ইতিহাস

“ডিভাইড এন্ড রুল” : দ্বিখন্ডিত ভূমি, ধ্বংস সভ্যতা

“ডিভাইড এন্ড রুল” : দ্বিখন্ডিত ভূমি, ধ্বংস সভ্যতা

ভারত উপমহাদেশ কিংবা ভারতবর্ষ, প্রাচীনকাল থেকেই শাসকগোষ্ঠী আর লুটেরাদের আকাঙ্ক্ষার স্থান ছিল। উর্বর মাটি, অজস্র প্রাকৃতিক সম্পদের আধার, এই এলাকায় মোঘল থেকে আরম্ভ করে জলদস্যু, পারসি সেনাবাহিনী, পর্তুগিজরা পর্যন্ত এসে হামলে পড়েছিল। কিন্তু এদের মধ্যে সবচেয়ে সফল হয় ফিরিঙ্গী বা ইংরেজরা, তারা দেশীয় মীরজাফরদের সহায়তায় এই দেশে অনেকটা সূঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়েই বের হয়। প্রায় ২০০ বছর এই দেশের সম্পদ চুষে চুষে নিজেদের ইউরোপে পাঠানোর পরেও, দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে বুনে দিয়ে যায় সাম্প্রদায়িকতার বীজ। এই বীজ এখন মহীরুহ হয়ে সদর্পে নিজের শিকড় বাড়িয়ে যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে।

ভারত-পাকিস্তান ভাগ করে ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন চলছিলো, সিপাহী বিদ্রোহ এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যেন বেশি বাড়তে না পারে, তার জন্য শাসকরা বঙ্গভঙ্গের কূট-সিদ্ধান্ত নেন। এই মোতাবেক লর্ড কার্জনের আমলে মুসলমান-প্রধান পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ (অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি বিভাগ) এবং হিন্দু-প্রধান বঙ্গপ্রদেশ (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রেসিডেন্সি ও বর্ধমান বিভাগ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা রাজ্য) এই দুটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।

ভারত-পাকিস্তান বর্ডার

কিন্তু এই বিভক্তির ফলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তো কমলোই না, বরং ঝামেলা আরো বেড়ে গেল। বিভক্ত বাংলায় কিছুসংখ্যক হিন্দু উচ্চবিত্ত গোষ্ঠীরা চিন্তায় পড়ে যান, কারণ তাদের জমিদারির বেশিরভাগই ছিল পূর্ববঙ্গে আর সেখানে কৃষক সমাজ ছিল মুসলমান। এছাড়া বাঙালি ভদ্রলোক সমাজও বঙ্গপ্রদেশে বিহারি এবং উড়িয়াদের মাঝখানে সংখ্যালঘু হিসেবে বসতি স্থাপন করতে রাজি হননি। আবার কতিপয় উচ্চবংশীয় মুসলিম নেতারা বঙ্গভঙ্গকে সাদরে গ্রহন করেন এবং ১৯০৬ সালে নতুন ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলমানেদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি জানায়।

প্রাক্তন শাসক এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের সহায়তার নথি তুলে ধরে আইনসভায় মুসলমানদের জন্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান। তার পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ স্থাপিত হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা আফগানিস্তানের যুদ্ধের পরে এবং সিপাহী বিদ্রোহের পরে মুসলিমদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা আরম্ভ করে, তাই তারা মুসলমান নেতাদের শুধু মৌখিক আশ্বাস দেয়। এভাবে ব্রিটিশরা “সাপও মরল না, লাঠিও ভাঙ্গল না” এই নীতিতে ভারতবর্ষের মানুষদের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে ফাটল ধরিয়ে দেয়। অনেক ঝামেলার পরে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হয়।

পরবর্তীতে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয় এবং এর সাথে সাথে বিভিন্ন অহিংস ও সহিংস আন্দোলনও আরম্ভ হয়। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ সরকারের অনেক দেনা হয়ে যায় এবং তারা ভিতরে ভিতরে অধিনস্ত দেশগুলোকে স্বাধীন করে দিয়ে দেনা কমিয়ে নিতে চায়। এরপরে ১৯৪৭ সালে তারা সম্পূর্ণ ভারতবর্ষকে স্বাধীন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ব্রিটিশ কূটবুদ্ধি এক্ষেত্রে আরেক পাশার দান খেলে যায়। ইউরোপ মহাদেশ এমনিতেই যুদ্ধের কারণে ক্ষতবিক্ষত অবস্থা, এখন এই সুযোগে যেন ভারতবর্ষ নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করে যেতে চায় ব্রিটিশরা। তার জন্য অখন্ড ভারতবর্ষকে তারা “ডিভাইড এন্ড রুল” এই নীতিতে পাকিস্তান আর ভারত নামে দুটি দেশে ভাগ করে দিয়ে যায়, যেখানে পাকিস্তান হয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আর ভারত হয় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। ব্রিটিশরা তো ভাগ করে দিয়ে চলে গেলো কিন্তু সেই বিভক্তির চারাগাছে পানি দিয়ে তাকে বড় করে তুললো সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মান্ধতা। দুই দেশেই সংখ্যালঘুদের উপর চলল সাম্প্রদায়িক অত্যাচার এবং দমন-পীড়ন, যা এখনো চলমান।

ভাগ যেহেতু হয়েছে, তাহলে আলপিনেরও ভাগ হবেঃ

রাজনীতিকরাই সব কিছু ভাঙ্গে আর তার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষদের। বিভক্তির ফলে শুধু দুই দেশের মধ্যে ভূমি ভাগ হল এমন কিন্তু না, ভাগ হয়ে গেলো মানুষের মধ্যেকার এতদিনের সম্পর্কটাও। রাজনীতিকেরা তো দুই দেশের মধ্যে সীমারেখা টেনে নিজেদের লাভ-লোকসান হিসেব করতেই ব্যস্ত, কিন্তু ঐতিহ্যও যেমন ভাগ হয়ে গেল, তেমনই দ্বিখণ্ডিত হল মিলেমিশে কাটানো সময়কালটাও এটা কেউ মনে রাখলোনা।

দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হল সূঁচ, পেন্সিল, চেয়ার, টেবিল, ফাইল রাখার আলমারি – এমনকি সরকারের পোষ মানানো জন্তু-জানোয়ার ভাগাভাগি নিয়েও। পরে রাজনীতিকরা (!) বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আয়তনের হিসাব অনুযায়ী পাকিস্তান পাবে ৪০% সম্পত্তি এবং ইন্ডিয়া পাবে ৬০% সম্পত্তি।

এই হিসাবমতে যেসব জিনিস ভাগ হয়েছিলো তাদের কয়েকটা উদাহরণঃ

• ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ২১টি টাইপরাইটার যন্ত্র, ৩১টি কলমদানি, ১৬টি সোফা, ১২৫টি কাগজপত্র রাখার আলমারি আর অফিসারদের বসার জন্য ৩১টি চেয়ার পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল।

• দেশভাগের কয়েক মাস আগে ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা ৬০টি হাঁসও দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।

• বন বিভাগের সম্পত্তি জায়মুণি নামের একটি হাতিকে পূর্ব পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা নিয়ে ভারতের মানুষের মধ্যে বেশ ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। ওই হাতিটির মাহুত অবশ্য ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এমন তুচ্ছ তুচ্ছ জিনিস নিয়ে যখন ভাগাভাগি চলছে, তখন অমূল্যবান প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলো নিয়ে কি হবে তা তো চিন্তাও করা যায়না।

মহেঞ্জোদারো, এক অনন্য আবিষ্কারঃ

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯২০ সালে সিন্ধু নদের অববাহিকায় মহেঞ্জোদারো এলাকা আবিষ্কৃত হয়, সেখানে খনন করে নিজেদের প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে জানতে পারে। মিশর, ইউনান আর চীনের সভ্যতার মতোই হাজার হাজার বছরের পুরনো ভারতবর্ষের ইতিহাস নিয়ে তখন ভারতীয়রা ব্রিটিশদের সামনে আত্মশ্লাঘা করতে পারত। মহেঞ্জোদারোতে একহাজারেরও বেশী প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছিল, যার মধ্যে উল্যেখযোগ্য ছিল একটি নর্তকীর মূর্তি আর ধ্যানরত এক পূজারীর মূর্তি, তবে দুঃখের বিষয় যে উভয় আবিষ্কারই আংশিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত ছিল। তবে অক্ষত অবস্থায় সোনার সুতোয় মোড়া বহুমূল্য পাথর দিয়ে গাঁথা একটি হার পাওয়া গিয়েছিলো।

কাটা-ছেঁড়া থেকে বাদ যায় নি মহেঞ্জোদারো

তামার পাত্রে পাওয়া এই সোনার হারটির ঐতিহাসিক মূল্য ছিল অপরিসীম এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, “তাম্রযুগের সিন্ধু সভ্যতার খোঁজ পাওয়ার ফলে ভারত সেইসব দেশের সঙ্গে একই সারিতে পৌঁছে গিয়েছিল, যাদের দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাসের কথা আগেই জেনেছিল পৃথিবীর মানুষ”।

ছাড় দেবোনা সভ্যতাকেওঃ

১৯৪৭ সালের জুন মাসে দেশভাগের পরে এই সভ্যতাকে এবং তার নিদর্শনগুলোকেও ভাগ করা হল। সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র মহেঞ্জোদারো চলে গেল পাকিস্তানের ভাগে, পাকিস্তান এটাকে পেয়ে লুফে নিল। তারা পাকিস্তানের পৃথক ইতিহাস হিসেবে তাই সিন্ধু সভ্যতাকে নিজেদের ইতিহাস এবং পাকিস্তানের সম্পত্তি বলে প্রচার করার চেষ্টা শুরু হল। লক্ষ্য এটাই ছিল যে, ভারতের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে পাকিস্তানের – যে ইতিহাস হিন্দু-প্রধান ভারতের নয় বরং মুসলিম পাকিস্তানের ইতিহাস।

এখন তো শুধু সভ্যতা পেলে হবেনা, সভ্যতার নিদর্শনও তো প্রমাণ হিসেবে রাখতে হবে, তাই মূর্তিগুলোর ভাগাভাগি হল। নর্তকীর মূর্তিটি ভারতের ভাগে গেল আর পাকিস্তান পেল পূজারীর মূর্তি। এখন সোনার হার ভাগ করব কিভাবে? ওটাই মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া একমাত্র অক্ষত নিদর্শন এবং তাও আবার একটাই মাত্র পাওয়া গিয়েছে। কোনো দেশই হারকে ছাড়তে রাজি না। এখন কি হবে?

সমস্যা নেই, রাজনীতিবিদরা আছে না! তারা এক মহান সিদ্ধান্ত নিলেন। কি সেই সিদ্ধান্ত? সিদ্ধান্ত হল যে হারকে দুই টুকরা করা হোক, এক টুকরা থাকবে পাকিস্তানে এবং আরেক টুকরা থাকবে ভারতে! হয়ে গেলো সমস্যার সমাধান। এই অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটিকে আধা-আধি ভাগ করে দুই দেশ একেকটি ভাগ খুশিমনে নিয়ে নিলো এবং নিজেদের জাতীয় সংগ্রহশালায় রেখে দিল।

দ্বিখণ্ডিত সেই ঐতিহাসিক হার

ইতিহাসবিদ সুদেষ্ণা গুহর কথায়, “এই হারটি ভাগ করা এক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা। ইতিহাসকে কেটে দু’টুকরো করে ফেলা হল। আফসোস এটাই যে এই ঘটনার জন্য কেউ লজ্জিতও হল না!”

আমেরিকায় একটি প্রদর্শনীর জন্য হারটির দু’টো টুকরোকে এক করার প্রস্তাব এসেছিল একবার। কিন্তু ভারত যে টুকরোটা পেয়েছিল, সেটি দিতে তারা অস্বীকার করে।

এভাবেই মানুষের ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা আর লোভের হাতে ধ্বংস হয়ে গেল সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যেকার সম্প্রীতি এবং এর সাথে প্রাচীন সভ্যতার এক অপূর্ব কীর্তিও।

তথ্যসূত্রঃ
বিবিসি,
উইকিপিডিয়া,
রেজা ঘটকের ব্লগ

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top