নাগরিক কথা

এদেশের “মালাউন”, “মাগী” কিংবা পশ্চিমা দেশের “নিগার”!

এদেশের "মালাউন", "মাগী" কিংবা পশ্চিমা দেশের "নিগার"!

কিছু কিছু শব্দ থাকে, যেগুলোর জন্ম হয় খুব নিরীহভাবে। কিন্তু, এক পর্যায়ে গিয়ে সেগুলো পরিণত হয় ভয়ংকর বর্ণবাদী শব্দ বা গালি হিসাবে। এই যেমন ধরুণ ‘নিগার’ শব্দটা। এটা একটা ল্যাটিন শব্দ নিগার থেকে এসেছে। এর অর্থ কালো। সরাসরি অবশ্য ল্যাটিন থেকে এসেছে বললে ভুল হবে। ল্যাটিন নিগার এই বিশেষণটির স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজ বিশেষ্য হচ্ছে নিগ্রো। এই নিগ্রো থেকেই ‘নিগার’ শব্দের উৎপত্তি। শুরুর দিকে এটা একটা নিরীহ এবং নিরপেক্ষ শব্দ ছিলো। কালো মানুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে মানুষের মনের তীব্র ঘৃণা মিশে যায় এতে। শব্দটা হয়ে পড়ে দূষিত এক বর্ণবাদী শব্দে। পাশ্চাত্য বিশ্বে এখন এটা একটা নিষিদ্ধ শব্দ। কেউ উচ্চারণ করলেই তার জেল-জরিমানা হয়ে যাবে।

আমাদের বাংলাতেও ‘মাগি’ বলে একটা শব্দ আছে। এটা মেয়েদের জন্য বরাদ্দ একটা বিচ্ছিরি গালি। অথচ এই শব্দটা ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে অহরহ ব্যবহৃত এক শব্দ। নারী শব্দের খুব প্রচলিত একটা প্রতিশব্দ ছিলো এটা। মাগ মানে পুরুষ, এর স্ত্রীবাচক শব্দ ছিলো মাগি। এখন এই শব্দটা নারীদের প্রতি পুরুষের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থান সবসময় সুখকর ছিলো না। এরা মিলেমিশে থেকেছে, আবার একে অন্যকে সন্দেহের চোখেও দেখেছে, আলাদা করেও ভেবেছে। বাংলা অঞ্চলে একসময় হিন্দুরা মুসলমানদের ‘নেড়ে’ বলে ডাকতো। শরৎ চন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসেই মুসলমানদের ‘নেড়ে’ বলে ডাকার উদাহরণ আছে। হিন্দুরা কিন্তু শুরুতে ‘নেড়ে’ বলতে মুসলমানদের বোঝাতো না। হিন্দুদের প্রথম সংঘাত শুরু হয়েছিলো বৌদ্ধদের সাথে। মুসলমানরা তখনও এই ভূখণ্ডে পা রাখেনি। কিংবা পা রাখলেও সংখ্যায় ছিলো তারা অপ্রতুল। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মাথা ন্যাড়া করে রাখে বলে বৌদ্ধদের গালি দিতে হিন্দুরা ‘নেড়ে’ শব্দটাকে ব্যবহার করতো। সেই ‘নেড়ে’ শব্দটাই, হিন্দুদের প্রতিপক্ষ হিসাবে বৌদ্ধরা সরে গিয়ে মুসলমানরা চলে আসাতে, মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য হয়ে যায়। মুসলমানদের ‘যবন’ বলে ডাকারও প্রচলন ছিলো। আগে ‘যবন’ শব্দটা বিদেশি আক্রমণকারীদের (খুব সম্ভবত গ্রিক আক্রমণকারীদের যবন বলা হতো) বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। সেই শব্দটাই পরে মুসলমানদের জন্যও ব্যবহার করা শুরু হয়। যেনো ভারতীয় মুসলমানরা ভারতের কেউ না, এরা সব বিদেশি আক্রমণকারী।

এইসব শব্দ, যেগুলো উল্লেখ করলাম, সেগুলো শুরুতে নিরীহ বা নির্বিবাদী শব্দ ছিলো। পরবর্তীতে তা মানুষের ঘৃণার দিয়ে আবৃত হয়ে বিষাক্ত শব্দে পরিণত হয়েছে। কিন্তু, বাংলা অঞ্চলে একটা শব্দ শুরু থেকেই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে ব্যবহৃত হতো। আজো তা। এই শব্দটা সাম্প্রদায়িক মুসলমানরা হিন্দুদের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছে। শব্দটা হচ্ছে মালাউন। এখন এটা সংক্ষেপে মালুও হয়ে গেছে। মালাউন আরবি শব্দ। এর মানে হচ্ছে অভিশপ্ত। মূলত ইবলিশ শয়তানকে বোঝানোর জন্য মালাউন শব্দটা ব্যবহার করা হয়। ইবলিশ হচ্ছে আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত। সেই মালাউন শব্দটাকে ভারতীয় মুসলমানরা বিশেষ করে বাংলার মুসলমানরা নিয়ে আসে হিন্দুদের জন্য। আগে কম ব্যবহৃত হতো শব্দটা আমাদের সমাজে। এখন বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। মালাউন, বা মালাউনের বাচ্চা এখন একটা অতি ব্যবহৃত গালি বাংলাদেশে।

একজন হিন্দুকে যখন মালাউন বলে ডাকা হয়, তখন একজন কালোকে নিগার ডাকলে যে অনুভূতি হয়, তার সমান অনুভুতি হয় তার। কিন্তু, সেটা বোঝার সক্ষমতা আমাদের সকলের আছে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে আমার। অন্যের অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করা, অন্যকে সম্মান দেওয়া, আমাদের সমাজের সংস্কৃতি না। এগুলো আমরা মুখে মুখে বলি, কাগজে লিখি, কিন্তু বাস্তবে অনুশীলন করি না। বাস্তবে বরং অন্যকে অপদস্থ করে, অন্যকে বাজে কথা বলে, অন্যকে গালি দিয়ে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মনের মাঝে প্রবল সুখ এবং অপরিসীম আত্মতৃপ্তি পাই।

পাশ্চাত্যে এখন একজন কালো মানুষকে নিগার বলে কেউ ডাকলে, এর বিরুদ্ধে সে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে সাথে সাথেই। পুলিশ ডাকতে পারে কিংবা আদালতের কাছে যেতে পারে। বাংলাদেশের একজন হিন্দুর মালাউন গালি শুনেও নিশ্চুপ থাকতে হয় নতুবা মুখে হাসি ধরে রেখে কিছু হয়নি এমন অভিনয় করে সরে পড়তে হয়। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিরোধের উপায় নেই তার। এই সব ঘৃণামূলক, জাতি-বিদ্বেষমূলক শব্দগুলোকে সারা বিশ্ব যেখানে ক্রমে ক্রমে নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে, আমরা সেখান এর চাষ করে চলেছি বিপুল আগ্রহে এবং চরম উৎসাহে।

মানুষের শুভ বুদ্ধি এবং অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা কবে জন্ম নেবে কে জানে।

Most Popular

To Top