ইতিহাস

“ফ্রম রাশিয়া, উইথ লাভ”- একজন রাশিয়ান মাফিয়া বলছি

“ফ্রম রাশিয়া, উইথ লাভ”- একজন রাশিয়ান মাফিয়া বলছি

হেডলাইন পড়ে আপনাদের নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে রাশিয়ার পটভূমিতে জেমস বন্ড সিরিজের বিখ্যাত মুভিটির কথা, যেখানে শন কনারি অভিনয় করেছিলেন বন্ড চরিত্রে। মুভিটির রিভিউ নয় এই লেখাটি, তবে কিছুটা হলেও সম্পর্ক আছে মুভিটার সাথে কারণ মুভিটার মতই আমার আজকের লেখা রাশিয়ান মাফিয়াদের নিয়ে।

মাফিয়া, নামটা শুনলেই গা শিউড়ে উঠে আমাদের মত সাধারণ মানুষের। লাল টকটকে চোখ, সুন্দর করে ছাঁটা গোঁফ, মুখের মধ্যে দামী চুরুট, ধোপ-দুরস্ত পোশাক-আশাকের সাথে মানানসই ঝাঁ চকচকে সব গাড়ি আর পান থেকে চুন খসার আগেই ঠাস করে গুলি; ইংরেজি আর তামিল সিনেমার কল্যাণে মাফিয়াদের এই রূপ দেখে আমরা অভ্যস্ত।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান সহ এশিয়া উপমহাদেশে ইন্টারপোল এর তালিকাভুক্ত কয়েকজন মাফিয়া আছেন কিন্তু শোনা যায় যে সারা বিশ্বের মধ্যে রাশিয়ান মাফিয়ারাই নাকি সবদিক দিয়ে এগিয়ে আছে। এখানে এগিয়ে আছে বলতে কিন্তু ভালো দিক দিয়ে এগিয়ে আছে তেমন না, এগিয়ে থাকা মানে অর্থ-বিত্ত আর নৃশংসতার দিক দিয়ে এগিয়ে থাকা।
মাস্টারপ্ল্যান করে শত্রুপক্ষকে খুন করতে কিংবা কাউকে দিনে-দুপুরে অপহরণ করতে এরা খুবই সিদ্ধহস্ত। এমনকি অনেক সময় টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকেও তারা খুন করে থাকে।

রাশিয়ান মাফিয়াদের উৎপত্তি কিন্তু সেই “জার”দের আমল থেকেই। তখন তারা অবশ্য মাফিয়া ছিলনা, ছোট ছোট ডাকাতের দল করে অত্যাচারী সামন্তপ্রভুদের প্রাসাদে কিংবা তাদের সম্পদের উপর হানা দিত এবং সেগুলো লুট করত। এই লুট করা সম্পদ থেকে নিজেদের জন্য কিছু রেখে বাকিটা গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিত এবং কখনোই কোনো গরীবের ঘরে তারা ডাকাতি করতনা। তাদের এই “রবিন-হুড” টাইপ কর্মকাণ্ডের জন্য শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল হলেও সাধারণ মানুষদের কাছে মাফিয়া বা ডাকাতরা ছিল খুবই জনপ্রিয়। Vorovskoy Mir বা “চোরদের জগত” নামে এদের মধ্যে একটি ভ্রাতা সংগঠন গড়ে উঠে যা নানা কঠোর নিয়মকানুন এবং নিজস্ব কোড দ্বারা পরিচালিত হত। এই সংগঠনের মূলমন্ত্র ছিল একে অপরের প্রতি সীমাহীন বিশ্বাস এবং সরকারের সাথে হাত না মিলানো, সম্পূর্ণ এই দুই “মটো”র উপর ভিত্তি করে এমন শক্ত দলের সৃষ্টি হয় যে স্বয়ং ভ্লাদিমির লেনিনও এদের দমন করতে পারেননি।

পরবর্তীতে যখন “জারদের”পতন হয় তখন স্টালিনের আমলে মাফিয়াদের ধরে ধরে “গুলাগ” নামক নারকীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রভাবশালী মাফিয়ারা vory v zakone (“thieves-in-law”) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মাফিয়াদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ

হিটলার যখন বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সোভিয়েত আক্রমণ করে তখন সোভিয়েত সরকার জেলখানায় বন্দী মাফিয়াদেরকে সরকারের হয়ে যুদ্ধের প্রস্তাব দেয় এবং বিনিময়ে তাদের সাজা মৌকুফ করে দেয়ার কথা বলা হয়।
অনেক মাফিয়া এই প্রস্তাবে রাজি হয় এবং যুদ্ধে যোগদান করে, কিন্তু এই প্রস্তাবের বিরোধিতাকারী মাফিয়ার সংখ্যাও নিতান্ত কম ছিলনা। বিরোধীতাকারী মাফিয়ারা সংগঠনের অর্ডারের মূলমন্ত্র “সরকারের সাথে হাত না মিলানো” অমান্য করায় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মাফিয়াদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করে কিংবা দলের নিচু পদে নিয়ে যায়। বহিষ্কৃত মাফিয়াদেরকে “সুকি বা কুকুরী” নামে ডাকা হত।

বহিষ্কৃত হওয়া মাফিয়ারাও নিজেরাই একটা দল বানায় এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা সরকারের থেকে নানা সুযোগ সুবিধা পেতে থাকে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে এবং সংগঠিত হয় কুখ্যাত “Bitch War”। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে অসংখ্য মাফিয়া মারা গেলেও পুলিশ চুপ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল, কারণ মাফিয়ারা নিজেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে মরলে “সাপও মরল কিন্তু লাঠিও ভাঙ্গলোনা”।

স্টালিন মারা যাওয়ার পরে প্রায় আট মিলিয়ন গ্যাংস্টার জেল থেকে ছাড়া পায় এবং তারা ছিল “বিচ ওয়ার”এ বেঁচে যাওয়া মাফিয়া। এরা সবাই মিলে বিভিন্ন দল গঠন করে এবং প্রাক্তন সেনা-অফিসাররাও টাকার লোভে এইসব গ্যাং-এ সামিল হয়।

মাফিয়ান ভ্রাতৃত্ব সংগঠন এবং একটি সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক

“রাশিয়ান মাফিয়া ইন আমেরিকা” নামক প্রবন্ধটির লেখক James Finckenauer তার প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে, মাফিয়া পরিবার হয়তোবা একদম দমবন্ধ করা নেটওয়ার্ক নয় কিন্তু তারা তাদের প্রত্যেক সদস্যকে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তুলে নিয়ে আসে। মাফিয়া গ্রুপে অনেকগুলো পদ থাকে এবং সেইসব পদাধিকারীরা তাদের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে।

মাফিয়া পরিবারে সর্বোচ্চ পদ থাকে “পাখান”র, তাকে বস বা পাপা বলে ডাকা হয় ক্ল্যানে। তিনি “ব্রিগেডিয়ার” নামক একজন মধ্যস্ততাকারীকে দিয়ে কাজ চালান এবং তার কথাই শেষ কথা।
“ব্রিগেডিয়ার” বা মধ্যস্ততাকারী নামক লোকের আন্ডারে থাকে ৫-৬ জনের একটা ব্রিগেড।অধস্তনদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া ছাড়াও সে অর্থ সংগ্রহ সহ সব ধরনের কাজ পরিচালনা করে।

“ডারজাথেল অবসচাকা” খটমটে নামধারী এই পদবির লোকরা ব্রিগেডিয়ারের কাছ থেকে টাকা আদায় করে এবং দরকার পড়লে সরকারের সাথে লিয়াজো করে অর্থের বিনিময়ে নিজদলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সৈন্য বা কর্মী হিসেবে ব্যাবহার করা হয় “ব্রাতক”দের, এরা ব্রিগেডিয়ারের নির্দেশ মত সবরকম অপকর্ম করে থাকে।

দলের অস্থায়ী বা ফ্রি-ল্যান্সার সদস্য হিসেবে কাজ করে থাকে “শেস্ট্যরকা”রা। কোনো টার্গেট সম্পরকে খবরা-খবর সংগ্রহ করাই এদের প্রধান কাজ। কাজের দক্ষতা এবং বিশ্বস্ততার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে তাদের “ব্রাতক” হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই যে এতগুলো পোস্ট এবং এতগুলো মানুষ, এদেরকে পাহারা দেওয়ার জন্য কিংবা গোয়েন্দাগিরি করার জন্য থাকে “স্পাই”। এরা সবসময় সদস্যদের নজরে নজরে রাখে এবং কোনো সদস্য বস’কে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলে সাথে সাথে বস’কে জানিয়ে দেয়।

পুরো ক্ল্যানকে এরপর ৪টি ইউনিটে ভাগ করে দেওয়া হয়, যার প্রধানরুপে থাকেন “পাখান” নিজেই।

১।এলিট গ্রুপের কাজ হলো বসের আন্ডারে পরিকল্পনা করা- সংগঠিত করা এবং ব্যাবস্থাপনা করা সকল কাজের।

২।সাপোর্ট গ্রুপ একজন স্পাইয়ের দ্বারা চালিত হয়, যা ওয়ার্কিং গ্রুপের অর্থ সংগ্রহ এবং কাজের প্রতি নজর রাখে।

৩।সিকিউরিটি গ্রুপের কাজই হলো দলের নিরাপত্তা রক্ষা করা, এর দায়িত্বে থাকেন আরেকজন স্পাই। এই দুই দলই কিন্তু এলিট গ্রুপের সাথে মিলে কাজ করে থাকে।

৪।সর্বনিম্ন গ্রুপ হল ওয়ার্কিং গ্রুপ যা চোর, ছিনতাইকারী টাইপের লোক দিয়ে গঠিত। এরাই মূলত সন্ত্রাসী কাজগুলো করে থাকে।

এইসবকিছু ছাড়াও আছে “ভর” নামক সর্বোচ্চ উপাধি যা একজন মাফিয়া নিজের কর্মদক্ষতা, বুদ্ধি, নেতৃত্ব দেওয়ার গুন এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে অর্জন করে থাকে। উচ্চপদের “পাখান”রা কাজ অনুযায়ী ভর উপাধি প্রদান করে।

এভাবেই গঠিত হয় এক-একটি রাশিয়ান ক্ল্যান, যারা পারেনা এমন কোনো কাজ নেই। রডিনা গ্যাং, জর্জিয়ান মাফিয়া, চেচেন মাফিয়া, ওরেকোভস্কা গ্যাং নামের প্রায় ৬০০০ টা গ্যাং আছে পুরো রাশিয়াতে এবং এদের মধ্যে ২০০ টা গ্যাং আবার আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করে থাকে। খুন, নারীপাচার, ড্রাগের ব্যাবসা, অপহরণ কোনোটাই এই গ্যাংগুলো করতে বাদ রাখেনি। অভিযোগ আছে যে, বিরোধীদেশের আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য রাশিয়া সরকার এদের মদদ দেয়।

তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুতিনের জবাব একটাই, “সব আমেরিকার বানানো কথা”।

Most Popular

To Top