শিল্প ও সংস্কৃতি

মেঘের মত বাধাহীন, মেঘের মতই গম্ভীর- মেঘদল!

ইট পাথরের খাঁচার মত একাডেমিক ভবনের ছাদ খোলা গ্রাউন্ড। গ্রাউন্ডের এক কোণে মঞ্চ। এক রাশ রুপালী আলোয় আলোকিত। নীল পলিথিনে মোড়া আকাশ আর মহাশুন্যে একা চাঁদ। সে রাতে গল্প শুনেছিলাম পাথুরে দেবী আর শহরবন্দী মেঘেদের। পহেলা ফাগুনের রাতে কি অবলীলায় বসন্ত চলে এসেছিল লাউড স্পিকারের কম্পনে। সুর আর তাল নিয়ে খেলার ছলে কত কথাই না বলেছিলেন ৬ জন অসাধারণ শিল্পী। সেবারই প্রথম আর শেষ চাঁদের আলোয় গান শোনা। আর এই দূর্লভ অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে একটাই নাম, “মেঘদল”।

মেঘের মত বাধাহীন, মেঘের মতই গম্ভীর- মেঘদল!

মেঘদল

২০০৫ সালে “দ্রোহে মন্ত্রে ভালোবাসা” অ্যালবামের হাত ধরে রেকর্ডিং যাত্রা শুরু করে মেঘদল। যখন থেকে মেঘদলের পথচলা সেসময় শ্রুতিমধুর কথা এবং বৈচিত্রয়ময় কম্পোজিশনের গান করাটা অন্য কেউ ভেবেছিল কিনা বলা দুষ্কর। নিজেদের কথা আর সুরে শার্ল বোঁদলেয়ার আর পিংক ফ্লয়েডের ছাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ব্যান্ড হয়তো আর পাওয়া সম্ভব না। চারুকলার পুকুর আর আজিজ সুপার মার্কেটের গ্রাফিক্স স্টুডিওতে বসে গান করা থেকেই সৃষ্টি হয় “ওম” আর “কবিয়াল” এর মত গানের। ২০০২ সালের জানুয়ারীর ২২ তারিখে মেঘদলের আত্মপ্রকাশ। ২০০৮ সালে নতুন সদস্যদের নিয়ে মুক্তি পায় দ্বিতীয় অ্যালবাম “শহরবন্দী”।

মেঘদল

মানুষের চারপাশে প্রতিদিনের ছোট ছোট অসঙ্গতিগুলোর ঠিকানা করেই মেঘদলের গান। সে হোক দিন শেষে বাসে ঝুলে বাড়ি ফেরা আর হোক সে নগরীর দেয়ালে বিষাদগ্রস্থ পাখি। ধর্মান্ধতা থেকে সমাজব্যবস্থা সবই যেন সুন্দর শব্দের মোড়কে বন্দী। জনরার ব্যাপারে কথা বলতে গেলে মেঘদলের হয়ে ভোকাল শিবুদা বলেছেন– “আমাদের গানের ফর্ম নিয়ে অনেকেই নানা কথা বলে, একটা জনারে ফেলতে চায়। আমরা আসলে এর উত্তর জানি না। আমরা একটা ব্যান্ড, আমরা দলীয়ভাবে গান করছি- কিন্তু কি করছি তাঁর ব্যাখ্যা সব সময় আমাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব না। এটা একটা প্রক্রিয়া বড়জোর”।

শোয়েব ভাই বিশাল এক ভক্তকূলের মধ্যমণি। ছবিঃ এরশাদুল হক টিঙ্কু

পাঁচমেশালী কাঠামোর গান গুলোর কথা ভাবতে গেলে আছে শিবুদা’র বুক কাঁপানো কন্ঠ, রণি ভাইয়ের কিবোর্ডে মেট্রোনোম ভাঙ্গা রান ওফ আর সিন্থের গর্জন, আমজাদ ভাইয়ের দূর্দান্ত হাই-হ্যাটস সাবডিভিশন, কিবরিয়া ভাইয়ের গ্রুভ বেইজ আর সর্বোপরি শোয়েব ভাইয়ের গীটারে ক্রাঞ্চ রিফ থেকে শুরু করে ক্লাসিকাল সোলো। ২০১৪ সালের ফাল্গুনের রুপালী রাতের পর আবার এই কিংবদন্তীদের দেখার সুযোগ হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। তখন ব্যান্ড মেঘদলের থেকেও আলাদা ভাবে চিনেছিলাম শোয়েব ভাইকে। আমজাদ ভাই ছিলেন না সেদিন। কিবরিয়া ভাইয়ের বেইজ আর নিজের টেইলর অ্যাকুস্টিকের তরঙ্গের উপর ভর করে সেদিন শোয়েব ভাই মুখে তুলে নেন কাজু নামের বাদ্য। “ঠিকঠাক” আর “চেনা অচেনার” হার্ড রক গীটার সোলো গুলো বের হয়ে আসে গলা থেকে, অবলীলায়। পিঙ্ক ফ্লয়েডের “গ্রেট গিগ ইন দ্যা স্কাই” শুনে শেখা শ্রুতিমধুর আর্তনাদের বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়ে ছিলেন সে দিন তিনি। যতবার “আমি এক…” বলে তারা ছেড়ে দিয়েছিলেন ততবার বাকি লাইন শেষ করে ছিলাম আমরা শ্রোতারা।

লাইভ কনসার্টে রশীদ শরীফ শোয়েব

ঢাবি’র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থেকে পাশ করা শোয়েব ভাই বিশাল এক ভক্তকূলের মধ্যমণি। একজন কম্পোজার হিসেবে সুনাম কামিয়েছেন অনেক। প্রথম সারির মিউজিক প্রোডিউসার হতে হয়তো বেশি দিন বাকি নেই, তবে দেশের সেরা লাইভ পারফর্মারদের তালিকায় তার নাম শুরুর দিকে আছে তা নিশ্চিত। মেঘদলের পাশাপাশি নতুন মিজিশিয়ানদের সাথে মিলিত প্রচেষ্টা কিংবা স্টুডিও প্রোডাকশনের কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সর্বশেষ এমন একটি প্রজেক্ট হল “Muse in The Dusk” যেখানে গীটারিস্ট হিসেবে ফিচার হয়েছেন সানি”র সাথে(সানি’র স্টুডিও অ্যালবামের মিউজিক ডিরেক্টর ও ছিলেন)।। অহরহ টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে আসছে শোয়েব ভাইয়ের সুর ও কথা। একটি টেলিফিল্মের আবহ সঙ্গীতও কম্পোজ করেছেন। নিজের স্টুডিও “Studio Cowbell” এ তাকে নিয়মিত পাওয়া যায় বলেই লোক মুখে শোনা। জোরে-শোরে জ্যাম সেশন চলিয়ে যাচ্ছেন ৪ বছর যাবৎ প্রতিক্ষীত “অ্যালুমিনিয়ামের ডানা” অ্যালবামের।

নিজের সুর আর গীটার সোলোর অজুহাতে শতশত রাত কেঁড়ে নেওয়া এই লিকলিকে গড়নের মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অন্যতম কারণ তার কাছে পাওয়া শিক্ষা। নিজের পরিচয় আর সৃজনশীলতার উপর ভরসা রেখে ভালো লাগার কাজটুকু চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন শোয়েব ভাই।

মন্ত্রমুগ্ধ ভক্তদের পক্ষ থেকে রইলো জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

ফিচারড ইমেজঃ টিপু আহামেদ

Most Popular

To Top