ উপহারের প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু সবকিছু ছিন্ন করে যেখান থেকে স্বপ্নোন্থান শুরু সেখানে ফিরে যেতে চাওয়া আদ্রিয়ানোকে কেই বা দোষারোপ করতে পারে? দিনশেষে মাতৃভূমিকেই যে শেষ ঠাই হিসেবে চেয়েছে!

“I played with player I saw was talent became… wow. But I felt could do it longer was…. and couldn’t was Adriano. Because the way he was! he was an animal. He could shoot from every angle. Nobody could tackle him, nobody could take the ball from him, he was a pure beast” – ZALATAN IBRAHIMOVIC।

বর্তমানে তার জীবনাত্রা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। ব্রাজিলিয়ান পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে তিনি নাকি ব্রাজিলের ড্রাগ ডিলিং এর জনক পাউলো রোজিরো দে সউজা পাজ (মিকা)- কে তার একটি ব্রেজিষ্ট্রেশনকৃত বাইক দিয়েছেন। বাইকটি নাকি ব্রাজিলের রেড কমান্ডের সদস্যরা ড্রাগ পাচারে ব্যবহার করত। পরে যথেষ্ট প্রমানের অভাবে অভিযোগটি নাকোচ করা হয়। তবে লোকমুখে শুনা যায় তিনি এখন নাকি একটি গ্যাং চালান যেটি চোরাচালান,অপহরন ও মাদক পাচারের সাথে যুক্ত!

একসময়কার সুপারস্টার এখন গ্যাংস্টার! কেটে গেছে জীবনের অনেকটি বছর। এই পথ ভ্রষ্টতা হয়ত কারোরই কাম্য ছিলনা। কিন্ত বিধাতা যা লিখেন তাই তো হয় দুনিয়ায়! বেঁচে থাকুক “The Fallen Emperor”, ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন কখনই না হয় ফুটবল বিশ্বে- দিনশেষে এটিই ফুটবলপ্রেমিদের এটিই প্রত্যাশা।

Most Popular

To Top