লাইফস্টাইল

আলোর দেখা পাচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র?

আলোর দেখা পাচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ?

আমাদের দেশের সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গেলে আশার চেয়ে হতাশার বর্ণনাই বেশী দিতে হয়। ভালোর চেয়ে মন্দের নজির বেশী। কিন্তু গত বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের আয়নাবাজী সিনেমা দিয়ে একটা বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। আয়নাবাজীর ধারাবাহিকতায় এ বছর ঢাকা এ্যাটাক, ডুব, অজ্ঞাতনামা কিংবা মুক্তির অপেক্ষায় থাকা হালদা, গহীন বালুচর মুক্তি পাবে। যেসব সিনেমা নিয়ে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের দর্শকেরা বেশ আশাবাদী।

ঢালাওভাবে কোন সিনেমা প্রশংসা কিংবা নিন্দা এই লেখাতে পাবেন না। বরং বাংলাদেশী সিনেমা কেন আলোচনার মধ্যে থাকছে, বদলে যাওয়া বাংলাদেশী সিনেমা, এফডিসি ভিত্তিক সিনেমার অকার্যকারতা এসব নিয়েই বেশী কথা থাকবে।

আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের উন্নতির প্রধান অন্তরায় মৌলিক গল্প এটা কমবেশী সবারই বোধগম্য। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সিনেমা দর্শক, সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে সেসব কোন সিনেমা নিয়েই কপি বা চুরি করার অভিযোগ ওঠেনি। সুতরাং, মৌলিক গল্প হলে সিনেমা চলবে নাহলে চলবে না। যেসব সিনেমার কথা শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, সব সিনেমা কিন্তু এফডিসি ঘরাণার বাইরের ছবি। বাংলাদেশে যেসব গতানুগতিক ধারার এফডিসি ভিত্তিক সিনেমা হয়, এগুলো তার পুরোপুরি বিপরীত। কাস্টিং এর ক্ষেত্রে নজর দিলেও বোঝা যায়। গতানুগতিক নায়ক বলতে যারা পরিচিত তাঁদের দেখা যায়নি। শুধুমাত্র ঢাকা এ্যাটাকে আরেফিন শুভ বাদে।

আমাদের দেশের সিনেমার মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো গতানুগতিক তামিল কিংবা হিন্দি ছবির স্ক্রিপ্ট চুরি করে এফডিসি ভিত্তিক সিনেমা বানানো। এফডিসি ভিত্তিক চলচ্চিত্রে বৈচিত্রতার অভাব বড় একটি সমস্যা। সেখানে নাচ, গান, মারামারি ছাড়া একটা সুন্দর গল্প দেখার প্রত্যাশা করা খুব কঠিন। অনেকের মতে এসব সিনেমাই আমাদের চলচ্চিত্রকে কোনমতে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিছু শ্রেণির দর্শককে টার্গেট করে বানানো এ সিনেমাগুলো সীমাবদ্ধ গন্ডির মধ্যেই থাকে, কখনো সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। এখানে কিছু শ্রেণির দর্শকদের কথা বলে তাঁদের অপমান করা হয়নি,  শুধুমাত্র ইন্ডিকেট করার জন্য কথাটি বলা হয়েছে।

আমাদের দেশের যে কমার্শিয়াল মুভির মেকিং তা অত্যন্ত হাস্যকর। যেসব স্টান্ট দেখানো হয়,  তা একজন নীরস বদনের মানুষের মুখেও হাসি ফোটাতে যথেষ্ট। নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষেরা এই মুভির প্রধান দর্শক। এখানে তাঁদের কোন দোষ নেই। তাঁদের যা দেখানো হয়েছে তারাই তা দেখেছে এবং বিনোদন খোঁজার চেষ্টা করেছে। তাঁদের দোষ অতি সামান্যই। মূল দোষ পরিচালকের যারা এত বছর ধরেও তাঁদের রূচির পরিবর্তন করতে পারেনি। পরিচালক যা দেখাবে তাই তো দেখবে দর্শকেরা। এই যুগে এসেও আমাদের সিনেমাতে ভ্যান নিয়ে ড্রিফ্ট করা দেখানো হয়! এসব দৃশ্য দেখতে হয় আমাদের। তাহলে সেই এফডিসি ভিত্তিক তৈরী চলচ্চিত্রে আগ্রহ থাকবে কি করে?

নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কথা বলতে আমি সাধারণত নিম্নআয়ের মানুষদের বুঝিয়েছি। অযাচিত ভাবে তেড়ে আসার আগে পুরোটা পড়ুন। দুনিয়ার সব শিল্পই সব ধরণের দর্শকের জন্য নয়। সবাই সবকিছু গ্রহণ করবে না। এটাই স্বাভাবিক। যারা কুবরিক, নোলানের দুর্বোধ্যতা দেখে তাদের চিত্তকে বিনোদিত করে আপনার কোন অধিকার নেই নাচ গানে ভরপুর কোন সিনেমা দেখার জন্য জোর করার। তেমনিভাবে যারা নাচ গানের সিনেমা দেখে অভ্যস্থ, তাদের ইচ্ছা না হলে তারাও ঐসব ক্যাটাগরীর সিনেমা দেখবে না। কিন্তু আমাদের দেশে ঢালাও ভাবে যে নিম্নরূচির সিনেমা বানিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের খাওয়ানো হচ্ছে তা খুবই নিন্দনীয় একটি কাজ।

এই যুগে এসেও তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। এখানে পরিচালকের দায়টা সবচেয়ে বেশি। তারাই দর্শকদের রূচি উন্নত করতে বড় ভূমিকা পালন করে কিন্তু তারা এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছে। এইসব সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট লোকজনের কিছু আয় হলেও তাতে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের কোন স্থায়ী লাভ হচ্ছে না। বরং যে গভীরে ডুবে ছিলো বাংলাদেশী সিনেমা সে গভীরেই ডুবে থাকবে। এরকমভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বাচিয়ে রাখার কোন মানে হয় না।

আয়নাবাজী সিনেমা দেখিয়েছে কিভাবে সিনেমার মার্কেটিং করতে হয়। বাংলাদেশী সিনেমার ক্ষেত্রে শুধু মাইক আর পোস্টারিং করেই প্রচার হয় বলে যে প্রচলিত ধারণা ছিলো, সেটার বাইরে ভিন্ন কিছু করে দেখিয়েছে আয়নাবাজী। ছবি মুক্তির একবছর আগে থেকেই প্রচারণা, বিভিন্ন প্রতিযোগীতার আয়োজন সম্ভবত আয়নাবাজীই প্রথম করে দেখিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা এ্যাটাক সিনেমাতেও আমরা ভিন্ন মাত্রার কিছু প্রচারণা দেখেছি। প্রচারণা যে কতবড় ফ্যাক্টর সেটার প্রমাণ পেতে হলে অজ্ঞাতনামা সিনেমাটির দিকে তাকান। তৌকীর আহমেদের এত সুন্দর মানবতার গল্প শুধুমাত্র প্রচারণার অভাবে দর্শক দেখতে পেল না। পরে অবশ্য ঠিকই এ নিয়ে চলচ্চিত্রমোদীদের আফসোস করতে দেখা গেছে। আশা করবো তৌকির আহমেদের পরবর্তী চলচ্চিত্র হালদা যেন এরকম নির্মমতার শিকার না হয়।

তৌকির আহমেদ, অমিতাভ রেজা, দীপঙ্কর দীপন, মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী কেউই এফডিসি কেন্দ্রিক সিনেমা বানান না ফলে তাঁদের হল পেতে সমস্যা হয়। সিন্ডিকেটের ঘেরাটোপে বন্দী করা হয় তাঁদের। কিন্তু দর্শকদের চাপেই আয়নাবাজী ও ঢাকা এ্যাটাকের মত সিনেমাগুলোর জন্য সিন্ডিকেট বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আপনা আপনি বেড়েছে হলের সংখ্যা। এফডিসি ঘরাণার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এটা একটা বার্তা। ভাল ও মৌলিক গল্প হলে সিনেমা চলবেই।

Most Popular

To Top