টুকিটাকি

বাইসাইকেল থিভসঃ একটি বাইসাইকেল এবং বাবা-ছেলের গল্প!

বাইসাইকেল থিভস: একটি বাইসাইকেল এবং বাবা-ছেলের গল্প!

স্কুল লাইফে পত্রিকা পড়ার খুব ঝোঁক ছিল আমার, তো একদিন ভুলক্রমে (ভাগ্যক্রমেও বলা যেতে পারে!) পত্রিকার পাতায় “Bicycle Thieves” নামের একটা মুভির রিভিউ পড়ে ফেললাম। তারপর  দিন গেছে, মাস গেছে, বছর গেছে তবুও এই মুভিটা আর দেখা হয়ে ওঠেনি। হঠাৎ একদিন IMDB ঘুরতে ঘুরতে এই মুভিটার দেখা পেলাম। তখন আর কোন অপেক্ষা না রেখেই মুভিটা দেখা শেষ করলাম। আমার আর “Bicycle Thieves” এর পরিচয় পর্বটা এভাবেই।

ছবিতে আন্টোনিও, ব্রুনো এবং সেই বাইসাইকেল!(বাম পাশ থেকে)

১৯৪৮ সালে মুক্তি পায় এই মুভিটি। ড্রামা ঘরানার মুভি। মুভির রানটাইম ৯৩ মিনিট। মুভিটা শুধু একটা মুভি না, এটা একটা সংগ্রামের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প, টিকে থাকার গল্প। ইতালিতে দ্বিতীয় যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একটা পরিবারের কাহিনী নিয়ে মুভিটি। যেহেতু যুদ্ধ মাত্রই শেষ হয়েছে সেহেতু অধিকাংশ মানুষই বেকার। এটা সেটা করে সবাই টিকে আছে। তেমনই একজন হচ্ছেন আন্টোনিও। বউ আর একটা বাচ্চা (বাচ্চার নাম ব্রুনো) নিয়েই তার সংসার। একটি চাকরীর পিছনে সকলেই ছুটছে। ভাগ্যক্রমে আন্টোনিও চাকরীটা পেয়ে যায় কিন্তু চাকরীর সাথে একটা শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়। শর্তটা হচ্ছে, একটা বাইসাইকেল থাকা লাগবে।  নতুন করে বাঁচার তাগিদে নিজেদের অধিকাংশ জিনিসই বন্ধক রেখে সাইকেল কিনে ফেলে সে এবং ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে চাকরীর প্রথম দিনেই সে সাইকেলটা হারিয়ে ফেলে! এরপর?

বাইসাইকেল হারিয়ে ফেলার পর ব্রুনো এবং আন্টোনিও (বাম পাশ থেকে) ।

এরপর বাবা আর ছেলে মিলে খুঁজতে বের হয় হারিয়ে যাওয়া সাইকেল। শেষমেশ কি তারা সাইকেল ফেরত পাই? নাকি পাইনা? জানতে হলে আপনাকে নিজ দায়িত্বে দেখে নিতে হবে। সাইকেল হারিয়ে ফেলার পরেও আন্টোনিও আর ব্রুনোকে হতাশ হতে দেখিনি, আশা করি আপনিও মুভি শেষে হতাশ হবেন না।

মুভিতে মনে রাখার মত খুব বেশি সংলাপ নেই, কোন হাস্যকর দৃশ্য নেই কিন্তু এই মুভিতে একটা ‘স্টোরি’ আছে। যে স্টোরি’টা আপনাকে এক বসাই মুভিটা শেষ করতে বাধ্য করবে। ভাষা হারিয়ে ফেলার মত কিছু সিন আছে মুভিতে। বিশেষ করে বলতে গেলে লাস্ট সিন। যে সিনটা আপনাকে ভাবাবে, অনেকবার ভাবাবে। মুভি শেষেও মুভির রেশ কাটাতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে আপনার।

এই মুভি সম্পর্কিত বেশ কিছু তথ্যঃ

১) মুভির একটা দৃশ্যধারণের সময়, পরিচালক উৎসুক জনতার মাঝ থেকে Enzo Staiola কে আবিষ্কার করেন এবং তাকে ‘ব্রুনো’ চরিত্রের জন্য ভাড়া করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। এই মুভির পরেও Enzo Staiola বেশ কিছু মুভিতে অভিনয় করেন এবং বড় হয়ে গণিতের শিক্ষক হন। উনি এখনো বেঁচে আছেন।

ব্রুনো চরিত্রের Enzo Staiola ।

২) মুভিটি যখন মুক্তি পায় তখন ইতালিতে চলছিল ‘ইতালিয়ান নিওরিয়েলিজম’ নামের একটি আন্দোলন। এই আন্দোলনের মুখ্য বিষয় ছিল যে, মুভির কাহিনী বাস্তবের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে হবে এবং অপেশাদার অভিনেতা, অভিনেত্রীদের দিয়ে অভিনয় করাতে হবে। অবশ্য মুভি দেখতে বসে আপনার মনেই হবেনা যে, আপনি অপেশাদার অভিনেতা, অভিনেত্রীদের মুভি দেখতে বসেছেন !

৩) মুভির প্রধান চরিত্র ‘আন্টোনিও’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন Lamberto Maggiorani। এই মুভিতে তার যুক্ত  হওয়ার গল্পটাও বেশ মজার। Lamberto Maggiorani এর স্ত্রী রেডিওতে একটি ঘোষণা শুনে তার ছেলে এন্রিকোর (Enrico) ছবি নিয়ে যান পরিচালকের অফিসে। পরিচালক ব্রুনো চরিত্রের জন্য এন্রিকোকে পছন্দ করেননি, কিন্তু পরিচালকের চোখ আঁটকে গেছিলো ছবিতে থাকা Lamberto Maggiorani কে দেখে। উনি পেশায় ছিলেন মেশিনিস্ট বা যন্ত্রচালক।

৪) লুইগি বারতোলিনির (Luigi Bartolini) ‘Bicycle Thieves’ নামের উপন্যাস থেকে মুভিটা করা ।

৫) David O. Selznick (Gone with the wind, Rebecca, Spellbound এর মত মুভির প্রোডিউসার) এই মুভির পরিচালক Vittorio De Sica (যিনি এই মুভির আগে থেকেই একজন প্রতিষ্টিত ফিল্মমেকার ছিলেন) কে অফার করেন যে, যদি মুভিতে কেরি গ্রান্টকে প্রধান চরিত্রে নেয়া হয় তাহলে তিনি মুভিটা প্রোডিউস করবেন। Vittorio De Sica অফারটি গ্রহণ করেননি ।

ফিল্ম বোদ্ধাদের কাছে “ভালো মুভির সংজ্ঞা” এক রকম, আর আমার কাছে আরেক রকম। একটা ভালো মুভিকে আপনি কখনোই অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব অথবা বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর দাঁড়িপাল্লায় মাপতে যাবেন না। একটা মুভি তখনই ভালো যদি সেই মুভিটা আপনাকে ভাবাতে পারে ।

Most Popular

To Top