ইতিহাস

গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম (দ্বিতীয় পর্ব)

গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম (দ্বিতীয় পর্ব)

[আগের পর্বঃ গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম (প্রথম পর্ব)]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার বাহিনীর গণহত্যায় এবং ১৯৯৪ সালে সংঘটিত রুয়ান্ডার গণহত্যায় প্রোপ্যাগান্ডার ভূমিকা কেমন ছিল, তা নিয়ে এই পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। পরিশেষে আলোচনা করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো হয়, তখন প্রচার মাধ্যমে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বয়ান কি ছিল তা উল্লেখ করা হয়েছে।

হলোকাস্ট

গণহত্যার তীব্রতা বাড়াতে এবং এতে জনগণের সম্মতি আদায়ে প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা কতটা প্রভাবশালী হতে পারে তার উজ্জ্বল (অথবা অনুজ্জ্বল) উদাহরণ হচ্ছে, জার্মানির নাৎসি আমল। লিফলেট থেকে শুরু করে সিনেমা পর্যন্ত- হেন কোন মাধ্যম নেই যা হিটলার ও তার বাহিনী ব্যবহার করেনি তাদের মতবাদ প্রচারের জন্যে। জার্মানিতে নাৎসি বাহিনী ক্ষমতা আসে ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে; এসেই হিটলারের নির্দেশে জোসেফ গোয়েবেলস নেতৃত্বে গঠন করা হয় নতুন মন্ত্রণালয়, Reich Ministry of Public Enlightenment and Propaganda’। গোয়েবেলস বুঝতে পারেন, তিনি একটা বিশাল সাম্রাজ্য পেয়ে গিয়েছেন যারা স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে ফিল্ম, রেডিও সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। তাই তিনি লিখেন, জার্মানদের জাতীয় শিক্ষা এখন আমার হাতের উপর ন্যস্ত[1]। এই মন্ত্রণালয় স্থাপন করা ছিল এক বিরাট ঘটনা, কেননা পরবর্তী সময়ে ইহুদীদের বিপক্ষে ঘৃণা ছড়ানো এবং গণহত্যায় এর ভূমিকা ছিল ব্যাপক!

তৎকালীন পৃথিবীতে প্রোপ্যাগান্ডার নেতিবাচক অর্থের কারণে গোয়েবেলস নাকি মন্ত্রণালয়ের নামের মধ্যে এই শব্দটা ব্যবহার করতে চান নি। কিন্তু, হিটলার এ শব্দের পক্ষেই ছিলেন[2]। হিটলার তাঁর Mein Kampf (১৯২৬) বইতে প্রোপ্যাগান্ডার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলেন,

‘Propaganda tries to force a doctrine on the whole people… Propaganda works on the general public from the standpoint of an idea and makes them ripe for the victory of this idea.’

অতঃপর, প্রোপ্যাগান্ডার মাধ্যমেই প্রচার করা হয় নাৎসিবাদের আদর্শ, যার মধ্যে লুকিয়ে ছিল বর্ণবাদ, ইহুদি বিদ্বেষ এবং বলশেভিক বিরোধিতা।

নাৎসিরা যে আদর্শ প্রচার করতো সেদিকেও কিঞ্চিৎ আলো ফেলা দরকার। তারা ‘race’ এর কিছু সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা একদিকে ছিল শতভাগ অবৈজ্ঞানিক এবং অন্যদিকে এটা ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ জন্ম দিচ্ছিল ক্রমাগতভাবে। ইহুদীদেরকে পশ্চিমা ও বিশ্ব সভ্যতার জন্যে অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিভিন্ন লেখা, বক্তৃতা-বিবৃতি, লিফলেট, পত্রিকা এবং ফিল্মে ইহুদীদের সম্পর্কে প্রচণ্ড নেতিবাচক ও ঘৃণ্য কথন প্রচার করা হত।
১৯৪৩ সালে নাৎসি পার্টি থেকে প্রচারিত এক পুস্তিকায় ইহুদিদেরকে পরজীবী হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়,

The Jew is the parasite of humanity. He can be a parasite for an individual person, a social parasite for whole peoples, and the world parasite of humanity. [3]

জোসেফ গোয়েবেলস ১৯৪১ সালে ‘ইহুদীরা অপরাধী’ শিরোনামে যে আর্টিকেল লিখেন সেখানে সরাসরি ইহুদিদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়,

The Jews are our destruction. They started this war and direct it. They want to destroy the German Reich and our people. This plan must be blocked. [4]

ডারউইনের ‘সার্ভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট’ থিওরি এবং ‘আর্যতত্ত্ব’ মিশিয়ে বলা হল, পৃথিবী একটা যুদ্ধক্ষেত্র এবং সেখানে জার্মানরা আর্য হওয়াতে পৃথিবীতে তারা টিকে থাকবে এবং তারাই শাসন করবে। কেননা, তারা শ্রেষ্ঠ। সাথে যুক্ত হল ‘রক্ত ও মাটি’ তত্ত্ব; বলা হল জার্মান মাটির সাথে ‘খাঁটি’ জার্মানদের সম্পর্ক রয়েছে, যা কিনা পৃথিবীকে ‘ঊর্ধ্বতন’ ও ‘অধস্তন’ দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য করে[5]। জাতিতত্ত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বারেবারে মার্ক্সকে আক্রমণ করা হচ্ছিল, সেই সাথে কমিউনিস্টদেরকেও। বলা হল, মানুষ উচ্চতর কিংবা নিম্নতর হয়ে জন্মায় এবং এটা কখনো পরিবর্তন করা যাবে না। তাদের একজন তাত্ত্বিক বলেন,

Racial science teaches us that all the essential differences between peoples and races in this world are inherited. They cannot be changed by educational or training systems. Humanity cannot change them. [6]

গোয়েবেলসের মন্ত্রণালয় রেডিও, নাটক, ফিল্ম, পত্রিকা সবকিছুকে ব্যবহার করে তাদের উপরোক্ত মতাদর্শের প্রচারে। সেই সাথে প্রণীত হয় কুখ্যাত Nuremberg Race Laws যা ইহুদি নিধনের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়। ১৯৪০ সালে The Eternal Jew নামে ইহুদি বিদ্বেষী একটা ফিল্ম তৈরি করা হয় যেখানে ইহুদিদেরকে দেখানো হয় ভ্রান্ত সাংস্কৃতিক পরজীবী এবং যৌন ও অর্থের দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত গোষ্ঠী হিসেবে। জার্মানিতে তখন এমন অনেক ফিল্মই নির্মিত হতে থাকে । সোভিয়েত আক্রমণের প্রাক্কালে নাৎসি প্রোপ্যাগান্ডাতে ইহুদিদের পাশাপাশি কমিউনিস্টদেরকেও পশ্চিমা সংস্কৃতির জন্যে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

Get the Jewish-Bolshevist warmongers out of Europe!

Get the Jewish-Bolshevist warmongers out of Europe!
প্রোপ্যাগান্ডার অংশ হিসেবে ১৯৩৩ সালের দিকে জার্মানির বাজারে নতুন ধরণের রেডিও চালু করা হয় যার কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিল; যেমন, এটাতে শুধুমাত্র লংওয়েব ধরার নব ছিল এবং ডায়ালে জার্মান স্টেশনগুলো মার্ক করা ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল জার্মানরা যেন আর কোন ধরণের খবর জানতে না পারে, এবং শুধু তাই জানবে যা তাদের সরকার জানাতে চাইবে। আর, কেউ যদি আগ্রহী হয়ে বিদেশী সংবাদমাধ্যম শুনতে চায় তবে সে ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া ছিল ডায়াল ট্যাগে,

“Think about this: listening to a foreign broadcasts is a crime against the national security of our people. It is a Fuehrer order punishable by prison and hard labor.”[7]

উল্লেখ্য, জার্মানির সেই ‘বিশেষ’ রেডিওর মডেল নাম্বার ছিল ৩০১; কারণ, ৩০ শে জানুয়ারি নাৎসি বাহিনী ক্ষমতায় আসে। বলার অপেক্ষা রাখে না এই আইডিয়ার জন্ম জোসেফ গোয়েবলসের মস্তিষ্কেই।

জার্মানির আরেকটি কুখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা, Der Sturmer, নিরলস ভাবে সে সময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়েছিল। তাদের শ্লোগানই ছিল ‘ইহুদিরা আমাদের দুর্ভাগ্য’ (Die Juden sind under Ungluck!)। তাদের প্রচারিত সংবাদের বিষয়বস্তু ছিল ইহুদিদের ‘অপরাধসমূহ’; যেমন, ইহুদিরা যিশুকে হত্যা করেছে, জার্মান নারীদের ধর্ষণ করেছে, অর্থনৈতিক জোচ্চুরি করেছে ইত্যাদি। পত্রিকায় প্রকাশিত কার্টুনে ইহুদী পুরুষদের বিকৃত চেহারা তুলে ধরা হত। পরবর্তীতে এই পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, ছবি নুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন Julius Streicher; গণহত্যায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগে নুরেমবার্গ ট্রায়াল তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় এবং ১৯৪৫ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় এই পত্রিকা[8]।

“When the vermin are dead, the German oak will flourish.”

“When the vermin are dead, the German oak will flourish.”

নাৎসি শাসনামলে নিয়ন্ত্রিত, আমলাতান্ত্রিক এবং রাষ্ট্রীয়- পৃষ্ঠপোষকতায় যে গণহত্যা চালানো হয় সেখানে ছয় মিলিয়ন ইহুদি মারা যান। নাৎসি গণহত্যার ভয়াবহতা ও নির্মমতা কেমন ছিল তা আমাদের সকলেরই জানা। নমুনাস্বরূপ মাত্র একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কথা বললেই নির্মমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। Auschwitz সম্পর্কে ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা যে তথ্য প্রদান করে তা নিম্নরূপ,

‘…the German SS systematically killed at least 960,000 of the 1.1-1.3 million Jews deported to the camp. Other victims included approximately 74,000 Poles, 21,000 Roma, 15,000 Soviet prisoners of war and at least 10,000 from other nationalities. More people died at Auschwitz than at any other Nazi concentration camp and probably than at any death camp in history. The Soviet troops found grisly evidence of the horror. About 7,000 starving prisoners were found alive in the camp. Millions of items of clothing that once belonged to men, women and children were discovered along with 6,350kg of human hair. The Auschwitz museum holds more than 100,000 pairs of shoes, 12,000 kitchen utensils, 3,800 suitcases and 350 striped camp garments.’ [9]

রুয়ান্ডা

আফ্রিকার পূর্ব-মধ্যাংশের রাষ্ট্র রুয়ান্ডাতে গণহত্যা সঙ্ঘটিত হয় ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে। যদিও এই গণহত্যা চলে প্রায় ১০০ দিন, কিন্তু এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল অন্যান্য স্থানের মতো উপনিবেশ আমলেই। তৎকালীন সময়ে রুয়ান্ডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উল্লেখজনক ভাবে বেড়ে গেলেও বিভিন্ন কারণেই এর আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিম্নমুখী হতে থাকে। তাছাড়া, উপনিবেশ আমলে তৈরি হওয়া বিভক্তি সাধারণ জনগণকে এমন এক জটিল অবস্থায় ফেলে দেয়, যা আসলে গণহত্যার পাটাতন তৈরি করতে সাহায্য করে। প্রকৃতিগত দিক থেকে একাত্তর সালে বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যার সাথে রুয়ান্ডার গণহত্যার প্রচুর মিল রয়েছে। তাই, রুয়ান্ডা সম্পর্কে একটু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন।
Twa, Hutu এবং Tutsi – এই তিন জনগোষ্ঠী দ্বারা রুয়ান্ডা গঠিত। কিন্তু, সংখ্যাগত দিক থেকে প্রথম দলটি খুবই ছোট হওয়াতে রাজনীতিতে কার্যত তাদের কোন ভূমিকা ছিলনা। আবার, শেষোক্ত দুই গোষ্ঠী – হুতু ও টুটসিদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে প্রচণ্ড মিল ছিল। তুলনামূলক ভাবে সংখ্যায় অল্প হলেও টুটসিরা ছিল এলিট শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, অন্যদিকে জনগণের বেশীরভাগই ছিল হুতু গোষ্ঠীর সদস্য। বেলজিয়ান উপনিবেশকালে বেলজিয়ানরা টুটসি এলিটদেরকেই ক্ষমতার চক্রে রাখে এবং প্রতিটা আলাদা আলাদা গোষ্ঠীর জন্যে পরিচয় পত্রের প্রচলনও শুরু করে। অনেকেই বলতেন যে টুটসিদের আদি নিবাস নাকি ইথিওপিয়াতে ছিল; তাই গণহত্যাকালীন সময়ে লাশগুলোকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে বলা হত, এদেরকে ইথিওপিয়ায় আবারো ফিরিয়ে দেয়া হল[10]। বেলজিয়ানদের আর্শিবাদ পুষ্ট দল হিসেবে এলিট টুটসিরা নিজেদেরকে ‘উচ্চতর’ হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে এবং এর বিপরীতে হুতুরা নিজেদেরকে ‘নির্যাতিত’ হিসেবে চিহ্নিত করে[11]।

ক্রমাগত অসন্তোষের ফলে হুতুদের অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৫৯ সালে; উত্থান কালে হুতুদের হাতে বিভিন্ন দাঙ্গাতে প্রায় ২০,০০০ এর বেশী টুটসি নিহত হন এবং বিরাট একটা অংশ দেশ ছেড়ে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়[12]। ১৯৫৯ সালর এই ঘটনা হুতু এবং টুটসিদের মনে দুই ধরণের প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়; টুটসিদের কাছে এটা ছিল “Tragic and Criminal Event” এবং হুতুরা এটাকে ‘Heroic Battle of liberation’ হিসেবেই ধরে নেয়[13]।

১৯৫৯ সালে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া টুটসিদের বংশধরেরাই একসময় Rwandan Patriotic Front (RPF) গেরিলা সংগঠন গড়ে তুলে এবং ১৯৯০ সালে তারা রুয়ান্ডাতে আক্রমণ করে। একাধিক চাপের কারণেই তখন ১৯৯৩ সালের আগস্টে RPF এবং রুয়ান্ডার সরকারের মধ্যে ‘Arusha Accords’ নামে এক শান্তি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এটা মনে রাখা প্রয়োজন RPF টুটসি-প্রাধান্য দল হওয়া সত্ত্বেও সেখানে হুতুরাও ছিল এবং সাধারণ টুটসিদের অধিকাংশেরই এই গেরিলা দলের সাথে কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং তার সমর্থকেরা সে ঘটনাকে টুটসিদের আক্রমণ হিসেবেই চিহ্নিত করেন। এটাকে জাতিগত দাঙ্গাতে পরিণত করার মূল কারণ ছিল বিভিন্ন কারণে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলা প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার এবং তার বিপক্ষে থাকা হুতুদেরও সমর্থন আদায় করা। তাই সাধারণ টুটসিদের এই গেরিলা দলের সাথে কোন সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও তখন প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সকল টুটসিদের। ‘প্রধান শত্রু’র সংজ্ঞায় বলা হয়,

“The Tutsi inside or outside the country, extremist and nostalgic for power, who have NEVER recognized and will NEVER recognize the realities of the 1959 social revolution and who wish to reconquer power by all means necessary, including arms.”[14]

Rows of human skulls and bones form a memorial to those who died in the redbrick church in the village of Nyarubuye, during the 1994 Rwandan genocide.

১৯৯০ সালে RPF এর আক্রমণের পর থেকে Kangura নামক পত্রিকা শুরু করে টুটসিদের বিপক্ষে জঘন্যতম প্রচারণা। কিন্তু জনগণের মধ্যে শিক্ষার হার অল্প এবং দারিদ্র্য পীড়িত রুয়ান্ডাতে পত্রিকার দাম তুলনামূলক বেশী হওয়াতে পত্রিকার চেয়ে সেখানে রেডিওর শ্রোতাই বেশী ছিল। শহরের প্রায় ৫৮.৭% মানুষের বাড়িতেই রেডিও ছিল এবং গ্রামে সে সংখ্যা ছিল ২৭.৩%। গণহত্যার সময়ে সে সংখ্যাও বেড়ে গিয়েছিল। এমনকি গণহত্যার প্রারম্ভে সরকারের পক্ষ থেকেও রেডিও বিতরণ করা হয় কর্তৃপক্ষের কাছে। এই তথ্যই বলে দেয় যে, রেডিওই ছিল রুয়ান্ডা সরকারের প্রধান প্রচারযন্ত্র[15]।

শুধুমাত্র টুটসিদের বিপক্ষে প্রচারণার লক্ষ্যেই ১৯৯৩ সালে কুখ্যাত Radio Television Libre des Mille Collines (RTLM) যাত্রা শুরু হয়। পূর্বে Kangura পত্রিকা যা প্রকাশ করত, তারই প্রতিধ্বনি উচ্চারণ করে RTLM। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক প্রোপ্যাগান্ডিস্টরা মূলত তখন টুটসিদের বিরুদ্ধে কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগ তুলত। যেমন, টুটসিরা বিদেশি, তাই এখানে বসবাস করার কোন অধিকার নেই। টুটসিরা এখনো উচ্চ মর্যাদা ও অধিক সম্পদ ভোগ করছে এবং কোন না কোনভাবে হুতুদের দারিদ্র্যতার জন্যে তারাই দায়ী। এছাড়াও, মিডিয়াতে টুটসিদেরকে হুতুদের জন্যে হুমকিস্বরূপ হিসেবেই তুলে ধরা হতো, যেমন, টুটসিরা টাকা দিয়ে হুতুদের কিনে নিতে পারে কিংবা, হুতু নারীদেরকে প্রলুব্ধ করতে পারে। এবং এজন্যেই হুতুদের দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের আত্মরক্ষা করা[16]।

গণহত্যার জন্যে আদর্শিক পটভূমি তৈরির জন্যে হুতুরা প্রচারণায় Appeal to fear পদ্ধতি কাজে লাগায়। গবেষকরা RTLM’র তাদের প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডকে দুইভাবে বিভক্ত করেছেন – গণহত্যার পূর্ববর্তী সময়ে এবং পরবর্তী সময়ে। পূর্ববর্তী সময়ে তারা মূলত হুতু এবং টুটসিদের জাতিগত ভিন্নতা তুলে ধরত এবং হুতুদের মনে টুটসি সম্পর্কে ভয় সংক্রমণ করত। ভয় উৎপাদনের সাথে সাথে জানিয়ে দেয়া হত আত্মরক্ষার উপায় যেন, আক্রমণ তারাই শুরু করে দিতে পারে। মনুষ্যত্বচ্যুতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে টুটসিদেরকে তখন Cockroach, wicked, sorcerers নামে সম্বোধন করা হতো। তৎকালীন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে টুটসিদেরকে বিভিন্ন প্রাণীর নামে লেভেল করা কতটা বিপদজনক ছিল তা একজন গবেষকের নিম্নের কথায় ফুটে উঠে[17],

“Given the volatile political climate of the time, labelling a group of people cockroaches was similar to sentencing them to death”।

দুই গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে হুতুদের প্রচারণা মাধ্যমগুলো যে উগ্রতার পরিচয় দেয় তার একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৯৪ সালের মার্চে রেডিও থেকে বলা হয়[18]–

“The thirst for power and blood for which the Tutsis of Burundi are known has just resurfaced… Soldiers invaded Kamenge (neighbourhood) and killed over 200 people… Most of the victims were intellectuals or eminent Hutus…The Tutsis are still blood thirsty. In fact, they are used to shedding blood and they continue to do so. Today, as they are still planning a coup, it means they still want to shed blood, this time around, on a large scale. …
What lesson can be drawn from what is happening in Burundi? Whatever the case may be, we must draw a lesson from the events of Burundi. Tutsi grandchildren who fled Rwanda gave themselves the name Inkotanyi and attacked Rwanda in 1990. They claimed they wanted to install democracy, but to date, it is obvious they want to take back power seized from them by the Hutus in 1959.”

এরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতি ১৯৯৪ সালের ৬ এপ্রিল রাতে হুতু প্রেসিডেন্ট Habyarimana নিহত হন। এই ঘটনার কিছুক্ষণ পর শুরু হয়ে যায় হত্যাযজ্ঞ। রুয়ান্ডা সৈনিক এবং আন-অফিসিয়াল মিলিশিয়া (Interahamwe) এর পাশাপাশি সাধারণ হুতুদের একাংশও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এই গণহত্যায়। নারী-পুরুষ নির্বিচারে টুটসিদের হত্যা করা হয়। প্রতিবেশীকে হত্যা করা হয়, এমনকি কখনো কখনো হুতু স্বামী তার টুটসি স্ত্রীকে হত্যা করে। সে সাথে মডারেট হুতু – যারা হত্যাযজ্ঞে অংশ নিতে অপারগ ছিলেন তাদেরকও হত্যা করা হয়। টুটসি নারীদেরকে ধর্ষণ করা হয় নির্বিচারে এবং যৌন দাসী হিসেবে বন্দী করে রাখা হয়। মাত্র ১০০ দিনে প্রায় ৮- ১০ লক্ষ টুটসি নিহত হন সেই গণহত্যায়।

গণহত্যা চলাকালীন সময়ে RTLM সরাসরি টুটসি নিধনের পরিকল্পনা তৈরিতে অংশ নিয়েছে; শ্রোতাদেরকে কখন কিভাবে কোথায় হত্যা করতে হবে সেটাও বলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সে সময়ের মে মাসে এক বার্তায় বলা হয়[19] –

“And you people who live down there near Rugunga, even though it is raining, go out. You will see Inkotanyi’s straw-huts in the marsh where horses are kept. It is clear then that this place shelters Inkotanyi [RPF soldiers]. I think that those who have guns should immediately go to these Inkotanyi before they listen to Radio RTLM and flee. Stand near this place and encircle them and kill them because they are there”

জুলাই মাসে RPF এর রাজধানী কিগালি দখল করার মাধ্যমে শেষ হয় এই গণহত্যা। কিন্তু এই ১০০ দিনেই পৃথিবী দেখে ফেলে নৃশংসতম কয়েকটি গণহত্যার একটি। এই গণহত্যার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল আক্রমণের ধরণে। প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিভিন্ন ধরণের কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার প্রমাণ করে গণহত্যায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল; তাই দেখা যায়, প্রতিবেশীর হাতে মারা যাচ্ছেন আরেক প্রতিবেশী, ঘনিষ্ঠ মানুষগুলোই একে অপরকে হত্যা করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই পুরো বিষয়, মানে সাধারণ জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ সম্ভব হয়েছিল প্রোপ্যাগান্ডার কারণেই।

বাংলাদেশ

এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। ৪৭-এ দেশভাগের মাধ্যমে ভারত – পাকিস্তান গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে তৈরি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তখন ভীষণ অদ্ভুত ধরনের এক রাষ্ট্র; একই দেশের দুই অংশের মধ্যে ভৌগলিক ব্যবধান যেমন বিদ্যমান ছিল, তেমনি দুই অংশের মানুষের মধ্যে শুধুমাত্র ধর্ম ছাড়া সংস্কৃতির আর কোন বিষয়ই মিল ছিল না। ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিমেই। শুরুতেই আঘাত আসে ভাষার উপর। উর্দু ছিল গুটিকয়েক পাকিস্তানীর মাতৃভাষা, অন্যদিকে অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষাই ছিল বাংলা, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান (পরবর্তীতে বাংলাদেশ) এর সকলের মুখের ভাষাই ছিল বাংলা, অথচ ঘোষণা করা হল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এক রক্তাক্ত আন্দোলনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সফল প্রতিবাদের পর থেকেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটতে থাকে।

সামরিক শাসনের প্রবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য চলে যায় পশ্চিমাদের গুটিককয়েক এলিটশ্রেণির হাতে। সেই সাথে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য চলতে থাকে এবং তা বৃদ্ধি পেতে থাকে ধীরে ধীরে। ১৯৫৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানিদের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি ছিল। দশ বছর পরে, ১৯৬০-৭০ সালের দিকে দেখা যায়, এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানিদের চেয়ে ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে।[20] পাশাপাশি চলতে থাকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিভিন্ন আগ্রাসন, যার ফলশ্রুতিতে বাংলার প্রতিটা শ্রেণি ফুঁসে উঠছিল শাসকদের বিরুদ্ধে। তাই শেখ মুজিব যখন ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন, তখন তা বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৬৯ সালে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের মিলিত প্রয়াসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব পদত্যাগ করলে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। কিন্তু সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের দল আওয়ামীলীগ বিশাল ব্যবধানে নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে পশ্চিমা শাসকদের কপালে আবারো চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। ক্ষমতা নিয়ে টালবাহানা করতে থাকে শাসক গোষ্ঠী। বাঙ্গালীদের এই উত্থান দমন করতেই ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে রাতের আঁধারে সাধারণ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। দেশীয় দালালদের সহায়তায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দীর্ঘ নয়মাসে ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যা ও চার লক্ষ নারীকে ধর্ষণের মাধ্যমে রচনা করে বিংশ শতাব্দীর আরেক নৃশংসতম গণহত্যার আখ্যান।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রোপ্যাগান্ডা আসলে শুরু হয়েছিল একাত্তরেরও বহু আগে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ আর সিদ্দিকী “The military in Pakistan: Image and reality” বইতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইমেজ গড়ে উঠার কাহিনী বিশদভাবে আলোচনা করেছেন; তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে প্রোপ্যাগান্ডার মাধ্যমে আইয়ুব খানকে জাতীয় ‘বীর’ এ পরিণত করা হয়। পাক ভারত যুদ্ধের পর সেনাবাহিনীর শৌর্য বীর্যের এই প্রচারণা এতই বেশি চলতে থাকে যে, সে সময় কিছু গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, যেমন: ‘মেরা মাহি চাইলে চাবে লি/ কানাইলি জার্নাইল নি’ বা ‘ মেরি চান মাহি কাপ্তান’[21]। ঠিক সে সময় তাদের প্রচারণার সাথে যুক্ত হয় নতুন উপাদান, ‘ধর্ম’। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এত বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেছিল কেন? কারণ সে মুসলমান। সে ইসলামের জন্যে যুদ্ধ করেছে। প্রচারণার এই ইসলামীকরণ একাত্তরে গণহত্যা চালানোর সময় ব্যাপক সাহায্য করেছিল পাকিস্তানি ও তার দালালদের। এরপর থেকে যখনই কেউ পাকিস্তানি সেনা ও শাসকদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়েছে তাকে ‘ইসলামের দুশমন’, ‘ভারতের (হিন্দুদের) দালাল’ আখ্যা দিয়ে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রচারণার এমন কৌশলের কারণেই ধীরে ধীরে ‘পাকিস্তান’, ‘সেনাবাহিনী’ এবং ‘ইসলাম’ হয়ে উঠে একে অপরের সম্পূরক শব্দ।

যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আরও তীব্র ভাবে প্রোপ্যাগান্ডা চালাতে থাকে, যত ধরণের মাধ্যম আছে সবগুলোকে ব্যবহার করা হয়। পূর্বের তুলনায় এই সময়কার প্রচারণার ধরণ পুরো ভিন্ন; পূর্বে যেখানে প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীকে মহান করে তোলা হত, যুদ্ধের সময় সেখানে মূলত গণহত্যাকে অস্বীকার ও জাস্টিফাই করার কাজে প্রচারমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হানের এক বক্তব্যে পাওয়া যায় পাকিস্তানিদের প্রোপ্যাগান্ডার নমুনা। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“I am Jahir Raihan. I don’t belong to any political party. I am a writer and a film maker. But I saw, in Bangladesh, the most surprising aspect of that war; when a military unit was moving for an operation after destroying and killing people, they were taking shots by a movie camera […] After compelling the […] to loot a shop they were taking shots of those looters through a movie camera. And later on when I heard and when I saw that, they edited those portions and release it…. And telling and showing that, Bengalis are killing non – Bengalis and because of that chaos and confusion, they had to intervene. It was an utter lie.”[22]

পাকিস্তানি শাসকদের প্রোপ্যাগান্ডার অংশ হিসেবে বিখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকারেনহাস এসেছিলেন ঢাকাতে; আসার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত গণহত্যাকে অস্বীকার করে বিশ্বকে জানানো যে সবকিছু স্বাভাবিকই আছে। তাঁর ভাষায়, “পাকিস্তান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে পাকিস্তানী ক’জন সাংবাদিক ও আলোক চিত্রশিল্পী সহ আমিও ঢাকায় গিয়েছিলাম। পূর্ববাংলা ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে’ এ বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করা ছিল আমাদের কাজ বা  এ্যাসাইনমেন্ট”[23]। নিজের পেশাগত ও মানবিক দায়বদ্ধতার কারণেই অতঃপর অনেকটা পালিয়ে গিয়ে লন্ডনে ‘সানডে টাইমস’ এর মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন আসলে কি হচ্ছিল এই বাংলায়। এই রিপোর্টকে নিয়ে পরে ‘পাকিস্তান অবজারভার’ প্রতিবেদন ছাপায় “Mascarenhas report in Sunday Times malicious” শিরোনামে।

মে মাসের পাঁচ তারিখে পাকিস্তান সরকার যে প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করে সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের সংকট নিয়ে সরকারী বক্তব্য হাজির করে। শুরুতেই, বিস্তর বিবরণ দেয়া হয় কিভাবে ‘হিন্দু’ ভারত ‘মুসলমান’ পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দিতে যাচ্ছে এবং ব্রিটিশ আমলে কিভাবে হিন্দু শিল্পপতিরা এই এলাকাকে পশ্চাৎপদ করে রেখেছিল। বলা হয়, ‘হিন্দু মাতৃভূমি’ তৈরি করার জন্যে ভারত পাকিস্তানের জনগণের আনুগত্য ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সে সময়ের বাঙ্গালি নেতাদের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়, ‘ইন্ডিয়া তার সাথে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু প্রতারক এবং সহযোগী পেয়েছে।’ পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ হিসেবে অত্যধিক জনসংখ্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যাকে দোষী করা হয়। মার্চে যে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, সে সম্পর্কে প্রচারপত্রে বলা হয়, ‘১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ বেসামরিক প্রশাসন পুরো পঙ্গু হয়ে পড়ে। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের খবরের প্রতিবেদন আসতে থাকে প্রদেশ জুড়ে -ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট সহ অন্যান্য শহরে ফ্যাসিস্ট হিস্টিরিয়ার ঢেউ উঠে।’ এমতাবস্থায় দেশকে বাঁচানোর জন্যেই সেনাবাহিনী ‘পালটা আঘাতের একটি সিরিজের উদ্যোগ নেয়’। ‘সুচিন্তিত এবং সুগঠিত’ আক্রমণের মাধ্যমে ‘পুরো শহরের চেহারা পালটে দেয় পশ্চিম পাকিস্তানিরা’। [24] প্রচারপত্রে বিভিন্ন কু-যুক্তি প্রদর্শন করলেও লুকানো সম্ভব হয়নি অপারেশন সার্চলাইটের তাণ্ডবের কথা। সংবাদপত্রের ওপর বিভিন্ন প্রকারের নিষেধাজ্ঞা জারির পরও যেহেতু আক্রমণের কথা লুকাতে পারছিল না কোনভাবেই, তাই প্রয়োজন পড়ে এর বৈধতা প্রদানের। এছাড়া ডিসেম্বর মাসে ওয়াশিংটনের পাকিস্তান দূতাবাস থেকে আরেকটি প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে মার্চ মাসের প্রতিদিনকার সরকারী বয়ান হাজির করে দেখানো হয়, পয়লা মার্চ হতে ‘ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা লুটপাট এবং চরমপন্থি গ্রুপের অগ্নিসংযোগ এবং হত্যার’ কারণেই পঁচিশে মার্চ রাতে সেনাবাহিনী এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়। [25]

তখন জুন মাস, ভারতে আশ্রয় নেয় শরণার্থীদের সংখ্যা তখন ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও আসতে শুরু করে। এমতাবস্থায়, ওয়াশিংটনের পাকিস্তানি দূতাবাস তাদের প্রচার পুস্তিকায় শরণার্থী সমস্যার পাকিস্তানী ব্যাখ্যা হাজির করে। কেন এত মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, এর কোন জবাব দেয়ার চেষ্টা না করেই বলা হয়, ‘ভারত সমস্যাকে কাজে লাগাচ্ছে।’ কিন্তু কেন এই সমস্যার উদ্ভব হল সে প্রসঙ্গে কোন কথা না বলে দাবি করা হয় শরণার্থীদের সংখ্যা অতিরঞ্জিত। বলা হয় যে, ‘ভারত চাইছে তার পছন্দ মতো শরণার্থী সমস্যার একটা রাজনৈতিক সমাধান পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে, যা আসলে বিদ্রুপকারী শোষণের নামান্তর’। [26]

জুন মাসে পাকিস্তান সরকার আরেকটা প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করে যেখানে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান সংকট’ বিষয়ে আলোচনা করা হয়। পুরো পরিস্থিতির দায়ভার চাপিয়ে দেয়া হয় শেখ মুজিব ও আওয়ামীলীগের ওপর। সেখানে বলা হয় যে আর্মি জনগণের ওপর আক্রমণ করে নাই, করেছে শত্রুর উপর। এবং শত্রু হচ্ছে তারাই যারা ‘ভিতর এবং বাইরের বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’। মার্চ মাসে আন্দোলনকারী জনতার ওপর যে গুলি চালানো হয়েছে এ বিষয়ে পাকিস্তানি সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, সৈন্যরা ‘ডাকাত শ্রেণির লোককেই গুলি করেছে।’[27]

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এক বাঙ্গালী অধ্যাপকের সাহায্যে তখন তৈরি করে ডকুমেন্টারি, “The Great Betrayal” – যা দেখার পর ইয়াহিয়া প্রশ্ন করেছিলেন, “I hope all the devastation shown in the film is not result of army action”। অবশ্য পরে আর রিলিজ দেয়া হয় নি এটা।

পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির হাতিয়ার হিসেবে পাকিস্তানি পত্রিকাগুলোও নিরলস ভাবে কাজ করতে থাকে। উপরে উল্লেখিত পাকিস্তানি প্রচারপত্রের ভাষ্যই ঘুরেফিরে তারা প্রচার করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কিংবা রাজাকারদের কোন সম্মুখযুদ্ধকে তারা ভারতীয় দালালদের সাথে যুদ্ধ বলে উল্লেখ করতো। যদিও ভারতের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ডিসেম্বর মাসের শুরুতে, কিন্তু এপ্রিল থেকেই পাকিস্তানি পত্রিকাগুলো ভারতের সাথে যুদ্ধ বলে রিপোর্ট প্রকাশ করতো। মুক্তিবাহিনী’র কথা কখনো উচ্চারণ করে নি, তাদেরকে সম্বোধন করার জন্যে কিছু প্রত্যয় নিয়মিত ব্যবহার করা হতো, যেমন, ‘দুষ্কৃতিকারী’, ‘ভারতের দালাল’, ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’, ‘অ্যন্টি-স্টেট এলিমেন্ট’, ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’। এই ‘দুষ্কৃতিকারী’ কারা, তাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। পাকিস্তানি সরকারের তরফ হতে দুষ্কৃতিকারী ধরিয়ে দেয়ার জন্যে পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। সে ঘোষণাপত্রে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার পুরষ্কারের কথা উল্লেখ করা হয়; যেমন, দুষ্কৃতিকারী যদি ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত হয় তাহলে তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ৭৫০.০০ টাকা। আবার, দুষ্কৃতিকারী যদি দলের নেতা হয় তাহলে তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ২০০০.০০ টাকা। কারা তাহলে এই দুষ্কৃতিকারী? তারও সংজ্ঞা দেয়া ছিল ঘোষণাপত্রে। মোট যে পাঁচটা শ্রেণিতে ভাগ করা হয় দুষ্কৃতিকারীদের, তা নিম্নরূপ,

• তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর নিয়মিত সদস্য, তথাকথিত মুক্তিবাহিনী ভর্তিতে সাহায্যকারীরা।
• স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের খাদ্য, যানবাহন ও অন্যান্য দ্রব্য সরবরাহকারী।
• স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের আশ্রয় দানকারী।
• বিদ্রোহীদের ‘ইনফর্মার’ বা বার্তাবাহকরুপে যারা কাজ করে এবং
• তথাকথিত মুক্তিবাহিনী সম্পর্কিত নাশকতামূলক লিফলেট, প্যাম্পলেট, প্রভৃতির লেখক বা প্রকাশক।[28]

মোদ্দা কথা, যারাই মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে ছিলেন তারা সবাই ‘দুষ্কৃতিকারী’র অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যভাবে বললে, হাতে গোনা কিছু দালাল ব্যতীত বাংলার সকল মানুষই ছিল শাসকগোষ্ঠীর চোখে দুষ্কৃতিকারী। এই প্রচারণার দরকার ছিল গণহত্যাকে জাস্টিফাই করতে, কেননা, যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ কিংবা অপরাধী বানিয়ে ফেলা যায় তাহলে তাদের উপর আক্রমণটাও বৈধতা পেয়ে যায়। রাজাকারদের সমাবেশ অথবা মিছিলের খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হতো; পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে এবং বিচ্ছিন্নবাদীকে প্রত্যাখ্যান করেছে এটা প্রমাণ করাই ছিল ওই খবরগুলোর উদ্দেশ্য। পত্রিকাগুলো তখন জোর দিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা স্বাভাবিক’ এ সংক্রান্ত খবরের দিকে।

পাকিস্তান অবজারভার নভেম্বরের দিকে রাজাকারদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের নিহত হওয়ার ঘটনা প্রকাশ করে ‘Razakars killed 19 Indian Agent’ শিরোনামে। আগস্ট মাসের আরেকটা রিপোর্ট ছিল ‘70 anti-state elements killed in Mymensingh’ শিরোনামে। খবরে বলা হয়, The razkars in Mymensing district killed 70 anti-state elements and injured many besides capturing a huge quantity of arms and ammunition during last month’. লক্ষ করার মতো বিষয় হচ্ছে, প্রতিটা খবরের উপস্থাপনা এমনভাবে ছিল যে, মুক্তিযোদ্ধারা (তাদের ভাষায় দুষ্কৃতিকারী) যেন যুদ্ধ করতে না গিয়ে জনসাধারণের উপর হামলা করতে গিয়েছিল, কিংবা সন্ত্রাসী (চুরি কিংবা ডাকাতি) কার্যকলাপে গিয়েছিল এবং সেখানে গিয়ে ধরা পড়েছে। অর্থাৎ, ‘যুদ্ধ’ কথাটা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করা হতো, কেননা যুদ্ধের কথা বললে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’র খবর ভিত্তিহীন হয়ে যায়।

পাকিস্তান অবজারভার ৩০ এপ্রিল Life returing to normal in Sylhet শিরোনামে সিলেট শহর নিয়ে যে খবর প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, ‘সেনাবাহিনী দুষ্কৃতিকারী ও ভারতীয় দালালদের হাত থেকে মুক্ত করার পর সিলেট শহর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা সমূহের জীবন দ্রুতই স্বাভাবিক হচ্ছে। দিনের বেলায় শহর জীবনভারে জীবন্ত হয়ে উঠছে। দোকান পাট ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে এবং সাধারণ মানুষ তার প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার মানুষের ভিড় এতটাই হচ্ছে যে, কাঁধের সাথে কাঁধ না মিলিয়ে হাটা দুরূহ হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আছে। আর্মি বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছে বাকী দুষ্কৃতিকারী ও ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের নির্মূল করতে। দুষ্কৃতিকারীরা এলাকার জঙ্গল ও বনাবৃত পাহাড় গুলোর সুবিধা কাজে লাগিয়ে জনগণকে হয়রানি করছে।’

জুনের ৩০ তারিখ ফরিদপুর নিয়েও এরকম প্রতিবেদন প্রকাশ করে পত্রিকাটি, Faridpur humming with activities শিরোনামে। সেখানে বলা হয়, Economic and social activities in Faridpur district have returned to normal. খবরে আরও উল্লেখ করা হয় যে, যারা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তারা আবার ফিরে এসেছেন এবং থানায় থানায় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই সাথে জনগণ ‘সমাজবিরোধী’ কর্মকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনকে আটকও করেছে, এটাও বলা হয়। স্পষ্টতই, এখানে মুক্তিযোদ্ধাদেরকেই সমাজবিরোধী বলা হচ্ছে। খবর পড়ে যে কারো মনে হতে পারে, লোকেরা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল ওই ‘সমাজবিরোধী’দের জন্যে।
পাকিস্তান হতে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে যে বিজ্ঞাপন- বিভিন্ন পণ্য কিংবা প্রতিষ্ঠানের- প্রচার করা হতো সেখানে যুদ্ধ সম্পর্কে সম্মতি উৎপাদনের আরও ভয়াবহ চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। সেগুলোতে মূলত, যুদ্ধকে পুরোপুরি ধর্মীয় লেবাস দিয়ে, মানে জেহাদ আখ্যায়িত করে, বাঙালিকে কাফের বা ইসলামের শত্রু বলে চিহ্নিত করা হত। এই মতবাদও প্রচার করা হত যে,বাঙালিক  বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা (তাদের ভাষায় জেহাদ) ফরজ।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, মিডিয়া মূলত তাই প্রচার করে যা সরকার কিংবা সমাজের এলিট শ্রেণি চায়। আন্তর্জাতিক যে কোন ইস্যুতে দেশের সরকারী দৃষ্টিভঙ্গিটাই কোন না কোনভাবে সে দেশের মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদে প্রতিফলিত হয়। একাত্তরে এর প্রমাণ পাওয়া যায় New York Times এবং লন্ডনের The Times পত্রিকার সংবাদে। তারা একধরণের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে তাদের প্রকাশিত সংবাদে। যুদ্ধ সংক্রান্ত খবরে তাদের মনোযোগ ছিল সামরিক যুদ্ধ এবং ভবিষ্যদ্বাণীমূলক খবরের দিকে। বাংলাদেশের যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব-শক্তিগুলোর অংশগ্রহণই ছিল তাদের পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের প্রধান বিষয়। যুদ্ধের সহিংসতা এবং বাংলাদেশের মানুষদের দুর্ভোগ তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরকারের মতো এই পত্রিকাগুলোর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল আন্তর্জাতিক সংঘাতের অংশবিশেষ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের ফল। এভাবে, পত্রিকাগুলো তাদের সরকারী বয়ানই তুলে ধরে একধরনের নিরপেক্ষ কণ্ঠ বজায় রেখে। অন্যভাবে বলতে গেলে, তাদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধ মোটেও উদ্বেগের বিষয়বস্তু ছিল না[29]।

প্রচারণার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল সম্পর্কে একটা উদাহরণ দেয়া যাক। একাত্তর সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আকস্মিক ভাবে ভারতের একাংশে অবতরণ করার ঘটনাকে আমেরিকা ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এপি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডানকার্কে ব্রিটিশ বাহিনীর অবতরণের সাথে তুলনা করে বলেছিল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ওই ঘটনার পর এটাই হচ্ছে সর্ববৃহৎ অভিযান। কিউবার সমাজবিজ্ঞানী নিওনার্দো আকোস্টা লিখেছেন, ‘এই প্রতি তুলনা অত্যন্ত স্পষ্টঃ পাকিস্তানিদের চিহ্নিত করা হয়েছে ব্রিটিশদের (ভালোদের) সঙ্গে, এবং, ভারতীয়দের জার্মানদের (খারাপদের) সঙ্গে।’[30]

[পরের পর্বঃ গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম ​​​​​(শেষ পর্ব)]

 

তথ্যসূত্র:
[1] Nazi Propaganda, United States Holocaust Memorial Museum,
[2] Ibid
[3] The Jew as World Parasite, German Propaganda Archive,
[4] Goebbels, Joseph, 1941, The Jews are Guilty, German Propaganda Archive
[5] Bartrop, Paul R., and Samuel Totten. 2008. Dictionary of Genocide.
[6] Groß, Walter, 1934, Race, German Propaganda Archive
[7] Volksempfänger – Nazi Radio,
[8] Bartrop and Totten, 2008
[9] Arnett, George. 2015 . Auschwitz: a short history of the largest mass murder site in human history . The Guardian
[10] Rwanda: How the genocide happened, BBC, 17 may, 2011
[11] The Rwandan Genocide: How It Was Prepared, A Human Rights Watch Briefing Paper, April 2006
[12] BBC, 2011
[13] A Human Rights Watch Briefing Paper, April 2006
[14] Ibid
[15] Asad, Rabiya, 2014, “Major Research Paper: Radio and the Rwandan Genocide”
[16] A Human Rights Watch Briefing Paper, April 2006
[17] Ibid
[18] Asad, Rabiya, 2014
[19] Ibid
[20] মার্কিন সরকারের অতি গোপনীয় প্রতিবেদন, পূর্ব পাকিস্তানে সংঘাত: পটভূমি ও ভবিষ্যৎ। সূত্র: বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদরী।
[21] মুনতাসীর মামুন, ২০১০, পাকিস্তানি জেনারেলদের মন বাঙালি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, সময়।
[22] ডকুমেন্টারি: 1972, Nine months to freedom, Directed by Sukhdev Singh Sandhu
[23] Mascarenhas, Anthony, 1971, Rape of Bangladesh
[24] হাসান হাফিজুর রহমান, ১৯৮২, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, প্রথম প্রকাশ, হাক্কানী পাবলিশার্স।
[25] দলিলপত্র
[26] দলিলপত্র
[27] দলিলপত্র
[28] দলিলপত্র
[29] Hossian, Mohammad D, 2015, “Manufacturing consent: framing the liberation war of bangladesh in the US and UK media.” Journalism,
[30] মফিদুল হক, ১৯৮৫, মনোজগতে উপনিবেশ তথ্য সাম্রাজ্যবাদের ইতিবৃত্ত, প্রাচ্য প্রকাশনী।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top