ইতিহাস

কি ঘর বানাইলা জিন্নাহ শূন্যের মাঝারে !

কি ঘর বানাইলা জিন্নাহ শূন্যের মাঝারে !

আমরা অনেকেই বলে থাকি (কিছুদিন আগে আমি ও বলতাম) জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্বের অসাড়তা প্রমান হয়েছে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর। কয়েকদিন আগে দিনা ওয়াদিয়ার বিষয়ে পড়ে বুঝলাম কিছু ভুল হয়েছিল জানতে। এই অর্বাচীন নির্বুদ্ধিতার আচরণের ভুল প্রমাণিত করার কাজ করেছিলেন তার মেয়ে। হ্যা, জিন্নাহর একমাত্র মেয়ে তার সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনেক আগেই প্রমান করেছিলেন জিন্নাহ একটি আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক এবং ভন্ড লোক ছিলেন। আসুন এর উপর বিস্তারিত আলোচনা করি।

গত দোসরা নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, নিউ ইয়র্কে দিনা ওয়াদিয়া মারা গিয়েছেন। মৃত্যুর সময় তার বয়েস হয়েছিল ৯৮ বছর। না, তার প্রয়ানের উপর কোনো শোকজ্ঞাপন করতে না তার জীবনের এক সাহসী সিদ্ধান্ত এবং তার পিতৃপরিচয় হলো আমার মুখ্য আলোচনার বিষয়। এই ভদ্রমহিলা ছিলেন পাকিস্তানের সৃষ্টির জন্য দায়ী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একমাত্র সন্তান।

মহাকালের কি পরিহাস, দিনা জন্মগ্রহন করেছিলেন ১৪ এবং ১৫ই অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ে, ১৯১৯ সালে। পার্শি মা রতন বাই এর ঔরসজাত দিনা বড় হয়েছিলেন বাবার কাছে।

রতনবাই

জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অতীব দুঃখের, তার ভালোবাসার মানুষ অর্থাৎ এই রতন বাই তার সাথে থাকেন নি। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর রতন বাই মারা যান দিনা জন্ম গ্রহণ করার কয়েক বছর বাদে। দিদিমা এবং জিন্নাহর বোন মানে ফতিমা জিন্নাহর অভিভাবকত্বে দিনার শৈশব কাটে। একসময় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে জিন্নাহর নিজের পরিবারে, দিনা তার জীবন সঙ্গী বেছে নেন তৎকালীন বোম্বাই এর পার্শি সম্প্রদায়ের মানুষ নেভিল ওয়াদিয়াকে। এই নেভিল প্রথমে পার্শি থেকে ক্রিশ্চান এবং পরবর্তীতে আবার নিজ ধর্ম পার্শিতে প্রত্যাগত হন। এই কাজ জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের ভাবমূর্তি অর্থাৎ ‘আপোষ হীন ইসলামের সেবক‘ ইত্যাদির ভাবমূর্তির উপর প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। মেয়ের থেকে চির দুরত্ব অথবা রাজনৈতিক উত্থান এর অবসান এই দুটোর মধ্যে জিন্নাহ বেছে নেন রাজনৈতিক আর ক্ষমতার অঙ্গন অতপর চির-একাকিত্ব তার পুরো জীবনের সঙ্গী হয়েছিল।এমনকি শেষ সময়ে এম্বুলেন্সে কোনো সুখের সময়ের কেউ ছিল না তাকে সঙ্গ দেওয়ার।

 

নেভিল এবং দিনা দম্পতি

দিনা নেভিল কে বিয়ে করেন যখন তার বয়েস ছিল মাত্র ১৭। আসুন তার আগে একটু জিন্নাহর বংশ লতিকা ধরে টান দিই। গুজরাটের কাঠিওয়ার অঞ্চলের বাসিন্দা প্রেমজি ভাই মেঘজি ঠাক্কার হলেন এই আলোচিত জিন্নাহর বংশের প্রতিষ্ঠাতা। মাছের ব্যবসায় ভালই টাকা করেছিলেন প্রেমজি। অতপর চিরন্তন ভারতীয় গ্রাম্য রাজনীতি আর জাতপাতের খেলা শুরু হলো। তাদের লোহানা গোষ্ঠীতে নিরামিষ খাওয়ার কারণে তার নিজ গোষ্ঠীতে বাধা শুরু হলো। তার জাত মারার কাজ সম্পন্ন করতে সচেস্ট হলো একদল মানুষ। প্রথমে বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়ে ফিরে আসেন কিন্তু ওই যে, জাত নামের বস্তুটি তো আবার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না ফলে কিছুতেই কিছু হলো না।

প্রেমজিভাই পরিচিত ছিলেন ‘জিন্নহ’ নামে। (পাঠক, খেয়াল করুন, এই উপাধি নিয়ে চলেছে পরবর্তী আলোচ্য পাকিস্তানের সৃষ্টিকর্তা জিন্নাহ।) তার মাছের কারবার এর পার্টনার মানে অংশীদার ছিলেন গ্রামস ট্রেডিং কোম্পানি। এই কোম্পানি তাদের মূল অফিস তৈরী করে করাচিতে। অতঃপর প্রেমজি তার পৈতৃক আবাসন এবং এলাকা ত্যাগ করে করাচিতে বসবাস করা শুরু করেন।

ক্রমাগত স্বদেশে নিজ গোষ্ঠির কাছে প্রত্যাখ্যাত প্রেমজির সন্তান পুঞ্জভাই ঠাক্কার (জিন্নাহর বাবা) চরম ঘৃণায় ত্যাগ করলেন পূর্বপুরুষের ধর্ম। নিজে আর তার চার ছেলে ধর্মান্তরিত হলেন ইসলামে। (সূত্র : Freedom at Midnight (Dominique Lapierre and Larry Collins)

জাতপাতের দালাল এর রোপন করা বিষবৃক্ষের প্রথম ফল ধরা শুরু করলো এরপর। জিন্নাহ তার আজীবন এই ঘৃনা বহন করে বেরিয়েছে এবং তার পরবর্তী কর্মে আজ আমরা সবাই ফল ভোগ করছি। যাইহোক, এই পুঞ্জভাই জিন্ন (পরবর্তিতে একটু পরিবর্তিত হয়ে জিন্নাহ) আর তার স্ত্রী মিঠিবাই এর সাত সন্তান হয়েছিল তারা হলো:
১. মহম্মদ আলী জিন্নাহ
২. আহমেদ আলী জিন্নাহ
৩. বন্দে আলী জিন্নাহ
৪. রহমত ভাই জিন্নাহ
৫. শিরেন ভাই জিন্নাহ
৬. ফাতিমা জিন্নাহ –ইনিই একমাত্র পাকিস্থান তৈরির আন্দোলনে জিন্নাহর ছায়াসঙ্গী ছিলেন আর জিন্নাহর কাজে অংশ নিয়েছিলেন
৭. মারিয়াম ভাই জিন্নাহ

জিন্নাহ মানে আলোচ্য মহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন বিত্তবান ঘরের ছেলে তাই তার শিক্ষার ব্যবস্থা হয় বিলেতে। এই বিলেত যাত্রার আগে ছেলে যাতে কোনো ইংরেজ বিয়ে না করে ফেলে এই ভয়ে তাড়াতাড়ি নিজের এক আত্বিয়া এমিবাই জিন্নাহর সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন জিন্নাহর মা। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই মহিলা জিন্নাহর বিলেত যাওয়ার কয়েকদিন পরেই মারা যান রোগে ভুগে। অতঃপর অনেক পরে জিন্নাহ যখন অনেক পরিণত মানে ৪২ বছর বয়েসে তার থেকে ২৫ বছরের ছোট পার্শি সম্প্রদায়ের মেয়ে রতনবাই পেটিট এর পরিণয় ঘটে। পুরো বিষয়টা ছিল প্রেমে পরে বিয়ে। রতনবাই ছিলেন তৎকালীন কটন মিল এর মাথা দিনশাহ মানেকজি পেটিট এবং রতনজি দাদাভয় টাটা র নাতনি। ঠিক পড়েছেন, উনি আমাদের পরিচিত জামশেদজি টাটা এবং রতন টাটার আত্মীয়া। যাই হোক খাতায় কলমে রতনবাই ধর্মান্তরিত হয়ে হলেন মারিয়াম জিন্নাহ কিন্তু শেষদিন পর্যন্ত নিজের রতনবাই নাম ছাড়েন নি। এমন কি তার সমাধিতে যা মুম্বাই এর মাজগাঁও এ খোঁজা সম্প্রদায়ের সমাধিক্ষেত্রে আছে, তাতে ও পাবেন এই রতনবাই নাম।

জিন্নাহ আর রতনবাই এই বিয়েতে সুখী হন নি। বয়সের ফারাক, সময় না দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকার কারণে ক্ৰমশঃ দূরত্ব বেড়েছিল দুজনের মধ্যে। অবশেষে বিচ্ছেদ এবং রতনবাই এর মৃত্যু হয় মাত্র ২৯ বছর বয়েসে। একমাত্র মেয়েকে মানুষ করতে জিন্নাহ দায়িত্ব নিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মানসিক দূরত্ব বেড়েছিল দুজনের। যে দ্বিজাতিতত্ব আর ঘৃণার আবাদ করেছিলেন সেটা তার নিজের মেয়েই বিরোধিতা করেছিলেন।

যখন দিনা ১৭ বছরে পা দিয়ে পার্শি নেভিল ওয়াদিয়া কে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন জিন্নাহর মুসলিম সত্বা এর প্রবল বিরোধিতা করে। প্রথমে তাদের আলাদা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ জিন্নাহ মেয়েকে ভয় দেখায় পরিত্যাগ করার। অবিচলিত দিনা বাবার নিষেধাজ্ঞা কে অস্বীকার করে তার মামারবাড়িতে নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন।

জিন্নাহর জীবনী থেকে জানতে পারছি দিনা অসামন্য একটি প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন তার বাবাকে। ক্ষিপ্ত জিন্নাহ যখন তাকে জিজ্ঞাসা করে এত লক্ষ লক্ষ মুসলিম ছেলে আছে তাদের একজন কে বিয়ে না করে কেন একেই বিয়ে করতে চাইছে দিনা, যার উত্তরে তার জবাব ছিল লক্ষ লক্ষ মুসলিম মেয়ে থাকতেও একজন অন্যধর্মের মেয়েকে কেন জিন্নাহ বিয়ে করেছিলেন। না, জিন্নাহর কাছে এর জবাব ছিল না।

দিনা এবং নেভিল এর বৈবাহিক জীবন যদিও তার বাবার মতই দীর্ঘ হয় নি তবু তার দুই সন্তান ছিল নেসলি এবং ডায়ানা ওয়াদিয়া। জিন্নাহ আর তার মেয়ের সম্পর্ক হয়ে যায় অতি শীতল। সামাজিক ভাবে জিন্নাহ মেয়েকে ‘মিসেস ওয়াদিয়া‘ সম্বোধন করতেন তবে পরিত্যাগ করার কাজটি সরকারী ভাবে করেন নি।

জিন্নাহর সৃষ্ট দেশ পাকিস্থানে দিনা যান নি বা কোনো সম্পর্ক রাখেন নি। একমাত্র তার বাবা মারা গেলে তিনি ১৯৪৮ এ অন্তেষ্টিক্রিয়ার সময় গিয়েছিলেন আর গিয়েছিলেন ২০০৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফ এর অনুরোধে। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে মুম্বাই এবং পরবর্তিতে নিউ ইয়র্কে। হাস্যকর বিষয় হলো যারা জিন্নাহ কে তাদের জাতির পিতা বলে তারা দিনাকে দেশে ঢুকতে দিতে চায় নি। জিন্নাহর সেই স্মৃতিস্মারকে তিনি খালি লিখেছিলেন ‘আশা করি জিন্নাহর স্বপ্নের পাকিস্থান একদিন সাকার হবে‘, কথাগুলো খেয়াল করুন!

দিনার পাকিস্তান ভ্রমণ

পারভেজ মুশারফ জিন্নাহর দেশভাগের আগের সম্পত্তি মানে জিন্নাহ হাউস যা মুম্বাই এ আছে ওটা কে হস্তগত করতে চেয়েছিলেন। স্মৃতিবিজরিত এই ভবন এর উপর নিজের অধিকারের দাবি ছাড়েন নি দিনা। বস্তুত তার কোর্টে আপিল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক চাপ উতরে উনি এই ভবনের অধিকার পেলেন না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি উনার ওটা প্রাপ্য ছিল।

ভারতে জিন্নাহ ভবণ

ঐতিহাসিক প্রমান বলে নিজের বোন ফতেমা জিন্নাহ কে নির্দেশ দিয়েছিলেন মেয়েকে যেন মুসলিম ধর্মের আদলে বড় করেন। কোনো মগজধোলাই সফল হয় নি, এক নিজ আদর্শে স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠা মানুষ আর যাই হোক ধর্মের পুতুল হয় না ফলে জিন্নাহ নিজের পরিবারেই ব্যর্থ হয়েছিলেন।

হায় জিন্নাহ,তুমি ধর্মের ভিত্তিতে একটা দেশ তৈরী করেছ অথচ ওই ধর্মের বাধনে নিজের ঘর ধরে রাখতে পারলে না! না পেলে নিজের স্ত্রীর ভালবাসা না সন্তানের। পরের জন্য রাস্তা দেখানোর স্বপ্ন দেখানোর জিন্নাহ তুমি কি ঘর বানালে শুন্যের মাঝারে! নিজের আদর্শ তোমার সন্তান মেনে নিল না!

ধন্যবাদ দিনা! আপনি মাথা উচু করে নিজের পথে চলে প্রমান করেছেন বিচার হওয়া উচিত সমানে সমানে। প্রমান করেছেন, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো আপনার কেউ হতে পারে না। আপনি প্রমান করেছেন মুখের বা চেহারার মিল আর মননের মিল এক না।

শুন্যের উপর তৈরী এই বায়বীয় ধারনাতে প্রথম আঘাত করে আপনি যে কাজ করেছেন তার জন্য আমার অকুন্ঠ শ্রদ্ধা আর ভালবাসা জানাই।

তথ্যসূত্র :
১. ‘Fearless’ Dina Wadia, Mohammad Ali Jinnah’s only daughter

২. Jinnah’s daughter

৩. Dina Wadia

৪. Girl who made Jinnah walk many miles

৫. Documentary on Jinnah

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top