টেক

রোবটের রাজত্বে আপনি কি রাবিশ?

রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় এসেছে ‘কিউট-দর্শন’ চাইনিজ রোবট। ওয়েটারের বদলে তারা কাস্টোমারদের খাবার সার্ভ করছে। মানুষজন বিপুল উৎসাহে সেখানে যাচ্ছে বা যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, যতটা না খেতে,তার থেকে বেশি রোবট দেখতে এবং তার সেলফি তুলতে। আবার অনেকেই আছেন যারা এর বিরোধীতা করছেন এই যুক্তিতে- যেখানে দেশে এত এত মানুষ এখনো বেকার বসে আছে, সেখানে দুজন মানুষকে চাকরি না দিয়ে এই রোবট-রেস্টুরেন্ট কতটা যৌক্তিক?

তাদের প্রশ্ন যথার্থ। প্রশ্নটি শুনে আমার সত্যজিৎ রায়ের ‘অনুকূল’ গল্পটির কথা মনে পড়ে গেল। সম্প্রতি গল্পটি অবলম্বনে একটি শর্ট-ফিল্ম নির্মিত হয়েছে, যেখানে রোবট হিসেবে অভিনয় করেছে পরমব্রত। তো ঘরের কাজের জন্য রোবট ব্যবহারের ফলে অনেক মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে, তাতে সেই মানুষ গুলো রোবটের বিরূদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে- এরকম একটা ব্যাপার ছিল সেখানে। আমাদের দেশে এখনো তেমনটি না হলেও সামগ্রিক ভাবে গোটা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ চিত্রটা অনেকটা এরকমই।

রোবট-রেস্টুরেন্ট যৌক্তিক কিছু কিনা, সেটা আমার বিবেচ্য নয়। এই সংক্রান্ত আলাপচারিতা দেখে দুটো কথা বলতে ইচ্ছে হল বলে বলছি। যিনি এই রোবট রেস্টুরেন্ট চালু করেছেন, সে লোক ঘাঘু ব্যবসায়ী। প্রযুক্তি না বুঝুক, অন্তত ব্যবসাটা বুঝে। দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় এখন রেস্টুরেন্টের রমরমা ব্যবসা। খাবার মোটামুটি সব গুলোতেই একই রকম জঘন্য, পাবলিক টানতে হয় তাই ‘থিম’ দিয়ে। এই যেমন- ভূত, গুহা, ছাদ এইসব দিয়ে। তো এই লোকও থিম হিসেবে নিয়ে এসেছেন ‘রোবট’। সেই সাথে তার চকচকে কপালে জুটে গেছে ‘দেশের প্রথম…’ তকমাটি। তিনি ব্যবসা করুন, আমরা বরং অন্য বিষয়ে আলাপ করি।

এখন চোখের সামনে মানব-সদৃশ রোবট দেখছেন বলে মনে হচ্ছে রোবট এসে আমার চাকরি খেয়ে দিল। কিন্তু যন্ত্র কর্তৃক মানুষের পেটে লাথি মারার ব্যাপারটা কিন্তু নতুন নয়, বরং বেশ পুরানো। কোন অফিসে যে কাজটি ম্যানুয়ালি করতে আগে ১০ জন মানুষের দরকার হত, সেই কাজটি একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে একজন মানুষই করে ফেলতে পারছে। তো এই একটা কম্পিউটার কি ৯ জনের চাকরি খেয়ে দিল না? ‘কোথাও কেউ নেই’- এর মুনার সেই দৃশ্যটির কথা ভুলে যাননি নিশ্চয়ই। অফিসে কম্পিউটার কেনা হচ্ছে, সেকারণে টাইপিস্ট মুনার চাকরি চলেও যেতে পারে- তার সেই শংকিত চেহারার কথা মনে আছে? তো রোবট-ওয়েটারের ব্যাপারটা অনেকটা এমনই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন গুজব শোনা যায়, এর রেজিস্টার বিল্ডিং এর অনেক কাজ এখনো ম্যানুয়ালি করা হয়, ডিজিটালাইজেশন করা হয়না, কারণ সেটা করলে অনেকের চাকরি চলে যাবে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তারা ‘অনুকূল’ এর কর্মচারীদের থেকে অনেক সংগঠিত। না হলে কী যে হত!

এখন অবস্থা যাই হোক, এটাই সমগ্র পৃথিবীর বাস্তবতা। মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য তৈরি হয়েছে যন্ত্র। প্রতিদিন নতুন নতুন যন্ত্র উদ্ভাবিত হচ্ছে, পুরনো গুলো হচ্ছে উন্নততর। এগুলো একদিকে যেমন মানুষের কষ্ট লাঘব করছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করছে, আবার একই সাথে এই কাজ গুলো যারা হাতে হাতে করতো, তাদের কর্মহীন করে ফেলেছে। এখন আর কাজ করার জন্য মানুষের দরকার নেই, এখন দরকার হয় যারা ওসব যন্ত্র গুলো চালনা করতে পারে- সেসব মানুষের। অর্থাৎ শ্রমিক নয়, এখন চাহিদা টেকনিশিয়ান এর, দক্ষ অপারেটরের। এটাই বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাস্তবতা। আমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক, এটাকে আমরা অস্বীকার করতে পারবো না।

তো বিশ্বের এই সামগ্রিক অবস্থায়, আমাদের অবস্থান কোথায়? কোন হিসাব বা ডাটা অ্যানালাইসিস ছাড়াই বলা যায় আমাদের অবস্থা অত্যন্ত সঙিন। আমরা এখনো শ্রমিক তৈরি করি। বিদেশে শ্রমিক পাঠাই। কিন্তু দৈহিক শ্রমের বাজার ক্রমশ সংকুচিত হবে। তখন কী হবে? আমাদের এখন দরকার দক্ষ মানুষ। কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ মানুষ। যারা দৈহিক শ্রম নয়, দিতে পারবে মেধা শ্রম। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকগণ এটা নিয়ে কতটা সচেতন সেটা আমার জানা নেই। এ নিয়ে তাদের কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আছে কিনা, সেটাও আমি নিশ্চিত নই।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যতই দিন যাবে যন্ত্র এসে দখল করবে অধিকাংশ স্থান, সেটা রোবট হিসেবে হোক বা কম্পিউটার বা অন্য যেকোন কিছু। সেই যন্ত্র গুলোকে হ্যান্ডেল করার মত, সেগুলো তৈরি বা মেরামত করার মত, সেগুলোকে অপারেট করার মত দক্ষ কারিগরীজ্ঞান সম্পন্ন জনশক্তি কি আমাদের আছে? কিংবা তৈরির কোন পরিকল্পনা আছে? আমরা কি নিজেদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করছি? না হলে, আর অল্প কিছু সময় পরেই সভ্যতার আবর্জনা হয়ে আমাদের দিন যাপন করতে হবে।

অবশ্য, এখন যে অবস্থা,সেটা আবর্জনার থেকে কিছুমাত্র ভালো আছে বলে মনে হয় না! আপনারা কী বলেন?

Most Popular

To Top