টুকিটাকি

আত্মার পরিচর্যা

আত্মার পরিচর্যা

চারদিকে এত কাজ, এত ব্যস্ততা! আত্মা নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? না ভয় পাবার কোন কারণ নেই, আমি প্রেত সাধানার আত্মা নিয়ে কোন কথা বলছি না। বলছি আপনার দেহের আবরণে যে অদৃশ্য দেহ আছে, সেই চিরন্তন সত্ত্বা বা আত্মা নিয়ে। কখনও কি দৃশ্যমাণ দেহের বাইরে গিয়ে ছুঁয়ে দেখেছেন সেই অদৃশ্য সত্ত্বাকে? তার সাথে কি দু দন্ড গল্প করেছেন? শুনতে চেয়েছেন তার কথা?

এইসব উদ্ভট প্রশ্নের হেতু কি যদি জানতে ইচ্ছে হয়, তবে তবে যান না কেন? শুনুন আপনার আত্মা কি বলে। আমরা সবাই একরমের অর্থহীন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ব্যস্ত শহরের ট্রাফিকেই কেটে যায় জীবনের বেশীরভাগ সময়। সেখানে নিজের জন্য সময় বের করা আর অরণ্যে রোদন একই বিষয়বস্তু। কিন্তু যত যাই হোক না কেন দিনশেষে আত্মার জোরেই বেঁচে থাকি। শরীর শুধুমাত্র ভার বহন করে। তাই নিজের জন্য সময় বের করা অতি মাত্রায় জরুরি একটা বিষয়। চারদিকে অনাচার–অনর্থ দিয়ে ভর্তি। তারচেয়ে বড় কথা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ দিয়ে ভরে উঠেছে। পেপার, টিভি কিংবা যে মাধ্যমেই খবর শুনুন বা দেখুন না কেন, সবখানেই একটা জিনিস খুব কমন আর তা হলো দিনকে দিন মানুষের মনুষ্যত্ব নিচু থেকে নিচুতর হচ্ছে।

শুধুমাত্র আকার আকৃতিগত ভাবেই আমরা ঐ বুনো পশুদের থেকে আলাদা। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য কমে আসছে। চিন্তার বিষয়, বড়ই চিন্তার বিষয়। কিন্তু চিন্তা করবে টা কে? শুধু শরীরটা আছে কাজ করার জন্য কিন্তু আত্মাটা সাথে নেই চিন্তা করার জন্য। ক্রমশ বড় হয়ে ওঠার ধাপগুলোতে আমরা ধাপে ধাপে আত্মাকে বিসর্জন দেই। সুতরাং, ম্যাচিউরিটি আসার পর আমাদের মধ্যে আত্মা নামক কোন বস্তুর অস্তিত্বই থাকে না। থাকে শুধু এক পিন্ড মাংসের দলা। ওতে জীবন ঠিকই চলে যায়। কিন্তু মনুষ্যজাতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হয়ে যায়। আত্মা যেখানে অনুপস্থিত যেখানে বর্বরতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আমরা কিন্তু এইসব আত্মাহীন মানুষদের বর্বরতা দেখতে দেখতে একরকম অভ্যস্ত হয়েছ গেছি। আগে কিছু মনে হতো কিন্তু এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। মনে হয় এইতো স্বাভাবিক, এইতো চিরকাল হয়ে আসছে।

সামান্য অসুখেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া ছাড়াই টন কে টন এন্টিবায়োটিক গিলতে পারি। কিন্তু কেউ যখন হতাশায় ভোগে, অবসাদে আচ্ছন্ন হয় তাকে আমরা নাটক বলে উড়িয়ে দেই। দেহের অসুখকে কত প্রাধান্য দেই আর ভেতরের অসুখকে করি অবহেলা। সুস্থ দেহে বাস করে সুন্দর মন কিন্তু সুন্দর মন না থাকলে অতি সুন্দর দেহখানা দিয়া কি করিবো?

যারা আমাদের সমাজে বিভিন্ন নেশায় আসক্ত তাদের কথা দিয়েই চিন্তা করা যাক। সবাই তাদের নিচু চোখে দেখি। দেখা হলে কোনরকমে এড়িয়ে যাই, কথা বলার চেষ্টা করা তো দূরে থাক। এখানে কিন্তু বাইরে দেখে ভেতরটা বিবেচনা করার মত ভুল হয়ে গেল। সমস্যার মূলে যাওয়া বাদ দিয়ে, এড়িয়ে যাওয়া হলো। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির জন্য রিহ্যাব যতটা না বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও হাজারগুণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আশেপাশের মানুষের সাহায্য পাওয়া। একজন আসক্ত মানুষের দেহ ভেঙ্গে পড়ে, আত্মাটাও নষ্টের পথে ধাবিত হয়। কিন্তু আশেপাশের মানুষজনের সাহায্য পেলে কিন্তু সে তার আত্মাটাকে পুনরায় ঘষেমেজে ঠিক করতে পারে। সমাজের মূলধারায় মিশতে পারে। এই ব্যাপারে একটা গবেষণার দিকে খেয়াল করা যাক। ১৯৭০ সালের দিকে কানাডিয়ান মনোবিদ ব্রুস কে আলেকজান্ডার ও তার সহযোগি সাইমন ফ্রেশার, ইঁদুরের উপর একটা এক্সপেরিমেন্ট করেন। তিনি একটা ইঁদুর কে খাচায় বন্দি করে রাখেন এবং একটা পাত্রে শুধু পানি এবং আরেকটা পাত্রে পানির সাথে মরফিন মিশিয়ে দেন। ইঁদুর অধিকাংশ সময়েই শুধু পানির পাত্র বাদ দিয়ে মরফিন মেশানো পানি পান করে এবং একসময় আসক্ত হয়ে যায়। একই সময়ে তিনি আরেকটা বিশাল জায়গায় ইঁদুরদের জন্য একটা পার্ক তৈরী করেন, সেখানে ইঁদুরদের জন্য সব রকম ব্যবস্থা রাখা হয়। তাদের বিনোদনের জন্য খেলনা রাখা হয়, অবাধ যৌনতার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এক কথায় বলা যায়, সেটা ইঁদুরদের জন্য স্বর্গতুল্য একটা জায়গা। কিছুদিন চলার পর সেই আসক্ত ইঁদুরকে ঐ স্বর্গে ছেড়ে দেওয়া হয়। এবং সেখানেও তার (আসক্ত ইঁদুর ) জন্য মরফিনের ব্যবস্থা করা হয়। বিস্ময়কর ভাবে দেখা যায় ইদুর টা আর মরফিন গ্রহণ করছে না। ইঁদুর টা অন্য সবার সাথে মিশে গেছে অর্থাৎ তার আর মাদকের প্রয়োজন পড়ছে না।

যেই সুযোগ টা ইঁদুর তার স্বজাতিকে দিয়েছে, আমরা মানুষ হয়েও আমাদের স্বজাতিকে দিতে পারছি না। এই এক্সপেরিমেন্টটা কি আমাদের নিচে নামায় না? আমাদের ভাবায় না?

Most Popular

To Top