গল্প-সল্প

পিস্তল!

পিস্তল!

অক্টোবর মাসেই তো শীত পড়ার কথা কিন্তু শীত কই? প্রচন্ড গরমে মাথা যেন পেকে গেলো, কোথাও শান্তি নেই, গাছের নিচের ছায়া নেই। এই শহরে মানুষের চাপে মানুষ আজ অর্ধমৃত। কোন পরিকল্পনা নেই, নেই কারো চিন্তা। ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ নিয়েও কোন ধারণা নেই। জনগণের ও নেই, জনগণের গড়া সরকারেরও নেই। বসবাসের জন্য সবদিক থেকে এই শহর এক বস্তির মত হয়ে যাচ্ছে।

পড়ালেখার পাশাপাশি মানুষ চাকরি বা অন্যকিছু করে কিন্তু আমি ব্যবসার পাশাপাশি পড়ালেখা করি। পড়ালেখা নিয়ে আমার কোন ভবিষ্যৎ নেই। কারণ আমি এমন পড়ালেখা করি না, যে পড়ালেখা আমাকে একসময় ভালো একটা সরকারি বা বেসরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দিবে। এইদেশে সে আশা করাও বোকামি! ওইরকম মেধাই নেই বলতে গেলে। তাই ভবিষ্যৎ কে সামনে রেখে আমি আল্লাহ’র নাম নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। সাথে থাকবে কিছু সার্টিফিকেট ।

কিন্তু আমার ধ্যানধারণা ও আজকাল ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। এদেশে ব্যবসা করারও কোন সুযোগ নেই। সবাই আছে শুধু ফ্রির চিন্তায়। আছে শুধু প্রতারণা, ঠকাবার আশায়। কিছুই ভালো লাগে না এখন আর! এমনি কিছু ভাবতে ভাবতে ফেসবুকে ঢুকলাম। আহা কি সুন্দর আমার নিউজফিড! প্রথমে দেখলাম এক পেইজ থেকে লিখছে মেনশন করুন আপনার ‘Y’ অক্ষরের ফ্রেন্ডকে যে আপনাকে ট্রিট দিবে। আমি কিন্তু আজ পর্যন্ত বুঝি নি সত্যিকারে ট্রিট মানে কি? ট্রিটমেন্ট? যাক গে, নিচে নামলাম এইবার দেখি লেখা এক ভিডিওর পোস্ট, যেখানে লেখা পাখিটি’ আল্লাহ আল্লাহ’ ডাকতেছে। কেউ আমীন না লিখে যাবেন না। মন আর মেজাজকে আর নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছি না।

আবার নিচে স্ক্রল করলাম। এইবার দেখলাম লেখা, এই লেখাটি ১০০ জনকে সেন্ড করেন। তারপর দেখবেন আগামীকালের ভিতর একটা সুসংবাদ। যদি না করেন পাবেন দুঃসংবাদ। আরো নিচে নামলাম আবার দেখলাম এক পোস্টে লেখা, এ কি করল এরশাদ? ভিডিও ক্লিক করে দেখুন। দেখলাম এরশাদের সাথে একটা মেয়ের ছবি লাগানো। মজাদার কিছু মনে করে লিংকে ঢুকলাম। হায় খোদা! দেখি ছবিটাই, এইরকম কোন ভিডিও নেই। এইবার আমার নতুন শিক্ষা হল। নোটিফিকেশন চেক করে দেখলাম একজনে আমাকে এক আনসেন্সরড গ্রুপে এড করেছে। গ্রুপে গিয়ে দেখি নারীপুরুষের অবাধ যৌনমিলনের এক ছোট্ট ফেসবুকিয় কারখানা।
তবে আমি সংশয়ে ছিলাম আসলেই কি এরা মেয়ে নাকি ফেক আইডি! ফেক আইডির কথা মনে পড়তেই আমি কয়টা পরিচিত মেয়ের আইডিতে ঢুকলাম। যেখানে তাদের ছবি নেই কিন্তু অন্যকোনো মেয়ের বা পুতুলের ছবি ঠিকই আছে। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এরা যদি এত প্রাইভেসি বা ধর্মীয় কারণেই নিজের ছবি না দিয়ে থাকে। তাহলে অন্য আরেক মেয়ের ছবি তার অনুমতি ব্যতিরেকে কিভাবে ফেসবুকে দেয়? নিজের প্রাইভেসি আছে অন্যের নেই? হতে পারে সে মেয়ে নায়িকা, হতে পারে সে মডেল কিন্তু আপনাকে কে অনুমতি দিল তার ছবি আপনার আইডিতে ব্যবহার করতে!

আপনারা হয়তো অনেকেই ভাবছেন, এগুলা আমি কেনো ফলো করি বা এমন মানুষদের কেন আমি আমার ফ্রেন্ডলস্টে রাখি? আসলে সেটা নয় হয়তো বা আমার ফ্রেন্ডলিস্টে কেউ ট্যাগপ্রাপ্ত হল, কেউ লাইক দিল বা কেউ মন্তব্য করল তখনই এগুলা আমার ফিডে দেখা যায়। এমন অনেক মানুষ আছে যারা বাস্তব জীবনে পরিচিত তাই তাদের আনফ্রেন্ড বা ব্লক কিছুই করতে পারি না।

আমার নাম ওমর। এই হল আমার প্রত্যেকদিনকার কিছু হতাশার গল্প এবং ফেসবুকিংয়ের ইতিহাস। ২৫ বছর বয়সেও এখনো বুঝলাম না জীবনের মানে। গ্রহণ করতে পারলাম না এর স্বাদ। তার উপর এগুলা দেখতে দেখতে আমি আজ ক্লান্ত! আমি ত্যক্ত বিরক্ত, আমি হতাশ! মনে হয় মানসিক ভারসাম্যহীন এক মানুষ আমি, যাকে এই সমাজের ভার্চুয়াল এবং বাস্তব জীবনের মানুষগুলো আস্তে আস্তে পাগল করে দিচ্ছে। অথচ এই ভার্চুয়াল লাইফের নামকরা ব্যক্তিরা ইচ্ছে করলে সমাজ, রাষ্ট্র বা পৃথিবীর বুকে জমে থাকা নানান সমস্যা নিয়ে লিখতে পারত। তারা বিনোদন দিতে পারত কিন্তু সাথে থাকত সমাজ বদলানোর এক ছোট্ট মেসেজ। কিন্তু এরা কেউ তা করে নি!

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, এইসব বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষগুলার এইসব পোস্টে হাজার-লাখ লাইক, শেয়ার এবং কমেন্ট পড়ে। আর কত ভালো ভালো লেখকের অনেক লেখায় কেউ তাকায়ও না!

তাই আজ আমি নিজে নিজে শপথ করলাম, এইসব নোংরামিকে কবরে পাঠানোর জন্য আমি কিছুদিন পাগল সেজে পাগলামো করব। যদিও এই ইচ্ছে আমার বহুদিনের। কিন্তু পাগলামো করলে তো হবে না। পাগলামোর সাথে থাকবে ভয়। ভয়ে দুনিয়া চলে! কথায় আছে না মানুষ শক্তের ভক্ত, নরমের জম।তাই আমাকে একটা পিস্তল কিনতে হবে। আমি এখন আর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করি না। তার সময় ও নেই। আমার আল্লাহ আমাকে যেভাবে চালাবেন, নিজ সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টা করব এবং সেভাবেই চলব। এই ভবিষ্যৎ ভাবনাই মানবজাতিকে আজ ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিসের ভবিষ্যৎ! ভবিষ্যৎ দিয়ে হবেটা কি ?

আমার কাছে আপাতত নগদ ৯০ হাজার টাকা আছে। এগুলা তার ব্যবসার মূলধনের টাকা ।ভাবছি এখান থেকে কিছু টাকা দিয়ে একটা পিস্তল কিনে ভয় দিব ভয়! কিন্তু কাকে ভয় দিব?

উপরোক্ত এইরকম ফেসবুক, ইউটিউবের দেশবিখ্যাত ৩০টা ট্রল পেইজ, গ্রুপ এবং সেসব নিয়ন্ত্রকদের লিস্ট করলাম। তিন দিন ধরে না খেয়ে, না দেয়ে বিভিন্ন উপায়ে, বিভিন্ন ছলেবলে কৌশলে এইসব বিগ শটদের নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার জোগাড়ের সর্বোচ্চ চেষ্টায় ওমর। অবশেষে জোগাড় হয়েও গেল। এই ৩০ জনের মধ্যে ২৫ জন ছেলে এবং ৫ জন মেয়ে। প্রায় একমাস ধরে এদের সাথে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে, চ্যাটিং করে, দেখা করে এদের বন্ধু হচ্ছি। তাও খুব সহজসরল ভাবে কিন্তু চলাফেরা ছিল ধনীব্যক্তির মত। এই একমাসে এদের পিছে আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। আর বাকী আছে ৫৫ হাজার টাকা।

এবার পিস্তল নিয়া ভাবার সময় এসেছে। ইতিমধ্যে এইসব মহারথীর আমি ‘best buddy’ হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছি। কিন্তু এদের কাউকে জানতে দেয় নি আমি এদের সবার পরিচিত। ইউটিউবার ছাড়া এরা নিজেরাও কেউ কাউকে চিনে না। আমি জানতাম ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না। আরতো জানতামই যে, মানবজাতি বর্তমানে কোন জিনিসের প্রতি বেশি দুর্বল। পিস্তল কিনার ব্যাপারটা প্রথমে ভেবেছিলাম গুগলে সার্চ দিব কিন্তু না এইসব ব্যাপারগুলো সার্চ করতে হয় না। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থারা এইসব সার্চকারীদের কালো তালিকাভুক্ত করে। যাইহোক, এক ক্লোজ ভাই এর সাথে যোগাযোগ করলাম। তার সাথে আমার সম্পর্ক আত্মার। সে বলল, ব্যবস্থা করে দিতে পারবে কিন্তু ৫০ হাজার টাকা লাগবে।ছেলেটা আমার সাথেরই রাজনীতি করতে করতে, আজ সে এই রাস্তায়। ব্যাকআপ দেওয়ার মত নেতার অভাব নেই তার। এখন বুঝলাম, কেনো যে রাজনীতি করলাম না। বয়স ও অবস্থা হিসেবে আমি কিন্তু পিস্তলের লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য না তাই আমাকে চোরাই জিনিসের উপর নির্ভর করতে হবে। ‘খারাপ জিনিস নির্মূল করতে খারাপ জিনিসের ই প্রয়োজন’। চোরাই জিনিস নিয়ে মন আমার নাখোশ থাকায়, উপরোক্ত বাণী নিজের মনকে শুনিয়ে দিলাম।

ATI FX45 Firepower Xtreme Military 1911 Semi-Automatic, .45 ACP, Battle-Worn Finish,8+1 Rounds। শেষ পর্যন্ত ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে পিস্তলের জোগাড় হল। ১৯১১ সালে মিলিটারিরা এই সেমি অটোমেটিক পিস্তলটা ব্যবহার করত। আমার বেশি পাওয়ারের পিস্তল লাগবে না। মোটামুটি ভয় আর হাত ফুটো করার জন্য এইরকম সেমি-নরমাল পিস্তল যথেষ্ট। এই পিস্তল পেতে আমাকে যে কষ্ট করতে হয়েছে সেটা আরেক বিশাল কাহিনী। যার কথা বলছিলাম, ভাইটা আমার সেইরকমের ফাপরবাজ কিন্তু মন ভালো। তাই তেনাকে আমার পুরো কাহিনী খুলে বলতে হয়েছে। সে আমার উদ্দেশ্যের কথা শুনে আমাকে বলল, মাথায় কি কিছু আছে নাকি?চিকিৎসা লাগবে তোর।

আমি উনাকে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম,

-আপনি কি করেন?
তারও উত্তর সাদাসাপটা

-এইতো ঘুরেফিরে খাই আর এইসব কাজকাম করি আর কি।

-আরে মিয়া, বলেন যে দালালী করি। আপনার কি এই কথা কইতে শরম

লাগে ?

– সেটা না, তবে সেটাও! অনার্স শেষ করে এক কোম্পানির মার্কেটিং এ কাজ নিলাম। দিন রাত খেটে পাইতাম ৯ হাজার টাকা। আর এখন কষ্ট না করেও মাসে কামাই ৩০-৩৫ হাজার টাকার মত।

-ঠিক আছে আপনার কথা। কিন্তু আপনাকে যারা এই লাইনে আনতে বাধ্য করছে, ওদের তো আপনি কিছুই করতে পারলেন না।

– কোন লাইন?

– আরে ৯ হাজার টাকা দিয়ে সংসার চলে? কাজ করে কোটিপতি বানাচ্ছ তাদের বিনিময়ে তোমরা অভাবের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছ। কেনো এসব? সুন্দর একটা জীবন দিয়ে দুনিয়াতে আল্লাহ আপনারে পাঠাইছে। আপনার নিজস্ব একটা পৃথিবী ছিল। যখনই আপনি আপনার নিজস্ব দুনিয়া শাসন করতে গেলেন। তখনই তারা আপনাকে স্বৈরাচার বলে নিচে নামাল। আর তারাই শাসন শুরু করল। কিন্তু দুনিয়া ছিল আপনার। কিছুই করতে পারলেন না। যদিও কিছু করতেন এই সমাজ আপনাকে মন্দ লোক বলে উপহাস করত। এই সমাজের মানুষই চোর, ডাকাত, দালাল বানায়। আপনার কাজ ভালো না খারাপ সে তর্কে বা সে বিচার আমি করব না। আমার সে অধিকারও নেই।

বাস্তবতা দেখেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মারতেছে আর মারতেছে কিন্তু বিশ্ব পরাশক্তি কোন দেশ কিছু বলে? বলে না। জাতিসংঘ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা যেন না নিতে পারে সে জন্যে চীন, রাশিয়া তার বিরুদ্ধে ভেটো দেয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে। যখন তারা এই অত্যাচার আর মেনে নিতে পারবে না। যখন তারা আর দেখতে চাবে না সন্তানের সামনে মায়ের ধর্ষণ, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ, বাবার সামনে মেয়ের নগ্ন শরীর। যখন তারা প্রতিবাদস্বরূপ দু-একটা বোম ফোটাবে আর তখনই বিশ্ব মুরুব্বি, বুদ্ধিজীবী, রেসিস্ট, রেপিস্ট সম্প্রদায় এদের উগ্র সন্ত্রাসী বলবে পাশাপাশি মুসলমান ট্যাগ দিবে। কিন্তু এরা তো এখন ও সন্ত্রাসী নয়। সন্ত্রাসী হলেও এদের সন্ত্রাসী বানিয়েছে তো তারাই।

আমি খুব রাফ এন্ড টাফ ডিসকাশনে ঢুকে গেলাম ভাই। হাহাহা কথার মধ্যে তোরে আপনি, তুমি সব ডেকে ফেলেছি। এই আরকি ঘটনা, কিন্তু আমিতো আর তাদের মত রাঘব বোয়ালদের কিছু করতে পারব না। আমার ওই সামর্থ্যও নাই।আমি পারব নিজ পৃথিবীর মানুষদের শাসন করতে। আমি পারব আমার আয়ত্তে লোকদের শায়েস্তা করতে। যারা আমাকে সুন্দরভাবে ফেসবুক চালাতে দেয় না। তাদের শিক্ষা দিতেই আমার এত আয়োজন।

-এতে তোর লাভ কি?

-কোন লাভ নাই। শুধু আমি বিরক্ত। আমি আমাদের এই বিরক্তি, বিভক্তি, অন্যায়, অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে চাই।অনেক কিছুই তো করলাম জীবনে। এইবার না হয় এডভেঞ্চার বেছে নিলাম।

– হুম বুঝলাম। তাহলে আমিও তোর সাথে থাকি। কি কস? আমিও তো অনেক কিছু করছি। এবার ঝাকানাকা কিছু করি।

-ভাই রে, এখানে রিস্কও আছে। আমি পাগলামি করি তাই বলে তুই করিস না। আমাকে হ্যান্ডেল করতে দে সব। তবে যাই বলি না কেন একা কিছু সম্ভব না। একজন সাথী দরকারই।

রায়হান কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল, মামা আমি তোর সাথে থাকব যাই বলছ না কেন। আমার তাহলে নতুন সাথীর নাম রায়হান। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখনো ওমরের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কি থেকে কি করা যায়।
হঠাৎ রায়হান, পাইছি মামা বলে চিৎকার দিল। আর ওমরের কানেকানে মিনিট খানেকের মত ফিসফিস করে কি যেন বলল। ওমর তার পরিকল্পনা শুনে বলল, ‘এত বুদ্ধি নিয়া ঘুমাছ ক্যামনে’! রায়হান নিজের পকেটে হাত দিয়ে ওমরের দেওয়া ৫ হাজার টাকা ফেরত দিল। বলেও দিল, এগুলা রাখ কাজে লাগাইছ। ওমর মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় ৬ টা বাজে। অনেক কথা হয়ে গেল।

ওমর রায়হানকে বলে দিল যেন সকাল সকাল এখানেই থাকে। ওমর বাসায় গিয়ে পিস্তলটা নিয়ে একটু ভাবল। যদিও আমার ইচ্ছে ছিল ফেলুদার সে ৩২ বোরের কোল্ট রিভলভারগুলোর একটা।

যাই হোক যা পেয়েছি যথেষ্ট। সকালে ওমর ঘুম থেকে উঠেই যেন হালকা হল। সারারাত এই এক মিশন নিয়েই তার স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেটে গেল। রাতেই এই মিশনের একটা নাম ও ঠিক করল।‘ মিশন : গার্বেজ ক্লিনিং’ কিছু ভেবে এই নামটাই ঠিক করল সে। যদিও নামটা একটু বড়। রায়হানেরও নামটা পছন্দ হয়ে গেল। প্ল্যান অনুযায়ী ওমর একটা বাসা ভাড়ার কথা চিন্তা করল। রায়হানের তাতে সায় নেই। তার মাথায় আরেকটা বুদ্ধির উদয় হল। ঝটপট করে সে ওমরকে উত্তরা ১৫ নং সেক্টরের কথা বলল। মরুভূমির মত ধুধু বালুময় হলেও ঢাকার মোস্ট ওয়ান শান্তিময় জায়গার একটা। এখানে সন্ধ্যায় লোক মোটামুটি কম থাকে। কিন্তু ওই মেয়েগুলা কিভাবে আসবে। এই চিন্তার থেকে ওমর বলে দিল সকাল ১০ টার কথা। ওইসময় আরো নীরব থাকে জায়গাটা। শেষপর্যন্ত দুইজনই জায়গা আর সময় নিয়ে একমত হল।

আজকের দিনের মত কথা এখানেই শেষ হল তাদের। আগামীকাল সকাল সকাল মিটিং হবে আবার। যাওয়ার সময় ওমর রায়হানকে স্মরণ করিয়ে দিল। ৩ দিন পর দেখা হল তাদের। এই কিছুদিন তারা একটু নিজস্ব কাজে ব্যস্ত ছিল।

দেখা হওয়ার সাথেই ওমর জিজ্ঞেস করল রায়হানকে।

– কিরে কিছু শুনছস?

– কোন ব্যাপারে? ওমর একটু হালকা গরম হয়ে বলল, ধূর ব্যাটা তুই দেখি কিছুই জানস না? তোর তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার! উত্তরপাড়ার হাসেম মিয়ার মাথা থ্যাতলে দিয়েছে তার ভাই নাসিম আবার সেটা মাত্র ৫০০ টাকার জন্য।

– ইন্নালিল্লাহ! উনি ভালো তো এখন?

– হ্যাঁ, ভালো। দেখছস কি জামানা এসে পড়ছে।মাত্র ৫০০ টাকার জন্য কোন মানুষ এই কাজ করতে পারে।

– আসলেইরে। মানুষের সামনে দিয়া ৫০০ টাকা লোকসান মেনে নিতে পারে না। কিন্তু পিছন দিয়ে লাখ লাখ টাকা চলে যায় তার হিসেব নেই। ওমর মাথা নেড়ে রায়হানের কথার সাথে একমত হল।

ওমরের মন-মেজাজ দুইটাই খারাপ। কাজের অগ্রগতি হচ্ছে না। কি থেকে কি করবে সে হিসেব করতে করতেই দিনগুলো উল্কার বেগে চলে যাচ্ছে। এবার সরাসরি রায়হানকে বলে দিল।

-না, এভাবে বসে না থেকে কাজে ঝাঁপ দিয়ে নামতে হবে।

– হুম সেটাই কর। রায়হান জানতে চাইল, আমি কি করব তাহলে?

– যা বলছি আমি তুই সেসব জোগাড় কর। আমি তাদের সবাইকে মোবাইল করে বলি ছোট একটা হ্যাং আউট করব। এই দিন, এই সময় তোরা চলে আসিস।

-আচ্ছা ওরা কি তোর বাসা বা তোর ব্যক্তিগত কিছু জানে? রায়হান কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল।

-না ওদের সাথে দেওয়া সব ঠিকানা ভুল। ফেসবুক আইডিও ফেক এবং মোবাইল নাম্বার কাজ শেষ হওয়ার পর ফেলে দিব।

-সাব্বাস, এই নাহলে অধিনায়ক।

ওমর একটু মুচকি হেসে রায়হানকে গোপনীয়তা নিয়ে সাবধান থাকতে বলল।
কিন্তু নিজের কাজে নিজে এখনো তৃপ্ত না ওমর। ইতিমধ্যে ওমর সবাইকে ফোন করে বলে দিল। তবে দুইটা মেয়ে আর একটা ছেলে আসবে না। একটু ঘাবড়ে গেল সে। ভয় পেল, এক অজানা ভয়। ওমর মাঝেমাঝে ভাবে তার এগুলা করা কি উচিত হচ্ছে কি না! আবার ভাবে, দেখি না একবার কি হয়। এত অগ্রসর হয়ে এখন পিছিয়ে যাওয়ার কোন মানেই হয় না।

আজ রবিবার। একটু আধটু বৃষ্টির পানিতে রাস্তায় কাদা জমে গেছে। সূর্যিমামাও তার ব্রাইটনেস একটু একটু বাড়াচ্ছে। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। সকাল ৯ টায় ওমর আর রায়হান তাদের কাঙ্খিত জায়গায় উপস্থিত। ইতিমধ্যে সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছে তারা। এই দিনের জন্যই এত প্রস্তুতি তাদের। আজ এক নতুন অধ্যায় লেখা হবে। ফেসবুকের সব বিখ্যাত ব্যক্তিরা আজ এক হবে। ওমর আর রায়হান দুজনেই খুশি। আবার তাদের চোখেমুখে ভয়ও দেখা যাচ্ছে। যেকোনো মূল্যে তারা আজ, ফেসবুক থেকে ময়লা-আবর্জনা সৃষ্টিকারী এইসব ভার্চুয়াল কিংদের শিক্ষা দিতে প্রস্তুত।রায়হান হঠাৎ বলল মামা আমাকে তবে যেকোনো একটা ছেলের কিডনি খোলার অনুমতি দিছ। পিডাই চামড়া লুজ কইরালামু হালারপুতগো। আর কিডনিগুলা নিয়া গুলিস্তান পাইকারি রেটে বিক্রি করে দিমু।

সকাল ১০ টা ৪০ মিনিটের ভিতরেই প্রায় সবাই এসে উপস্থিত হল। এক এক করে সবাই সবার সাথে পরিচয় পর্ব সেরে নিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বাহির থেকে আনা কাচ্চিবিরিয়ানির প্যাকেট সবার হাতে তুলে দিল রায়হান। সাথে ছোট একটা পেপসির বোতল। সবাই খেয়েদেয়ে ফুরফুরে মেজাজে। কেউ কেউ এদিকওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ওমর সবাইকে ডাকল,

-গাইজ, সবাই এদিকে আসবা? খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।

সবাই আসল। ওমর রায়হানকে ইশারা দিল। বড় ব্যাগ থেকে সবাইকে মাস্ক দেওয়া হল। সবাই নাক, মুখ বন্ধীকরণ এই মুখোশ পড়ে নিল। সবাই একটু আশ্চর্য হল। ওমর তাদের ভয়ভীতি দূর করে হাসিমুখে বলল, সারপ্রাইজ দিব সারপ্রাইজ!

এদিকে ওমর তাদের হাত পিছে নিয়ে বেঁধে ফেলল। কি হচ্ছে এসব! সবাই ফিসফিস করে বলতে লাগল।

একজন জিজ্ঞেস করল,

– কি করতেছস আমির ?

আমির! রায়হান একটু অবাক হল। পরে বুঝল ব্যাপারটা। মনে মনে ভাবল। তাহলে কি খেলা শুরু। ব্যাগ থেকে পিস্তলটা বের করল ওমর। সাথে চুরি আর একটা লিস্ট। এবার পড়তে শুরু করল সে।

পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে সিরিয়াল করে দাঁড়ানো সবাই। এক এক করে সে লিস্ট থেকে সবার ভার্চুয়াল পরিচয় শোনাতে শুরু করল।

১. রেডিও মুসার এডমিন রকি দুই কদম সামনে আসেন।

২.আনসেনসরড পোলাপান এর নায়ক রুমন ভাই সামনে আসেন।

৩. কস্কি বাতেন পেইজের মর্ডারেটর জাহেদ সামনে আসেন।

এমন সময় পিছনে থাকা বাকি সবাই বুঝতে পারল। কিছু একটা হতে যাচ্ছে। এইভাবে ওমর মজা নেন, ১ মিনিট দাঁড়া দুই মিনিতে আইতেছি, যাস কই, ছেলে vs মেয়ে গ্রুপ, ভুয়া নিউজ পোর্টালসহ প্রায় ৩০ টা পেইজ, গ্রুপ, পোর্টাল নিয়ন্ত্রণকারীদের সামনে আসতে বলল। সাথে ইউটিউবার তো আছেই।

এদিকে বাম দিক থেকে ৩ নাম্বার জনকে ডাকা হল। না আসায় তার পায়ের কাছে একটা গুলি করা হল। সে ইউটিউবার। প্রায় বেশিরভাগ ভালগার কন্টেন্টের ভিডিও তার চ্যানেলে পাওয়া যায়। এইরকম ইউটিউবার আরো ৩ জন আছে। সেগুলা হচ্ছে ফানি ভিডিও, আজব কাহিনী এবং Just Prank। তাদের চ্যানেলগুলির সাবস্ক্রাইবার ও কম না। একেকটাতে প্রায় ৫-৬ লাখ সাবস্ক্রাইবার। আর এসব ভিডিওর ভিউ মাঝেমাঝে মিলিয়ন পার হয়ে যায়।

এতক্ষণ পর সবাই বুঝল তাদের অন্তিমসময় খুব নিকটে। ব্যাগ থেকে তারা দুইজনই মুখোশ আর দুইটা পাগলের পোশাক পড়ে নিল। ওমর আর রায়হান এক সাইজের। বুঝা যাচ্ছে না কে কোনজন। সবার মোবাইল, হেডফোন, ল্যাপটপ, ডিএসএলআর সহ সব নিয়ে নেওয়া হল। সবাইকে চুপ থাকার জন্য আরেকটা গুলি মারা হল। পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ। রায়হান ওমরকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল,

-কিরে এইদিকে আজ পুলিশ আসবে না তো?

-আরে না। এইদিকে এখন পুলিশ কম আসে। আমি খোঁজ নিয়েই আসছি।

সিরিয়ালের পশ্চিম দিকের একজন তার পাশের জনের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টাস্বরূপ জিজ্ঞেস করল,

-আমার ডান পাশেরজন। কে ভাই আপনে? কিছু দেখতে পাচ্ছি না, তাই এরকম প্রশ্ন।

পাশের জন উত্তর দিল। ভাই, আমাকে বললেন?

– নারে ভাই, আপনেরে কমু ক্যা? কইতেছি আমার কপালরে। আমার আ*দা কপালরে। কেন আইলাম এইখানে?।

-ভাই দেখি ক্ষ্যাপা? আমি কিন্তু হ্যাকার। কথা বেশি বললে আপনার আইডি সহ সব হ্যাক করে দিমু।

-ভাই তুই তো হ্যাকার না, তুই একটা আস্ত হাহাকার। মনে মনে বলছে ‘শালা বলদ! জীবনমরণ সন্ধিক্ষণে সবাই আর সে হ্যাক করার কথা ভাবে!’ আমাদের কিডন্যাপ করছে রে ভাই।

হ্যাকার সাহেব একটু চুপসে গেলেন। বুঝে গেলেন কিবোর্ডের জোর এখানে চলবে না।

সবাই ফুসুরফাসুর করা শুরু করল। কেউ জায়গা নিয়ে। কেউ তার পাশে লোকের বগলের গন্ধ নিয়ে আবার কেউ তার ভার্চুয়াল পাওয়ার নিয়ে। কেউ ভাবছে তার বর্তমান অবস্থা নিয়ে তো কেউ ভাবছে তার গফ নিয়ে। আবার কেউ আছে কখন এই ঘটনা ব্লগ লিখবে সেটা নিয়ে।

মেয়ে দুইটাকে এক পাশে এনে চুপ থাকতে বলা হল। ১০ মিনিট পর এরা নাচবে এই শর্তে তাদের সাথে ভদ্র আচরণ করল রায়হান।

‘কাসেম টিভি’ এই পেইজ কার?’ ওমর আবার ডাকা শুরু করল।
উত্তর আসল এক চশমাপরা ছেলের মুখ থেকে। বলল, ‘আমার ভাই’।
ওর কানের নিচে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল,

‘ এই ঘটনার একটা ভিডিও ছেড়ে দে ফেসবুকে। আর লিখবি লিংকে দেখুন আন্ডারটেকার আর বিগশোর সেই বিখ্যাত রেসলিং।

-কিরে পারবি না? ওমর ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল।

আজ ফেসবুকের এই নোংরা অবস্থার পিছে এদের অবদান অর্ধেক। আমীন না লিখে যাবেন না বা শেয়ার করে আপনার ঈমানী শক্তি দেখিয়ে দিন। এইসব কাজ চশমাওয়ালা এবং তার গংরা করে। এদের ভালোমত ভয় দিলেই এই নোংরা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ওমর ছেলেটার কানের উপরে একটা কষিয়ে থাপ্পড় দিল। সঙ্গে সঙ্গেই প্যান্ট ভিজিয়ে দিল দুর্বল ঈমানের চশমাপরা ছেলেটা।

-এই ফকিরের বাচ্চা, এগুলা আর করবি বল করবি? ওমর রাগের সহিত বাম গালে আরেকটা থাপ্পড় দিল। ছেলেটার চোখ-মুখ বাঁধা তাই দেখতেও পারছে না কে তাকে এমন নিষ্ঠুরভাবে মারার সহিত ফ্রিতে গালি দিচ্ছে। রায়হান ও এসে দুচারটা দিয়ে দিল।

-ভাই ভাই ভাই আর হবে না। সব ছাইড়া দিমু। সব ডিলিট দিমু। ভাই আর মাইরেন না। আমার কানে এমনিই সমস্যা। অনেক কাকুতিমিনতির পর ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে দুই কদম সামনে আনল। এইভাবে প্রায় ১০ জন জীবন্ত ফেসবুক কিংবদন্তীকে মারা হল। কাউকে পেটে মারে তো কাউকে গালে। আবার কাউকে পিস্তলে নল দিয়ে ঠুয়ায় তো কারো হাঁটুতে লাঠি দিয়া মারে। অনেকের প্যান্ট ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রায় ২০ জনকে এইরকম মেরে মেরে সামনে আনা হল। সবার মুমূর্ষু অবস্থা। কেউ কাঁদে, কেউ রাগে ফুলে আছে আবার কেউ আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত-পা নাড়াচ্ছে আর ভাবছে, এ কেমন বন্ধুর পাল্লায় পড়লাম !

রায়হান ওইদিকে সবার কপালে গিয়ে ঠুয়াচ্ছে ইচ্ছেমত। আর বলছে লাইক,কমেন্ট, শেয়ার লাগবে কার তারা হাত তোলেন। যারা হাত তোলে। এদের লাঠি দিয়ে পিঠে, পাছায় আবার মারা হয়। এই করুণ পরিস্থিতে মেয়েগুলো ভয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে নিজেদের অসহায় বানানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রায়হান গিয়ে তাদের বলে, কিচ্ছু লাভ হবে না। এত ইনোসেন্ট আপনারা না। যতটা না অভিনয় করেন।

-নেন একটা সেল্ফি নেন। আরে নেন না, শুধু একটা। ওমর এসে যোগ দিল এবার।
-না না না। উনারা এখন লাইভে যাবে।কি বলেন আপারা?

একটা মেয়ে উত্তর দিল।
-না ভাইয়ারা, কি বলেন! এই মুহূর্তে লাইভে যাওয়া ঠিক হবে না।
-আপনাদের পেইজের নাম কি?

-আমাদের পেইজের নাম ‘ললনা’। পাশের জনকে দেখিয়ে বলল ওদের পেইজের নাম ‘ভালোবাসার উক্তি’ আর ‘কিউটের ডিব্বা’।

– ওহ আচ্ছা, এই কিউটের ডিব্বা থেকেই লাইভে যান। তো এইরকম কিউটের তো কিছু দেখি না। এই যে কিছু ছ্যাবলা মার্কা পোলাপানের কমেন্ট বা মেসেজ পান, কেমন লাগে তাদের নোংরা অনুভূতিগুলো? তাদের থেকে পাওয়া লাইক, কমেন্ট পেয়ে নিজেদের যে ফেমাস বানান। খুব ভালো লাগে এগুলা? একবারও কি মনে হয় না এইসব কাজকামের কোন মানে নেই।

জবাবে ‘কিউটের ডিব্বা’ পেইজের মেয়েটা যা বলল তা রীতিমত অবাক করার মত।

-না ভাইয়া, আমরা তো লাইভে আসি না। আমরা অন্যকোন বিদেশি পেইজ থেকে লাইভের ভিডিও ডাউনলোড করে সেগুলাই আবার লাইভে চালাই। মাঝেমাঝে আমরা আসি। আর বিদেশিগুলাতে বলে দেই, এটা আমাদের বিদেশি এডমিন।

ওমর আর রায়হান আশ্চর্য হয়ে এসব শুধু শুনেই যাচ্ছিল। ‘হরি কাকা’ পেইজ আর আনসেন্সরড তিন-চারটা গ্রুপের এডমিনদের ভালোভাবে আদরযত্ন করা হল। ‘হরি কাকা’ পেইজে সবচেয়ে বেশি অমূলক পোস্ট দেওয়া হয়।যেমন, ছাগলের ছবি আপলোড করে লিখে,

‘মেনশন ইউর ছাগলমার্কা বন্ধু’।

‘ মেনশন করুন আপনার গরুর মত দেখতে বন্ধুটাকে’। এইরকম হাজার রকমের পোস্ট দেওয়া হয়। যা দেখতে দেখতে আমার মাথার চুল পেকে গেল। মানে আর কত? সারাদিন এইরকম করতে কেমন লাগে এদের।

ওমর এবার গুলি তার মাথায় ধরে বলল,

‘এবার তোর পেইজ থেকে একটা পোস্ট দে। তোর মাথায় বন্দুক রাখা একটা সেল্ফি তুলে, লেখ যে এই অবস্থায় আপনার কোন বন্ধুকে মনে পড়বে। নিচে তোর বন্ধুর নাম ও মেনশন করে দিছ। শা*রপুতের বাচ্চা এবার তোদের মানুষ করে তবেই ছাড়ব’।

চারপাশে শুনশান নীরবতা। সবাই নিচে তাকিয়ে আছে। ইতিমধ্যে ভয়ে সবার মুখ শুকিয়ে কাঠ হওয়ার দশা। একটু পর কি হবে সবার মাথায় এখন এই দুশ্চিন্তা।

এইসব কেনো হচ্ছে এতক্ষণে সবাই বুঝে গেছেন আপনারা’। ওমর তার মিশনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সবাইকে কিছু একটা পড়ে শোনানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার আগে সবাইকে চুপ থাকার জন্য বলল। লেখাটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করল।

”প্রিয় ভাই ও বোনেরা, প্রথমেই বলে নেই আমি আমার কাজের জন্য দুঃখ প্রকাশ করব না। কারণ আপনারাই আমাকে এই কাজ করাতে বাধ্য করেছেন। আমার কোন দোষ নেই। আপনাদের ভার্চুয়াল জগৎ আমাকে এই কাজ করতে প্রলুব্ধ করেছে। আপনারা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোর রথীমহারথী। আপনাদের দেখা পাওয়া আমার ভাগ্য আর আপনাদের ভুল ধরানোর জন্য এই ঘটনার জন্ম দেওয়া আমার সৌভাগ্য আপনাদের জন্য দুর্ভাগ্য। আপনারা এই দেশের নামকরা ফেসবুকার, ইউটিবার। আপনাদের পেইজ, চ্যানেলে লাখ লাখ লাইক, সাবস্ক্রাইবার। আপনারা নিতান্ত কাশ দেওয়ার ঘটনাও ও যদি ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেখানে হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট পড়ে। ভালো না খারাপ সে বিতর্কে না গিয়ে বলব এটাও একধরনের শ্রমের ফসল। যদিও আপনারা সবাই টাকা দিয়ে বুস্ট করিয়েছেন”।

হঠাৎ একটা ছেলে সরু কন্ঠে নরম ভাষায় বলে উঠল,

‘ভাই ঠিক আছে সব মানলাম। তো এখন আমাদের কি করতে বলছেন’?

ওমর রায়হানকে আদেশ দিল ওর কপালের মাঝখান বরাবর একটা টোকা দিয়ে গুলি করতে।

ছেলেটা ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চাইল।

– কথার মাঝখানে কেউ যদি আবার ডিস্টার্ব করে তাহলে কিন্তু এবার সত্যি ফুটা করে দিব। ওমরের হুংকারে সবার দাঁড়ানোর জায়গাটাও মনে হয় নড়ছিল। সবাই নিচে তাকাল। ওমর আবার পড়তে শুরু করল।

‘ বুস্ট করেছেন সমস্যা নাই। কিন্তু এই বিরাট প্লাটফর্মকে আপনারা কি কাজে লাগাচ্ছেন। সেটা বড় কথা। আপনারা আছেন সারাদিন মজা নিয়ে, আছেন ভুয়া খবর নিয়ে, কেউ আছেন ধর্মীয় উস্কানি নিয়ে, কেউ আবার ধর্ম বিক্রি লাইক, কমেন্ট খোঁজেন। আবার অনেকেই অশ্লীলতা ছড়াচ্ছেন ইচ্ছেমত।

তাহলে আপনাদের মাঝে আর একটা অমানুষের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? মজা করেন, ফাজলামো করেন। ঠিক আছে, কিন্তু সবসময় কি এটা ভাল্লাগে? দেশে কত সমস্যা। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, এখানে-ওখানে, যেখানে-সেখানে সমস্যা সমস্যা আর সমস্যা। আপনারা সেসব নিয়ে লিখতে পারেন। সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তার মাধ্যমে সমাধানের পথ ও বের হয়ে আসতে পারে। কিন্ত সেটা তো করেন না আপনারা। এখানেও তো লেখার মধ্যে মজা নেওয়া যায়।

একজন বলে উঠল, আমরা এগুলা করলে অন্য কাজ কখন করব?

রাগকে দূরে রেখে ওমরের উত্তর,

-যে সময়টা আগে পোস্টগুলি দিতেন। সেসময় এগুলা করবেন।

এবার লেখাটার দিকে না তাকিয়ে মানুষগুলির দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করল,

‘আজকেই আপনারা সবাই ফেসবুকে গিয়ে আপনাদের পেইজ, গ্রুপ থেকে লিখবেন,

‘আগের কর্মকাণ্ডে যদি কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে আমরা দুঃখিত’ এবং আরো লিখবেন, ‘আপনাদের এলাকার চারপাশে যে যে সমস্যা আছে সেগুলা আমাদের ইনফর্ম করে জানাবেন’। যখন আপনারা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মেসেজ পাবেন, ফোন পাবেন তখন আপনারা সে সমস্যাগুলা নিয়ে লিখবেন, শেয়ার করবেন এবং ফলোওয়ারদেরও তাই করতে বলবেন।

সমস্যার সমাধান হবেই। সরকার বা সরকারের অধীনস্থ লোকজনের নজরে ব্যাপারগুলো যাবেই যাবে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হবেই হবে। ইন-শা-আল্লাহ।

যদি কেউ এর উলটো করে তাহলে আমি আছি। আমি মনিটরিং করে যাব সব। কারো মতলব যদি দেখি অন্যকিছু ‘তাহলে পরেরবার এইরকম আদেশ শোনার ও কান থাকবে না। মানুষটাকেই উধাও করে দিব। না, কোন থ্রেট না। এবার যা হবে সত্যি হবে। এখানে আমার কোন লাভ নেই। তবুও আমি কেন এতকিছু করতেছি তা আপনাদের শিক্ষিত মাথায় ঢোকা উচিত। আপনারা এই দেশের ফেসবুকের বিখ্যাত পেইজগুলা চালান। আপনারা আওয়াজ তুললে অনেক কিছুই সম্ভব।

ওমর কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর রায়হানকে বলল, এদের একজনের হাতের বাঁধন খুলে দিতে। বাঁধন খুলে দেওয়া মানুষটার প্রতি ওমরের শেষ আদেশ ছিল, ‘আমি যাওয়ার ৩০ মিনিট পর এদের সবার বাঁধন খুলে দিও’। দূরে একটা ব্যাগ দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওইখানের ব্যাগটাতে সবার সব জিনিস আছে নিয়ে নিও’।

চলে যাচ্ছে তারা। রায়হান আর ওমর দুইজনই ক্লান্ত। দুপুর দুইটা বাজে। সূর্য ঠিক মাথার উপর থেকে একটু বামে। অনেক গরমে তাদের শরীর থেকে ঘাম বেরুচ্ছে। সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। অন্যচিন্তা তাদের মাথায়। এত কষ্টে পরীক্ষার ফলাফল কি তাদের পক্ষে আসবে নাকি বিপক্ষে? রাস্তায় লোক কম। এলোমেলো ভাবে চলতেছে সে। জানেনা এই পথের শেষ কোথায়। জানেনা এই কাজের ভবিষ্যৎ কি। শুধু জানে সে যা করেছে ভুল কিছু করে নি। আত্মতৃপ্তি ঢেকুর তোলার মত কাজ করতে পেরে তারা আজ ধন্য। যে কাজের মাধ্যমে হয়তো বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই ভয়াবহ অবস্থা বদলেও যেতে পারে। আর তার বদৌলতে হয়তোবা আমাদের বাস্তবিক সমাজেও পরিবর্তন আসতে পারে।

ফলাফল যাই হোক চেষ্টা তো করেছে তারা।

Most Popular

To Top