ইতিহাস

নাম তার ছিল জন হেনরি

নাম তার ছিল জন হেনরি

এই গল্পের জন্ম হয়েছিল কালো রঙের মানুষদের মাঝে। এখন থেকে অনেক অনেক বছর আগে। এরা ছিল দিনমজুর। গ্যাসোলিন যুগের আগে রেইল রোড বসানোর কাজ করতো তারা। সেখানে তারা লোহার পাত বহন করতো, পাহাড় কাটতো আর খচ্চরের পিঠে করে মোট বয়ে নিয়ে যেতো। অতি সাধারণ, অবহেলিত এবং অনুল্লেখ ছিল তাদের জীবন। গর্ব, অহংকার করার মত কিছু ছিল না তাদের। তবে, এ কথাটা ঠিক নয়। একটা জিনিস নিয়ে তারা ঠিকই গল্প করতো। বুক ফুলিয়ে গর্বের সাথে তারা বলতো যে, জন হেনরির মত শক্তিশালী মানুষ এই পৃথিবীতে আর নেই।

জন হেনরি ছিল তাদেরই মত একজন। তাদের মতই রেইলরোডের টানেলে স্টিল বইতো। নয় পাউন্ড ওজনের একটা মুগুর দিয়ে হ্যান্ড ড্রিলকে পেটাতো ক্রমাগত। অসম্ভব কঠিন একটা কাজ। কিন্তু, এই কঠিন কাজটাও সে করতো হাসি মুখে, গান গেয়ে গেয়ে।

একদিন নির্মাণকাজের সাথে সম্পৃক্ত প্রকৌশলী নির্মাণ এলাকায় নিয়ে আসে একটি স্টীম ড্রিল মেশিন। শ্রমিকরা বাকরুদ্ধ হইয়ে যায় প্রকৌশলীর এই কাজে। জন হেনরি বুক চিতিয়ে জানান দেয় যে, কোনো মানুষ বা মেশিনের পক্ষে তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়।

হেনরির এই এক ঘোষণাতেই মেশিন এবং মানুষের বাজির লড়াই শুরু হয়। টানেলের গভীর থেকে গভীরে যাবার লড়াই। ডানপাশে জন হেনরি, বাঁ পাশে মেশিন। সূর্যাস্তের আগেই চৌদ্দ ফুট গভীরে চলে যান জন হেনরি। মেশিন তখনো পড়ে রয়েছ নয় ফুটে। শক্তি পরীক্ষার বাজিতে জেতার পরেই ক্লান্ত অবসন্ন হেনরি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। আর উঠেন না।

হেনরিকে নিয়ে গাথা হয়েছে অসংখ্য গান। এই সমস্ত গানগুলো ব্যালাড হিসাবে পরিচিত। প্রায় দুশোটি রেকর্ডেড ব্যালাড খুঁজে পাওয়া যায় জন হেনরিকে নিয়ে। আফ্রিকান আমেরিকানদের ব্লুজ হিসাবে খ্যাত গানের মধ্যে এটাই প্রথম। প্রথম রেকর্ডেড কান্ট্রি সং-ও এই জন হেনরি ব্যালাড। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের লোকসাহিত্য গবেষকদের মতে এটা আমেরিকার সবচেয়ে বেশি গবেষণাকৃত লোক গান। শুধু আমেরিকারই নয়, খুব সম্ভবত সারা পৃথিবীতেই এই গানকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে।

আফ্রিকান আমেরিকানদের কাছে জন হেনরি কিংবদন্তী, প্রবাদতুল্য ব্যক্তি। ফিলাডেলফিয়ায় একজন কালো মানুষ অন্য একজন কালো মানুষকে সম্ভাষণ জানায় এই বলে যে, “তোমার হাতুড়িটা ঠিকমত ঝুলছেতো?” কালো মানুষদের মধ্যে হাইপারটেনশন এবং হার্ট এটাকের হার অনেক বেশি। কার্ডিওলোজিস্টরা এর নাম দিয়েছেন জন হেনরি সিন্ড্রোম বলে। ক্লিভল্যন্ডের শ্রমজীবী মানুষদের বসতি এলাকা এবং ভার্জিনিয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষকেরা কালো ছেলেমেয়েদের তাদের ইতিহাস নিয়ে গর্বিত হবার জন্য, তাদের অনুপ্রেরণা দেবার জন্য জন হেনরির গল্প শোনাতো।

গত একশ বছর ধরে বেশিরভাগ ঐতিহাসিক এবং লোকসাহিত্য গবেষক ধরে নিয়েছিলেন যে, জন হেনরি কিংবদন্তী মাত্র, কাল্পনিক এক চরিত্র। বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই গল্প তৈরি করা হয়েছে গর্বিত হবার গণ আকুলতায়, অনুপ্রাণিত হবার প্রবল অভিপ্রায়ে। কিন্তু, নতুন নতুন গবেষণায় বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য। জন হেনরি বলে আসলেই কেউ ছিল। রক্ত মাংসের জীবন্ত একজন মানুষ। কাজ করতো রেললাইন বসানোর কোম্পানিতে, কুচকুচে কালো ইস্পাতের মত শক্ত পেশিবহুল বাহুর স্পর্ধিত অহংকারে হাতুড়ি পিটিয়ে পাহাড় কাটতো, পাথর গুঁড়ো করতো, লোহার পাতে ছিদ্র বানাতো।

কলেজ অব উইলিয়াম এন্ড মেরি-র ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্কট রেনল্ডস নেলসন  একটা গবেষণামূলক বই লিখেছিলেন Steel Drivin’ Man: John Henry, the untold story of an American Legend নামে। এই বইয়ে তিনি জন হেনরির লিজেন্ড খোঁজা শুরু করেন কিন্তু অবশেষে সত্যিকারের জন হেনরিকে আবিষ্কার করেছেন বলে দাবী করেন। শুধু তাই নয়, কোথা থেকে জন হেনরি সি এন্ড ও কোম্পানিতে এসেছে, কীভাবে জীবন যাপন করতো, কোথায় তাকে কবর দেওয়া হয়েছে তার সব আবিষ্কার করেছেন বলে মত দেন। কিন্তু কীভাবে জন হেনরি মারা গিয়েছে সেই রহস্য উদঘাটন করতে পারেন নি বলে জানান। জন হেনরিকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন ব্যালাডের ভাষা বিশ্লেষণ করে এবং তার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গবেষণা করে তিনি এই সকল তথ্যসমূহ উদ্ধার করেন।

নেলসনের মতে জন হেনরির গল্প শুধু গল্পই নয় এবং জন হেনরিও কোনো পুরাকথা নয়। ঐতিহাসিকেরা অনেকদিন ধরেই সন্দেহ পোষণ করছিলেন, আঠারো শতকের সত্তর দশক থেকে যে চারণগীতি ছড়াতে শুরু করে তা আসলে একজন সত্যিকারের রেলকর্মীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তবে, নেলসন তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার শেষে অসংখ্য দলিলপত্রের উপর ভিত্তি করে দাবী করেন যে, এই জন হেনরি আসলে ছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ইউনিয়ন পক্ষের একজন যোদ্ধা। মাত্র পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার একজন লিটলম্যান। এক গ্রোসারি দোকানে চুরির অভিযোগে সে জেলে যায়। ভার্জিনিয়ার কারাগারে থাকার সময় অন্য আরো অপরাধীদের সাথে সি এন্ড ও কোম্পানির হয়ে এলেগেনি মাউন্টেইনে টানেল খোঁড়ার কাজে স্টিল ড্রাইভার হিসাবে কাজে নিযুক্ত হয় সে।

নেলসন দেখতে পান যে, আঠারো শো সত্তরের প্রথম দিকে ভার্জিনিয়া স্টেট পেনিটেনশিয়ারি থেকে অসংখ্য অপরাধী সি এন্ড ও রেলওয়েতে কাজ করেছিল এবং অকাতরে মারা গিয়েছিল। জন হেনরির এক ব্যালাডের একটা লাইন উল্লেখ করেন নেলসন। যেখানে বলা হয়েছে যে, “তারা জন হেনরির লাশকে হোয়াইট হাউজের পাশে নিয়ে যায় এবং বালুময় মাটিতে তাকে সমাহিত করে।“ নেলসনের ভাষ্য অনুযায়ী এই কারাগারটি তখন সাদা রং এর ছিল সে কারণে একে হোয়াইট হাউজ হিসাবে ডাকা হতো। এই পেনিটেনশিয়ারির যখন ১৯৯২ সালে ভেঙে ফেলা হয়, তখন কর্মীরা এর পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে প্রায় তিনশত কঙ্কাল খুঁড়ে বের করে। নেলসন রাষ্ট্রীয় দলিলপত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজে আবিষ্কার করেন যে, এই ব্যক্তি, যাকে নিয়ে ব্যালাডসমূহ রচিত হয়েছে, তার আসল নাম জন উইলিয়াম হেনরি।

যদিও ঐতিহাসিক দলিলসমূহ ততটা জোরালো নয়, তারপরেও যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তাতে করে জন উইলিয়াম হেনরিকে একজন রেলকর্মী হিসাবে সনাক্ত করতে কোনো অসুবিধা হয় না। হেনরি একটা টিমের সাথে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার লুইস টানেল খোঁড়ার কাজে নিযুক্ত ছিল। এখানেই স্টীম ড্রিলের সাথে কর্মীদের হাতুড়ির লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সালের মধ্যেই জেলের রেকর্ড থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় জন হেনরি। অপরাধের মার্জনা পেয়েছিল নাকি খালাস পেয়েছিল, কিংবা প্যারো্লে মুক্তি পেয়েছিল তার কোনো রেকর্ডই সেখানে নেই। জেলখানার ভিতরেও সে মারা যায় নি। তাহলেও তারা রেকর্ড থাকতো। কাজেই, একটাই মাত্র পথ খোলা থাকে যে, কাজ করার সময়ে সে মারা গিয়েছিল।

কে ছিল এই জন হেনরি? নেলসন খুব বেশি কিছু তথ্য বের করতে পারেন নি অবশ্য তার বিষয়ে। তার বসবাস ছিল নিউ জার্সিতে। ১৮৬৬ সালে আঠারো বছর বয়সে পিটারসবার্গের কাছাকাছি সিটি পয়েন্টে ইউনিয়ন আর্মির হয়ে কাজ করে। একই বছরের এপ্রিল মাসে একটা গ্রোসারি স্টোরে চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয় এবং দশ বছরের কারাদণ্ড হয় তার। ভার্জিনিয়ার স্টেট পেনিটেনশিয়ারিতে পাঠানো হয় তাকে। এখানকার জেলরক্ষক জেলখানার আয় বাড়ানোর জন্য রেল কোম্পানিতে প্রতিদিন পঁচিশ সেন্টের বিনিময়ে পাঠানো শুরু করেন।

মেশিনের সাথে অসম লড়াইয়ের যে রোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ব্যালাডগুলোতে তার বিপরীতে গিয়ে নেলসন বলেছেন যে, এই লড়াই একপেশে ছিল, তবে তা মেশিনের পক্ষে নয়, বরং মানুষদের পক্ষেই ছিল। কারণ একক কোনো ব্যক্তি মেশিনের সাথে লড়তো না, বরং একটা দল মেশিনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। এই মেশিনগুলো উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ছিল ঠিকই, তবে প্রায়ই সেগুলো অকেজো হয়ে যেতো। এ ছাড়া এই মেশিন থেকে সিলিকনের কালো ধোঁয়া বের হতো প্রচুর পরিমাণে। ব্যালাডে যে রকম বলা হয়েছে যে, মেশিনের সাথে বিপুল বিক্রমে লড়াই করে নিদারুণ ক্লান্তিতে কিংবা হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে জন হেনরি মারা গিয়েছে, সেরকম নয়। বরং সিলিকনের কালো ধোঁয়া ক্রমাগত ফুসফুসে যাবার মধ্য দিয়ে আরো অনেক রেলকর্মীর মত জন হেনরিও মারা গিয়েছিল। সেখান থেকে তার লাশ এনে সাদা পেনিটেনশিয়ারির পাশেই গণ কবরে সমাহিত করা হয়।

নেলসনের এই বক্তব্যের সাথে একমত হন নি রসায়নের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর এবং লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর জন গার্স্ট। তার কথা হচ্ছে যে, লুইস টানেলে কাজ করা দুইশো জন অপরাধীর মধ্য থেকে জন হেনরি নামের একজনকে খুঁজে পাওয়া কোনো কিছুই প্রমাণ করে না। সবচেয়ে অবাকের বিষয় হচ্ছে যে, নেলসন মাত্র একজন জন হেনরিকেই খুঁজে পেয়েছেন, দুইজন বা তার বেশি নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জন হেনরি খুবই প্রচলিত একটা নাম ছিল।

জন হেনরি যে স্টিল ড্রাইভার ছিল তারও কোনো প্রমাণ নেই। সে শেকার হতে পারে, মাকার হতে পারে, ওয়াটার বয় হতে পারে, হতে পারে শার্পেনার কিংবা এমনকি হতে পারে পাচকও। এ ছাড়া জন হেনরির যে উচ্চতা তাতে করে তাকে সেরা স্টিল ড্রাইভার হিসাবেও মেনে নেওয়া যায় না। বরং রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, বব জোনস নামের এক ব্যক্তি লুইস টানেলের সেরা স্টিল ড্রাইভার ছিল।

লুইস টানেলে মানুষের সাথে মেশিনের প্রতিযোগিতারও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। নেলসন সমষ্টিগত প্রতিযোগিতার যে বর্ণনা দিয়েছেন তাও খুবই দুর্বল। কারণ হাতুড়ি ব্যবহার করা হতো আনুভূমিক গর্ত তৈরি করার জন্য এবং স্টীম ড্রিল ব্যবহার করা হতো উল্লম্ব গর্ত খোঁড়ার কাজে। কাজেই দুটো ভিন্ন ধরণের কাজের মধ্যে প্রতিযোগিতার কোনো প্রশ্নই আসে না।

জন হেনরি লুইস টানেলে মারা গিয়েছে এই ধারণাটাও চূড়ান্ত নয়। সে পালিয়ে যেতে পারে, যেরকম গিয়েছিল আরো অনেক অপরাধীই। জন হেনরির শবদেহ ভার্জিনিয়া পেনিটেনশিয়ারিতে নিয়ে গিয়ে দাফন করার যুক্তিটাও দুর্বল। এক্ষেত্রে নেলসনের যুক্তি ছিল যে, প্রতিজন পলাতক আসামীর ক্ষেত্রে রেল কোম্পানিকে একশ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। কিন্তু চুক্তিতে আসলে কথা ছিল প্রতিটা আসামীকে নিরাপদে ফেরত দিতে হবে। এই নিরাপদে ফেরত দেওয়াকে ভুল বুঝেছেন নেলসন, এবং ভেবেছেন যে জন হেনরির লাশকে পেনিটেনশিয়ারিতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর থেকে বরং এই ধারণা করাই সহজ যে, লুইস টানেলের ভিতরের কবরস্থানেই জন হেনরিকে কবরস্থ করা হয়েছিল। কারাগারে লাশ পাঠানোর চেয়ে এটাই অর্থনৈতিক দিক থেকে সুবিধাজনক ছিল।

নেলসন অবশ্য জন গার্স্টের এই সমস্ত সমালোচনাকে খণ্ডন করেছেন এভাবেঃ

আঠারো শ সত্তর সালে কালোদের মধ্যে জন হেনরি প্রকৃতপক্ষেই অপ্রচলিত নাম ছিল। ১৮৭০ সালের আদমশুমারিতে মাত্র সামান্য কিছু কালো লোকের নাম জন হেনরি ছিল। তাদের মধ্যে আবার বেশিরভাগই হয় কম বয়েসী ছিল নতুবা বেশি বয়েসী ছিল। আমি যে জন হেনরির কথা বলেছি, তার নাম আদমশুমারি এবং কারাগারের খাতায় একইভাবে লেখা ছিল। প্রফেসর গার্স্টের ধারণা অনুযায়ী এই জন হেনরি হাজারো জন হেনরির একজন হতে পারে, এই ধারণার কোনো যথাযথ ভিত্তি নেই। আঠারো আশি সালের পরে যখন জন হেনরির কিংবদন্তী লোকমুখে প্রচার হওয়া শুরু হয়েছে তখন ব্যাপকভাবে এই নামের ব্যবহার শুরু হয়।

জন হেনরির উচ্চতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রফেসর গার্স্ট। ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে টানেল কর্মীরা বিশেষ করে যারা টানেল বিস্ফোরণের জন্য ছিদ্র তৈরি করতো তারা সকলেই খর্বাকৃতির ব্যক্তি ছিল। এটা প্রয়োজনের কারণেই হতো। নাইট্রোগ্লিসারিন রক ব্লাস্টের মাধ্যমে যে, গর্ত তৈরি করা হতো সেগুলো হতো খুবই ছোট। পরে এগুলো মানবদেহের সমানের গর্তে পরিণত করা হতো ড্রিলের মাধ্যমে। কাজেই, টানেল ড্রিলার হলে জন হেনরির শরীর যে খর্বকায় এবং ক্ষুদ্রাকৃতির হবে, এটাই প্রত্যাশিত।

প্রফেসর গার্স্ট দাবি করেছেন যে, স্টীম ড্রিলের সাথে কোনো প্রতিযোগিতা লুইস টানেলে হয় নি এবং জন হেনরি কোনো স্টিল ড্রিলার ছিল না। আমি যথেষ্ট পরিমাণে তথ্য আমার বইয়ে দিয়েছি এই বলে যে, আঠারো শো সত্তরের দশকে এখানে দুই ধরণের স্টীম ড্রিলার ব্যবহার করা হতো। আমি খুব ভালো করেই দেখিয়েছি যে, কন্ট্রাক্টরদের একশ ডলারের জরিমানা এড়ানোর জন্য সব আসামীকেই কারাগারে ফেরত দিতে হবে, তা সে জীবিতই হোক  কিংবা মৃত। আমি দেখিয়েছি কীভাবে কারাগারের ডাক্তার অনেক আসামীর লুইস টানেলে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুর কথা লিখে রেখেছেন। আমি দুটো সমকালীন সূত্রের উল্লেখ করে দেখিয়েছি যে, কর্মীরা এবং স্টীম ড্রিল পাশাপাশি কাজ করতো। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, জন হেনরির মেশিনের সাথে লড়াইয়ের কোনো আলোকচিত্র আমার কাছে নেই। তবে, থাকলেও কোনো লাভ হতো না। কারণ প্রফেসর গার্স্ট সেটা নিয়েও বিতর্ক শুরু করতেন।

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে লুইস টানেলের নিজস্ব সমাধিস্থান ছিল। কিন্তু সেখানকার ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাধি ফলকসমূহে শুধুমাত্র সাদা চামড়ার পুরুষ এবং রমণীদের নাম পাওয়া যায়। কাজেই, এখানে কোনো কালো মানুষকে সমাহিত করা হবে সেই সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। বরং জরিমানা এড়ানোর জন্য জেলখানায় তার লাশ ফেরত পাঠানোটাই স্বাভাবিক। এই লাশ ফেরত পেয়েছেন এই মর্মে জেলখানার ডাক্তারকে সার্টিফিকেটও দিতে হতো।

জন হেনরিকে নিয়ে নেলসন এবং গার্স্টের তর্ক বিতর্কে আমরা যাবো না। জন হেনরি বলে কেউ ছিল কী ছিল না, সেই বিষয়টা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, শ্রমিক আন্দোলনে, নাগরিক অধিকার আন্দোলনে জন হেনরি একক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শক্তি, সাহস, সহিষ্ণুতা, মানবতার মর্যাদা, বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সামর্থ এর সবকিছুর পিছনে জন হেনরি নামের কিংবদন্তীটি আকাশছোঁয়া উচ্চতা নিয়ে যুগে যুগে, দেশে, দেশে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদেহী, সুঠাম, পাথরের খোদাই করা জন হেনরি হাতের উত্তোলিত মুগুর যেন শোষিত, বঞ্চিত মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় ভরসা।

এই দারুণ ভূমিকা্টা যে চরিত্র পালন করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে, তার ঐতিহাসিক হওয়া না হওয়াতে কিছুই যায় আসে না আমাদের। হেনরির বীরগাথা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে দিয়ে সিটি দিয়ে যেমন চলে যায় ইঞ্জিন, আমরাও তেমনি এই বীরত্বগাথাকে ছড়িয়ে দিতে চাই সবদিকে। পূব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে, পৃথিবীর প্রতিটা প্রান্তে।

Most Popular

To Top