ইতিহাস

গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম ​​​​​(শেষ পর্ব)

গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম ​​​​​(শেষ পর্ব)- নিয়ন আলোয়

আগের পর্বঃ গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম (দ্বিতীয় পর্ব)

পাকিস্তানিরা যখন বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে, তখন কিছু দক্ষিণ-পন্থী দল ও ওই মানসিকতার লোকেরা এগিয়ে আসে গণহত্যার তীব্রতা বাড়াতে এবং গণহত্যাকে জাস্টিফাই করতে। পূর্ববাংলায় দক্ষিণ-পন্থী দলগুলোর জনসমর্থন কখনোই ছিল না, উল্টো সত্তরের নির্বাচনে তারা একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যেহেতু জনসমর্থন ছাড়া ক্ষমতার স্বাদ কোনভাবেই পাওয়া সম্ভব না সেহেতু তারা বিকল্প পথ ধরে; সামরিক গোষ্ঠীর পদলেহন করে ক্ষমতার ছিটেফোঁটা ভোগ করাটাই ছিল তাদের বিকল্প পথ। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলায়, এদের ‘দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দালালরা পুরো নয় মাস জুড়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করার জন্য মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ করেছে। এমনকি, পাকিস্তানিদের কর্মকাণ্ডকে জায়েজিকরণের ব্যবস্থাও করেছে। তাই, স্বভাবতই দেখা যায়, পাকিস্তানি পত্রিকাগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করার জন্যে যে প্রত্যয়সমূহ ব্যবহার করেছে, দালালরাও তাদের পত্রিকা, লিফলেটে সেগুলোই ব্যবহার করেছে।

দক্ষিণপন্থী এই দলগুলোর প্রতি সামরিক শাসকদের সমর্থন কতটুকু ছিল, কিংবা অন্যভাষায় বলতে গেলে, দক্ষিণপন্থীরা কেন পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে গলা ফাটাচ্ছিল সেটা বুঝা যায় সত্তরের নির্বাচনের সময়। নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোকে সাহায্য করার জন্যে শিল্পপতিদের ওপর চাপ দিয়ে প্রায় ২২/২৩ লক্ষ টাকা জোগাড় করে দেয়া হয়েছিলো। তবু নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে, এজন্যে অবশ্য শাসকগোষ্ঠী দায়ী করেছে ইসলামপন্থী দলগুলোর বিভক্তিকেই। অনেকে তাই দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন কেন এই ইসলামী দলগুলো একত্রে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো না।[1] অর্থনৈতিক এই হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী দালালদের পত্রিকাগুলোও কথা বলেছে শাসকগোষ্ঠীর সুরেই।

একাত্তরেও, আলবদররা শুধু যে আদর্শিক জায়গা থেকে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল তাও না, বরং, পাকিস্তানি শাসকেরা এসব দালালদের জন্যে নিয়মিত বেতনের ব্যবস্থাও করেছিল। সাধারণ দরিদ্র মানুষদেরকে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হতে প্রলুব্ধ করতে সামরিক বাহিনী তখন উচ্চহারে বেতনের ব্যবস্থা করেছিল। রাজাকাররা সেনাবাহিনী ও মুজাহিদদের মতো ফ্রি রেশন পাবে, এই ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল তখন। তাই, তাদের প্রোপ্যাগান্ডা-মাধ্যম যে, সামরিক গোষ্ঠীর আর্থিক মদদ-পুষ্ট ছিল সেটা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়।

পূর্বপাকিস্তান থেকে যে পত্রিকাগুলো পাকিস্তানের পক্ষে প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়েছে, তন্মধ্যে আইএসের অর্থায়নে প্রকাশিত ‘দৈনিক সংগ্রাম’ অন্যতম। জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করা এই পত্রিকা পুরো একাত্তর জুড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও শাসকদের প্রোপ্যাগান্ডার অংশ হিসেবেই কাজ করেছে। জামায়াত-ই-ইসলাম ও মুসলিম লীগের সাথে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সম্পর্ক ছিল খুব মধুর। একাত্তরে, পঁচিশে মার্চের রাতের পর থেকে এই সম্পর্ক আরও নগ্নভাবে ধরা পড়ে জামায়াত ও মুসলিম লীগের নেতাদের কর্মকাণ্ডের কারণে। ‘দৈনিক সংগ্রাম’ যোগ্য মুখপাত্র হিসেবেই তখন কাজ করেছে। তাদের খবরগুলো থেকে দুটো বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

এক, কিভাবে একাত্তর নিয়ে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার চালানো হয়েছে, এবং দুই, জামায়াত ও মুসলিম লীগের নেতারা কি করেছেন।

‘দৈনিক সংগ্রাম’ এ প্রকাশিত বিভিন্ন খবর ও সম্পাদকীয়গুলোর সংকলন প্রকাশ করেছেন আলী আকবর টাবী; নাম দিয়েছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা’[2]। পরবর্তী আলোচনার যাবতীয় তথ্য নেয়া হয়েছে আলী আকবর টাবীর তথ্যবহুল সে বই থেকে। ১৯৭১ সালের মার্চ – ডিসেম্বর পর্যন্ত দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবর এবং সম্পাদকীয়গুলোকে মোটা দাগে চার ভাগে ভাগ করা যায়:

১) শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশংসা এবং ‘দুষ্কৃতিকারী’ মুক্তিবাহিনী নিধনের কিংবা নিধনে উৎসাহদানের খবর।

২) গোলাম আযম, মওদুদী, নিজামী, মুজাহিদসহ শান্তিকমিটির বিবৃতি সমূহ।

৩) আওয়ামী লীগের সাথে একত্র হয়ে হিন্দু তথা হিন্দুস্থান কর্তৃক ষড়যন্ত্র; খবরে ভারত আর হিন্দু আসলে সমার্থক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মকে ব্যবহার করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।

৪) বিভিন্ন ব্যক্তিদেরকে নিয়ে রসালো, চটুল এবং অশালীন ভাষার খবর; কখনো কখনো সাহিত্য পাতায় কিছু কু সাহিত্য প্রকাশিত হয় যার মূল উদ্দেশ্য ছিল (৩) নম্বর পয়েন্ট, ধর্মোন্মাদনা সৃষ্টি।

একাত্তর সালের ২৫ শে মার্চ থেকে বাংলার জমিন হয়ে উঠে এক মৃত্যুপুরী; পাকিস্তানি ও তার দোসরদের দ্বারা হত্যা, লুণ্ঠন, নারী ধর্ষণ চলতে থাকে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। মার্চের ত্রিশ তারিখে প্রকাশিত এক সংবাদে নিহতের সংখ্যা ১৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।[3] এপ্রিলের প্রথমার্ধেই টাইম পত্রিকা ধারণা করেছিল, মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

পাকিস্তানিদের আক্রমণ সম্পর্কে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, এটা যথার্থই রক্তস্নান, সৈন্যরা চরম নির্দয়।[4] অথচ এর কোন কিছুই ‘দৈনিক সংগ্রামের’ চোখে পড়েনি। অপারেশন সার্চলাইটের সেই কালো রাত সম্পর্কে তাদের বয়ান ছিল পুরো উল্টো, নির্জলা মিথ্যায় ভর্তি। মার্চের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত উল্লেখ করে বলা হয়, ‘মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার নরনারীকে অমানুষিক ভাবে হত্যা করা হয়, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়, ২৫ শে মার্চের মধ্যরাত্রিতে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিদ্রোহের সমস্ত পরিকল্পনা যখন সম্পূর্ণ হওয়ার পথে এমন এক সংকট মুহূর্তে আল্লাহর অফুরন্ত রহমতে পাক সেনাবাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে ষড়যন্ত্রকারীদের সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থ হয়’। (দৈনিক সংগ্রাম, ৭ আগস্ট, ১৯৭১)

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে সামরিক শাসন কিছু নির্দিষ্ট প্রত্যয় ব্যবহার করতো; তাদের সাথে সুর মিলিয়ে দালাল গোষ্ঠীও একই কাজ করতে থাকে। তাই, এই ‘দুষ্কৃতিকারী’দের শায়েস্তা করে পাকিস্তানের শান্তি বজায় রাখার জন্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল এরা পুরো নয় মাস। এ ধরণের খবর প্রচারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, প্রকৃত খবর লুকিয়ে জনগণকে গণহত্যার বিষয়ে অন্ধকারে রাখা, অর্থাৎ এক কথায় গণহত্যার প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থনদান। কিন্তু সমর্থন দিলেও এটাকে গণহত্যা বলে স্বীকার করে নেয়া যাবে না, তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত হামলা উল্লিখিত হয় ‘সময়োচিত পদক্ষেপ’ হিসেবে।

অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন জেনারেল টিক্কা খান। মার্চের শুরুতেই তাকে পূর্বপাকিস্তানে নিয়োগ করা হয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। তার নিয়োগের পূর্বে আরও দুজনকে সরিয়ে ফেলা হয়, কেননা তারা অপারেশনে অংশগ্রহণ করতে অপারগতা জানিয়েছিলেন। বেলুচিস্তানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্যে জেনারেল টিক্কা খানকে তখন বেলুচিস্তানে কসাই নামে ডাকা হত। কিন্তু, দৈনিক সংগ্রামের নিকট তিনি ছিলেন একজন মহাবীর, যার কর্মের জন্যে তারা কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করছিল। সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করে, ‘পাকিস্তানের ইতিহাসে এক চরম সংকট সন্ধিক্ষণে তিনি যে বীরত্ব, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন, এ দেশের ইতিহাসে তাঁর এ কীর্তি যেমন চিরদিন অম্লান ও অক্ষয় হয়ে থাকবে, তেমনি এ দেশবাসী তাঁর কাছে থাকবে কৃতজ্ঞ’। (দৈনিক সংগ্রাম, ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)

৮ এপ্রিল ‘ভারতীয় অপপ্রচারের ব্যর্থতা’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘নতুন করে জাতীয় মীর জাফরদের তারা চিনবার সুযোগ পেয়েছে। ভারত ও তার এজেন্টেদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে যে কোন মূল্যে তারা স্বদেশ ও জাতি রক্ষার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছে’।

এপ্রিলের দিকে যখন শরণার্থীর সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলছে, তখন ১২ এপ্রিল ‘অর্থনীতি পুনর্গঠন’ সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘গত মাসে রাজনৈতিক আন্দোলন হিংসাত্মক পথে মোড় নেয়ার পর যারা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তারাও ফিরে আসছেন, এমনকি যারা প্রদেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন তারাও পরে আসছেন। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার এক পর্যায় থেকে শান্তি ও শৃঙ্খলার দিকে দেশের উত্তরণ ঘটেছে’।

১৫ এপ্রিলের সম্পাদকীয়তে বিভিন্ন এলাকায় আক্রমণ করার জন্যে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়,

‘সরকারের কাছে আরজ করা হচ্ছে ভারতীয় অস্ত্রশস্ত্র ও অনুপ্রবেশকারী নিয়ে এখনও কিছু সংখ্যক ভারতীয় চর পূর্ব পাকিস্তানের কোন কোন পল্লী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে বলে শোনা যায়, তারা যেন অনতি বিলম্বে সে সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে প্রদেশের শহরগুলোর মতই দুষ্কৃতিকারী মুক্ত করে স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনে’।

৩০ এপ্রিল ‘নৈরাজ্যের অবসান’ লেখায় পাকি বাহিনীর প্রশংসা করে লেখা হয়, ‘মাত্র এক মাসের ভিতর আমাদের ঐতিহ্বাীহী পাক সেনারা পূর্ব পাকিস্তানের গোটা ভূখণ্ড নাপাক হিন্দুস্তানি অনুপ্রবেশকারী ও অনুচরদের হাত থেকে মুক্ত করে এ এলাকার জনতাকে দুঃসহ এক অরাজকতার রাজ্য থেকে মুক্তি দিয়েছে’।

২৭ মে ‘দেশপ্রেমিক জনগণ পুরস্কৃত’ শিরোনামে বলা হয়, ‘দুষ্কৃতিকারীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্যে কর্তৃপক্ষ জনগণের মধ্যে এক হাজার টাকা বিতরণ করেছেন […] দুষ্কৃতিকারীদের ধরিয়ে দিলে বা তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য জানালে কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত পুরষ্কার দেবে’। ৯ জুন প্রথম পাতার খবরের শিরোনাম ছিল, ‘পুনর্বাসন কাজে সেনাবাহিনীর আত্মনিয়োগ’।

৮ জুলাই এক খবরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিষেদগার করে বলা হয়, ‘দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’। এ ধরণের অসংখ্য খবর তখন প্রকাশিত হতে থাকে।

এখানে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে শুধুমাত্র দুষ্কৃতিকারী কিংবা সেনাবাহিনীর প্রশংসাই করা হচ্ছে না, বরং, ‘পুরস্কার’ প্রদানের খবর প্রচারিত করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু, প্রশ্ন হল, তাহলে পুরস্কার কি জনগণকে দেয়া হয় নাই? আসলে শান্তি-কমিটি, রাজাকার নামে যে বেতনভুক দালাল বাহিনী গঠন করা হয় তারাই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ধরিয়ে দিত এবং নিজেরা এসব খবর প্রকাশ করতো সাধারণ জনগণের নামে। সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার তাদের এই প্রচেষ্টা কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে তা বলা মুশকিল।

এবার দেখা যাক, দ্বিতীয় ধরণের খবর: পাকিস্তানি দালালদের বিবৃতিসমূহ। যুদ্ধ শুরুর কয়দিন পর, এপ্রিলের শুরুর দিকে গঠিত ‘শান্তি কমিটি’ নামক সংগঠনটির আড়ালে আসলে লুকিয়ে ছিল জামায়াতে ইসলামী। এই শান্তি কমিটি থেকে ধীরে ধীরে রাজাকার, আলবদর, আল শামস প্রভৃতি সশস্ত্র দল গঠিত হয়। এই দালালদের সাহায্য ব্যতিরেক পাকিরা এতবড় গণহত্যা এত কম সময়ে চালাতে পারত না। তাদের কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানিরা এতই খুশি ছিল যে, জেনারেল নিয়াজী তাঁর বইটি ‘রাজাকার’দেরকেই উৎসর্গ করেন।

রাজাকাররা পুরো নয় মাস জুড়েই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, সংঘর্ষ হলে খুন করেছে, লুটপাট ও ধর্ষণ করেছে, পাকিদের নারী সরবরাহ করেছে । আর অন্যদিকে আলবদর ছিল ডেথ স্কোয়াড এবং তাদের লক্ষ্যও ছিল স্থির। ‘প্রকৃতিতে তারা ছিল অতীব হিংস্র ও নিষ্ঠুর’[5]। দালালদের চিন্তাধারা ও আদর্শিক অবস্থানে পাকিস্তানিদের সাথে প্রচুর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ‘দৈনিক সংগ্রাম’এর ‘শান্তি কমিটির বিবৃতি সংক্রান্ত’-খবরে দেখতে পাওয়া যায়, সশস্ত্র একটা সহযোগী বাহিনী তৈরি করার জন্যে কিভাবে তারা বারে বারে অনুরোধ জানিয়েছিল পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কাছে। এই সশস্ত্র বাহিনীর কারণেই যে সবদিকে শান্তি বিরাজ করছে সেটাও সবগুলো বিবৃতেই উল্লেখ থাকত। মোটামুটি প্রতিদিনই ছাপা হত এমন বিবৃতি, নমুনাস্বরূপ কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে।

১১ এপ্রিল ঢাকায় শান্তি কমিটির গঠন ও এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘ঢাকায় দৈনন্দিন জীবন যাত্রার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে, গতকাল শনিবার ১৪০ সদস্যের একটি নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে’।

১২ এপ্রিল একটি লেখায় শান্তি কমিটি গঠনকে একটি শুভ পদক্ষেপ আখ্যায়িত করে শিরোনাম করা হয়, ‘একটি শুভ পদক্ষেপ’ নামে। ঠিক পরেরদিন, ১৩ এপ্রিল পাকিস্তান রক্ষার জন্যে গোলাম আযমের মোনাজাতের খবরও ফলাও করে ছাপা হয়।

২৮ মে শান্তিকমিটির মত আরও কিছু বাহিনী গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়, ‘আমাদের বিশ্বাস পাকিস্তান ও জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী নির্ভরযোগ্য লোকদের সমন্বয়ে একটি বেসামরিক পোশাকধারী বাহিনী গঠন করে তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে অতি তাড়াতাড়ি এসব দুষ্কৃতিকারীকে নির্মূল করা সহজ হবে’। ২ সেপ্টেম্বর ‘সহযোগীতার দৃষ্টিতে’ নামক উপসম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘অধ্যাপক গোলাম আযম তাঁর বিগত পশ্চিম পাকিস্তান সফরকালে বারবার দাবী করেছিলেন যে, দেশপ্রেমীদের সশস্ত্র করা হোক অন্যথায় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটবে। সুখের বিষয় সরকার এ সঠিক পরামর্শ গ্রহণ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় দেশপ্রেমিকদের সামিল করেছে’। ৭ অক্টোবর এক সম্পাদকীয়তে ঠিক একই ধরনের কথা বলা হয়, ‘রাজাকারদেরকেও ভারী অস্ত্র দেয়া আবশ্যক’। ১১ অক্টোবর আরেক সম্পাদকীয়তেও রাজাকারদের হাতে অস্ত্র দেয়ার জন্যে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, ‘অন্যথায় রাজাকারদের মন দুর্বল হয়ে যেতে পারে’। নভেম্বরের ১২ তারিখে প্রকাশিত ‘রোকেয়া হলের ঘটনা’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে সরাসরি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার উপদেশ দেয়া হয়। এতে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তর থেকে যারা এ দুষ্কর্মকে সহায়তা করছে তাদেরকে যদি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তবে সেটাই সঠিক পদক্ষেপ হবে বলে আমরা মনে করি। সেই সাথে বুদ্ধিজীবীদের ‘ছদ্মবেশী দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে তাঁদেরকে উচ্ছেদের আহ্বান জানানো হয় এবং আশা করা হয় যে, এর মাধ্যমেই ‘হিন্দুস্তানি চরদের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে’ দেয়া সম্ভব হবে।

২৬ জুলাই রাজাকার বাহিনীর প্রশংসা করে লেখা হয়, ‘ইতিমধ্যেই প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়ে তারা দুষ্কৃতিকারীদের দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে’। এছাড়া, ‘আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ময়দানে রাজাকারদের গুলি চালনা ট্রেনিং’ (৪ জুলাই), ‘জনগণ এখন স্বেচ্ছায় রাজাকার ট্রেনিং নিচ্ছে (৯ জুলাই) ধরণের খবর তখন নিয়মিতই ছাপা হত।
দৈনিক সংগ্রামে নিয়মিত প্রকাশিত গোলাম আযম, মওদুদী, নিজামীদের কিছু বিবৃতি তুলে ধরা হয়েছে নিম্নে:

‘দুষ্কৃতিকারীরা জনগণকে রেডিও পাকিস্তান শুনতে দেয় না’। – গোলাম আযম (১৭ জুন)

‘বর্তমানের এমন কোন শক্তি নাই যা সেনাবাহিনীর প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে’। – গোলাম আযম (২১ জুন)

‘সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে রক্ষা করার বিকল্প ছিল না’।- গোলাম আযম (২২ জুন)

‘৬ দফা কর্মসূচীর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া’ ।- গোলাম আযম (২৩ জুন)

‘মুজিবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জনতা সমর্থন করেনি’। – মওদুদী (৭ জুন)

‘প্রেসিডেন্টের শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা খুবই যথোপযুক্ত এবং জামায়াত একে অভিনন্দন জানিয়েছে’। – মওদুদী (৩০ জুন)

‘পাকিস্তান কোন ভূখণ্ডের নাম নয়, একটি আদর্শের নাম’। – নিজামী (১৬ আগস্ট)

‘পাকিস্তানকে যারা বিচ্ছিন্ন করতে চায় তারা এ দেশ থেকে ইসলামকেই উৎখাত করতে চায়’। – নিজামী (২৩ আগস্ট)

‘ছাত্রসংঘ কর্মীরা পাকিস্তানের প্রতি ইঞ্চি জায়গা রক্ষা করবে’। – নিজামী (৮ সেপ্টেম্বর)

‘পাকিস্তান যদি না থাকে জামায়াত কর্মীরা দুনিয়ায় বেঁচে থাকার কোন সার্থকতা মনে করে না’। – গোলাম আযম (২৬ সেপ্টেম্বর)

‘সেদিন আর খুব বেশী দূরে নয় যে দিন আল বদরের তরুণ যুবকেরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে পর্যদুস্থ করে হিন্দুস্থানের অস্তিত্বকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে’। – নিজামী (১৪ নভেম্বর)

‘পাকিস্তান আল্লাহর ঘর’। –নিজামী (১৬ নভেম্বর)

এবার দেখা যাক তৃতীয় ধরণের খবর:

হিন্দু তথা হিন্দুস্থান কর্তৃক ষড়যন্ত্র বিষয়ক খবর। বলা হয়েছে যে, প্রায় অধিকাংশ খবরেই হিন্দু ও ভারত আসলে সমার্থক হিসেবেই তুলে ধরা হতো; যেখানে হিন্দুস্থানের ষড়যন্ত্র বলা হয়েছে সেখানে আসলে হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের দিকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছিল। প্রথম দুই ধরণের খবর থেকেই দেখা যাচ্ছে, যেখানেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক খবর এসেছে সেখানেই এই ‘হিন্দু – তত্ত্ব’ এসেছে। এ ধরণের খবরের প্রধান টার্গেট ছিল মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা; তাদের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রচার করে এবং তাদের দ্বারা যে মুসলমানদের ক্ষতি হচ্ছে,

যেমন, ‘মুসলমানদের দাড়ি জোর করে কেটে দিচ্ছে’(১৭ জুন) – এমন উত্তেজনাকর খবর প্রকাশ করে দুই ধর্মের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করাই ছিল প্রধান লক্ষ। আগেই বলেছিলাম, একাত্তরের পূর্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রচারণার ইসলামীকরণ শুরু করেছিল; একাত্তরে এসে সেই প্রচারণা সবচেয়ে বেশী কাজে লাগিয়েছিল দৈনিক সংগ্রাম। তাদের ‘হিন্দু-তত্ত্ব’ সংক্রান্ত কিছু খবর নিম্নরূপ,

‘রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি হিন্দু’ (১০ এপ্রিল, ভারতের মায়াকান্না)

‘আমরা গত ১ লা মার্চ থেকে থেকে তাদের তথাকথিত জয়বাংলার স্বেচ্ছাচার দেখেছি, তাদের লুটতরাজ ও হত্যা অপহরণ আমাদের অনেকেই স্বচক্ষে দেখেছে। দেখেছে তাদের অমুসলিমদের সহযোগিতায় পাইকারি হারে মুসলমানের গলাকাটার লীলা’ (১৫ এপ্রিল, শিরোনাম: জনতা পাকিস্তান চায়)

‘জনাব তাজউদ্দীন পাকিস্তানকে অস্বীকার করে ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণের সাথে সাথে তিনি স্বভাবতই শ্রী তাজউদ্দীন হয়ে গেছেন”। (৮ মে, শ্রী তাজউদ্দীনের বাংলাদেশ)

‘মুসলমানি ভাবধারা পুষ্ট জাতীয় সঙ্গীতের স্থান দখল করেছিল মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু কবির রচিত গান’। (১২ মে, সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের ইতি হোক)

‘এ নতুন জাতির নাম হল ‘জয় বাংলা’ জাত। তাদের কলেমা ও সালাম – কালাম হল “জয় বাংলা”, তাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, তাদের ধর্মের নাম বাঙালি ধর্ম। এ ধর্মের প্রবর্তকের নাম দিয়েছে তারা বঙ্গবন্ধু’। (১৩ মে, জয় বাংলা ধর্মমত)

‘মুসলমানদের জাত শত্রু ইহুদীরা আরব মুসলমানদের যেভাবে ব্যাতিব্যস্থ করে তুলেছে তেমনি ইহুদিদের পরম বন্ধু হিন্দুরাও একই যোগসাজশে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলোপের কাজ করে যাচ্ছে’। (১৫ জুন, আলেমদের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রচারণা)

‘শত শত বাংলাভাষী আলেম ও ওলামা ও দাড়ি টুপী-ওয়ালাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী হোতাদের আসল রূপ আজ ধরা পড়েছে।’ (১২ আগস্ট, দালালদের স্বরূপ)

‘মুক্তিবাহিনী আসলে একটি হিন্দু বাহিনী।’ (৯ অক্টোবর)

‘তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর শতকরা ৯০ জনই এখন হিন্দু এবং তাদের চালাচ্ছে ভারতীয় আর্মি ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের অফিসাররা’। (১৩ অক্টোবর)

‘শেখ মুজিবের বাংলাদেশ ছিল আসলে হিন্দু ইহুদিদের বাংলাদেশ’। (৮ নভেম্বর, হিন্দু ইহুদী পরিকল্পিত বাংলাদেশ)

৬ মে ‘শরণার্থী বাহানা’ শিরোনামের খবরে বলে, ভারতে কোন শরণার্থী যায়নি; অথচ, ৩ জুন খবরে বলা হয়, ‘ভারত এ নীতি নিয়েছে যে, হিন্দু হলে শরণার্থী এবং মুসলমান হলে অনুপ্রবেশকারী। খাবার ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও হিন্দু মুসলমানের বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি কোন কোন শিবিরে মুসলমান যুবকদের আলাদা করে গুলি করে হত্যা করার মত ঘটনা ঘটেছে’। এখানেও হিন্দু – মুসলিম উত্তেজনা ছড়ানোর প্রচেষ্টা! ব্রিটিশ টেলিভিশনে বাংলাদেশের গণহত্যার ছবি প্রদর্শন করার পর সারা বিশ্বে যখন হৈচৈ পড়ে যায় তখন ১৯ জুলাই দৈনিক সংগ্রাম ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি’ উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘ব্রিটিশ টেলিভিশনে যে সব ছবি দেখানো হচ্ছে সে গুলো সাম্প্রতিককালের নয় বরং সেগুলো ঘূর্ণিঝড়ের সময়কার ছবি […] সন্দেহ নেই ব্রিটিশ প্রচার মাধ্যমের এ ষড়যন্ত্র হিন্দুস্থান থেকেই প্রেরণা পেয়েছে”। এখানে উল্লেখ্য, তাদের ‘ষড়যন্ত্র – তত্ত্ব’ ধীরে ধীরে এতই ভয়াবহ আকার ধারণ করছিল যে তারা ব্রিটিশ পত্র পত্রিকা থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মাঝেও ভারতীয় ও হিন্দুদের চক্রান্ত খুঁজে পেয়েছিল। ৫ জুলাই ‘হিন্দুস্থানের চক্রান্ত জালে ব্রিটিশ’ ও ৬ জুলাই ‘চক্রান্তকারী ভারতের আরেক দোসর মার্কিন পত্র – পত্রিকা’ শিরোনামের খবরগুলো সে চক্রান্ত সংক্রান্তই।

সর্বশেষ ধরণের খবর: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইরত নেতাদের নিয়ে রসালো অশালীন ভাষায় পরিবেশিত খবর। স্বভাবতই তাদের মূল টার্গেট ছিলেন শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী। যখন দেখত যে তাদের অপকর্মকে ঢেকে রাখতে পারছে না তখনই তারা আশ্রয় নিত ব্যক্তিগত নোংরা আক্রমণের। দুটো উদাহরণ দেয়া যাক।

জুলাই মাসের ৬ তারিখ ‘দশ হাত শাড়ীর রাজনীতি’ শিরোনামে যে লেখা প্রকাশ করে সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে শেখ মুজিবকে জড়িয়ে বলা হয়, ‘ইন্দ্রদেবের স্বর্গরাজ্যের ইন্দিরা দেবীর কথাই বলছি। […] তাই আসুন ইন্দিরা দেবী এবারে মান অভিমান ছেড়ে দিয়ে সইদের মাধ্যমে খোশামোদ না চালিয়ে সোজাসুজি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। শেরওয়ানীর কাছে শাড়ীর আত্মসমর্পণে কোন লজ্জা নেই। তারপর আসুন মিলেমিশে যারা ঘর ভেঙ্গে ঘর করতে চায় তাদের ভালো হাতে দেখে নেই’। (দৈনিক সংগ্রাম, ৬ জুলাই, ১৯৭১)

অক্টোবরের ১৯ তারিখ একই ধরণের লেখা প্রকাশ করে ‘রাজনৈতিক ধ্রুমজাল’ শিরোনামে। বলা হয়, ‘বৈধ হোক কি অবৈধ, আমাদের মুজিবের সাথে যে তাঁর একটি সম্পর্ক আছে তা আজ আর তিনি ঢেকে চালাতে পারছেন না। […] মুজিব কোন প্রয়োজনে দু একবার ইন্দিরা দেবীর দিকে তাকিয়েছিলেন। সেটাকেই প্রেম ধরে নিয়ে ইন্দিরা দেবী যদি তাদের আদর্শ রমণীর রাধিকার মত চির জীবন ভাগ্নের গান গাইতে থাকেন, তো আমাদের কিছুই বলার থাকেনা। […] আমাদের সবিনয় নিবেদন, ইন্দিরা দেবী যদি একান্তই আমাদের মুজিব কে ভালোবাসেন, তা হলে বিশ্বময় চেঁচামেচি করে মুজিবকে অধিকতর বিপন্ন না করে তাদের প্রেমের আদর্শ রাধিকার পথ অনুসরণ করুন। সে পথেই মুজিব ও তাঁর তথা মুজিবের দেশ ও তাঁর দেশের কল্যাণ নিহিত। আশা করি ইন্দিরা দেবী আমাদের এ নিবেদনটি নারী সুলভ আবেগের অতিশয্যে উপেক্ষা করবেন না’। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৯ অক্টোবর, ১৯৭১)

এছাড়া, ৭ নভেম্বর বদর দিবস উপলক্ষে দৈনিক সংগ্রামের সাহিত্য বিভাগে প্রকাশিত হয়েছিল ‘আলবদর আলবদর আলবদর – থ্রি ওয়ান থ্রি, থ্রি ওয়ান থ্রি , থ্রি ওয়ান থ্রি’ নামক নাটিকা যার প্রতিটা লাইন জুড়েই ধর্মোন্মাদনা সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষণীয়।

সংগ্রাম নিয়ে শেষ কথা:

উপরের প্রতিটি সংবাদ মনোযোগ দিয়ে পড়লে খেয়াল করে দেখবেন যে, তারা একদিকে যেমন প্রচার করছিল পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি বিরাজ করছে আবার অন্যদিকে বলছিল শান্তি আনয়নের লক্ষ্যে ‘শান্তি কমটি’ গঠনের কথা। একদিকে যেমন বলছিল শরণার্থী একটা বাহানা আবার অন্যদিকে বলছিল সেই শরণার্থী শিবিরে নাকি হিন্দু মুসলিম বৈষম্য চলছে। অর্থাৎ, কোন ভাবেই তারা সত্যকে চেপে রাখতে পারছে না, তাদের মুখ দিয়েই নিজের অজান্তে ফাঁস করে দিচ্ছিল তাদের কু কর্ম। তাদের খবরগুলোর ধরণ বিচার করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ‘দৈনিক সংগ্রাম’ আসলে গণহত্যাকারীর বয়ানটুকুই প্রকাশ করে পুরো নয় মাস জুড়ে। গণহত্যা অধিবেশন অনুযায়ী গণহত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণ করা যেমন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, ঠিক তেমনি গণহত্যার ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করা(Conspiracy to commit genocide) কিংবা গণহত্যায় উস্কানি দেয়াও (Direct and public incitement to commit genocide) শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবরগুলোতে এই দুটো অপরাধ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।

পাকিস্তানি এবং তাদের দোসরদের প্রোপ্যাগান্ডার ধরণ বুঝার জন্যে তাদের মতাদর্শিক স্থানটাকেও পর্যালোচনা করা উচিৎ; বিশেষ করে কেন এবং কিভাবে এই মতাদর্শ প্রচারের প্রয়োজন পড়লো তা আলোচনা করা জরুরী। পূর্বে উল্লিখিত নমুনা থেকে পরিষ্কার যে, তাদের বক্তব্য ও বিবৃতিতে ‘অখণ্ড’ পাকিস্তানের মতবাদ প্রচার হয়েছে সর্বাধিক। ‘পোকায় কাটা’ খণ্ডিত পাকিস্তান অখণ্ড রূপ ধারণ করেছিল শুধুমাত্র একটা যোগসূত্র দিয়ে; সেটা হচ্ছে ইসলাম। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে যে জাতীয়তাবাদের উত্থান, তা পথ হারিয়ে ঢুকে পড়ে সাম্প্রদায়িকতার খোলসে। ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব প্রতিস্থাপিত হয়ে যায় হিন্দু-মুসলমান বিরোধে। ‘এক জাতি’ তত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেয় ‘দ্বি-জাতি’ তত্ত্ব। দুই তত্ত্বের জাতীয়তাবাদীরাই জাতি প্রশ্নের গোঁড়ায় না গিয়ে দিনশেষে কথা বলেছেন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের ইচ্ছানুসারে, তাদের সুরে। এই যে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ, তার জন্ম যেমন দেশি ও বিদেশি শাসকদের হাতে, তেমনি এর বিকাশও ঘটেছে তাদের হাতে, তাদের শ্রেণি স্বার্থের কারণেই। সাম্প্রদায়িকতাকে পরিচর্যা করে নেতা ও এলিট শ্রেণি তাদের ফায়দা তুলে নিয়েছেন দুহাত ভরে। তাদের অমূলক, অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক জাতিতত্ত্বের কারণে যে পাকিস্তান জন্ম নেয় তার মধ্যে ধর্ম ছাড়া কার্যত কোন মিল ছিল না। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বেও অনেকেই এই পাকিস্তানের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। আশঙ্কা করেছিলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাবে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যখন এই অদ্ভুত রাষ্ট্রের সমস্যাগুলো উন্মোচিত হতে শুরু করলো, তখনই শাসকরা ‘খণ্ডন রোধ’ করার জন্যে হাতিয়ার হিসেবে নিলো দুই অংশের ‘একমাত্র মিল’কে। মানে, ইসলামকে। শুরু হল ধর্মকে ব্যবহারের দ্বিতীয় পর্যায়। পূর্বে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছিল দেশকে খণ্ডন করতে, এবার ব্যবহার করা হল খণ্ডন রোধ করতে।

শাসক গোষ্ঠীর কাছে পূর্ব পাকিস্তান ছিল লোভনীয় স্থান, ঔপনিবেশিক কায়দায় শোষণ করার জন্যে প্রকৃত স্থান। তারা যে তা করেছে সেটা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। একাত্তরে ঢাকাস্থ মার্কিন কনস্যুলেটর কনসাল জেনারেল মি আর্থার কে ব্লাড এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের দুই অংশে বিরাজমান বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকর এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থ জিম্মি।[6] দি সানডে টাইমস পত্রিকায় মাসকারেনহাস যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন সেখানেও তিনি উপনিবেশায়নের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তার মতে পাকিস্তানের ‘পুনর্বাসন প্রক্রিয়া’ ছিল আদতে উপনিবেশ বানানোর প্রক্রিয়া। সেনাবাহিনীর তরফ হতে পূর্ব বাংলা সংক্রান্ত সরকারী যে নীতির কথা তাকে বলা হয়েছিল তা নিম্নরূপ,

১) বাঙালিরা নিজেদেরকে অবিশ্বস্ত প্রমাণ করেছে এবং তাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসনে থাকতে হবে।

২) বাঙালিদের অবশ্যই সঠিক ইসলামি নীতিমালায় নতুন করে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে দৃঢ় ধর্মীয় বন্ধন গড়ে তোলার অভিপ্রায়েই সরকারীভাবে ‘জনসাধারণের ইসলামীকরণের’ জিকির তোলা হয়েছে।

৩) নিহত ও পলায়নের মধ্য দিয়ে হিন্দুরা নির্মূল হয়ে গেলে, তাদের সম্পদ স্বল্প সুবিধাভোগী মুসলমান মধ্যবিত্তদের মন জয় করার ক্ষেত্রে সোনার মূল্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আর ভবিষ্যতে তা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে’।[7]

মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে প্রয়োজন ছিল ‘অখণ্ড’ পাকিস্তানের এবং এই অখণ্ডতার জন্যে প্রয়োজন হয়েছিল ‘জনসাধারণের ইসলামীকরণের’ জিকির তোলা। তা করাও হয়েছিল সরকারীভাবে। প্রচারণার কৌশল হিসেবে, পাকিস্তানি শাসক ও দেশীয় দালাল, সকলেই ‘ধর্ম’কে ব্যবহার করছে নগ্নভাবে। এর মূল কারণ, ধর্মের প্রতি মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের মনোজগতে বাংলার মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা ছিল তা এই ‘ইসলামীকরণ’ প্রক্রিয়াতে বেশ সহায়তা করেছে। তাদের দৃষ্টিতে বাঙালী ছিল সর্বদা নিচু জাত, কমজোর মুসলমান এবং হিন্দু দ্বারা প্রভাবিত সংকর মুসলমান।

একাত্তরে এত অধিক হারে নারী ধর্ষণের মূল কারণ ছিল তাই এই ‘নিচু সংকর মুসলমান’দের মধ্য থেকেই সাচ্চা ইমানদারি পাকিস্তানি প্রজন্ম তৈরি করা। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ‘সাচ্চা ইমানদারি পাকিস্তানি’ তত্ত্বের সাথে নাৎসিদের ‘খাঁটি জার্মান’ তত্ত্বের বেশ মিল পাওয়া যায়।

বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে যখন বাঙালি জাতীয়তা বোধের উত্থান শুরু হল, তা অসাম্প্রদায়িক রূপে হলেও, পাকিস্তানি শাসক-চক্র এটাকে সাম্প্রদায়িক রূপে গ্রহণ করলো। তারা প্রচার করা শুরু করলেন এটা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ষড়যন্ত্র। পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশই সরকারী এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বিশ্বাস করেন। প্রচারণার তোড়ে অনেকেই ভেবেছিলেন, পূর্ব বাংলার প্রায় সকলেই হিন্দু হয়ে গিয়েছেন। এমনকি শাসকচক্রের মধ্যেই এ ধারণা এতই গভীরে প্রোথিত ছিল যে যুদ্ধের ২০ বছর পরেও তাদের মাথা থেকে যায় নি। তাই যখন আবিষ্কার করেছিলেন বাংলাদেশের টেলিভিশনে আজান প্রচার করা হয়, তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকদের এই মনোভাবেরই প্রতিফলন দেখা যায় তাদের প্রোপ্যাগান্ডাতে। তারা সুচারুভাবে বাঙালির স্বাধীনতার জন্যে লড়াইটাকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘হিন্দু-মুসলমান’ এর ‘জেহাদ’ হিসেবে।

প্রচারণায় ইসলামীকরণের প্রমাণ পাওয়া যায় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে পাকিস্তান ও ইসলামকে সমার্থক হিসেবে উপস্থাপনের মধ্যে। ‘পাকিস্তান আল্লাহর ঘর’, এবং ‘ইসলাম ও পাকিস্তান এক ও অবিচ্ছেদ্য ’ – এমন উক্তিগুলো দৈনিক সংগ্রামে ঘুরেফিরে বারে বারে আসে। তাছাড়া , লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত যে চার ধরণের সংবাদের কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে তার প্রায় অধিকাংশ সংবাদেই ‘হিন্দু’ শব্দটা এসেছে, এবং সেটা নেতিবাচক অর্থে। দৈনিক সংগ্রাম ছাড়াও অন্যান্য পত্র-পত্রিকা সে সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে প্রবন্ধও ছাপায়।

প্রোপ্যাগান্ডার সময়ে এমন কিছু শব্দ বা প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় আক্রান্তদের চিহ্নিত করতে, তা তাদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রত্যয় ব্যবহার নির্ভর করে পরিস্থিতির উপরে। এককালের নিরীহ শব্দও কখনো কখনো পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে হয়ে ওঠে ভয়ংকর। দৈনিক সংগ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করতে যেসব প্রত্যয় করতো, যেমন, ‘দুষ্কৃতিকারী’, ‘ভারতের দালাল’, ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’, ‘অ্যন্টি-স্টেট এলিমেন্ট’, ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ তা বর্তমানে নিরীহ গোছের মনে হলেও তৎকালীন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তা ছিল ভয়ংকর। যেহেতু এরা ‘খারাপ’, তাই এদেরকে হত্যা করতে কোন অসুবিধা না। মুক্তিযোদ্ধারা যেহেতু ‘দুষ্কৃতিকারী’ এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদের ‘নির্মূল’ করছে, তাই সেনাবাহিনীর প্রশংসাও করতে হবে সাধ্যমত।

উপরে যে চার ধরণের সংবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে এই প্রত্যয়গুলোর প্রচুর ব্যবহার পাওয়া যায়। দৈনিক সংগ্রাম যখন রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু কবি বলে প্রচার করে তখন রবীন্দ্রনাথের শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ইঙ্গিত কর হয় না, বরং, একাত্তরের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সেটা হয়ে উঠে বিদ্বেষপূর্ণ। ঠিক তেমনি দেখা যায় মুজিব -তাজউদ্দীনকেও হিন্দু বানিয়ে দেয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতি অনুযায়ী শব্দ-বাক্যের অর্থের ভিন্নতা দেখা দেয়। যে কোন সংঘাতের মূহুর্তে নিজের জাতির শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা অন্য জাতির জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অন্য সময়ে, হয়তোবা তা খুব স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হতে পারে। পাকিস্তানি সামরিক গোষ্ঠী এবং তাদের দালালদেরকে দেখা যায় বিভিন্ন সভা সমিতিতে বক্তৃতা প্রদান কালে, বিশেষ করে জনসাধারণের সামনে, ‘মুসলমানরা শ্রেষ্ঠ’ এমন দাবি প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন[8]। তাদের এমন দাবির মাধ্যমে প্রকারান্তরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরকে হেয় করা হয় এবং ওই পরিস্থিতিতে এ বক্তব্যগুলো মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্যে হুমকিস্বরূপই ছিল।

পাকিস্তানিদের আক্রমণের প্রথম দিকে দৈনিক সংগ্রামের সংবাদগুলোতে ভয় উৎপাদনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। উত্তেজনা ছড়াত মূলত Appeal to fear এর মাধ্যমে। মুসলমানদেরকে হিন্দুরা হত্যা করছে – এই ধরনের খবর প্রকাশ করত জনসাধারণদের মনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সম্পর্কে ভয় ঢুকিয়ে দিতে। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘হিন্দুদের দালাল’ আখ্যায়িত করে তাদের সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা প্রচার করত যেন সাধারণ মানুষ জীবনের ভয় থেকেই আত্মরক্ষার্থেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে। দেখা যায়, যুদ্ধ যত এগিয়ে যায় দৈনিক সংগ্রাম গণহত্যার জন্যে বিভিন্ন পরিকল্পনাও দিতে থাকে। দেশীয় দালালদের হাতে ভারী অস্ত্র – শস্ত্র তুলে দিতে শাসকদের কাছে অনুরোধ করে। শেষের দিকে এসে সরাসরি হত্যার হুমকি ও প্ররোচনা দিতে থাকে তারা; অনেকটা রুয়ান্ডার মতোই।

ভাষা প্রয়োগে গণহত্যা লুকানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, সেনাবাহিনী হত্যা করেছে – এমন সংবাদ প্রকাশ করা হত না। মানে, ‘হত্যা’ উল্লেখ করা হত না। ‘হত্যা’র স্থলে ব্যবহার করা হত ‘শত্রু নিধন’ কিংবা ‘শুদ্ধি প্রক্রিয়া’র মতো গালভরা নাম। কখনো কখনো আরও সুন্দর ও নরম ভাষায় বলা হত ‘সময়োচিত পদক্ষেপ’। অনেকটা ভূট্টোর মতো করে। পঁচিশে মার্চ রাতের পর তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে বলেছিলেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে।

এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষার হার ছিল খুবই অল্প। ১৯৬৭ সালের পরিসংখ্যান বলছে পূর্বাঞ্চলে সাক্ষরতার হার ছিল শতকরা ১৭.৬; তাই ধরে নেয়া যায় যে, পত্রিকার পাঠকদের সংখ্যা অধিক ছিল না। জনসাধারণের উপর পত্রিকার প্রভাবের মাত্রাও কম থাকাটাই স্বাভাবিক। এমন পরিবেশে জনসভার বক্তৃতা – বিবৃতি প্রোপ্যাগান্ডার জন্যে খুবই কার্যকর। ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এ প্রকাশিত দালালদের সভা –সমাবেশ –বিবৃতির খবরের আধিক্য তাদের প্রচারণার সে কৌশলের সত্যতা প্রমাণ করে। তবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একাংশের উপর যে পত্রিকাগুলোর প্রভাব পড়েছিল সেটাও অস্বীকার করা যায় না।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।বাংলাদেশ এবং রুয়ান্ডার গণহত্যায় প্রকৃতিগত অনেক ধরনের মিল থাকলেও এর পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে কিছু মৌলিক অমিলও বিদ্যমান। প্রথমত, রুয়ান্ডার গণহত্যার পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার হাত বদল হয় কিন্তু পাকিস্তানের গণহত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দ্বিতীয়ত, রুয়ান্ডা গণহত্যাকারীদের বিচার শীঘ্রই শুরু এবং শেষ করতে পারে, কিন্তু আমরা যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই বিচারকার্য শুরু করলেও রাজনৈতিক উত্থান পতনের কারণে সে বিচার ৪৫ বছর পিছিয়ে যায়।

বলা হয়েছে, Der Sturmer পত্রিকার সম্পাদক জুলিয়াসকে গণহত্যায় উস্কানিদানের জন্যে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছিল, যুদ্ধের পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল পত্রিকার প্রকাশনাও । একইভাবে, International Criminal Tribunal for Rwanda (ICTR) ২০০০ সালেই RTLM এর কর্তৃপক্ষকে গণহত্যার পূর্বে এবং গণহত্যাকালীন সময়ে উস্কানিমূলক খবরের জন্যে ‘গণহত্যায় উস্কানিদান’ এবং ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ এর দায়ে অভিযুক্ত করে। এবং, ২০০৩ সালেই তাদের বিচার হয়। Kangura পত্রিকার প্রধানকেও বিচার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এর বিচার তো হয় নি, উল্টো তারা এখনো তাদের প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিরামহীন ভাবে। যুদ্ধ পরবর্তী তাদের প্রোপ্যাগান্ডা জন্যেই একাত্তরের গণহত্যাকারীরা খুব সহজে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত হয়।

উপসংহার

উপরোক্ত আলোচনায় যে গণহত্যার কথা বলা হয়েছে তার সবগুলোই গত শতাব্দীর। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই একবিংশ শতাব্দীর দুই দশকের মধ্যেই অনেকগুলো গণহত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করে ফেলেছি, তারমধ্যে কিছু ঘটেছে আমাদের প্রতিবেশী দেশসমূহের ভেতরে। যে কোন সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যাকে সমস্যা বলে চিহ্নিত করা। আমরা এখনো তা করতে পারি নি। গণহত্যা অস্বীকার করার প্রবণতা, বিভিন্ন মতবাদের চশমার কারণেই, আমাদের মধ্যে বিরাজমান। অরুন্ধতী রয় ভারতের গুজরাটে সংঘটিত গণহত্যার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, তুরস্ক আর্মেনিয়ার গণহত্যা অস্বীকার করে নীরবতার মাধ্যমে এবং ভারত গুজরাটের গণহত্যা অস্বীকার করে উৎসবের মাধ্যমে। গণহত্যা অস্বীকার করা হয় আমাদের দেশেও। আমরা কখনো অস্বীকার করি নিজেদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা, আর নিজেদেরটা স্বীকার করলেও অনেকসময় গণহত্যার প্রকৃতি বুঝে উঠতে না পেরে কিংবা বিভিন্ন মতাদর্শিক কারণে অস্বীকার করি অন্যের উপর চালিত গণহত্যাকে। গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিবর্গের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করে দল মত নির্বিশেষে পৃথিবীতে সংঘটিত গণহত্যাকে স্বীকার কর নিতে হবে আমদের। বিষয়টা সরলীকরণ হয়ে গেলেও এটা সত্য যে, প্রতিটা গণহত্যার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। এই বৈষম্য থেকেই উৎসারিত বিভিন্ন সমস্যা ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে গণহত্যার পথ সুগম করে। সাত্রে বলেছিলেন যে, অধীনস্থ জনগণের বিদ্রোহে ঔপনিবেশিক শক্তির উত্তর একটাই – নিপীড়ন ও গণহত্যা। একটু অন্যভাবে বলা যায়, অধীনস্থ জনগণের বিদ্রোহে ক্ষমতাবান শক্তির উত্তরও হচ্ছে গণহত্যা। তাই, গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অংশ হিসেবেই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে সকল সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে, আওয়াজ তুলতে হবে নিপীড়নকারী সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।

________________________________________
[1] সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ২০১৬, “একাত্তরের যুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা”, নতুন দিগন্ত চতুর্দশ বর্ষ (তৃতীয় সংখ্যা)।
[2] আলী আকবর টাবীর ‘মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে।
[3] ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ, ১৯৭১। সূত্র: বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদরী।
[4] টাইম সাময়িকী, ১২ এপ্রিল, ১৯৭১। সূত্র: বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদরী।
[5] মুনতাসীর মামুন, রাজাকারের মন
[6] মার্কিন সরকারের অতি গোপনীয় প্রতিবেদন, পূর্ব পাকিস্তানে সংঘাত: পটভূমি ও ভবিষ্যৎ। সূত্র: বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদরী।
[7] গণহত্যা: এন্থনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন, দি সানডে টাইমস, ১৩ জুন ১৯৭১। সূত্র: বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদরী।
[8] সহুল আহমদ, মুক্তিযুদ্ধে ধর্মের অপব্যবহার, আমার প্রকাশনী, ২০১৭

Most Popular

To Top