নাগরিক কথা

হাজার-হাজার টাকা খরচ করে কি শিখাচ্ছি আমাদের সন্তানদের

হাজার-হাজার টাকা খরচ করে কি শিখাচ্ছি আমাদের সন্তানদের- নিয়ন আলোয়

সন্তান যেন সুশিক্ষিত হয়, পরিবারের নাম উজ্জ্বল করতে পারে অনেক বড় হয়ে- এ স্বপ্ন দেখেন না এমন বাবা-মা সম্ভবত একজনও নেই। আর সে জন্যই ছোটবেলা থেকেই অভিভাবকদের আপ্রাণ চেষ্টা থাকে সন্তানকে সুশিক্ষিত করে তোলার, মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার। আর সেজন্য ভাল স্কুলে ভর্তি করা থেকে শুরু করে কোন চেষ্টাটা বাদ রাখেন তারা?

ব্যস্ত নাগরিক জীবনে সারাদিন অফিস-আদালতে কাজের ধকল সামলে সন্ধ্যায় শিশুর পড়াশোনার পিছনে দেওয়ার মত সময় পান না অনেকেই, আর সে ঘাটতি পোষাতে একাধিক প্রাইভেট টিউটর নিয়োগ দিতেও কার্পণ্য করেন না। আর অভিভাবকরা সময় পান বা না পান, অফিসে হাজারটা কাজ থাকুক বা না থাকুক, শিশুকে প্রয়োজনীয় কোচিং-এ নিয়ে যেতে গলদঘর্ম হন অনেকেই। সেই সাথে শিশু বয়স থেকেই মারাত্মক চাপে পড়ে যায় সন্তান।

তবে অভিভাবকদের এত দৌড়ঝাঁপ আর অর্থব্যায়, আর সে সাথে শিশুদের এত পরিশ্রম আসলেই কি কাজে দিচ্ছে? সে প্রশ্নই রেখেছেন গতকাল সাব্বির আহমেদ শাওন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে।

হ্যাঁ, প্রশ্নফাস কিংবা ভর্তিবানিজ্য সহ হাজারটা সমস্যা নিয়ে এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লেজেগোবরে অবস্থা। এসব সমস্যা নিয়ে অহরহ কথা উঠলেও একদম রুট লেভেলের এসব বিষয় সবসময়ই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

তবে এসব ছোটখাটো ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া কতটুকু বুদ্ধিমানের কাজ? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ভুলকে ভুল বলা আর সঠিক তথ্যের পক্ষে কথা বলা কি শিখাচ্ছে আমাদের? “বইয়ে যা লেখা আছে সেটাই ঠিক” এমন কথাগুলো এখনকার অভিভাবকরাও শুনেছেন তাদের শৈশবে। এবং এটা মেনে নিয়েই দেখা যাচ্ছে আমরা বছরের পর বছর মুখস্তবিদ্যা নির্ভর একের পর এক প্রজন্ম গড়ে তুলছি যারা শিক্ষার একদম মৌলিক বিষয়াদি সম্বন্ধে কিছুই জানছে না কিংবা বুঝছে না।

প্রতিবছর হাজার-হাজার গ্র্যাজুয়েট পাশ করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে, থিসিস পেপার জমা হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। কিন্তু এদের মধ্যে ঠিক কত শতাংশ আসলেই “শিক্ষিত” সেটা কি ভেবে দেখছি আমরা? ১০ বছরের স্কুলজীবনে আমরা শিখি “বইয়ের লেখাই সঠিক”; দেড় বছরের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় কিছু বুঝে উঠার আগেই শেষ হয়ে যায়। এরপর ভর্তিপরীক্ষার ইঁদুরদৌড় ডিঙ্গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই একজন শিক্ষার্থী দেখতে পারে সেখানে তার অগ্রজেরা জীবন্মৃতের মত ১৫-২০ বছর আগের মলিন হয়ে যাওয়া ফটোকপি শিট মুখস্ত করে যাচ্ছে যেটা কিনা কোর্স টিচার শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময়ে নিজের জন্য নোট করেছিলেন। এই শিটের বাইরে থেকে পড়লে পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন পড়বে না, আবার এর বাইরে থেকে কিছু লিখলে পরীক্ষার খাতায় নাম্বারও মিলবে না! অবশ্য অনেক শিক্ষার্থী খুশি হন এরকম “রেডিমেড” “শর্টকাট” শিট হাতে পেয়ে যাওয়ায়।

আর যুগের পর যুগ এই চক্করে ঘুরতে থাকা শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারছে না কোন কল্যাণমুখী জনশক্তি কিংবা উদ্ভাবক। যার ফলশ্রুতিতে, সুদীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করে গ্র্যাজুয়েটদের দল বেঁধে ঘুরতে হচ্ছে চাকরির আশায়, কিন্তু মিলছে না সে সোনার হরিণ। কেননা চাকুরীক্ষেত্রে অনেকাংশেই মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা।

অন্যদিকে বলা যায় দেশের বাইরে চলে যাওয়া মেধাবীদের কথা। প্রায়সময়ই আমরা দেখি “বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অমুক এর সাফল্য তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে” শিরোনামের খবর। হ্যাঁ, তারা বাংলাদেশী “বংশোদ্ভূত” বলেই এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে থেকে গেলে হয়তো তাদের পক্ষে এ অর্জন করা শুধু দুরূহ না, অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত।

তবে এরপরেও কি এদেশের মেধাবীরা দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছেন না? অবশ্যই আনছেন। তবে এ সাফল্যের হার অত্যন্ত কম দেশের শিক্ষার্থীদের মেধার তুলনায়। সহজ বাংলায় বললে, একেবারে হাতে ধরে গলা টিপে মারা হচ্ছে এদেশের সকল সম্ভাবনাকে। প্রশ্নফাস হচ্ছে অহরহ, ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি হচ্ছে, প্রতি সপ্তাহান্তে হাজারখানেক কিলোমিটার রাস্তা পারই দিয়ে ভর্তিপরীক্ষার্থীদের দৌড়াতে হচ্ছে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। এত প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়েও যে এদেশের শিক্ষার্থীরা সফল হচ্ছেন না তা নয়। তবে সেটাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে শৈশবেই তাদের এভাবে হেলাফেলা করে ভুল শিখতে বাধ্য করা হলে।

কোচিং বাণিজ্যের ঘোর বিরোধী এদেশের সরকারসহ সকল শিক্ষাবিদেরা। এরপরেও কেন জেনেশুনে এসব কোচিং-ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিচ্ছেন নিজের সন্তানকে? সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না বলে একাধিক প্রাইভেট টিউটর নিয়োগ দিয়েছেন, হাজার-হাজার টাকা ঢালছেন। তবে মাঝেমধ্যে নিজেকেও তো খোঁজখবর নিতে হবে সন্তানের।

সর্বশেষে একটি কথা-ই বলতে হয়। সন্তান আপনার, তার ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দায়িত্বও আপনার হাতেই। যতই মিষ্টি-মিষ্টি কথা বলুক না কেন সবাই, শিক্ষা আজকের দিনে একটি বানিজ্য-ই! আর এ বাণিজ্যে সবাই আপনাকে ঠকিয়ে নিজের লাভটাই খুঁজবে। এখন সিদ্ধান্তও আপনার- হেলাফেলা করে লাখ-লাখ টাকা খরচ করেও ঠকে গিয়ে নিজের সন্তানের জীবন ধ্বংস হতে দিবেন, নাকি সন্তানের ভবিষ্যতের হাল নিজের হাতে তুলে নিবেন?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top