নিসর্গ

স্বপ্নের সান্দাকুফু (দ্বিতীয় পর্ব)- পাহাড় ও পারিবারিক সংকট

স্বপ্নের সান্দাকুফু (দ্বিতীয় পর্ব)- পাহাড় ও পারিবারিক সংকট

স্বপ্নের সান্দাকুফু (প্রথম পর্ব)- সান্দাকুফুর স্বপ্ন শুরু

অপেক্ষায় ছিলাম ঈদ পর্যন্ত বাসার কারো সাথে কোন রকম বাক-বিতণ্ডায় না গিয়ে ভালো ভাবে ঈদের ছুটিগুলো সবার সাথে, সবার চাওয়ার মত করে হাসি-আনন্দে, উচ্ছ্বাসে-উৎসবে কাটানোর। আর অপেক্ষায় ছিলাম, কবে ঈদ শেষ হতেই সান্দাকুফু যাবার কথা এবং ৮/৯ দিন যে থাকবোনা সেটা বলে মোটামুটি সবাইকে একটা মানসিক প্রস্তুতি নেবার সুযোগ করে দেবার। সবাই ঈদের আনন্দে বিভোর আর আমি সান্দাকুফুর স্বপ্নে।

সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক, গভীর অরণ্য ভেদ করে ট্রেকারসদের জন্য তৈরি রাস্তা, বৃষ্টি ভেজা পাহাড়, সবুজের সমুদ্র, শত-শত পাহাড় চুড়া, কাছে-দূরে বরফের পাহাড়ের মায়াবী চাহনি, হেটে-হেটে পাহাড় ডিঙ্গানো, পাহাড়ি পাড়ায় রাত কাটানো, ঝমঝমে বৃষ্টিতে কফির সাথে, টিনের চালে বৃষ্টির গান, হিম শীতল সকাল বেলা, মেঘ-কুয়াসার ঘিরে ধরা, মায়াবী মেয়ের মোহময়তার। এসব স্বপ্নে দেখে-দেখে, ওয়েব সাইট, পরিচিত বন্ধু ও অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে চলেছি দিন-রাত। আর সেই সাথে স্বপ্ন পুরনের নানা রকমের পরিকল্পনা তো আছেই।

সবার ঈদের আনন্দ ছিল কোরবানির গরু আর তার নানা রকম পদ নিয়ে আর আমার ঈদের আনন্দ ছিল কবে ঈদের সেপ্টেম্বর মাস গিয়ে সান্দাকুফু যাবার অক্টোবর মাস আসবে। আর এবারই প্রথম অক্টোবর মাস যে মাসে আমার কর্মখেত্র থেকেও ছুটির তেমন একটা ঝামেলা নাই। পূজা আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে বেশ বড় একটা ছুটি মিলবে, সাথে এই-দুইদিন ছুটি নিলেই ব্যাস স্বপ্ন পূরণে আর তেমন কোন বাঁধা নেই।

ঈদ শেষ হল। পরের দিন একটি পারিবারিক আবহে আমি জল পানি ঢেলে দিলাম। কারণ পরের মাসে একটা অনুষ্ঠান আয়োজনের কথাবার্তা চলছে, কবে-কিভাবে আর কোথায় হবে, কে কি দায়িত্ব পালন করবে সেসবের কর্মতালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আমি বলে বসলাম আমাকে বাদ রাখতে সবকিছু থেকেই। সবাই অবাক কেন?

-কারণ আমি ওই সময়টায় থাকবোনা।
-কেন কোথায় যাবে আবার?
-সান্দাকুফু।
-এইটা কি, কোথায় আর কতদিনের জন্য?
-৮/৯ দিনের জন্য, ভারতের দার্জিলিং এ, আর এখান থেকে হিমালয়ের পুরো বরফ মোড়া পর্বত শৃঙ্গ গুলো দেখা যায়, তাই যাবো। এটা আমার অনেক বছরের স্বপ্ন-ভাবনা আর কল্পনা।

ব্যাস এক নিমিষেই সেই অনুষ্ঠান কার্যত পণ্ড। সাথে সাথে নানা জনের নানা উক্তি, আসলে ব্যাঙ্গউক্তি…
-কদিন আগেই না ভারতে গেলে তুমি?
-আরে না, ও তো দার্জিলিং গিয়েই ঘুরে এলো গতমাসেই?
-শুধু গতমাসেই না তো! তার আগের মাসেও তো দার্জিলিং গিয়েছিল।
-ওখানে কি বিয়ে করেছ আর একটা? বাচ্চা-কাচ্চাও আছে নাকি সেখানে?

এমন নানা বিব্রতকর আর উত্তরহীন প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে বিপন্ন প্রায় আমার সান্দাকুফুর স্বপ্ন। কিন্তু তবুও চুপচাপ ঘাপটি মেরে বসে থাকলাম কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আর কোন রকম যুক্তি-তর্কে না গিয়ে।

কারণ এসব যুক্তি-তর্কের কোন সমাধান নেই, এসব প্রশ্নের কোন সঠিক ও গ্রহনযোগ্য উত্তর নেই, এসব প্রকৃতি-পাহাড়ের প্রতি প্রেম বা ভালোবাসার, আবেগের কোন মূল্য নেই বাস্তববাদী দুনিয়ার আরও বেশী বৈষয়িক আর বাস্তববাদী মানুষের কাছে। তাই চুপ করেই ছিলাম। আর অটল ছিলাম স্বপ্ন পুরনের, শুধু সময় সামনে আসার অপেক্ষায়।

এরপর ঈদের ছুটির পর। বাসায় প্রতিদিনই এই সান্দাকুফু ট্রেক নিয়ে কম-বেশী তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। বাসার কেউ বাদ যায়না এই বিরোধী কথাবার্তা থেকে। এমনকি অফিসের অনেক সহকর্মী পর্যন্ত এটাকে বেশী বেশী বলে আখ্যা দিয়েছেন সামনা-সামনি-ই। কিন্তু কে শোনে কার কথা, আমি আছি আমার মত, চার বছরের লালিত স্বপ্ন পুরনের নেশায় বুঁদ হয়ে।

দিন যায়, রাত যায় আর স্বপ্ন কাছে আসে। আরও দিন যায়, রাত যায় রাত গুলো নির্ঘুম হয়ে ওঠে, স্বপ্ন সত্য হবার সম্ভাবনায়, আরও দিন যায়, রাত যায় সময়গুলো বড় উদ্ভুত আর অস্থির হয়ে ওঠে, সান্দাকুফুর টানে। আরও সময় যায়, মন-প্রাণ সব অস্থির আবেগে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক একটা দিন যায়, আর এক এক রকম স্বপ্ন দানা বাঁধে মনে।

ধীরে ধীরে সময় ঘনিয়ে আসে। আসে কাঙ্ক্ষিত অক্টোবর মাস। ব্যাগ গোছাই, ছুটির আবেদন করি, অনাপত্তি পত্র চাই অফিস থেকে।সবকিছু ঠিক-ই ছিল কিন্তু হুট করেই কিভাবে যেন সব কিছুতে একটা অস্থিরতা তৈরি হল। ছুটি চূড়ান্ত অনুমোদন আটকে যায় কোন একটা কাজ এখনো শেষ না হওয়ায়, সেই সাথে অনাপত্তিপত্রও। এদিকে বাসায় রোজকার অসন্তোষ তো আছেই। কখনো কখনো তো এমনও হয়েছে যে, “হয় পাহাড় বেছে নাও, নয়তো সংসার।”

আমার আবার দুটোই চাই। বেঁচে থাকতে সুখের সংসার আর জীবনকে উপভোগ করতে পাহাড় ও প্রকৃতি। সেই সাথে আছে প্রতিদিন সহকর্মীদের বিভিন্ন রকম খোঁচা, যেন না যাই তেমন কথাবার্তা, চরমভাবে নিরুৎসাহিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা, বসের কাজ শেষ না করলে ছুটি না দেবার চোখ রাঙ্গানি, এমন আরও যে কত কি।

ছুটির অনুমোদন, বাসের টিকেটের জন্য হাহাকার, বাসায় দেরীতে ফিরলে যেতে না দেবার হুমকি, কোন রকম অপ্রাপ্তিতে পাসপোর্ট বাজেয়াপ্তর হুংকার। অবশেষে কোন রকমে অফিসের কাজ শেষ হল, বস নিরুপায় হয়ে আর আমার অনেক দিনের স্বপ্নে বাঁধা হয়ে অভিসাপ কুড়ানোর ভঁয়ে ছুটি দিলেন। দিলেন বিদেশ যাবার অনাপত্তিপত্রও। বাসায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে সব পুড়িয়ে দেবার হুমকি দিয়ে পেলাম, যেতে পারার নিমরাজী সম্মতি।
সবকিছু শেষে অক্টোবরের ৬ তারিখে অফিস শেষ করে বাসায় ফিরে একটু গুছিয়ে আর ব্যাগপ্যাক চেক করেই, শ্যামলী পরিবহণের রাত আটটার বাসের উদ্দেশ্যে সান্দাকুফুর স্বপ্ন পূরণের পথে বেরিয়ে পড়া।

(চলবে)

Most Popular

To Top