নিসর্গ

স্বপ্নের সান্দাকুফু (তৃতীয় পর্ব)- ট্রেকিং সঙ্গী ও ইমিগ্রেশন

স্বপ্নের সান্দাকুফু (তৃতীয় পর্ব)- ট্রেকিং সঙ্গী ও ইমিগ্রেশন

আগের পর্বঃ স্বপ্নের সান্দাকুফু (দ্বিতীয় পর্ব)- পাহাড় ও পারিবারিক সংকট

গত বছরের শেষ দিকে আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ টিম নিয়ে পঞ্চগড় আর তেতুলিয়া গিয়েছিলাম। এবং বাংলাবান্ধা গিয়ে জানতে পেরেছিলাম যে এই (বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি) পোর্ট পন্যর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের জন্যও খুলে দেয়া হয়েছে। তখনই ভেবে রেখেছিলাম যে এরপর ভিসা করার সময় এই পোর্ট দিয়ে ভিসা করবো। তাইএবার ভিসা করার সময় থেকেই মাথায় ছিল যে বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি পোর্ট দিয়ে ভিসা নেব যদি কোন সমস্যা না থাকে। আর যদি পেয়েই যাই তবে অনেক দিনের স্বপ্ন সান্দাকুফু ট্রেকটা শেষ করতে চাই, পাশাপাশি আর একটি আকাঙ্ক্ষা রিশপ-লাভা দেখার সেটাও শেষ করবো, আরও সম্ভব হলে ডুয়ার্স টাও শেষ করতে চাই! তাহলে মোটামুটি পশ্চিমবঙ্গটা শেষ হয়ে যায়। তাই এই পোর্ট দিয়েই ভিসার জন্য আবেদন করেছিলাম আর পেয়েও গিয়েছিলাম। যার ইতিবাচক ফলাফলটা হাতে নাতে পেয়েছি আর পাচ্ছি প্রতি ভ্রমনেই!

আগের গুলো তো সবাই কমবেশী জানেনই, এবার এই ভ্রমণের তিক্ত গল্পটি বলি। সান্দাকুফু যাবার জন্য প্রাথমিকভাবে চারজনের একটি টিম হয়েছিল, যেটা শেষ দিনে দুইজনে এসে ঠেকেছিল। যার একজন আমি আর একজন তুষার। আমার তো এই পোর্ট দিয়ে ঝামেলাহীন ভাবে শিলিগুড়ি পৌঁছে যাবার অভিজ্ঞতা আছেই। তাই ভেবেছিলাম তুষারও যদি বুরিমাড়ি বর্ডার দিয়ে ১১/১২ টার মধ্যে শিলিগুড়ি এসে পৌছাতে পারে তবে দুজনে মিলে প্রথম দিনেই মানেভাঞ্জন গিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চিত্রে বা মেঘমা গিয়ে প্রথম রাত্রি থাকবো। দুজনে মিলে সেভাবেই পরিকল্পনা সাজালাম। এরপর চললাম যে যার বাসে, তার নিজ নিজ বর্ডারের দিকে।
আমার বাস যথারীতি ৮ টার মধ্যে সীমান্তে পৌঁছে দিল। ওদিকে তুষারের বাসও ঠিক সময়েই পৌঁছে গেল বুড়িমারি সীমান্তে, ফোনে কথা হল। তার মানে তেমন কোন সমস্যা না হলে আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারবো। মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে, এই ভেবে যে শিলিগুড়ি-দার্জিলিং আর মানেভাঞ্জনের যান্ত্রিকতার মধ্যে খুব বেশিক্ষণ থাকতে হবেনা। বিকেলের মধ্যেই কোন এক নির্জন পাহাড়ি পাড়া-গ্রাম বা লোকালয়হীন অরন্যের মাঝে চলে যেতে পারবো এই ভেবে।

কিন্তু সব ভাবনাই কি আর সত্য হয় বা ভাবনার মত করে হয়? হয়না, আর তাই সেই দিনটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল দেখে আমি আর দেরি না করে আমার প্রেয়সীর পানে ছুটে গিয়েছিলাম তাকে একান্ত আলিঙ্গনে বাঁধতে…!! সেটা কি রকম? বলছি…..

আমার ইমিগ্রেশন শেষ করে আমি শিলিগুড়ি পৌঁছে গেলাম বেলা ১০:৩০ এর মধ্যে। এরপর আমার ট্রেকিং সঙ্গীর জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু হল। কিন্তু যা হয় আর কি… একা একা সময় তবুও নিজের মত করে কেটে যায়, কিন্তু কারো জন্য অপেক্ষার প্রহরগুলো কেন যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে থাকে। এক একটা মিনিট যেন এক একটা ঘণ্টার চেয়েও দীর্ঘ আর ভারী নিশ্বাসে কাটতে লাগলো। মিনিটে সাত-আটবার করে ঘড়ির দিকে তাকালে কি আর ঘড়ির কাঁটা এগোয়? এগোয়না, আমার তাই সময় গুলো অত্যন্ত অস্থিরভাবে কাটতে লাগলো। আর শিলিগুড়ি জংশন এমন একটি যায়গা, যেখানে দু-দণ্ড কোথাও বসে থাকার উপায় নেই চুপচাপ। এমনকি বাস স্ট্যান্ডে গিয়েও বসে থাকার উপায় নেই এতটুকু! এতো এতো বাস ছেড়ে যায় পুরো পশ্চিমবঙ্গময় যে সারাক্ষণই মাইকে বিভিন্ন বাস আর তার সময়ের উল্লেখ করে ঘোষণা চলতে থাকে অনবরত। তাই সেখানে আর যাই হোক কয়েক দণ্ড বসে সময় কাটানোর কোন উপায় থাকেনা। যে কারণে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি আর হাঁটাহাঁটি করে ঘণ্টাকাল অতিবাহিত করার পরে ট্রেকিং এর জন্য নিজের পছন্দ-চাহিদা আর সাধ্যমত শুকনো খাবারের কেনাকাটা শুরু করে দিলাম।

খুবই ধীরে ধীরে কেনাকাটাশেষ করে প্রায় এক ঘণ্টা কাটানোর পরেই আমার সঙ্গীর কোন আপডেট পেলামনা। এদিকে সময় সময়ের মত চলে যাচ্ছে তার নিজস্ব নিয়মে। সেতো আর আমাদের পরিকল্পনামত অপেক্ষা করবেনা কোথাও কারো জন্য। এদিক সেদিক ঘুরে আর প্রায় ৩০ মিনিট সময় কাটানোর পরে তুষারের ফোন এলো ওর বাংলাদেশী নাম্বার থেকেই! যা দেখে আমি পুরোপুরি ভড়কে গেলাম। তার মানে সে এখনো বাংলাদেশেই পেরোতে পারেনি? তাহলে আর আসবে কবে? রাতে থাকবো কোথায়? আর আজকের চিত্রা বা মেঘমায় থাকার কি হবে তবে? এসব ভাবতে ভাবতেই ফোনটা ধরলাম। এরপর যা যা ভেবেছি ঠিক তাই। তিনি জানালেন যে এখনো তার কোন কাজই তেমন হয়নি কখন শেষ হবে সেটাও ঠিক বুঝতে পারছেননা!

হায় হায়! এখন তবে কি হবে? তবে আমি তাকে তার মত করে ধীরে ধীরে আসার কথা বললাম, আর মেসেজ নিয়ে দিলাম আমি তবে এই সুযোগে আমার পুরনো প্রেয়সীর কাছে যাই, বাঁধি তাকে একান্ত আলিঙ্গনে! হ্যাঁ তাই-ই করেছিলাম। আমি শিলিগুড়ি থেকে সোজা চলে গিয়েছিলাম আমার প্রথম প্রেম আর একান্ত ভালোবাসার আচল বিছিয়ে রাখা প্রেয়সীর গহীন আদরের আড়ালে! বেঁধেছিলাম তাকে আর সে আমাকে একে অন্যের একান্ত আলিঙ্গনে!! সেই গল্পটা অন্যদিন বলবো, একান্ত আবেগে…

এরপর অপেক্ষা অপেক্ষা আর অপেক্ষা… কিন্তু তাহার তেমন কোন খবর নেই। বিকেল চারটার পরে তিনি একটি নাম্বার থেকে ফোনে জানালেন যে তিনি আসছেন আমি যেখানে আছি সেখানে, আমার অবস্থান তাকে আমি মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলাম ফেসবুকের মেসেঞ্জারের মাধ্যমে। আমি আমার মত করে একান্ত সুখের, গভীর আবেগের আর পরম মমতাময় ভালোবাসার সময় কাটাচ্ছিলাম আমার প্রেয়সীর সাথে, বর্ণিল বিকেল-সোনালি সন্ধা আর তারা ভরা রাত্রিতে!

দারুণ কাটছিল প্রতিটি প্রহর, আবেগে-উচ্ছ্বাসে-ভালোবাসায় আর খুনসুটিতে। কিন্তু সেই আবেগে গরম জল ঢেলে দিল আমার সঙ্গে সঙ্গী হবেন যে তার বাসার ফোন, তার কোন খোঁজ না পেয়ে, আমার কাছে খোঁজ-খবর জানতে চাইছে তার বাসা থেকে? কিন্তু আমি কি বলবো, আমি নিজেই তো কোন খোঁজ খবর জানিনা। তবুও সান্ত্বনা দিতে আর টেনশন থেকে মুক্ত রাখতে জানালাম যে তিনি আসছেন, আমার সাথে কথা হয়েছে, এলেই আপনাকে ফোন করে জানানো হবে, আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন।

আমার মত টেনশনহীন একজনও এখন টেনশনে পরে গেলাম। যতটা না সঙ্গীর তার চেয়ে বেশী তার শেষ আপডেটের। যেটা তার পরিবারের জন্য আরও বেশী দরকার। কারণ প্রিয়জনের খোঁজ খবর না পাওয়ার যন্ত্রণা আর কিছুতে হয়না। এটা একটা অব্যাক্ত যন্ত্রণা, কাউকে সেভাবে বলে বোঝানো যায়না, আবার স্থির থাকাও যায়না। ভিতরে কুঁকড়ে যায়, অস্থিরতায়, যন্ত্রণায় আর নীরব কষ্টে। কেউ বুঝবেনা সেটা, শুধু নিজে নিজে বোঝা যায়, এই কষ্টের গভীরতা কত…

এরপর আরও প্রায় ২ ঘণ্টা বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষার পরে রাত ৯ টার দিগে তিনি এলেন। এবং আমাকে আর তার পরিবারকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করলেন। তার এই দেরি বা একটি দিন নষ্ট হয়ে যাবার পিছনে কারণ ছিল শুধু মাত্র বুড়িমারি সীমান্তে আমাদের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের নিদারুণ দক্ষতা আর দ্রুতগতির সেবা মানসিকতা! সেই তিক্ত গল্প বলে বা লিখে নিজ দেশ, মানুষ আর সেবার মানের সাথে সবাইকে পরিচিত করে ধিক্কারের অংশীদার করতে চাইনা। তাই ওটা গোপন আর একান্ত আক্ষেপ হয়েই থাক।

(চলবে)

Most Popular

To Top