ফ্লাডলাইট

নড়াইল এক্সপ্রেসঃ ১৬ বছরের গৌরবময় যাত্রা

নড়াইল এক্সপ্রেসঃ ১৬ বছরের গৌরবময় যাত্রা

এই শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলাদেশ পেয়েছিলো তিনজন জেনুইন ফাস্ট বোলার। মোহাম্মদ শরীফ, তালহা জুবায়ের এবং মাশরাফি বিন মর্তুজা। কালের বিবর্তনে তালহাকে আমরা হারিয়েছি ইনজুরিতে, মোহাম্মদ শরীফের ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে আইসিএল কান্ডে আর তৃতীয় জন এখনো লড়ে যাচ্ছেন, মাশরাফি বিন মর্তুজা।

৮ নভেম্বর ২০০১, ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক হয় চিত্রা পাড়ের দূরন্ত সন্তান, নড়াইলের “কৌশিক” নামের লিকলিকে শরীরের তরুণ ফাস্ট বোলারের। শান্ত চাহনি, চুপচাপ স্বভাবের ছেলেটিই যেন বল হাতে হয়ে ওঠে খুনে মেজাজের দূর্দান্ত এক পেসার। জাতি আশান্বিত হয়, বিসিবি কর্তাদের মুখের হাসি চওড়া হয়, তাহলে কি বাংলাদেশ পেয়ে গিয়েছে এতোদিনের চাওয়া একজন জেনুইন ফাস্ট বোলার? টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম শিকার তৎকালীন জিম্বাবুয়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, একমাত্র ইনিংসে বল করে চারটি (১০৬/৪)। চিত্রা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে, সাঁতরে বেড়ানো সেই “কৌশিক” নতুন স্বপ্নে ভাসালেন সবাইকে। এমন না যে আমাদের দেশে আগে কখনোই পেস বোলার আসেনি, গোলাম নওশের প্রিন্স, সাইফুল ইসলাম, হাসিবুল হোসেন শান্তসহ আরো অনেকেই এসেছেন কিন্তু কেউই নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে মানুষকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছিলেন না! ফাস্ট বোলিং করেও যে স্টার হওয়া যায় সেটাতো কৌশিকই প্রথম দেখালেন!

কৌশিক অথবা ডেভ হোয়াটমোরের “পাগলা”, অথবা হালের “গুরু” “বস” “ফাইটার” যে নামেই ডাকেন তিনি আমাদের মাশরাফি বিন মর্তুজা, আমাদের “নড়াইল এক্সপ্রেস”, যিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন আজ থেকে ১৬ বছর আগে আজকের এই দিনে। ১৬ বছর পর আজ সবাই জানে মাশরাফি কি, কি মাশরাফির অবদান। কিভাবে তিনি একটি দলকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন। একজন লিজেন্ড, একজন ফাইটার, একজন চ্যাম্পিয়ন।

মাশরাফি ঢাকার কোচদের নজরে আসেন অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়া কাপের মাধ্যমে। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ ক্যাম্পের সময়েই নজরে আসেন ক্যারিবিয়ান বোলিং লিজেন্ড এন্ডি রবার্টসের। তার ইচ্ছাতেই ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ “এ” দলে নেয়া হয় মাশরাফিকে। অনেকেই হয়তো জানেন না এখন পর্যন্ত ওই একটি ম্যাচই খেলেছেন মাশরাফি “এ” দলের হয়ে। মাশরাফি বিন মর্তুজা টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের ৩১-তম প্লেয়ার যিনি কোন প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ না খেলেই সরাসরি টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন এবং ১৮৯৯ সালের পর মাত্র তৃতীয় যিনি এই রেকর্ড করেন।

অভিষেকের পর আর পেছনে ফিরে তাকানো লাগেনি, নিয়মিত ১৩৫ কি.মি./ঘন্টা এভারেজ স্পিডে মাশরাফি খেলেছেন দূর্বার, অপ্রতিরোধ্য হয়ে। “নড়াইল এক্সপ্রেস” থামলেন ইনজুরিতে। ব্যাক ইনজুরিতে ২০০২ সালের পাকিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজ মিস করলেন। সেটা থেকে ফেরার আগেই হাঁটুর ইনজুরি, প্রথমবার সার্জনের ছুঁরির নীচে, অপারেশনের টেবিলে। কিন্তু মাশরাফি মানেই হার না মানার গল্প, মাশরাফি মানেই লড়াই! ফিরেছিলেন ২০০৩ বিশ্বকাপে, কপাল খারাপ সেখানেই আবার ইনজুরি! (সেবার মাশরাফির রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে গিয়েছিলেন আকরাম খান!)।

ক্যারিয়ারের সেরা সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন ২০০৩ সালের ইংল্যান্ড সিরিজকে। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৪১/৩, দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৬০/৪। আমি ব্যক্তিগতভাবে মাশরাফিকে মনের ভেতর গেঁথে নেই যখন গ্রাহাম থর্পের স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলেন মাশরাফি। নাসির হুসেইনকে উইকেটের পেছনে অসাধারন এক ডেলিভারিতে খালেদ মাসুদের তালুবন্দি করেন, সেটাও এখনো চোখে ভাসে।

তবে ২০০৪ সালে এক বছরের গ্যাপে টেস্ট ক্রিকেটে ফেরার পর যে বলটিতে রাহুল দ্রাবিড়কে শূন্য রানে বোল্ড করেন সেটা কখনোই ভুলতে পারবো না। দ্রাবিড়ের বিশ্বস্ত “ওয়াল” ভেঙে চুরমার হয়েছিলো আনপ্লেয়াব্যাল এক ইয়র্কারে।

১৬ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের কত স্মৃতি! ভারতের বিপক্ষে শততম ম্যাচ, কার্ডিফের মহাকাব্যিক জয়, বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো, তার অধিনায়কত্বে বিশ্বকাপের নক আউট পর্ব, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমি ফাইনাল সবগুলাই মাশরাফির মুকুটের এক একটি পালক যোগ করেছে।

হাজার পৃষ্ঠার বই লেখা যাবে তবুও হয়তো মাশরাফিকে বর্ননা করা যাবেনা। বাংলাদেশ একদিন অনেক বড় দল হবে, পরিসংখ্যান বিচারে মাশরাফির চেয়েও বড় ক্রিকেটার আসবে কিন্তু মানুষ মাশরাফি আর কি আসবে? এইরকম একজন অভিভাবক কি শতাব্দীতে একজন আসেন? মাশরাফি কি শুধুই ক্রিকেটার? ক্রিকেটের মাঠে মাশরাফিকে কখনোই সীমাবদ্ধ করে রাখা যাবেনা। আপনি ক্রিকেটার হন বা যেই পেশাতেই থাকুন না কেন মাশরাফির হার না মানা মানসিকতা আপনাকে অনুপ্রেরণা দিতে বাধ্য। যখনই হেরে যেতে থাকবেন শুধু নিজেকে একবার বলবেন “দৌড়া”! থেমে থাকবেন কেন!

মাশরাফি আলাদা একটা জীবনদর্শন, মাশরাফি মানে বিনয়। বিশ্বাস না হলে “মাশরাফি” বইটা একবার পুরাটা পড়বেন, শুধু একবার। আপনি অন্যভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হবেন।

মাঠ এবং মাঠের বাইরে মাশরাফির মত শ্রদ্ধাভাজন ক্রিকেটার এদেশে আর জন্মায়নি। মাশরাফির কথা আজ যেন বাণী একেকটা। দেশ এবং দেশের ক্রিকেট নিয়ে মাশরাফির প্রতিটা কথা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়। এই ভরসা মাশরাফি অর্জন করে নিয়েছেন! কেউ দয়া করে দেয়নি কিন্তু!

“নড়াইল এক্সপ্রেস” এখনো চলছে, ক্যারিয়ার জুড়েই ঝড়ঝাপ্টা এসেছে ইনজুরি হয়ে, মাশরাফি আর ইনজুরি বেদনাদায়ক এক জুটি। চলার পথে সামান্য বিরতি এসেছে, ইঞ্জিনের মেরামত লেগেছে কিন্তু কখনোই লাইনচ্যুত হয়নি নড়াইল এক্সপেস। শেন বন্ড, শন টেইট, এন্ড্রু ফ্লিনটফ কত বড় বড় নাম থেমে গিয়েছে!

হতাশা শুধু এটুকুই, একজন পূর্নাঙ্গ অল রাউন্ডার পেলাম না আমরা, ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরী পেয়েছিলেন (১৩৮*), আছে ছয়টি ফিফটি, লিস্ট “এ” ক্রিকেটে সাত ফিফটি, একটি সেঞ্চুরী (১০৬) সাথে টেস্ট ক্রিকেটে তিনটি আর ওয়ানডেতে একটি ফিফটি প্রমাণ করে অল রাউন্ডার হবার সব গুনাবলি তার ভেতর ছিলো। হায়! ইনজুরি যে ব্যাটিং নিয়ে কাজ করারই সুযোগ দিলো না গুরুকে!

বলতে থাকলে শেষ হবেনা! শেষ করতে হবে, ধন্যবাদ জানাই মাশরাফি বিন মর্তুজা আপনাকে, ১৬ বছর ধরে বিতর্কবিহীনভাবে দেশকে সার্ভিস দিয়ে যাবার জন্য। হয়তো আর খুব বেশিদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনাকে দেখতে পারবো না, সম্ভবত আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত। কিন্তু যতদিন থাকবেন এভাবেই মাথা উঁচু করে খেলে যাবেন এটাই মনেপ্রাণে চাইবো। আর বিদায়টাও যেন হয় রাজসিক, শ্রদ্ধা আর গৌরবের। কারন মাশরাফি মানেই লড়াই, মাশরাফি মানেই মাথা উঁচু করে বাঁচা, মাশরাফি মানেই পথ দেখানো অগ্রজ, মাশরাফি মানেই ভালোবাসা …মাশরাফি মানেই “আপনার তুলনা আপনি নিজেই”, মাশরাফি মানেই…

“পা দুটো বেইমানি করলেও ঘাড়ের রগ বাঁকা করে চ্যালেঞ্জ করবো নিজেকেই। শুধু একটা বল করতে চাই বাংলাদেশের হয়ে”।

Most Popular

To Top