টুকিটাকি

কি দেখার কথা আর কি দেখছি!

কি দেখার কথা আর কি দেখছি!- নিয়ন আলোয়

এই লেখাটা লিখবো কি না, অনেকবার ভেবেছি – শেষ পর্যন্ত না লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর কেন যেন আবার মনে হলো, থাক নিজের জন্যই এটা লিখে রাখি। গত কয়েকদিনে রংপুরে হিন্দুদের ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর ফেসবুক পোস্ট দেয়া এবং সেটার প্রেক্ষিতে অতি অনুভূতিপ্রবণ মুসলমানদের দ্বারা সেই হিন্দুদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া নিয়ে অসংখ্য মানুষের অসংখ্য পোস্ট, শেয়ার, কমেন্টস দেখলাম – দেখছি এবং হয়তো আরো দেখবো (যদিও আশা করি সেটা যেন না হয়)। নিকট অতীতের এমনিতর ঘটনাসমূহে যেমনটা করি, এবারও তাই করেছি, করছি।

কোন পোর্টালের নাম খেয়াল করিনি, কোন ব্যক্তির নাম মনে রাখিনি –
শুধু তাকিয়ে দেখেছি কুমার, চ্যাটার্জী, মুখার্জী, ভট্টাচার্য, মোহাম্মদ, আহাম্মদ, আলি পরিচয় ধারী আইডি গুলোর পিছন থেকে অসংখ্য মানুষের ঘৃণা, রাগ, অক্ষমতা, হতাশা আর আস্ফালন। কি অকথ্য ভাষা আর শব্দের ব্যবহার, কি নিদারুণ অপচয় রক্ত দিয়ে কেনা শব্দগুলোর! মুক্তিযুদ্ধের মত একটি গৌরবময় বিষয় নিয়ে যে জাতি একমত হতে পারিনি, তারা যে জাতীয় জীবনে আর কোন কিছু নিয়েই একমত হতে পারবোনা সেটা বলাই বাহুল্য।

বহুমত- দ্বিমত বিষয়টা খারাপ না, তবে আমরা যেভাবে সেটার প্রকাশ করি সেটা কেবল খারাপ বললে কম বলা হত, সেটা আসলে এক ধরনের অসুস্থতা।
মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য ধর্মের চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহার আমরা তো সেই মুক্তিযুদ্ধ থেকেই শিখছি।

অদ্ভুতভাবে এত এত পোস্ট, শেয়ার, কমেন্টস এর ভীড়ে আমরা সবচেয়ে আসল এবং প্রয়োজনীয় যেই জিনিসটা দেখার কথা ছিল, সেটাই দেখছি না।
আমাদের দেখার কথা ছিল মনুষ্যত্ব, আমাদের দেখার কথা ছিল চোখের সামনে ঘরবাড়ী পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কিছু মানুষের ক্ষত বিক্ষত হৃদয়, আমাদের দেখার কথা ছিল আসলে কারা কিছুদিন পর পরই একই ধরণের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আগুন উস্কে দিচ্ছে।

কিন্তু আমরা দেখছি ঠিক এর উল্টোটা, আমরা লিপ্ত হয়ে যাচ্ছি আরো গভীরতম বিবাদে, গালাগালিতে – সেই বিবাদ গালাগালি আল্লাহ-রসুল, দেব – দেবী ঘুরে এসে শেষ পর্যন্ত নেমে আসে একে অন্যের মা-বোনের সম্পর্কে, নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে আমরা বেছে নিয়েছি ধর্মের ছুঁড়ে ফেলে দেয়া জিনিসগুলোকেই।

কি নিদারুণ অপমান ধর্মের আর ধর্মের চর্চার। রাষ্ট্রীয় হিসাবে বলা আছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। সেই ইসলামী রাষ্ট্রে যখন প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকা ঘুষ দেয়া নেয়া হয় তখন আশ্চর্যজনকভাবে কারো কোন অনুভুতিই আঘাত প্রাপ্ত হয়না, যখন কোন মেয়েকে ধর্ষণ করে মাথা থেঁতলে দেয়- তখন “মিনমিন” গলার আওয়াজ ছাড়া আর কোন অনুভূতি হয়না, যখন অনেক অনিয়মের কোন বিচার হয়না তখন কারো অনুভূতি আঘাত প্রাপ্ত হয়না………….(দ্যা লিস্ট গোওস অন এন্ড অন এন্ড অন…) কিন্তু কে কোথায় একজন ধর্ম নিয়ে কি বললো না বললো এতেই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল।

ধর্মীয় অনুভূতিএতো নরম, এত ভংগুর কেন এখনকার মানুষের? নাকি জগতের সকল অপ্রাপ্তি আর আক্ষেপ উদগিরণের নাম এই “ধর্মীয় অনুভূতি”!
যদি এতই ধার্মিক হয়ে থাকেন, তবে কেন বোঝেন না যে, আল্লাহ ক্ষমাকারী কে পছন্দ করেন – অন্যের ঘর পুড়ানি মানুষ কে নয়। এমন ঘটনার বিচার হওয়া দরকার – সে যেই ধর্মের লেবাসেরই হোক।

অনেকেই বলবেন, ভাই অন্য ধর্মের মানুষের পান থেকে চুন খসলেই এতো কথা বলেন – কই কোন মুসলিম আমাদের দেশে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তো কিছু বলেন না, তাদের কে বলি, এই লেখাটা আর কষ্ট করে পড়ার প্রয়োজন নেই, কারণ, এই লেখার মুল বক্তব্যটাই আপনি বুঝতে পারেন নি। যেখানে মানুষ কে সাহায্য বা তার ক্ষতি করার জন্য ধর্মীয় পরিচয়টা না দেখে, তাকে মানুষ হিসাবে দেখতে চেয়েছি।

আবার অনেকে বলবেন, অন্য অনেক দেশের চেয়ে আমাদের দেশে অন্য ধর্মের মানুষেরা অনেক ভালো আছে। হয়তো সত্যি কথা, আমার কাছে কোন প্রকার তথ্য পরিসংখ্যান নেই। যেহেতু আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম, সেহেতু আমরা কি পারি না এই অল্প সংখ্যক অন্য ধর্মাবলম্বীদের আমাদের আমানত ভেবে এই দেশে ধর্মীয়ভাবে অন্তত তাদের সকল অধিকার রক্ষা করতে? ইসলামের মতে কি সেটাই হওয়া উচিত না? তারা যদি ভুল বা অনাচার কিছু করে থাকে, সেটার শাস্তি জন্য দেশে আইন আদালত আছে – বিচার ব্যবস্থা আছে – না হলে বিশ্বাসের শক্ত দোরগোড়ায় শেষ পর্যন্ত সর্বশক্তিমান সৃস্টিকর্তা তো আছেন ই- ধর্মের দোহাই দিয়ে আপনি তাদের ঘর পুড়িয়ে দেয়ার কে?

ছোট্ট একটা দেশ, তাই নিয়ে কত রাজনীতি-সীমান্তনীতি- এখন যদি এই ধর্মনীতির নামে অধর্মনীতিটা আমাদের মাঝে চিনে জোঁকের মত চেপে বসে, তাহলে তো আর আমাদের কখনো উঠে দাঁড়ানো হবে না।

তাই দয়া করে ধর্মের নামে অন্যের ঘরে আগুন দেয়ার আগে নিজের ধর্মটাকে একটু বোঝার চেষ্টা করুন – এতে যেমনি স্রষ্টা খুশি থাকেন, তেমনি স্রষ্টার সৃষ্টিরাও দুদণ্ড শান্তিতে থাকতে পারে আর তাতে মানবতাও রক্ষা হয়।
আমারও ভুল থাকাটা – দেখার দৃষ্টিটা ভুল হওয়া খুবই সাধারণ কিন্তু তারপর ও শুধু মনে রাখি,

“জীবে দয়া করে যেই জন
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর “

আর মানুষ তো আশরাফুল মাখলুকাত- সৃষ্টির সেরা জীব, সে যেই ধর্মের ই হোক না কেন।

Most Popular

To Top