নাগরিক কথা

নন্দিত নরকে!

নন্দিত নরকে!

পৃথিবীতে কয়টি দেশ আছে, আমি জানি না। তবে বেশ কয়েকটি দেশে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। যেমন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, এমনকি সুইজারল্যান্ড। দেশের কাছাকাছি আরও ৩ টি দেশ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, ভারত, নেপাল এবং শ্রীলংকা। আর এই নিয়ে আমেরিকায় আমি তৃতীয়বারের মতো এসেছি। এবার মোটামুটি দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকছি। এক বছর পার হয়েছে; আরও বছর খানেক থাকার প্ল্যান আছে। এই নানান দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি কথা গর্ব নিয়ে বলতে চাই। আমাদের মানিকগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে যে রকম মাটি আছে, সেই রকম মিষ্টি মায়ায় ভরা মাটি পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

বোম্বের জুহু বিচ নাকি খুবই বিখ্যাত। সেই অতি বিখ্যাত বিচে আমি ৩ দিন থাকার প্ল্যান নিয়ে গিয়েছিলাম। দুই ঘন্টার মধ্যে চরম বিরক্ত হয়ে হোটেলে ফিরে এসেছি। আমাদের কক্সবাজার কিংবা সেন্টমার্টিনের তুলনায় এই বিচকে নিতান্তই ছাপোষা মনে হয়েছে। ইতালীর আর্নো নদীতে পা ভিজিয়ে আমার বিবমিষা হয়েছে। বাংলাদেশের নদীর মতো মিঠা নদী পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা জানা নাই।

বাংলাদেশের মতো সুন্দর দেশ, স্বর্গসম দেশ কোথাও নেই। এমন দেশ আসলেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কবিরসত্যিকারের চোখ ছিলো। তিনি নির্ভুলভাবে বলেছিলেন, ভায়ের মায়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ। বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলা মায়ের আদর, ভায়ের স্নেহ, এই দেশটিকে একটি মনোরম স্বর্গপুরীতে রূপান্তর করেছে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বর্গে আমরা কেন নরকের যন্ত্রণা ভোগ করবো? নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমাদের বন্ধু মুবাশ্বের হাসান সিজার বাংলাদেশকে সত্যিকারের অর্থেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দেশ ভাবতো। সে ইউরোপ আমেরিকার লোভ ত্যাগ করে বাংলাদেশেই ছিলো। ছাত্র পড়িয়ে খেতো। সেই সিজার আজ দুইদিন হলো নিখোঁজ। সিজার অত্যন্ত পরিচিত একটি ছেলে। সরকারের উপর মহলের অনেকেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে এবং অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে চেনেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের এটুআই প্রজেক্টে কাজ করতো। এই ছেলেটি দুইদিন হলো নিখোঁজ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার ফেসবুক কিন্তু দিব্যি চলছে। সিজার বাসা থেকে বের হবার সময় ল্যাপটপ রেখে গিয়েছিলো। সে ল্যাপটপে এলার্ট দিচ্ছে। সাধারণত ফেসবুক বা জিমেইল অন্য কোনো ডিভাইস থেকে খুলতে যে ধরণের এলার্ট আসে, ওই ধরণের এলার্ট। এর মানে হচ্ছে, সিজার ”অন্য কোনো জায়গায়’ বসে অন্য কোনো ডিভাইস থেকে ফেসবুক খুলছেন। তাকে মেসেজ পাঠালে, সেটি সিনও হচ্ছে।

সিজারকে কি অপহরণ করা হয়েছে? এ কেমন অপহরণকারী যে মুক্তিপণ না চেয়ে ওর ফেসবুক আর ইমেইল খুলে বসে আছে। শার্লক হোমস এই কেস হাতে পেলে, তাজ্জব হয়ে বসে থাকতেন। কিন্তু আমরা যারা বাংলাদেশ নামক স্বর্গে বাস করি, তারা স্পষ্টই অনুমান করতে পারছি, সিজারের ভাগ্যে কী ঘটেছে। যে মনোরম দেশটি আমরা জন্মসূত্রে পেয়েছি, যে মায়াময় দেশটি আমরা অনেক ভাগ্যে পেয়েছি, ঠান্ডা মাথায় এই দেশটিকে কেন নরক বানাচ্ছি? এই বিচার আমরা কার কাছে চাইবো?

সিজার যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে বলুন, কী তার অপরাধ? সেই অপরাধের বিচার করুন। দেশে বিচারালয় আছে, আইন আছে, পুলিশ আছে। একটা মানুষ দিনে দুপুরে নিখোঁজ হয়ে যাবে, এটা কেমন কথা? আমরা কি ঠান্ডা মাথায় একবার ভেবে দেখেছি, দেশটাকে টেনে টেনে আমরা কোন পাতালে নিয়ে যাচ্ছি? এই দেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? এই দেশ কি সিজার চেয়েছিলো? ছোট্ট একটা ঘনবসতিপূর্ণ শহর থেকে একটা মানুষ গায়ের হয়ে যাবে, অথচ তার ফেসবুক চলবে, তার মতো সুপরিচিত মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, এটাই কি এখনকার বাংলাদেশ? বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। সরকারের উচ্চ মহলের চেনা, অচেনা প্রতিটি মানুষের উপরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। কেননা আমরা বাঙালি, আমাদের অন্তর মায়ায় ভরা। এবং এই মায়ার সূত্রে আমরা সকলে ভাই। সেই মায়ার দোহাই দিয়ে বলছি, একবার সিজারের বাবার কথা ভাবুন। উনি তো আমাদেরই বাবা। একবার সিজারের হতবাক মায়ের কথা ভাবুন। উনি তো আমাদেরই মা। একবার সিজারের একমাত্র বাচ্চা মেয়েটার কথা ভাবুন, ও তো আমাদেরই মেয়ে। আমরাই তো কোনো না কোনো বাবার সন্তান, মায়ের আদরের ধণ, সন্তানের স্নেহশীল পিতা। আপনাদের শুভবোধের দোহাই, সিজারকে খুঁজে বের করুন। এই দেশকে নরক বানাবেন না।

Most Popular

To Top