শিল্প ও সংস্কৃতি

প্রয়াণের এক দশকেও “চিরঞ্জীব সঞ্জীব”

প্রয়াণের এক দশকেও "চিরঞ্জীব সঞ্জীব"- নিয়ন আলোয়

সঞ্জীব চৌধুরীকে গায়ক হিসেবে কেমন ছিলেন ? তার মৃত্যুর দশ বছর পরে সময় তাকে মূল্যায়ন করে যাচ্ছে। সুতরাং, গায়ক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন এ প্রশ্ন উঠা অবান্তর। সঞ্জীব চৌধুরীর গানে সময়কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেয়ে সময়কে ধারণ করার তীব্র আকুতি দেখতে পাওয়া যায়। কালজয়ী কোন শিল্পী নন কিন্তু সময়কে যেভাবে ধারণ করেছেন , তা কোনভাবেই অবমূল্যায়ন করার মত নয়। তাইতো তার প্রস্থানের দশ বছর পরেও আলোচনায় থাকছেন।

সঞ্জীব দা কে বুঝতে কোন বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। একটা খোলা খাতার মতই তার গানগুলো। যে কেউ গানের সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারবে। সঞ্জীব দার সময়কে আমি নিজ চোখে দেখতে পারিনি। কারণ তার মৃত্যুর সময় আমার বোধের চোখ পাতা মেলেনি। ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় গিয়েছি। এক বড় ভাইয়ের মেসে উঠেছি। ঢাকা শহরকে খুব কাছ থেকে সেই প্রথমবারের মত দেখা। বড় ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক খুব সোজা না হলেও জটিল ছিল না। তার জীবনের কিছু পাতা আমারও পড়া ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তার প্রেম আসেনি। তা নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল না কিন্তু মাঝেমধ্যেই বলে উঠতো, “ভাইরে মাঝেমধ্যে হাতটা রাখার জায়গা থাকলে ভাল হতো”। আমি শুনতাম আর শুনতাম। তার মোবাইলে সারাদিন সঞ্জীব চৌধুরীর গান বাজতো। পড়াশোনার ব্যস্ততার কারণে আমাকে নিয়ে তেমন একটা ঘুরতে বের হত না।

কি মনে হলো তার সাথে সাথে আমিও আমিও সঞ্জীব চৌধুরীর গান শুনতে শুরু করলাম। তার গান আমার অপরিচিত ছিল না কিন্তু এবার নতুন করে বোধের জায়গায় আঘাত করলো। “বিকেল বেলা তোমার বাড়ির লাগোয়া পথ ধরে যাচ্ছে যখন, ফিরে ভুলে না হয় দিয়েই ছিল শীষ হাত ছিল নিশপিশ” এরকম আরো অনেক জায়গায় আমাকে একটা ধাক্কা দেয় । আমার ভাইয়ের অনুভূতি যেন কেমন করে আমার মধ্যে এসে ভর করে। আমি বয়সে ছোট না হলে তখনই ভাইকে সান্ত্বনা দিতে বসে যেতাম।

সঞ্জীব দার সবচেয়ে বড় ক্যারিশমা ছিল তার দুর্বোধ্যতা। তার দুর্বোধ্যতা ছিল সহজ সরলতায়। কেউ তাকে বুঝতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে এমনটা আমার মনে হয় না। নাগরিক জীবনের অনেক প্রতিচ্ছবি তিনি একেছেন সুনিপুন হাতে। নগর জীবনের ছোট ছোট উপলব্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার মত আর কেউ আছে কিনা আমার জানা নাই। তার গায়ক পরিচয় বাদ দিলে তার সাংবাদিক পরিচয় বড় হঠে কিন্তু আমার কাছে তার এসব পরিচয়ের চেয়েও বেশী যথার্থ মনে হয় যদি তাকে নাগরিক কবি বলা হয়। শিল্প–সাহিত্যে সময় ধরে রাখার ব্যাপারটা খুব জরুরী। আর এই সময় ধরে রাখার জন্য জন্ম নেন অনেক সাহ্যিতিক, গায়ক, চিত্রশিল্পী। আমি আগেই বলেছি সঞ্জীব চৌধুরী সময় আমার গন্ডির বাইরে ছিল কিন্তু তার কাজের মধ্য দিয়ে তার সময়কে আমি বুঝতে পেরেছি বা অনেকেই বুঝতে পেরেছে এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আগুন যেমন পোকাকে আকর্ষণ করে তেমনি সঞ্জীব দা সে সময়ের তরুণদের আকৃষ্ট করেছিলেন। তাদের বেদনাকে রাঙ্গিয়ে দিয়েছেন। শুধু বেদনাকেই রাঙিয়েই থামেননি তিনি নতুন আশাও দেখিয়েছেন। দশ বছর আগেও সঞ্জীব দা যেমন ছিলেন এখনও তেমনি আছেন।

Most Popular

To Top