টুকিটাকি

হালদা এবং তৌকির আহমেদকে নিয়ে দর্শকদের যত আশা

হালদা এবং তৌকির আহমেদকে নিয়ে দর্শকদের যত আশা

নিঃসন্দেহে তৌকির আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম সারির অভিনেতাদের একজন। টেলিভিশন নাটক রুপনগর, যুবরাজ কিংবা তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত নদীর নাম মধুমতী , চিত্রা নদীর পারে সিনেমা দেখলে বোঝা অভিনেতা হিসেবে তিনি কতটা দক্ষ। তবে ব্যক্তিগত ভাবে আমার অভিনেতা তৌকির আহমেদের চেয়ে নির্মাতা তৌকির আহমেদকে বেশী পছন্দনীয়।
বাংলাদেশের এতো নদী থাকতে হালদা নদীকে নিয়ে আপনার সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা এবং ইচ্ছে টা কেনো? এমন প্রশ্নের উত্তরে তৌকির বলেছিলেন,

“হালদা একটি বিশেষ নদী বাংলাদেশের। যে নদী টি একটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। যেখানে কার্প জাতীয় মাছ মানে রুই, কাতল, মৃগেল এরা আসে এবং এসে ডিম পাড়ে। সহস্র বছর ধরে এটি একটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে যে ওই এলাকার স্থানীয় মানুষরা সে ডিম গুলোকে সংগ্রহ করেন, নিষিক্ত করেন এবং সারা দেশে সেটা মৎস্য সম্পদের পোনা হিসেবে ছড়িয়ে দেন। এটি প্রায় হাজার কোটি টাকার একটি কন্টিবিউশন বাংলাদেশের ইকোনোমিতে। কিন্তু অনেক নদীর মতোন হালদাও বিপন্ন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে পলিউশন হয়েছে, রাসায়নিক বর্জ্য পড়ছে, নাগরিক বর্জ্য পড়ছে, তামাক চাষ হচ্ছে, অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে মানে একটি নদীকে যতো ভাবে অত্যাচার করা যায় আমরা স্বক্ষমতা সঙ্গে সেটা করেছি। এখন নদীটা এতোটাই বিপন্ন হয়ে গিয়েছে যে মাছ আর আগের মতোন ডিম দিতে আসছে না। এর ফলে স্থানীয় মানুষরা তাদের পেশা হারাচ্ছেন। এসব বিপর্যয়ের কারণে নদীর ভাঙ্গনও বেড়েছে । সুতরাং আমার কাছে মনে হয় হালদা একটি বিশেষ নদী যেটি হিমালয় বা ভারত থেকে আসেনি এবং কর্ণফুলী হয়ে এটি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। আমার মনে হয়েছে এই নদী টির এই বৈশিষ্ট্য গুলো আমরা জানি না অনেকেই। যদি মানুষকে জানানো যায়, যদি জনগণ কে সচেতন করতে পারি তাহলে শুধু হালদা না হয়তো আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি নদীর প্রতি যত্নশীল হবো। আর বাংলাদেশের নদীমাতৃক দেশ নদী ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। নদী আমাদেরকে পলি দিবে, নদী আমাদেরকে যোগাযোগ দিয়েছে, নদী আমাদেরকে সভ্যতা দিয়েছে। সুতরাং সেই নদী হলো মা, সেই নদীকে যদি আমরা রক্ষা না করি তাহলে আমাদের পরিবেশ যেমন বিপন্ন হবে আমাদের জীবনযাত্রাও বিপন্ন হবে। মূলত আমি গল্পটির মধ্যে যেটি খোঁজার চেষ্টা করেছি নদী ও নারীর যে উপাদানটি যেটি শাশ্বত একটি বিষয়। দু’টোই আমাদের জীবনের উৎস জীবনের আধার। কিন্তু এই দুটো উৎসকেই আমরা অত্যাচার করছি বিপন্ন করছি। আসলে এই দু’টো মিলিয়েই হালদার গল্প এবং আমাদের চেষ্টা “

গত বছর তৌকিরের “অজ্ঞাতনামা” সিনেমাটি মাত্র এক সপ্তাহ ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সে প্রদর্শনী হওয়ার পর সিনেমাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিলো হলে মানুষ আসছে না বলে। সিনেমাটি খুব নীরবে রিলিজ পেয়েছিলো এবং খুব দ্রুতই হল থেকে নেমে গিয়েছিলো। আয়নাবাজি নিয়ে মানুষের মাঝে যতোটা হাইপ সৃষ্টি হয়েছিলো, অজ্ঞাতনামা ছিলো ঠিক তার উল্টো। এর জন্যে তৌকির আহমেদ নিজেও কিছুটা দায়ী। তিনি সিনেমা প্রচারে তেমন একটা আগ্রহী নন। এই ব্যপারে তিনি এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন,

“সিনেমা প্রচারে আমি দক্ষ নই। এটি আমার সীমাবদ্ধতা বলতে পারেন। সত্যি বলতে সিনেমা প্রচার করাটা আমার কাজও না। আমার কাজ হলো সিনেমা বানানো। আর প্রচার করাটা হলো প্রোডিউসারের কাজ”

গত বছর আলমাসে আয়নাবাজি সিনেমা যেদিন সিলেমা রিলিজ পায় তার ঠিক একদিন আগে থিয়েটার ইনিষ্টিটিউতে অজ্ঞাতনামার তিনদিন ব্যাপী প্রদর্শনী শুরু হয়। প্রথমদিনেই গেলাম অজ্ঞাতনামা দেখতে। কারণ আগেই বলেছি আমি নির্মাতা তৌকির আহমেদের খুব ভক্ত। তো সেখানে আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা। সে বন্ধু টি তার কয়েক টি মেয়ে বন্ধুর সাথে সিনেমা দেখতে এসেছেন। বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে এসেছে খুবই ভালো কথা। দূর্ভাগ্যবশত আমার সেই বন্ধুটি তার বন্ধু গুলোকে নিয়ে আমার পাশের সারিতেই বসেছিলো। দূর্ভাগ্য এজন্যই বলছি কারণ তাদের সাইড টকিং এর জ্বালায় আমার সহ আশে পাশের অনেকের সিনেমা দেখতে অসুবিধা হচ্ছিলো। পুরোটা সময় তারা একে অন্যের সাথে ফেসবুক আর অন্যান্য বিষয় নিয়ে বকবক করেই গিয়েছে। সিনেমা টা কি তারা এক মুহূর্তের জন্যে দেখেছেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কিছুদিন পর যখন ইউটিউব সহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট গুলোতে অজ্ঞাতনামা ওপেন করে দেওয়া হয় তখন আমার সেই বন্ধু ফেসবুকে ওয়াচিং স্ট্যাটাস দিয়ে সুন্দর করে লিখেছেন, “সিনেমাটি দেখে ২য় বারের মতোন চোখে জল চলে এলো। ১ম বার জল এসেছিলো যখন থিয়েটারে দেখেছিলাম। আহা ফজলুল রহমান বাবুর কি অভিনয়।”

বন্ধুর সেই স্ট্যাটাস দেখে আমার চরম হাসি পায়ছে আবার রাগও লাগছে। রাগ লাগছে এ জন্যে যে থিয়েটারে সিনেমা দেখার সময় সাইড টকিং করে অন্যদের ডিস্টার্ব করার জন্য। আপনি নিজের টাকা খরচ করে টিকিট কিনে সিনেমা দেখতে গিয়েছেন তার মানে এই না আপনি হলে যা ইচ্ছা তাই করবেন। সিনেমা ভালো লাগাটা আপেক্ষিক ব্যাপার। সবার সব সিনেমা ভালো লাগবে না এটাই স্বাভাবিক। এবং সিনেমার আসল সৌন্দর্যটা এখানেই। আমি যখন থিয়েটারে অজ্ঞাতনামায় মুগ্ধ হয়ে শহীদুজ্জামান সেলিম, মোশাররফ করিম, শতাব্দী ওয়াদুদ আর ফজলুল রহমান বাবুর অভিনয় দেখেতে ছিলাম তখন অনেকেই সিনেমার মাঝ পথে হল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু হলে বসে অন্যের সিনেমা দেখায় ডিস্টার্ব করাটা খুব অন্যায়। আরেকটা গল্প বলি। ডুব যেদিন রিলিজ পায় অর্থাৎ প্রথমদিনই আলমাসে গিয়েছি সিনেমাটি দেখতে। তো যে সারিতে আমি ও আমার এক বন্ধু বসেছি তার ঠিক পিছনের সারিতে এক বিবাহিত কাপল বসেছে এবং বউয়ের কোলে একটি ছোট্ট বাচ্চা। বাচ্চাটির বয়স বেশী হলে ৮ -৯ মাস হবে। বাচ্চাটি কিছুক্ষণ পর পর কেঁদে উঠছে আর মা বাচ্চাকে থামানোর চেষ্টা করছে। ঠিক সে সময় আশে পাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে বাচ্চার বাবাটি লজ্জার সহিত বলে “আসলে বাসায় কেউ নাই যে বাচ্চাটিকে রেখে আসবো আর আমি ফারুকির সিনেমার ভক্ত তাই বাচ্চা সহ এসেছি সিনেমা দেখতে।”

মজার ব্যপার হলো বাচ্চাটি এরপর থেকে আর একটি বারের জন্যও কান্নাকাটি করেনি বরং খুব সুন্দর করে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে ছিলো। হয়তোবা বাচ্চাটি বুঝতে পেরেছিলো সে কাঁদলে অন্যদের সিনেমা দেখতে অসুবিধা হবে তাই সে আর কাঁদেনি। আফসোস মাঝে মাঝে আট মাসের বাচ্চাও অনেক কিছু বুঝতে পারে কিন্তু আমরা বড়োরা অনেক কিছু বুঝেও কুকর্ম করি।

যাই হোক ধান ভাঙ্গতে অনেক শিবের গীত হয়ে গিয়েছে। তৌকির আহমেদ থেকে আরেকটি ম্যাজিক্যাল কাজ দেখার অপেক্ষায়। যেখানে রয়েছে আমাদের সংস্কৃতি ও মাটির গন্ধ । যেখানে রয়েছে ফজলুল রহমান বাবু, মোশাররফ করিম, তিশা, দিলারা জামান, শাহেদ আলী আর রুনা খানের মতোন জাত অভিনয় শিল্পীরা আর বিশেষ নেগেটিভ চরিত্রে প্রিয় জাহিদ হাসান তো আছেই।

Most Popular

To Top