টুকিটাকি

যখন একদিনে বিক্রি হয় ২৫.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য!!!

যখন একদিনে বিক্রি হয় ২৫.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য!!!

“সিঙ্গেল দিবস”-এ চীনের জনপ্রিয় অনলাইন বেচাকেনার প্রতিষ্ঠান আলিবাবার বিক্রি ছুঁয়েছে প্রায় ২৫.৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার। হ্যাঁ, দিবসটির নাম “সিঙ্গেল দিবস”, যা যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক ফ্রাইডের মতো চীনে বর্তমানে কেনাকাটা বিষয়ক একটি উৎসবমুখর দিনে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গেল দিবসের আদ্যোপান্ত জানানোর আগে আলিবাবা প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়।

আলিবাবা চীনের অন্যতম প্রধান ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, যা প্রধানত ক্রেতাদের সাথে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের কাজ করে। এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম, কেনাকাটা বিষয়ক সার্চ ইঞ্জিন সহ আলিবাবা আরো অনেক সেবা প্রদান করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে ১৯৯৯ সালে, এর প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা-এর হাত ধরে। এবছরই আলিবাবা প্রথম এশিয়ান কোম্পানি হিসেবে ৪০০ বিলিয়ন ডলার এর সীমা অতিক্রম করে। ৫০ হাজারের এরও অধিক কর্মচারীসম্পন্ন কোম্পানিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৮৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার। চীনে গোড়াপত্তন হলেও বর্তমানে সারাবিশ্বেই পণ্য বেচাকেনার নির্ভরযোগ্য নাম “আলিবাবা.কম”।

এবার আসা যাক সিঙ্গেল দিবসে। নভেম্বরের ১১ তারিখ, অর্থাৎ ১১/১১ তারিখ টি বেছে নেন চীনের সিঙ্গেল মানুষেরা, কারণ তারিখটিতে চারটি এক আছে। আজ থেকে এক যুগ আগেও চীনে নিছক হাস্যরসাত্মকভাবে পালিত হতো এই সিঙ্গেল দিবস। প্রেমের রণে ভঙ্গ দেয়া মানুষদের, কিংবা গাঁটছড়া বাঁধেননি বা অদূর ভবিষ্যতে বাঁধার কোনো সম্ভাবনাও নেই এমন মানুষেরা তাদের সিঙ্গেল থাকাকে উদযাপন করে এই দিনে। কিন্তু আলিবাবা এই দিনটিকে করে তোলে চীনের বেচাকেনার মহোৎসবের এক দিনে, ঠিক যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রে পালিত হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে।

ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে বিশাল মূল্যহ্রাসের বিজ্ঞাপন দেখে লাখ লাখ ক্রেতা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দোকান আর অনলাইন বেচাকেনার ওয়েবসাইটগুলোতে। চীনের সিঙ্গেল দিবসও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য এর সিঙ্গেল জনগোষ্ঠী, যাদের সহজেই পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করা যায়। চীনে এই দিবসটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে গত ১১ই নভেম্বরে সিঙ্গেল দিবসের একদিনে মোট ক্রয়-বিক্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত “সাইবার মানডে” আর “ব্ল্যাক ফ্রাইডে”র সম্মিলিত ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে।

আলিবাবার তরফ থেকে জানানো হয় যে, সিঙ্গেল দিবসে তাদের সর্বমোট ২৫.৩ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য বিক্রি হয়, যা তাদের বিগত বছরের বিক্রির চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। আরো জানানো হয় যে, দিনের প্রথম ১৩ ঘন্টায়ই প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বেচাকেনার মাইলফলক স্পর্শ করে প্রতিষ্ঠানটি। বিগত বছরে এ রেকর্ড ছিলো ১৭.৮ বিলিয়ন ডলারের, যা সিঙ্গেল দিবসের পুরো ২৪ ঘন্টায় সম্পন্ন হয়েছিলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপণনের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং আলিবাবা-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার দখল করার প্রতিযোগিতা।

আবার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখা যায় যে ২০১৬-এর “থ্যাংক্সগিভিং” থেকে “সাইবার মানডে”, অর্থাৎ ২৪শে নভেম্বর থেকে ২৮শে নভেম্বর সর্বমোট পাঁচ দিনে বেচাকেনা হয় ১২.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার সমমূল্যের। সিঙ্গেল দিবসে চীনা ক্রেতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে চীনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর যেমন মুন্সিয়ানা রয়েছে, তেমনি ভূমিকা রয়েছে এই প্রযুক্তির মোহাবিষ্ট ক্রেতাদের। সাধারণ জনগণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদক্ষ কৌশলের কাছে বরাবরই হার মানেন আর অনেকটাই ঝোঁকের বশে কিনে ফেলেন অপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী। ক্রেতারা এমনও বলেছেন যে, গত বছরের তুলনায় এ বছরের অফার তুলনামূলকভাবে কম লোভনীয় থাকা সত্ত্বেও তারা প্রচুর কেনাকাটা করেছেন। এমন হুজুগে কেনাকাটায় তারা যেমন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, তেমনি কোম্পানিগুলোর “বিগ ডাটা” ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতাদের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্রেতাদের পছন্দসই পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা কেনাকাটা বিষয়ক দিবসগুলোর মতোই সিঙ্গেল দিবসে আলিবাবায় গৃহস্থালী দ্রব্যাদি, কাপড়, ইলেক্ট্রনিক সরঞ্জামাদি, প্রসাধন সামগ্রী সহ আরো অনেক পণ্যের মূল্যেই ছাড় দেয়া হয়। এছাড়াও অনেকটা কৌতুক করে কিছু উদ্ভট অফারও দেয়া হয় দিবসটিতে। যেমন : কোনো কোম্পানির মদের আজীবন যোগানের বিনিময়ে এককালীন অর্থপ্রদানের সুযোগ। এছাড়া, অনলাইনে কেনাবেচার সময় “কার্ট” নামে যে ভার্চুয়াল তালিকায় ক্রয়যোগ্য পণ্য যোগ করা হয়, তার ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যও এদিন ক্রেতাদের টাকা খরচ করতে দেখা যায়। কারণ আলিবাবা-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্ট এর ধারণক্ষমতা থাকে সীমিত, যা তাদের জন্য বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় সিঙ্গেল দিবসের মতো দিনগুলোতে। আর তাই সিঙ্গেল দিবসে আলিবাবা-র দোকান আর ওয়েবসাইটে হিড়িক পড়ে যায় শপিং পাগল লাখ লাখ মানুষের।

ব্যবসাসফল দিনটি উদযাপন করার জন্য কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা আয়োজন করেন এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের, যাতে অংশগ্রহণ করেন নামীদামী সংগীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী আর খেলোয়াড়েরা। অনুষ্ঠানটি আলিবাবা-র নিজস্ব ভিডিও সার্ভিস ছাড়াও তিনটি জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার করে। আর করবেই বা না কেন, চীনের অর্থনীতির জন্য সিঙ্গেল দিবস এর গুরুত্বটাই যে এমন!

সিঙ্গেল দিবস এর মতো কোনো উৎসব বা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে আলিবাবা-র মতো কোম্পানির সুকৌশলে ব্যবসা করা এবং ভোক্তাদের আকৃষ্ট করার এ ঘটনা কিন্তু নেহায়েতই নতুন নয়।

আজ থেকে প্রায় ১৯৫ বছর আগে, অর্থাৎ ১৮২২ সালে যুক্তরাজ্যে ভ্যালেন্টাইন দিবসে প্রেমিক-প্রেমিকাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ক্যাডবেরি তাদের প্রথম “হার্ট” আকৃতির চকোলেট বাক্স বাজারজাত করে। এরপর “হাওল্যান্ড” আর “হলমার্ক” এর মতো কোম্পানির হাত ধরে দিবসটিতে প্রবেশ করে কার্ড আদানপ্রদানের রীতি। এভাবেই শুরু হয় দিবসটির বানিজ্যিকরন, যা আজ বৃহদাকার ধারণ করেছে। ব্যতিক্রম নয় “ব্ল্যাক ফ্রাইডে” আর “সাইবার মানডে”-ও। প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার আনন্দকে পুঁজি করে রীতিমতো দিবসগুলোকে একরকম প্রচলনে পরিণত করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। কিংবা, খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব ক্রিস্টমাস এর কথাই ধরা যাক। ১৮৭০ সালে এক জার্মান কার্ড ব্যবসায়ী ভাবছিলো কিভাবে তার ব্যবসার প্রসার ঘটানো যায়। স্ত্রীর পরামর্শে সে ক্রিস্টমাস কার্ড তৈরি করা শুরু করে। ছোটখাটো উপহার হিসেবে ভালো সাড়া ফেলে এই কার্ড। ১৮৭৫ নাগাদ ক্রিস্টমাস কার্ড এতটাই জনপ্রিয় হয়ে পড়ে যে, ওই ব্যবসায়ী কার্ডের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে শুরু করে। আবার, ক্রিস্টমাসে সান্টা ক্লস এর যে বর্তমান মূর্তি আমরা দেখতে পাই, তা কিন্তু সব সময় এমনটা ছিলো না। কাল্পনিক এই চরিত্রকে অনেকেই অনেকভাবে চিত্রায়িত করলে, আজকের এই সদা হাস্যোজ্জ্বল বৃদ্ধের সৃষ্টির পেছনে ছিলো কোকা-কোলা কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশল। সাধু নিকোলাসের নমনীয় ব্যক্তিত্বের ছাপ দিয়ে তারা তৈরি করে সান্টা ক্লসের এই আধুনিক রূপ, তাকে বসিয়ে প্রতিটি বিজ্ঞাপনে। আধুনিক সান্টা ক্লসের কাজ ছিলো সবার কাছে আনন্দ পৌছে দেয়া, আর এই আনন্দ পৌছানোর মাধ্যমই ছিলো কোক। এভাবে তারা ধর্মীয় উৎসবের প্রতীককে বানিয়ে দেয় তাদের পণ্যের বিক্রেতা। এভাবেই যুগে যুগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লাভের জন্য ব্যবহার করে আসছে ভোক্তাদের আবেগ, উৎসব আর দুর্বলতাকে। বিশ্বায়নের এই যুগে সেই লাভের অংক যে বিলিয়নের কোঠা ছুঁয়েছে, সে আর আশ্চর্য কি!

Most Popular

To Top