টুকিটাকি

মস্তিষ্কের নিউরণের মুক্তিঃ চিন্তা নিয়ে চিন্তা করা

মস্তিষ্কের নিউরণের মুক্তিঃ চিন্তা নিয়ে চিন্তা করা- Neon Aloy

শিক্ষার একটা বড় অংশ চিন্তা করা শেখায়। এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কম বেশি সবার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকটা সময় কেটেছে। জীবনের দৃশ্যপটে এখন যা দেখছেন তার উপর ঐ সময়টুকুর প্রভাব কল্পনা করা যায় কতটা বিশাল?

প্রাণরসায়ন পড়তে আসার আগ পর্যন্ত আমি ছিলাম জীববিজ্ঞানে বকলম। কোন রকম কটা প্রশ্ন মুখস্ত করে উচ্চ-মাধ্যমিকে এ-গ্রেড পেয়েছিলাম জীববিজ্ঞানে। ভাগ্যের একটা ছোট পরিহাস অবশ্য ঘটে এর মধ্যে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রাণরসায়ণ পড়তে এসেছি, সেখানে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নে জীববিজ্ঞানের কোন প্রশ্ন ছিল না। এই কারণেই হয়তো আমার পরীক্ষাটা ভাল হয়েছিল। ভর্তি হতে পেরেছিলাম।

নিতান্তুই পারিবারিক আব্দারে প্রাণরসায়ন নিতে বাধ্য হই আমি। জীববিজ্ঞানের কিছুই আমি বুঝে আসিনি এখান পর্যন্ত। পাঠ্য বইয়ের ছবি গুলো মাথায় রেখে কোন রকম একটা বর্ণনা লিখে দেয়া ছিল আমার অভ্যাস। সে অবস্থায় প্রথম সেমিস্টারে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় ”Lehningers principles of Biochemstry.” বইটা যারা দেখেছেন তারা অবশ্যই জানেন, এটার সাথে বালিশের সাদৃশ্য আছে। ম্যাডাম বলেছিলেন এই হল আমাদের বাইবেল।

রসায়নে বেশ পটু ছিলাম। সেই অষ্টম শ্রেনী থেকেই রসায়ন শিক্ষক পেয়ে ছিলাম যারা রসায়নে সিদ্ধহস্থ ছিলেন। সে ডাল্টনের পরমাণুবাদ থেকে বায়ো অণু সমূহের রসায়ণ সব ছিল নখ দর্পণে। একটা বড় সময় পার করেছি দৈনিক ১০০ বিক্রিয়া প্র্যাক্টিস করে, তার সাথে ছিল নিজে বিক্রিয়া লিখে চিন্তা করা সেটা আদৌ বাস্তবে হয় কিনা। চিন্তাধারার অনেক বড় একটা অংশ তৈরি হয়েছে দুই ভাবে।

প্রথমত, পরমাণুর আর অণুর ধারণায়। সব কিছুই একই জিনিসের বিভিন্ন কম্বিনেশনে তৈরি। দ্বিতীয়ত, জৈব রসায়নের হাজার হাজার বিক্রিয়া যেখানে হাজার হাজার যৌগ আবার হাজার হাজার কম্বিনেশনে নিজেরদের মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে।

সেই জ্ঞান নিয়ে খুলে বসলাম Lehningerকোর্সের পড়া গুলো পড়ার পাশাপাশি বইটার শুরুতে কিভাবে জীববিজ্ঞান আর রসায়নের সমন্বয় হয়েছে প্রাণরসায়নে তা আমাকে আপ্লুত করে তোলে। জানতে পারলাম, কোন কিছুর জীবন থাকার মানে হল সেখানে প্রতি সেকন্ডে আমার জৈবরসায়নে পড়ে আসা সেই হাজার হাজার বিক্রিয়া গুলোই চলতে থাকে। কি অদ্ভূত ব্যাপার তাই না? আমার যে জিনিসগুলো পড়ে বুঝতে ৮ বছরের শিক্ষা জীবন পার হয়ে গেছে, তার থেকে বেশি আমার শরীরে এক সেকেন্ডের কম সময়ে ঘটে যাচ্ছে। Introductory Biochemistry শেষ হতে না হতেই আমি প্রাণরসায়নই পড়ার সিদ্ধান্তে আসি।

জীববিজ্ঞানে পড়ে আসা সেই কোষ এবং তার অঙ্গানু নতুন ভাবে মেলে ধরা হয় চোখের সামনে। কিন্তু এবার রসায়নের চশমাটা পরে নিয়েছিলাম। বুঝলাম কিভাবে আমাদের প্রত্যেকটি কোষ অগণিত বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। প্রতিটি হৃদস্পন্দনেই যে অসংখ্য বিক্রিয়া আমদের হৃৎপিন্ডকে সংকুচিত আর প্রসারিত করে। আমদের নিশ্বাস নেয়া গাড়ির কম্বাশ্চন ইঞ্জিনের মত। ইঞ্জিনে যেমন বাতাসে তেল পুড়িয়ে শক্তি উৎপন্ন হয় তেমনি আমরাও নিশ্বাসের সাথে অক্সিজেন নিয়ে সেটা রক্তে মেশাই। রক্ত সেটা কোষে নিয়ে পৌঁছে দেয়। কোষের ভেতর আমাদের কম্বাসচন চেম্বারের কাজ করে মাইটোকন্ড্রিয়া। সেখানে আমাদের খাবারের থেকে পাওয়া উপাদান গুলো অক্সিজেনের সাহায্যে জারিত হয় যার থেকে উৎপাদিত শক্তি দিয়ে কোষের বিভিন্ন কার্য সম্পাদিত হয়। বললে বিশ্বাস করবেন এই মাইটোকন্ড্রিয়া যে ইউক্যরিওটিক কোষের অংশ ছিল না একটা সময়?

প্রত্যেকটি অঙ্গাণুই বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে সচল রাখে কোষ কে। এই অঙ্গানুগুলো একটি শিল্প কারখানার একেকটি আলাদা উইং এর মত। কারখানা সার্বিক কর্ম ক্ষমতা নির্ভর করে প্রত্যেক উইং এর একক কর্মক্ষমতার উপর। যে কোন এক জায়গায় গোলমাল থাকলেই পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়বে। কাঁচামালও উপস্থিত থাকা বাঞ্ছনীয়। কোষের আলাদা অঙ্গানুগুলোও তেমনি আলাদা আলাদা ভাবে সচল থাকা দরকার। নইলে পুরো কোষই যে হুমকীর মুখে পড়ে যাবে। কাঁচামাল কোষের জন্য বিভিন্ন ধরণের ম্যাক্রোমলিকুল। শর্করা, আমিষ, স্নেহ, নিউক্লিইক এসিড হিসেবে ম্যাক্রোমলিকুল গুলোকে ভাগ করা হয়। অগণিত বিক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা উৎসেচক আর বিক্রিয়া প্রণালী।

শুধু জীবের বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার তা জেনেই আমাদের শেষ নয়। জীবের বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার সেটা জীব কিভাবে বিবর্তনের সাথে অর্জন করেছে সেটা জানার পেছনেও একটি বিশাল জনগোষ্ঠি কাজ করে যাচ্ছে। এভাবে অতীত ঘাঁটার সুবাদে জন্ম হয়েছে RNA hypothesis এর। যার মতে উষ্ণ পৃথিবীর সমুদ্রে অকিজেন তাপমাত্রার প্রভাবে প্রথম RNA এর উদ্ভব হয়। এই RNAই প্রথম যৌগ যা জীবের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ করে। গবেষকদের মতে RNA ই প্রথম যৌগ যা নিজের প্রতিকৃতি তৈরীর চেষ্টা করে। কল্পনা করা যায় আমি আপনি যা কিছু করছি তার উৎস এক ছটাকের ও কম কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফসফরাস আর সালফারের একটি মিশ্রণ। অর্থাৎ আমি আপনি আর আপনার বাসার কাজের লোক একই মাটি পানি আর বাতাসের তৈরি। আপনার পাশের হিন্দু বাড়িতে আর খ্রীষ্টান বাড়িতেও একই কথা। একই কথা বাসে আপনার পাশের সিটের ভদ্র মহিলার ক্ষেত্রেও। লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের গাঠনিক একক হল কোষ। কোষের ভেতর আমাদের রেসিপি রাখা আছে ক্রোমসোম নামের বিশাল এক ফাইল ক্যাবিনেটে। আমাদের রেসিপিটাতে বলা আছে, কোন অ্যামিনো এসিডের পর কোনটা  বসিয়ে আমার রক্তের হিমোগ্লোবিন বানানো হবে। আমার মস্তিষ্কের ভেতরে আমার সজ্ঞান অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যা করা দরকার সব আছে রেসিপিতে। কোষের কিছু ভারী যন্ত্রপাতি আছে যেগুলো এই রেসিপি পড়ে আমার যখন যা দরকার সেটা তৈরী করে।  এই রেসিপি হল DNA। মজার বিষয় কি জানেন? এই রেসিপিটায় আমাদের সবার মধ্যে ৯৭% একই কথা লেখা আসলে। অর্থাৎ, আমার আর একজন সমকামী বা পতিতার DNA অন্তত ৯৭% মিল আছে এবং সেটা আপনাদেরও আছে। অত্যধিক রূপবতী ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট মডেল থেকে অত্যধিক ক্ষমতাবান শাসক বানানোর জন্য মাত্র ৩% DNA দায়ী। এই ৩% আমাদের সবার আলাদা। যার কারণে প্রত্যেকটি মানুষ ও মানুষের চিন্তা আলাদা। আমাদের মধ্যে যতটুকু পার্থক্য আছে সেটা পরিবেশের প্রভাবে ও টিকে থাকার তাগিদে হয়েছে। এর উপর কারো হাত থাকে না কখনই।

তবুও আমাদের বাহ্যিকতা নিয়ে এতটা বাছ বিচার। বিভেদ তৈরীর কত অজুহাত। বর্ণ, লিঙ্গ, উচ্চতা, সৌন্দর্য, ধর্ম, জাতীয়তা, সম্পদ কত মোড়কেই না ভাগ করা যায় আমাদের। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে যখন আমাদের কোষ গুলোর বয়স হয় তখন আমাদের জীবন যাত্রার উপর নির্ভর করে বয়স্ক কোষ গুলো আমাদের টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা। যদি কোন অঙ্গানু অচল হয়ে যায় তবে ধীরে ধীরে আশেপাশের কোষ গুলোই তাকে মেরে ফেলে। এভাবে শেষ দিকে পচন ধরে গোটা অঙ্গে। শরীর ঢলে পড়ে মৃত্যু সজ্জায়। এই পচন আপনার কোষে যে প্রক্রিয়ায় হবে সকালে যে কুকুরটাকে ঢিল মেরেছিলেন তারও হবে।

জীবন নিয়ে পড়েতে এসে শিখেছি একবিংশ শতাব্দীর মানুষ বাঁচার জন্য যা করা দরকার তার থেকেও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পরশ্রীকাতরতা কে। আশে পাশের জীবনের বৈচিত্র্য তাদের অভিভূত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যে পৃথিবীতে আর যে মানুষের মাঝে বেঁচে আছি তাদের নিয়ে চিন্তা করতে আমাদের অনিহা।          

কি অদ্ভূত ভাবে না দেখা যায় পৃথিবী যদি জীবন আর জীবের প্রতি একটু সংবেদনশীল হয়ে ওঠা যায়। আমাদের পরিবেশটা আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই একরকম ছাঁচে কেটে বানানো। আমরা না থাকলে পরিবেশের কিছু হবে না। আমরা এসেছি মাত্র ২০ হাজার বছর হতে চলল। পরিবেশের অনেক জীব কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে এই পৃথিবীতে বসসবাস করে। আমরা না থাকলে তাদের কিছুই আসে যায় না। পুরো পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের উপর নির্ভরশীল এক নগণ্য জীব হয়ে আমাদের জাতিগত আধিপত্য বিস্তারের চিন্তাটা নিতান্তই হাস্যকর লাগে। কারণ এখনও একটা প্রজাতি হতে পারিনি আমরা। আমরা বাঙ্গালী, ভারতীয়, এশিয়ান, আমেরিকান, স্প্যানিশ, পর্তুগীজ, ইংরেজ বলে পরিচয় দেই। মানুষ পরিচয়টা হারিয়ে গিয়েছে কোথায় যেন। সে সাথে হারিয়ে গেছে মানুষের পাওয়া সর্বসেরা হাতিয়ার। যার নাম চিন্তা শক্তি।

এতক্ষণ যা বলেছি এমন কোন রকেট সায়েন্সের কথা না। ৮ম-৯ম শ্রেনীতেই এখন এসব বিষয় নিয়ে প্রোজেক্টোরে ডিজিটাল ক্লাস নেওয়া হয়। সে শিক্ষা যদি চিন্তা করা শেখাতে পারে তবে সেটাই হয়তো আমাদের মস্তিষ্কের নিউরণের মুক্তি এনে দেবে।  

“চিন্তা করা।

চিন্তা নিয়ে চিন্তা করা।

কি অদ্ভূত চিন্তার আবার চিন্তা হয় নাকি?

হতে পারে না?

পারে?”

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top