ইতিহাস

আব্দুল জব্বার; এক কিংবদন্তির গল্প

আব্দুল জব্বার এমন এক ব্যক্তি যার কন্ঠে মুক্তিযোদ্ধারা খুঁজতো অনুপ্রেরণা, আশার আলো। যার ভুবন ভোলানো কন্ঠের আকুলতায় হারিয়েছে সব প্রজন্মের বাঙ্গালি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নেননি ঠিকই কিন্তু তার কণ্ঠ কোনো অংশে বন্দুকের চেয়ে কম যেতো না। বরং তার কন্ঠের জোরেই মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল গর্জে উঠতো দ্বিগুণ বেগে।

কিংবদন্তি আব্দুল জব্বারের জন্ম ১৯৩৮ সালের ৭ই নভেম্বর কুষ্টিয়াতে অর্থাৎ থেকে ঠিক ৭৯ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। ১৯৫৬ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। তার প্রাথমিক পর্যায়ে সংগীত গুরু ছিলেন ওস্তাদ ওসমান গণি এবং পরে ওস্তাদ লুৎফুল হকের সাহচর্যে এসে নিজেকে আরো শাণিত করেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাশের দুবছর পর তিনি পাকিস্তান বেতারে গান গাইতে শুরু করেন। বেতারে প্রচারিত তার সর্বপ্রথম গান “হারিয়ে এলাম কোথায় বলো আমার সেই সাথীটিরে“।

এরপর তাকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৬২ সালে তিনি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করতে শুরু করেন। দর্শকদের একের পর এক জনপ্রিয় ও কালজয়ী গান উপহার দিতে থাকেন। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’ এ কন্ঠ দেন তিনি। ১৯৬৮ সালে বিখ্যাত সুরকার সত্য সাহার সুরে তিনি কন্ঠ দেন “তুমি কী দেখেছো কভু“ গানটিতে। গানটি প্রকাশ পাবার পর রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান আব্দুল জব্বার। তিনি অনেকবার সাক্ষাৎকারে এই গানটিকে তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমন খুব কম বাঙ্গালিই আছে যারা এই গানটির সাথে নিজের জীবনকে রিলেট করতে পারেনি। এরইমধ্যে বিটিভির নিয়মিত গায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ১৯৭০ সালে আরেকটি কালজয়ী গান “পীচঢালা পথে“ তিনি কন্ঠ দেন। এই গানটিও তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সে সময় সবার মুখে মুখে ফিরতো গানটি। গানটির সুরকার ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার অশোক ঘোষের ভাই রবীন ঘোষ, যিনি নিজেও সুরকার হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ছিলেন। ষাট ও সত্তরের দশকে অসংখ্য জনপ্রিয় গান দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে ফেলেছিলেন আব্দুল জব্বার। তাই নির্দ্বিধায় তাকে সে সময়ের অন্যতম প্রধান প্লেব্যাক শিল্পী বলা যায়।

এরপর ৭১ সালে শুরু হয় আমাদের আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। কেউ অস্ত্র ধরে, দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বাড়ি ছেড়ে যায় কেউ। কেউ কেউ কন্ঠ দিয়ে তাঁদের অনুপ্রাণিত করার জন্য বাড়ি ছেড়ে যায়। আমরা তাঁদের বলি কন্ঠসৈনিক। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র ছিল সেই কন্ঠসৈনিকদের আবাসস্থল। কন্ঠসৈনিকদের অন্যতম একজন হলেন আব্দুল জব্বার। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকেই জব্বার গেয়েছিলেন “সালাম সালাম হাজার সালাম, জয় বাংলার জয়, মুজিব বাইয়া যাও র“ এর মত অনেক কালজয়ী গান, যা সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

শুধু বেতারে গান গেয়েই তিনি তার দায়িত্ব পালনে ইস্তফা দেননি। কলকাতায় প্রশিক্ষণরত মুক্তিবাহিনীদের ক্যাম্পে গিয়ে গান গেয়ে তাঁদের উৎসাহ দিয়েছেন। এখানেও তিনি থেমে থাকেননি মক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গী করে মুম্বাইয়ের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরী করেছেন। সেখানে গান গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি তিনি বাংলাদেশের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৮ সালে আব্দুল জব্বার কন্ঠ দেন সারেং বৌ চলচ্চিত্রের আরেক কালজয়ী গান “ওরে নীল দরিয়া“ তে। গানটির সুরকার ছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত আলম খান। গানটি এতই দর্শকপ্রিয়তা পায় যে একসময় নীল দরিয়া গানটি দেশের ট্রেডমার্কে পরিণত হয়।

আব্দুল জব্বারের দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে একটিমাত্র একক এ্যালবাম প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। এ্যালবামের শিরোনাম ছিলো “কোথায় আমার ওরে নীল দরিয়া“।

আব্দুল জব্বার জীবিত থাকা অবস্থাতেই অনেক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তার মধ্যে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক, ১৯৮৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে নানা সময়ে নানাভাবে সম্মানিত করেছে।

২০১৭ সালের ৩০ ই আগস্ট পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে পাড়ি জমান শিল্পী সত্ত্বাকে ছাপিয়ে মহৎ হয়ে ওঠা এ মানুষটি। মৃত্যুর পূর্বে দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিলতায় ভুগেছেন তিনি। তার বাঁচার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সঙ্গতি ছিলো না। তাই তো সরকারি অনুদানের পরেও তিনি তার চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পারেননি। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বেও তিনি বাঁচার প্রবল আকুতি জানিয়ে বলেছিলেন –

“যখন লাইফ সাপোর্টে থাকবো, তখন সবাই আমাকে দেখতে আসবেন। মারা গেলে শহীদ মিনারে নিয়ে যাবেন। আমার এসবের কিছুর দরকার নাই। আমি আরও কিছুদিন বাঁচতে চাই“।

কিন্তু ভাগ্যবিধাতা তার ডাকে সাড়া দেননি। দুঃখের দহনে, করুণ রোদনে তিলে তিলেই তার ক্ষয় হয়েছে।

এই মহান মানুষটির ৭৯ তম জন্মবার্ষিকীতে নিয়ন আলো পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

Most Popular

To Top