ইতিহাস

পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলার মরিচা, নাগরদোলার জৌলুস (দ্বিতীয় পর্ব)

নিয়ন আলোয়- পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলার মরিচা, নাগরদোলার জৌলুস (দ্বিতীয় পর্ব)- Neon Aloy

আগের পর্ব- পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় অনৈক্য,বিভক্তি ও সংঘাত (প্রথম পর্ব)

[এডিটোরিয়াল নোটঃ শুরুতেই যে কথাটি বলে নিতে হয়, তা হলো- এই সিরিজের লেখাগুলো ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল নয়। লেখক সে সময়কার ঘটনাবলী যারা কাছ থেকে দেখেছেন এবং যারা ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে ছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের লেখা বইয়ের রেফারেন্স ধরে লিখেছেন। বিষয়টাকে সহজভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জমাট এক অধ্যায়ের ঘটনাগুলো লেখক বিন্দুর পর বিন্দু মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন।

লেখাটি নিয়ন আলোয় এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো ১৯৭৫-এর সেই টালমাটাল দিনগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে। এই সিরিজটি আপনার মনে হয়তো এমন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিবে যেগুলো এর আগে কখনো আপনি ভেবে দেখেননি। আর সে প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে আপনাকে পড়তে হবে সে সময়কার ইতিহাস নিয়ে লেখা বইগুলো।]

১৫.
…৪ নভেম্বর সকালে কর্নেল শাফায়াত জামিল সবার আগে ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টারে এসে পৌঁছান। তাকে চিন্তিত দেখা যায়। একবার তার চেয়ারে বসেন, তো একবার বারান্দায় দাঁড়ান। শাফায়াত জামিল স্বস্তি পাচ্ছেন না যদিও ফারুক-রশিদ-ডালিম গং আগের সন্ধ্যায় দেশ ছেড়ে চলে গেছে, ক্যান্টনমেন্টের বাইরের সব ট্যাঙ্ক নিরস্ত্র করা হয়েছে এবং জিয়াউর রহমান পদত্যাগ করেছেন। তার অস্বস্তির মুল কারণ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে এখনো সেনাপ্রধান করা হয়নি। শাফায়াত আশা করেছিলেন আগের রাতেই বঙ্গভবন থেকে ঘোষণা আসবে, কিন্তু তা আসেনি।

অনিশ্চয়তা ভাল জিনিস নয়; সাধারণ অফিসার ও সৈনিকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে কারণ তাদেরকে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তারা শুধু জানে জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী। কেন জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হলো তা জানানো প্রয়োজন। যতক্ষণ না জানানো হবে, ততক্ষণ অনিশ্চয়তা বাড়বে, সন্দেহের ডালপালা বাড়বে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হবে। আর যতক্ষণ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে নতুন চীফ হিসেবে ঘোষণা না করা হচ্ছে ততক্ষণ সাধারণ অফিসার ও সৈনিকদের কিছু জানানোও যাচ্ছে না। অস্বস্তির অন্য কারণ হলো খালেদ মোশাররফের খোন্দকার মোশতাকের প্রতি অতিরিক্ত মমতা দেখানো; শাফায়াতের বিশ্বাস সব অনিষ্টের মূল এই মোশতাক; অনিষ্টের মূলকে কেন তোয়াজ করে চলতে হবে! তাকে সরিয়ে দিয়ে জাস্টিস আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রেসিডেন্ট করা উচিত, মনে করেন শাফায়াত জামিল। ইতিমধ্যে অভ্যুত্থানের ২৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কালের হিসাবে ২৮ ঘণ্টা কোন বড় সময় নয় কিন্তু অভ্যুত্থানের সময় ২৮ ঘণ্টা অনেক বড়। রড গরম থাকতেই হাতুড়ি দিয়ে আঘাত দিতে হয়। তার মনে হচ্ছে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ পুরো অভ্যুত্থান অত্যন্ত ‘মানবিক’ আকারে পরিচালনা করছেন এবং হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে দেরী করছেন।

টেবিলে চা দিয়ে গেছে বেয়ারা, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কর্নেল শাফায়াত জামিল আরেক কাপ চা দিতে বলেন। এরপর ইউনিফর্মের খোপ থেকে কলম বের করে একটা কাগজে কিছু পয়েন্ট লিখা শুরু করেন। এর মধ্যে অফিসে জুনিয়ার অফিসারদের আসা শুরু হয়েছে। এক অফিসার কর্নেল শাফায়াত জামিলকে এসে জানালো রংপুর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নওয়াজেশের নেতৃত্বে ১০ ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান আরিচায় এসে পৌঁছেছে; আজকের মধ্যেই তারা ঢাকায় চলে আসবে। আফিসারটি আরও জানালো লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম তার ১৫ ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে যমুনা নদীর অপর প্রান্তে অবস্থান করছেন। এটা শুনে শাফায়াত বেশ অবাক হলেন; এই ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। বললেন “How could they come so fast?” ধারণা করে নিলেন খালেদ মোশাররফ রংপুরের ব্রিগেড কামান্ডার কর্নেল হুদাকে দিয়ে ১০ ইস্ট বেঙ্গল ও ১৫ ইস্ট বেঙ্গল ঢাকায় আনানোর ব্যবস্থা করেছেন। কর্নেল হুদা খালেদ মোশাররফের কাছের মানুষ ও ১০ ইস্ট বেঙ্গল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার নেতৃত্বে লড়াই করেছে। এরা ঢাকায় আসলে শাফায়াতের কোন আপত্তি নেই কিন্তু তাকে জানানো হলো না কেন? তবে কি তার ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডকে ‘ব্যাল্যান্স’করার জন্য খালেদ মোশাররফ ১০ ইস্ট বেঙ্গল ও ১৫ ইস্ট বেঙ্গল ঢাকায় আনছেন? এসব চিন্তা করতে করতে চায়ের কাপ হাতে নেন; চায়ের স্পর্শ ঠোটে লাগলে বুঝেন এই চা-ও এর মধ্যে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। তিনি অফিসের বারান্দায় এসে দাঁড়ান।

এসময় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ানে পৌঁছান। শাফায়াত এগিয়ে যেয়ে স্যালুট করেন খালেদকে। খালেদ বারান্দায় দাঁড়িয়েই শাফায়াতকে গতরাতে বঙ্গভবনে হওয়া কথোপকথন সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন। শাফায়াত ১০ ইস্ট বেঙ্গল ও ১৫ ইস্ট বেঙ্গল কেন ঢাকায় আসছে প্রশ্ন করবেন, সেই মুহূর্তে স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি ই এ চৌধুরী এসে উপস্থিত হন। শাফায়াত ও খালেদ তখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে; ই এ চৌধুরী কোন ভুমিকা ছাড়াই তাদের জানালেন জেল হত্যাকান্ডের কথা। হতভম্ব হয়ে যান শাফায়াত ও খালেদ। ই এ চৌধুরী আরও জানান রশিদ ও মোশতাকের নির্দেশে রিসেলদার মুসলেমউদ্দিন হত্যা করেছে তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও মনসুর আলীকে।

খালেদের কণ্ঠে আর্তনাদ “আগে জানালেন না কেন?” ই এ চৌধুরীর কাছে এর উত্তর নেই। তিনি কাল রাত পর্যন্ত জানেন রশিদ আর মোশতাকের কাছেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। আজ সকালে জেনেছেন বঙ্গভবনের অফিসাররা দেশ ছেড়ে গেছে এবং আর্মি চলছে ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টার থেকে। খালেদ মোশাররফ জেলহত্যার কথা শুনে বিব্রত কারণ তিনি প্রথম থেকেই রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান চাচ্ছিলেন। তিনি জেনারেল জিয়াকে গৃহবন্দী করেছেন, রশিদ-ফারুক-ডালিম গংকে দেশের বাইরে চলে যেতে দিয়েছেন যাতে কোন রক্তপাত না হয়। সেই তো হলো! বলি হলেন স্বাধীনতার চার স্তম্ভ।

কর্নেল শাফায়াত জামিল তখন ভীষণ ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত; তিনি খালেদকে বলেন “স্যার, ইউ মাস্ট রিমুভ খন্দকার মোশতাক ফ্রম দ্যা পোস্ট।” খালেদ সবাইকে বলেন অফিসে গিয়ে বসতে; সেখানে বসে খালেদ ডিআইজি প্রিজনের সাথে কথা বলে পুরো ঘটনা জেনে নেন। এরপর ফোন করেন ব্রিগেড কমান্ডারদের; তাদের পরিস্থিতি অবহিত করেন। বেয়ারারা চা-নাস্তা দিয়ে যায়, সবাই চা-নাস্তা খান আর পরবর্তী করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধান এসে উপস্থিত হয়েছেন। কর্নেল শাফায়াত কিঞ্চিত রাগত স্বরে বলেন “হোয়াই আর উই ওয়েস্টিং টাইম? খন্দকার মোশতাক নিডস টু বি রিমুভড এট আর্লিয়েস্ট”। শাফায়াতের অগ্নিমূর্তি দেখে খালেদ, বিমানবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, ই এ চৌধুরী ও আর কজন অফিসার নিয়ে উঠে পড়েন; গন্তব্য বঙ্গভবন। যাবার সময় হাতে নিলেন জেনারেল জিয়ার পদত্যাগপত্র। কর্নেল শাফায়াত রয়ে গেলেন অফিসে।

১৬.
বঙ্গভবনে পৌঁছে খালেদ জেনারেল ওসমানী’র উপস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাককে প্রশ্ন করেন জেলের ভেতর চার নেতাকে কেন হত্যা করা হয়েছে। মোশতাক যতটা পাকা রাজনীতিবিদ তততুকুই পাকা অভিনেতা। তিনি হত্যার কথা শুনার পর বিলাপ করতে থাকেন, তার প্রাক্তন সহকর্মীদের মৃত্যুর খবরে ভেঙ্গে পড়েন। মোশতাকের বিলাপ শুনে খালেদ দ্বিধায় পড়ে যান; একজন পেশাদার সৈনিকের পক্ষে পাকা ও ধূর্ত রাজনীতিবিদের কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব নয়।

পরিস্থিতি একটু জটিল আকার ধারণ করে যখন পাশে দাড়ানো ই এ চৌধুরী উপস্থিত সবাইকে জানান ঘটনার রাতে ডিআইজি প্রিজনকে প্রেসিডেন্ট সাহেবই অনুমতি দিয়েছিলেন মোসলেমউদ্দিনকে অস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকতে। এটা শুনার পর খন্দকার মোশতাক চোখ মুছতে মুছতে বলেন রশিদ ও ফারুকের প্ররোচণায় তাকে এটা করতে হয়েছে।

খন্দকার মোশতাকের এই মিথ্যাবাদী রুপ দেখার পরও ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের মনে পড়লো না তিনি বঙ্গভবনে কেন এসেছেন; তিনি ভুলে গেলেন তার লক্ষ্য। বিলাপ নাটক শেষ হলে খালেদ হাতে থাকা জেনারেল জিয়ার পদত্যাগপত্র মোশতাকের হাতে দেন। বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধান বলেন খালেদকেই যেন পরবর্তী আর্মি চীফ ঘোষণা করা হয়। মোশতাক মাথা নাড়েন সম্মতির কিন্তু মুখে বলেন তিনি শুধুমাত্র সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানীর সুপারিশেই চীফ অফ আর্মি স্টাফ নিয়োগ করতে পারেন। ওসমানীও আছেন পাশে, তিনি বলেন চীফ অফ আর্মি স্টাফ নিয়োগের ব্যাপারে নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে এবং তাতে কেবিনেটের অনুমোদন লাগবে।

কেবিনেট বিকেলে বসবে। খালেদ সিদ্ধান্ত নিলেন অপেক্ষা করবেন।

বেতার সম্প্রচার তখনো বন্ধ।

১৭.
সেদিন দুপুরে কবি নির্মলেন্দু গুণ ও মহাদেব সাহা ভয়ে ভয়ে বাসা থেকে বের হন। যাবেন নিউমার্কেট হয়ে প্রেসক্লাব। নীলক্ষেতের কাছে এসে দেখেন একটা মিছিল আসছে। চমকে ওঠেন তারা। মিছিল! ১৫ই আগস্টের পর ঢাকায় তো কোন মিছিল হয়নি। জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন মিছিলটি বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে ফুল দিয়ে এসেছে; এখন যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। নির্মলেন্দু গুণ ও মহাদেব মিছিলে ভিড়ে যান; যেতে যেতে শুনতে পান এর অগ্রভাগে রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ। এই রাশেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নেতা খালেদ মোশাররফের ছোট ভাই। মিছিলে তার মা-ও নাকি আছেন। আরও আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদের মা আয়শা ফয়েজ। হুমায়ুন ইতিমধ্যে ‘নন্দিত নরকে’ নামে এক উপন্যাস লিখে বেশ নন্দিত হয়েছেন। কবি নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা ও আয়শা ফয়েজের মিছিলে থাকা নিষ্পাপ প্রতীয়মান হলেও রাশেদ মোশাররফ ও তার মায়ের মিছিলে থাকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যদিও এই মিছিল পূনঃনির্ধারিত, এই দুজনের উপস্থিতিতে প্রশ্ন দেখা দেয় খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা আছে কিনা। আদতে ব্যাপারটা কাকতালীয় এবং কোন সম্পর্ক নেই, কিন্তু মানুষের মন তো সন্দেহপ্রবণ।

১৮.
বিকাল বেলা বঙ্গভবনে মন্ত্রীরা কেবিনেট মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতে আসলে খালেদ মোশাররফ, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিন বাহিনীর প্রধানদের আনুগত্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে মন্ত্রীরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন। খালেদ মোশাররফ অন্য দুই বাহিনী প্রধানদের সাথে একটি কক্ষে বসে হালকা আলোচনায় মাতেন। কেবিনেট মিটিংয়ে অনেক বিষয় আলোচনা হয় কিন্তু পরবর্তী চীফ অব আর্মি স্টাফ কে হবেন এই বিষয়টি উঠে আসেনা।

সময় গড়াতে থাকে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়। বেশ বিচিত্র খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান কৌশল; যেই খুনী অফিসারদের বিরুদ্ধে তার অভ্যুত্থান, সেই অফিসারদের বানানো প্রেসিডেন্টের কাছেই তিনি সেনাপ্রধান হবার আর্জি করে যাচ্ছেন। আর সেই প্রেসিডেন্ট কালক্ষেপণ করছেন জেনেও খালেদ বসে আছেন; চাপ প্রয়োগ করার প্রয়োজন অনুভব করছেন না!

ওদিকে ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টারে বসে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেন শাফায়েত জামিল। তিনি অনুধাবন করেন দেরী হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই তার স্টাফ অফিসার জানিয়ে গেছে সৈনিকদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এও খবর আছে অনেক ইউনিটের সৈনিকরা এবং কিছু কিছু অফিসার জেনারেল জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দীত্ব ভাল চোখে দেখছে না। ফোর বেঙ্গলে উপস্থিত অফিসারাও প্রশ্ন করতে শুরু করেছে কেন কোন অগ্রগতি হচ্ছে না? কেন এখনো খালেদকে চীফ ঘোষনা করা হয়নি? কেন মার্শাল ল ঘোষণা করা হচ্ছে না? কেন খন্দকার মোশতাককে উৎখাত করা হচ্ছে না?

এক সময় চেয়ার থেকে উঠে দাড়ান শাফায়েত। ঘরে উপস্থিত অফিসারদের বলেন “আই ক্যান নট ওয়েট এ্যানিমোর! আই আম স্টার্টিং ফর বঙ্গভবন। তিনি মেজর ইকবাল, কর্নেল মালেক এবং মেজর হাফিজকে ইশারা করেন গাড়িতে উঠতে। সবাই সশস্ত্র। দ্রুততার সাথে আর্মির কয়েকটি জীপ বঙ্গভবনের দিকে ছোটে।

ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ছয়টার একটু পর বঙ্গভবনে পৌছেন কর্নেল শাফায়েত জামিল ও তার দল। পৌছে দেখেন প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারির ঘরে খালেদ মোশাররফ, এম জে তোয়াব ও এইচ এম খান হালকা মেজাজে বসে আসেন। বেশ বিরক্ত হন শাফায়েত। একটু গম্ভীর ভাবেই খালেদ মোশাররফকে উদ্দেশ্য করে বলেন “স্যার, আপনি এগারোটার সময় এখানে এলেন আর সারাদিন কিছুই হল না। কিছুই জানালেন না।” খালেদ অবস্থাটা বুঝতে পারলেন, তিনি উঠে বাকি দুই বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে কেবিনেট কক্ষে গেলেন। শাফায়েত ও তার সাথে থাকা অফিসাররা থেকে যান সেক্রেটারির ঘরে।

মিনিট দশেক পর কেবিনেট কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন খন্দকার মোশতাক, ওসমানী, খালেদ, তোয়াব ও এইচ এম খান। তাদের গলার উচ্চস্বর শুনে শাফায়েত উঠে দাড়ান। তার সাথে থাকা অফিসাদেরকে নিয়ে করিডরে যান; শোনেন মোশতাক বলছেন “আই হ্যাভ সিন ম্যানি বিগ্রেডিয়ারস এন্ড জেনারেলস অব পাকিস্তান আর্মি। ডোন্ট ট্রাই টু টিচ মি।” এই শুনে শাফায়েতের পাশে দাড়ানো মেজর ইকবাল ততোধিক উত্তেজিত হয়ে তার সাবমেশিন গান মোশতাকের দিকে তাক করে বলে “ইউ হ্যাভ সিন জেনারেলস অব পাকিস্তান আর্মি। নাও সি দ্যা মেজরস অব বাংলাদেশ।” ঘটনার আকস্মিকতায় কুকড়ে যান মোশতাক, স্থান-কাল ভুলে বিড়বিড় করতে থাকেন “সরি, সরি! ডোন্ট কিল মি, ডোন্ট কিল মি!”

উদ্বেগজনক এই সময়ে জেনারেল ওসমানী মোশতাকের ত্রানকর্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হন; তিনি কর্নেল শাফায়েতকে বলেন “শাফায়েত, সেইভ দ্যা সিচুয়েশান! ডু নট রিপিট বার্মা।” আবহাওয়া তখন উত্তপ্ত। মেজর ইকবালের সাথের সৈনিকরাও অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে; মুহূর্তেই শুরু হতে পারে গোলাগুলি। শাফায়েত ইকবালকে বলেন “ইকবাল তুমি সরে যাও।” ইকবাল তার অস্ত্র নামিয়ে নেয়; সাথে সাথে তার সৈনিকরাও। শাফায়েত এরপর রুক্ষ গলায় সবাইকে নির্দেশ দেন কেবিনেট কক্ষে ঢুকতে।

সবার সাথে কেবিনেট কক্ষে আরও ঢুকলেন ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবির, কর্নেল মালেক, মেজর হাফিজ। সবাই সশস্ত্র। এদের দেখে উপস্থিত মন্ত্রীরা ভড়কে যান। কেবিনেট কক্ষে যেয়ে মোশতাক প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসলেই কর্নেল শাফায়েত জামিল চিৎকার করে বলেন “ইউ আর আ মার্ডারার! ইউ কিলড বঙ্গবন্ধু। ইউ ক্যান নট রিমেইন অ্যাজ প্রেসিডেন্ট।আই পুট ইউ আন্ডার এ্যারেস্ট! ইউ হ্যাভ নো রাইট টু রিমেইন ইন পাওয়ার এন্ড ইউ হ্যাভ টু রিজাইন নাও।” মোশতাক পাকিস্তানের বিগ্রেডিয়ার আর জেনারেল দেখেছেন অনেক; বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী বাংলাদেশী মেজরও দেখেছেন গতকাল অব্দি। আজ বাংলাদেশী জাতের আসল কর্নেল দেখলেন; তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ভেঙ্গে পড়লো; তিনি সজোরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানান; তাকে দেখে মনে হয় বাঘের সামনে মোরগ মাথা ঝাঁকাচ্ছে। শাফায়েত ভীষন উত্তেজিত আর তার অফিসাররা সংকেতের অপেক্ষায়! এর মধ্যে এক অফিসার স্টেনগান উচিয়ে মোশতাকের দিকে তাক করে বলে “উই ওয়ান্ট খালেদ মোশাররফ! হি হ্যাজ টু বি মেইড চীফ অব স্টাফ।” মোশতাক তখন চেয়ার থেকে নেমে টেবিলের নিচে চলে যেতে চান। অন্য এক অফিসার তেড়ে এসে বলে “ইউ আর আ বাস্টার্ড! ইউ আর আ কিলার।” মোশতাক আরও কুঁকড়ে যান।

এসব হচ্ছে বিগ্রেডিয়ার খালেদের সামনে; তিনি শাফায়েত ও সাথের অফিসারদের অগ্নিরুপ দেখে কিছুটা হতভম্ব। পরিস্থিতি বাস্তবিকই নাজুক। মেজর জেনারেল খলিল কিছু বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে শাফায়েত বলেন “আপনি জেল হত্যার ব্যাপারে জেনেও আমাদের জানাননি কিছু। এই ডিসগ্রেসফুল আচরণের জন্য আমি আপনাকে এ্যারেস্ট করতে বাধ্য হচ্ছি।” ওসমানী যখন দেখেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট টেবিলের নিচে যেতে ব্যস্ত, তখন আরেকবার তার ‘নো মোর ব্লাড’ তত্ত্ব নিয়ে মঞ্চে আবির্ভূত হন। তিনি শাফায়েত জামিলকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। ওসমানী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক; শাফায়েতের শ্রদ্ধা আছে তার প্রতি; তিনি ওসমানীকে কোন অসম্মান করলেন না।

পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে ওসমানী শাফায়েতকে বলেন “তোমাদের সব দাবি এখনই পাশ করা হবে।” এরপর তিনি মোশতাককে বলেন “আপনি কাগজে সই করে দিন।” বাংলাদেশী মেজর ও কর্নেলদের রুপ দেখে মোশতাক তখন যেকোন কিছু করতেই প্রস্তুত। কর্নেল শাফায়েত একে একে তার প্রস্তাবগুলো রাখেন; মন্ত্রীরা দ্রুততার সাথে তা পাশ করেন। কর্নেল মালেক কাগজপত্র তৈরী করার দায়িত্ব নিলেন। মোশতাক সবগুলোতে সই করেন; সীল দেন। গৃহীত প্রস্তাবগুলো ছিল- এক, বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেল হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হবে; দুই, বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে জেনারেল পদে উন্নিত করে চীফ অব স্টাফ নিযুক্ত করা হবে; তিন, বঙ্গভবন থেকে সব ল্যান্সারস ও আর্টিলারি সৈনিক ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাবে।

কাগজপত্র তৈরী করতে সময় নিল। এর মধ্যে মেজর হাফিজ এসে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে অনুরোধ করে রেডিওতে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ভাষণ দিতে। খালেদ মোশাররফ অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে বলেন তার দ্বারা ভাষণ দেয়া সমীচীন হবে না। কিছুক্ষণ পর অন্য এক অফিসার এসে একই অনুরোধ করলে খালেদ মোশাররফ তাকে বলেন “নতুন রাষ্ট্রপতিই ভাষণ দেবেন।” খালেদ মোশাররফের এই সিদ্ধান্তে সরকারী কর্মকর্তারা, দেশের মানুষ, সাধারণ সৈনিক সবাই রয়ে গেল অন্ধকারে; তারা জানলো না ক্ষমতার কেন্দ্রে কি হচ্ছে, তারা জানলো না নাগরদোলায় কে উঠছে, কে নামছে।

কাগজপত্র তৈরী হতে, মন্ত্রী পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের সই নিয়ে সব শেষ হতে হতে মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। শাফায়েত দুজন অফিসারকে নির্দেশ দেন মোশতাককে প্রেসিডেন্টশিয়াল স্যুইটে গৃহবন্দি করে রাখার জন্য। দুই অফিসার অস্ত্র তাক করে মোশতাককে নির্দেশ দেয় “স্যার, লেটস গো।” তারা নির্ধারিত কক্ষে মোশতাককে রেখে বাইরে সৈন্য মোতায়েন করে নির্দেশ দেয় কর্নেল শাফায়েতের অনুমতি ব্যাতিত কেউ যেন এই কক্ষে না ঢোকে এবং মোশতাক যেন বের না হন।

গভীর রাতে জেনারেল ওসমানী বঙ্গভবনের বারান্দায় এসে দাড়ালেন।তার পাশে কিছু জুনিয়ার অফিসার।ওসমানী কাধ ঝাঁকিয়ে বললেন “আমি আর ডিফেন্স উপদেষ্টা নই। কাজেই সরকারী গাড়ি ব্যবহার করব না।” কর্নেল মালেক এগিয়ে এসে বললেন “স্যার, আপনি আমার গাড়ীতে আসুন। আমি আপনাকে পৌঁছে দিয়ে তারপর বাড়ী যাব।” ওসমানী রাজি হলেন। যাবার পথে কর্নেল মালেককে ওসমানী বললেন “উই প্লেইড আ ব্যাড গেম।” মালেক এর কোন উত্তর দিলেন না।

সেদিন মধ্যরাতের পর পুলিশের একটা ট্রাকে করে ৭৫১ সাত মসজিদ রোডের বাড়িতে তাজউদ্দিন আহমেদের লাশ আসে। সাথে আসে রক্তমাখা ঘড়ি স্যান্ডেল বুলেটের ক্ষেত্রসহ টিফিন ক্যারিয়ার আর বুলেটে ঝাঁঝরা কোরআন শরীফ।

১৯.
ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ যখন বঙ্গবন্ধুর খুনিদেরকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেও তাদের মনোনীত প্রেসিডেন্টের কাছে চীফ অফ আর্মি স্টাফ হবার জন্য আর্জি করে করে সময় নষ্ট করছিলেন, তখন মঞ্চে আবির্ভাবের জন্য ঢাকা শহরের এক প্রান্তে তৈরী হচ্ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহের। কর্নেল তাহের ছিলেন বাংলাদেশ আর্মিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; চেয়েছিলেন আর্মিকে গণমুখী ও সমাজতান্ত্রিক আদলে পুনর্গঠন করবেন; অন্য কোন সিনিয়ার অফিসার তার তত্ত্ব সমর্থন না করাতে হতাশ হয়ে পদত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন। সরকার তাকে চাকরী দেয় নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার সংস্থার ডিরেক্টর পদে। নিষ্ঠার সাথে কাজ করে চলেন কর্মস্থলে আর গোপনে যোগ দেন দেশের প্রধান বিরোধী পক্ষ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- যা সংক্ষেপে জাসদ নামে পরিচিত, গণআন্দোলন ও সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে একটি সশস্ত্র গণবাহিনী তৈরি করছিল, কর্নেল তাহের হন সেই গণবাহিনীর প্রধান। সরকারী চাকরী করে, সরকার থেকে ভরণপোষণ নিয়েও গোপনে একটি সশস্ত্র গণবাহিনী তৈরীর দায়িত্ব নিতে আদতে নীতিবান কর্নেল তাহেরের বাঁধে না।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও তার অঙ্গসংগঠন গণবাহিনী নিজস্ব গতিতে তৈরি হচ্ছিল একটা গণআন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের এবং দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে নিয়ে। কিন্তু ১৫ আগস্ট রশিদ-ফারুক-ডালিম গং তাদের হিসেব ওলটপালট করে দেয়। খন্দকার মোশতাকের ঘাড়ে চেপে রশিদ-ফারুক-ডালিম গং দেশ শাসন শুরু করলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও গণবাহিনী নতুন করে তাদের অংক কষতে শুরু করে। ৩ নভেম্বরের ঘটনায় জাসদ ও গণবাহিনী আর একবার ধাক্কা খেল। বারবার পট পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, নাগরদোলায় নতুন সওয়ার উঠছে কিন্তু তারা কিছুই করতে পারছে না এই উপলব্ধি জাসদ নেতাদের, বিশেষ করে কর্নেল তাহেরকে পীড়া দিচ্ছিল। অতএব আবারো নতুন কিছু ঘটার আগে নিজেদের কিছু একটা করতে হবে ঠিক করেন তারা।

একের পর এক মিটিং চলতে থাকে তাহেরের ভাই আবু ইউসুফের বাসায়। ঠিকানা ৩৩৬ এলিফ্যান্ট রোড। তাহের জাসদের মুল নেতাদের বুঝাতে থাকেন রাষ্ট্র এখন একটা ভালনারেবল জায়গায় আছে এবং সৈনিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে, তাই এখনই ইন্টারভিন করার সঠিক সময়। তাহের আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন গোপন সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে তিনি ক্যান্টনমেন্টের কন্ট্রোল নিতে পারবেন। জাসদের অন্যতম প্রধান নেতা ড. আখলাকুর রহমান অমত দিয়ে প্রশ্ন করেন এরকম একটা পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেবার মতো অবস্থায় পার্টি কি আদৌ আছে? তাহের বোঝান এই সময়ে ক্ষমতা দখলের সুযোগ হাতছাড়া করা হবে মারাত্মক ভুল। তাহের জানান জেনারেল জিয়ার সাথে তার আগেই যোগাযোগ হয়েছে এবং অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াকে বের করে এনে ক্ষমতায় বসাবেন তিনি; বলেন “জিয়াকে ক্ষমতায় বসিয়ে আমরা দ্রুত পার্টি লিডারদের কারামুক্তি নিশ্চিত করবো। তারপর আমরা একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবো।” কাজী আরেফ জিয়ার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন করলে তাহের বলেন “হি উইল বি আন্ডার আওয়ার ফুট।” পার্টির নেতারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হন না কিন্তু তাহেরের আত্মপ্রত্যয় তাদের প্রভাবিত করে। আরও প্রভাবিত করে সম্ভাব্য বিপ্লবের রোম্যান্টিসিজম। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে থাকা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দলের সদস্যদের মাধ্যমে সাধারণ সৈনিকদের বিপ্লবের সাথে সংযুক্ত করতে হবে।

জাসদ নেতাদের সাথে মিটিং শেষ করে তাহের বসেন তার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের সাথে। আর্মি থেকে পদত্যাগ করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেও পুরোপুরি ক্যান্টনমেন্টের ছায়া ছাড়েননি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের। গোপনে গোপনে সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়েছেন বিপ্লবের নেশা, ছড়িয়েছেন আর্মিকে গণমুখী করবার মন্ত্র, দিয়েছেন আশা এমন এক আর্মি গড়ার যেখানে সৈনিকরা অফিসারদের মতন বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাবে, স্বপ্ন দেখিয়েছেন এমন এক আর্মির যেখানে হাবিলদারের উপর আর কোন rank থাকবে না। যেসব সৈনিক তাহেরের দেয়া মন্ত্র, আশা ও স্বপ্ন বিশ্বাস করেছে তারা যোগ দিয়েছে তার নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থায়। তারা প্রশ্ন করেনি শিক্ষিত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসারদের বাদ দিয়ে স্বল্প শিক্ষিত সৈনিকরা কিভাবে সমাজ তৈরীতে অবদান রাখবে। তারা এ-ও প্রশ্ন করেনি কর্নেল তাহের একজন প্রাক্তন আর্মি অফিসার হয়ে এবং বর্তমানে সরকারের দেয়া চাকরীতে অধিষ্ঠিত থেকে কিভাবে এই সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও ‘অফিসারহীন’ আর্মির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।

২০.
নভেম্বরের ৫ তারিখ। খুব ভোরে মেজর নাসির, মেজর হাফিজ, কর্নেল গাফফার এবং খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত আরো কিছু অফিসার মিলিত হন পুরো পরিস্থিতিকে পর্যালোচনা করার জন্য। তারা সকলেই ইউনিফর্ম পরিহিত। যেয়ে দাঁড়ান ফোর ইস্টবেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টারের সামনে বিশাল এক আম গাছের নীচে। তাদের একটু শঙ্কিত দেখায়; একটি সফল অভ্যুত্থান করেও খালেদ মোশাররফের দোটানার মধ্যে থাকা এবং জনসাধারণকে গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা তাদেরকে অস্থির করে তোলে। তারা ঠিক করেন একটি খসড়া বক্তৃতা তৈরি করে খালেদ মোশাররফকে দেবেন। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে পয়েন্টগুলো লিখতে শুরু করেন মেজর নাসির।

সকালে আর্মি হেডকোয়ার্টারে মিটিং করেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ; অফিসারদের সাথে কথা বলেন, তাদের মনোভাব জানার চেষ্টা করেন। মিটিং শেষ করে খালেদ ফোর ইস্টবেঙ্গল ব্যাটেলিয়ানে আসেন; গাড়ী থেকে নামলে মেজর হাফিজ তাকে আম গাছের কাছে নিয়ে আসেন। হাফিজ ও গাফফার সংক্ষেপে খালেদকে তাদের আশঙ্কার কথা বলেন এবং তার হাতে চার পাতার একটি খসড়া বক্তৃতা দেন। হাফেজ ও গাফ্ফারকে মাঝপথেই থামিয়ে দেন খালেদ, বলেন “তোমরা যদি আগের মেজরদের মতন আচরণ শুরু করো তাহলে তোমরাই হাল ধরো। আমি যাই।“ তারপর বক্তৃতাটি একরকম ছুঁড়ে হাফিজকে ফেরত দিয়ে বলেন “আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ কেন দেব?” তরুন অফিসারেরা হতাশ হন আরো একবার কিন্তু খালেদকে আর কিছু বলতে পারেন না।

খালেদ অফিসে যেয়ে বসলে কেউ কেউ তাকে অনুরোধ করে সৈনিকদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে কারণ কোন কোন ইউনিটের সৈনিকরা বিচলিত ও ক্ষুব্ধ আছে। খালেদ এই অনুরোধটিও এড়িয়ে যান; তিনি ভাবছিলেন একবারে মেজর জেনারেলের rank পরে এবং চীফ অফ আর্মি স্টাফ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে সৈনিকদের সামনে যাবেন।

সেদিন দুপুরের আগেই খালেদ চীফ অফ আর্মি স্টাফ পদে অধিষ্ঠিত হন; বঙ্গভবনে বিমানবাহিনী প্রধান এম জে তোয়াব ও নৌবাহিনী প্রধান এম এইচ খান তাকে মেজর জেনারেলের rank পরিয়ে দেন। কর্নেল শাফায়েত জামিল এসময় তাকে আবারো বলেন রেডিও ও টিভিতে জাতীকে বর্তমান পরিস্থিতি অবহিত করে ভাষণ দেবার। খালেদের তখনও এক কথা, নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যিনি দায়িত্ব নিবেন কেবল তিনিই ভাষণ দেবেন।

সন্ধ্যায় শাফায়াত জামিল তোয়াব, এম এইচ খান এবং আর কিছু অফিসার নিয়ে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের বাসভবনে যান। সেখানে কর্নেল শাফায়াত জামিল বিগত ৮০ দিনের ঘটনাবলী তার নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান বিচারপতিকে সবিস্তারে বর্ণনা করেন; তারপর ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য এবং অর্জিত সাফল্যের কথাও জানান।

প্রধান বিচারপতির মুখে তখনো তটস্থ ভাব। এবার শাফায়েত যান তার মূল বক্তব্যে; তিনি প্রধান বিচারপতিকে বলেন, “দেশ এবং জাতির স্বার্থে এখন আপনাকে রাষ্টপতির পদ গ্রহণ করতে হবে।” একথা শুনে প্রধান বিচারপতি কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন; তাকে দেখে উপস্থিত অফিসারদের মনে হয় তিনি এখন যা শুনেছেন তা বিশ্বাস করতে পারছেন না; শাফায়েত এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করে “স্যার আপনি বুঝতে পেরেছেন আমি কি বলেছি? আরও কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রধান বিচারপতি মাথা নাড়েন এবং প্রশ্ন করেন “কবে নাগাদ নির্বাচন দেবেন বলে আপনারা আশা করছেন?” জামিল এর উত্তরে বলেন “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।” বিচারপতি এবার উপস্থিত সকল অফিসারদের দিকে তাকিয়ে বলেন “আমার মেয়ে এবং মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে একটু আলাপ করবো, আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিন।”

অফিসারেরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকেন। বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না, পাঁচ মিনিট হবার আগেই বিচারপতি সায়েম ফেরত আসেন এবং অফিসারদের জানান রাষ্ট্রপতির পদ নিতে তার সম্মতি আছে।

রাত ৯ টায় বিচারপতি সায়েমকে বঙ্গভবনে নিয়ে আসা হয়। জেনারেল ওসমানী তাকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আবশ্যকতা তুলে ধরেন। রাত এগারটার সময় খন্দকার মোশতাকের কাছ থেকে পদত্যাগ পত্র নিয়ে নেয়া হয়। তিনি পদত্যাগ পত্র দিয়ে আগামসী লেনে চলে যান। শেষ হয় তার ৮৩ দিনের রাজত্ব।

২১.
নভেম্বরের ৬ তারিখ সকাল ১০টায় বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বাংলাদেশের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথগ্রহণ করেন; তিন বাহিনী প্রধান সেখানে উপস্থিত থাকেন। শপথগ্রহণ হয়ে গেলে কিছু সেনা অফিসার নতুন রাষ্ট্রপতিকে তার নির্দিষ্ট রুমে নিয়ে যায়। ঠিক হয়, একটু পর বেতার এবং টেলিভিশনে তাঁর ভাষণ সম্প্রচার করা হবে। রাষ্টপতির ভাষণে কোন কোন বিষয়ের উল্লেখ থাকবে তার একটি মৌখিক বিবরণ দিতে শুরু করেন খালেদ মোশাররফ। বিচারপতি সায়েম শপথ গ্রহণের সময় নিয়ে এসেছেন তার আস্থাভাজন সচিব ওবায়দুল্লাহ খানকে। খালেদের দেয়া পয়েন্টগুলো ওবায়দুল্লাহ খান নোট করে নিচ্ছিলেন। এমন সময় একটু দ্বিধাগ্রস্ত ভাবেই মেজর নাসির তার পকেট থেকে গতদিনের তৈরি করা বক্তৃতাটি বের করেন এবং খালেদের দিকে বাড়িয়ে দেন। খালেদ এক নজর চারপৃষ্টার বক্তৃতাটি দেখে কাগজগুলো ওবায়দুল্লাহ খানের দিকে এগিয়ে দেন। ওবায়দুল্লাহ খান পুরো বক্তৃতা পড়েন এবং বলেন “এখানে তো মোটামুটি সবই আছে, সামান্য কিছু পরিবর্তনের দরকার শুধু, সেনাপ্রধানের পরিবর্তে বক্তৃতাটি এখন করবেন রাষ্ট্রপতি এইটুকুই যা।”

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান আসেন তার অফিসে। সাথে নিয়ে আসেন মেজর নাসিরকে। নুরুজ্জামান চেয়ারে বসার পরপরই রক্ষীবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের এক অফিসার এসে তাকে কিছু প্রচারপত্র দেখান যার কিছু ছাড়া হয়েছে বিপ্লবী সৈনিকের নামে, কিছু ছাড়া হয়েছে মুসলিম লীগের নামে। দুই প্রচারপত্রের ভাষা অভিন্ন যেখানে খালেদ মোশাররফকে দেশদ্রোহী ও ভারতের দালাল আখ্যা দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে বাংলাদেশকে তিনি ভারতের কাছে বিক্রি করে দিতে চান। মুসলিম লীগের প্রচারপত্রে অবশ্য এক বাক্য বেশী; সেখানে বলা আছে খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য হলো বাকশালের পুনরুত্থান। মেজর নাসির টেলিফোন করেন মিলিটারি পুলিশের মেজর আমিনকে। আমিন তাকে জানান যে তিনি প্রচারপত্র সম্পর্কে কিছু জানেন না তবে ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটেলিয়ান এবং বেঙ্গল লান্সারসের সৈনিকদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সমসাময়িক সময়েই ক্যাপ্টেন তাজ প্রচারপত্রের কিছু কপি হাতে নিয়ে ব্রিগেড মেজর হাফিজের রুমে ঢুকেন। একটা প্রচারপত্রর দিকে ক্যাপ্টেন তাজ হাফিজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যেখানে সৈনিকদের দাবি-দাওয়া উল্লেখ রয়েছে যার মধ্যে আছে অফিসারদের জন্য batman প্রথা বাতিল, অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে সকল ব্যবধান দূর করা এবং সৈনিকদের মধ্য থেকে অফিসার নিয়োগ করা। মেজর হাফিজ ভেবে পান না কোন নির্বোধের মাথা থেকে এসব আসে যে স্বল্পশিক্ষিত সৈনিক এবং উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে ব্যবধান কমানো যাবে আর স্বল্পশিক্ষিত সৈনিকদের মধ্যে থেকে অফিসার নিয়োগ করা হবে।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে খালেদ মোশাররফ ক্যান্টনমেন্টে ফেরত আসেন এবং বেলা ১১ টায় ফরমেশন কমান্ডারদের নিয়ে কনফারেন্স করেন; কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন খালেদের একান্ত বিশ্বস্ত রংপুরের ব্রিগেড কামান্ডার নাজমুল হুদা এবং একান্ত অবিশ্বস্ত ও আস্থাহীন যশোর ব্রিগেড কামান্ডার মীর শওকত। কনফারেন্সের পর ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত কিছু সময় চান খালেদের কাছে, ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টারের এক ঘরে বসে দুজন রুদ্ধদ্বার মিটিং করেন; মিটিংয়ের বিষয়বস্তু খালেদ কর্নেল শাফায়েত জামিলকে বা মেজর হাফিজকে জানান না। শাফায়েত জামিল মনঃক্ষুণ্ণ হন কিন্তু নিজে থেকে কোন প্রশ্ন করেন না।

দুপুরে কর্নেল শাফায়াত জামিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম এ গাফফারকে নির্দেশ দেন একটি পদাতিক কোম্পানিকে মহাখালী চৌরাস্তায় এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করাতে, যাতে গুলশান-বনানীর দিক থেকে কোনো বিদেশি শহরে আসতে না পারেন এবং কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পারেন।

বিকেলে মেজর সাখাওয়াত কর্নেল শাফায়াত জামিলকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লিফলেট সম্পর্কে জানান যেগুলোর মাধ্যমে সৈনিকদের খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা হচ্ছে। শাফায়াত জামিল তা খালেদকে জানালে খালেদ ট্যাংক রেজিমেন্টে যান সৈনিকদের শান্ত করতে। ছোট একটি বক্তৃতা তিনি দেন সেখানে, যার পরিপ্রেক্ষিতে তার মনে হয় সৈনিকদের আশ্বস্ত করা গেছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আশ্বস্ত হয়না। জাসদ ও বিপ্লবী সেনা সংস্থার প্ররোচনায় তারা বিশ্বাস করেছে খালেদ মোশাররফ ভারতীয় দালাল, তারা বিশ্বাস করেছে খালেদ মোশাররফ আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসাবেন।

কর্নেল গাফফার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লিফলেট সম্পর্কে জানতে পেরে হাবিলদার মেজর আবদুল হাইকে বললেন ব্যাটেলিয়ানের সবাইকে একত্রিত করতে। সব সৈনিক একত্রিত হলে কর্নেল গাফফার প্রশ্ন করেন “এই লিফলেট কারা ছেড়েছে?” হাবিলদার আবদুল হাই যিনি যে কিনা নিজেই লিফলেট ছেড়েছে সৈন্যদের মধ্যে, আগ বাড়িয়ে বলে ‘স্যার আমাদের ব্যাটেলিয়ানের ভেতর অনেক সিভিলিয়ান আসা-যাওয়া করে আমরা কিছুই জানিনা। এখন থেকে সতর্ক থাকব এবং ডিউটি করবো কারা লিফলেট ফেলে।’ কর্নেল গাফফার টের পেলেন না বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা কত প্রকটভাবে ঢুকে গেছে তার ইউনিটে।

সন্ধ্যা ৭ টার সময় খালেদ মোশাররফ তার বাসা ৫৬, স্টাফ রোডে যান। তাকে খুব হাসিখুশি ও উৎফুল্ল দেখায়। আগ্রহ ভরে গত কয়েকদিনের ঘটনা তিনি তার স্ত্রীকে শোনান। রাতে তারা একত্রে খাবার খান। সাথে ছিলেন খালেদের প্রিয় অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার।

২২.
নভেম্বরের ৩ ও ৪ তারিখের তুলনায় ৫ তারিখ ও ৬ তারিখের প্রথমভাগ ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবন উত্তাপহীন কাটালেও এলিফ্যান্ট রোডের ৩৩৬ নম্বর বাসাটিতে প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভুত হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহের অনবরত মিটিং করে চলছেন সেখানে। এসব মিটিংয়ে বেঙ্গল ল্যান্সারের সারওয়ারের নেতৃত্বে মুশতাক-ফারুক-রশিদ অনুগত কিছু সৈনিকও উপস্থিত। মোশতাক-ফারুক-রশিদ অনুগত এসব সৈনিকদের তাহেরের গণমুখী বাহিনী তৈরী করার বা সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বে কোন আগ্রহ নেই। রশীদ-ফারুকরা এদের রেখে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াতে তারা হয়ে পড়েছে অসহায়। এরা কর্নেল তাহেরের অভ্যুত্থানে যুক্ত হয়েছে খালেদ মোশাররফ এবং তার সঙ্গের অফিসারদের পরাজিত করে আবার ক্ষমতাশালী হওয়ার জন্য। মোশতাকের ডানপন্থী আর জাসদের বামপন্থীরা প্রথমবারের মত এক হয়েছে- খালেদ মোশাররফকে সরিয়ে দিতে হবে।

জাসদ ও মুসলিম লীগ সমস্ত শহর ও ক্যান্টনমেন্টে হাজার হাজার লিফলেটে ভরিয়ে দেয়। খালেদের অভ্যুত্থানের পেছনে ভারত কাজ করছে বলে প্রচার তুঙ্গে উঠে। ডানপন্থী ও বামপন্থী সর্বশক্তি নিয়োগ করে খুব দ্রুত একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে বিশ্বাসঘাতক ও ভারতের দালাল হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে লাগে। সফলও হয় তারা।

ক্যান্টনমেন্টে ছড়ানো লিফলেট পড়ে সৈনিকরা তাঁতিয়ে উঠলো। বিপ্লব সফল হলে কোন অফিসার তাদের উপরে থাকবে না; তারাই কম্যান্ড করবে আর্মি; তাদের বেতন, আবাসন ও রেশন হবে আফিসাররা যা পায় তাই – লিফলেটের এই চটক সহজেই আকৃষ্ট করে সৈনিকদের।

৬ তারিখ সন্ধ্যার পর গুলশানের এক বাসায় বসে চূড়ান্ত মিটিং। অংশ নেয় জাসদের নেতারা, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা এবং সাধারণ সৈনিকরা। সিদ্ধান্ত হয় তাহের ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থেকেই অভ্যুত্থান পরিচালনা করবেন। তাহের সবাইকে অভ্যুত্থানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করেন এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের নেতা গোত্রের যারা আছে তাদের ছয়টি দলে ভাগ করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। সুবেদার মাহবুবকে দায়িত্ব দেয়া হয় সেন্ট্রাল অর্ডিন্যান্স ডিপো দখল করে অস্ত্রাগারের অস্ত্র সদস্যদের মধ্যে বিলি করার এবং ওপেন ফায়ার করে বিদ্রোহের সূচনা সংকেত দেবার। হাবিলদার আব্দুল হাইকে দায়িত্ব দেয়া হয় জেনারেল জিয়াকে ৬ নং মইনুল রোডের বাসা থেকে তুলে এলিফ্যান্ট রোডে নিয়ে আসার। নায়েক সিদ্দীক ও সারওয়ারকে দায়িত্ব দেয়া হয় খালেদ মোশাররফকে বন্দী করার। হাবিলদার সুলতানকে দায়িত্ব দেয়া হয় অফিসারদের ধরে এনে সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে আটক করে রাখতে। সবাই উত্তেজিত। এক সৈনিক বলে বসে “জিয়া আর খালেদকে বন্দী করার প্রয়োজন কি? মেরে ফেললেই তো হয়।” তাহের এই প্রশ্ন শুনে থমকে যান। তিনি জানেন মৃত জিয়ার কোন মূল্য নেই, ক্ষমতা দখলের জন্য তার প্রয়োজন জীবিত জিয়া; তাই দ্রুত সামলে নিয়ে বলেন “জিয়াকে মুক্ত করে আমার কাছে নিয়ে আসতে পারার মধ্যেই আমাদের পুরো অভ্যুত্থানের সাফল্য নির্ভর করছে। সুতরাং খুব সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে।” খালেদ মোশাররফ সম্পর্কে তিনি কিছু বলেন না। যাদের বোঝার তারা বুঝে নেয়।

মিটিং শেষ করে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট ফেরত এসে যোগ দেয় বিভিন্ন ইউনিটে। সবাইকে তৈরী থাকতে বলে। সব সৈনিকরা তখন ক্ষুব্ধ হয়ে আছে; সবার একই সংকল্প, জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে, ভারতের দালাল খালেদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে হবে।

বিভিন্ন ইউনিট নিজেদের উদ্দ্যোগেই ছোট ছোট দল গঠন করে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করার লক্ষে।

২৩.
৬ নভেম্বর। রাত সাড়ে দশটা। টু-ফিল্ড আর্টিলারির সুবেদার মেজর আনিস তার বিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে একটা দল গঠন করেছে। সে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য নয় তবে সে সিপাহী বিদ্রোহের ডাকে সাড়া দিয়েছে। তার প্রাণপ্রিয় চীফের গৃহবন্দিত্ব সে মেনে নিতে পারেনি মোটেও। মেজর মহিউদ্দীনকে আনিসের কাছের মানুষ মনে হয়। এই মেজর মহিউদ্দীন ১৫ আগস্ট কর্নেল রশিদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর বাড়ী আক্রমণ করেছে। আনিস নিরূপণ করে একজন অফিসার তাদের সাথে থাকলে জেনারেল জিয়াকে মুক্তির মিশন গতি পাবে। সে মহিউদ্দীনকে বলে “স্যার, আপনি আমাদের সাথে থাকেন। আমরা জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে আনবো।” মেজর মহিউদ্দীনের সময় তখন দোলাচলে কাটছে। তার সাথীরা সবাই চলে গেছে ব্যাংকক। জেনারেল খালেদ ও কর্নেল শাফায়েত জামিল প্রকাশ্যে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করা হবে। একমাত্র জিয়া আর্মি চীফ থাকলেই সে বাঁচবে, তাই তার বাজির সবটাই জিয়াকে মুক্ত করার মিশনে রাখতে সে রাজী হয়। মহিউদ্দীন আনিসকে জানায় “আমি যাবো আপনাদের সাথে।”

পরবর্তি পর্ব- পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় উত্থান, পতন ও অবস্থান (তৃতীয় পর্ব)

 

তথ্যসূত্রঃ

লেখক ওয়াসীম সোবহান চৌধুরী পেশায় গবেষক ও বিশ্লেষক। লেখালেখি তার নেশা; নিয়মিত লিখেন তার নিজের ব্লগে। ‘বাতাস পরিবর্তনের গল্প ও অন্যান্য’ নামে তার একটি গল্পের বই বেরিয়েছে অগ্রদূত প্রকাশনী থেকে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top