টুকিটাকি

ডুবঃ যা দেখলাম, যা বুঝলাম

ডুবঃ যা দেখলাম, যা বুঝলাম

২০১৪ সালের অক্টোবার মাসের ২৪ তারিখ। শুক্রবার। সেদিন আমার মেডিকেল এর ভর্তি পরীক্ষা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও সিট পড়েছিল, আর পরীক্ষা ছিল সকাল দশটায়।

একপ্রকার বাসার জোরাজুরিতে যেহেতু এই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা, তাই কোন প্রকার প্রস্তুতি ছিল না। প্রস্তুতি না থাকায় পরীক্ষাও হল যাচ্ছেতাই। এটা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা যেহেতু ছিল না তাই পরীক্ষা শেষ করে চলে গেলাম বলাকা সিনেমা হলে। সেদিনই মুক্তি পেয়েছিল মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী পরিচালিত সিনেমা “পিঁপড়াবিদ্যা”। মুলত এই সিনেমা দেখতেই যাওয়া বলাকায়। দুপুরের শো’তে ঢুকলাম টিকেট কেটে। হলে কানায় কানায় ভর্তি দর্শকে। ভালই লাগছিল। এত দর্শকের সাথে এর আগে আমি কোন সিনেমা দেখি নি (এটা ছিল হলে আমার তৃতীয় সিনেমা), তাই সিনেমা দেখার একটা সেরা অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ফেরার পর থেকে নিজের এই অসাধারণ অভিজ্ঞতা ফেসবুকে শেয়ার করার এক অভূতপূর্ব তাড়না অনুভব করতে লাগলাম। তখন বিভিন্ন ব্লগে একটু আধটু ঘুরাঘুরি করতাম। মাঝে মাঝে এক দুই শব্দ লিখতাম। বায়োস্কোপে যেতাম শুধুই পড়তে। সেখানে লোকেদের সিনেমার রিভিউ দেখে আমারও শখ জাগল সিনেমার রিভিউ লেখার। আর এইবার “পিঁপড়াবিদ্যা” অর্জনের পর সে ইচ্ছাগুলো যেন পাখা মেলতে শুরু করল। লিখে ফেললাম দু কলম “পিঁপড়াবিদ্যা” নিয়ে। ফেসবুকে পোস্ট করার আগে কেন যেন কপি করে মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী ভাইকে ইনবক্সে পাঠালাম সেই রিভিউ (তথাকথিত রিভিউ)। কোন এক্সপেকটেশন ছিল না সেই ম্যাসেজ নিয়ে।

কিন্তু ম্যাসেজ পাঠানোর মিনিট দশের মাথায় ফারুকী ভাই আমার বার্তার উত্তর পাঠালেন। বললেন যে ভাল লিখেছি। তিনি লেখাটা শেয়ার করতে বললেন। সেই মূহুর্তটা এখন যতটা সহজে বলে ফেললাম সেদিনের আনন্দটা এতটা প্রাণহীন ছিল না। কি পরিমাণ ভালোলাগা যে সেদিন আমার মাঝে কাজ করছিল তা আমি কোনোদিনই বলে বোঝাতে পারবো না।

এরপর থেকে মুভি রিভিউ লেখার একটা ভূত চেপে বসল মাথায়। সেই থেকে শুরু। তারপর অপেক্ষা করছিলাম মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর নতুন সিনেমার জন্য। সে সিনেমার রিভিউ লেখার জন্য। ঠিক তিন বছর পর মুক্তি পেল মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী’র নতুন সিনেমা “ডুব- নো বেড অফ রোজেস” । প্রথম দিনের প্রথম শো’তেই দেখে নিলাম “ডুব”। আর সিনেমাটিকে ঘিরে আমার ভালোলাগা – মন্দ লাগার বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা জানাতে সিনেমা পর্যালোচনের এই প্রয়াস।

প্রথম দিনের প্রথম শো তে ‘ডুব’ দেখার পর ভাললাগার অনুভূতি লিখে ফেসবুকে পোস্ট করলাম। আমার লেখা পোস্ট টি জাজ, ছবিয়াল তাদের পেজে শেয়ার করল। খুব কনফিডেন্স নিয়েই “ডুব” সিনেমার রিভিউ লিখতে বসলাম। এরপর একে একে সব খারাপ আর বাজে বাজে রিভিউ দেখার পর দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলাম, আসলেই কি এতটা খারাপ ছিল মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর ‘ডুব- নো বেড অফ রোজেস’? আবার গেলাম সিনেমা হলে। আবার দেখলাম এবং নতুন উদ্যম নিয়ে আবার লেখা শুরু করলাম। যে কারণে এতটা দেরি হয়ে গেল।

কুশীলব
ইরফান খান (জাভেদ হাসান)
নুশরাত ইমরোজ তিশা (সাবেরী)
রোকেয়া প্রাচী (মায়া)
পার্ণো মিত্র (নিতু)
নাদের চৌধুরী

গল্প সংক্ষেপ
সাবেরী আর নিতুর বন্ধুত্ব সেই ছোটবেলায় পুতুলখেলার সময় থেকে। এক সাথেই বেড়ে উঠেছে দুইজন। কিন্তু মাঝে কয়েকটি বড় বড় ঘটনার আকস্মিকতায় ছেদ পরে দুজনের বন্ধুত্বে। কেটে যায় আরও কিছু বছর। কলেজের রি-ইউনিয়নে দেখা হয় দুই বন্ধুর। দুজনের চোখের সামনে ছবির মতন ভেসে ওঠে অতীতের দিনগুলো।

গান
মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর এর শেষ তিন সিনেমার মতন এই সিনেমাতেও মাত্র একটি গান ব্যবহার করা হয়েছে। আগের তিন সিনেমার মত এই সিনেমার গানও করছে চিরকুট। “আহারে জীবন” শিরোনামের গানটি হয়েছে একটি অপ্রতিম গান। এছাড়া সিনেমার একাংশে একটি রবীন্দ্রসংগীতের অংশ বিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে আবহ সঙ্গীত বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আকারে।

সার্বিক মূল্যায়ন
বিশ্লেষণ অংশের শুরুটা কিভাবে করবো, কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। মাঝে কেটে গেছে কয়েকটা দিন। তবুও কিছুই লিখতে পারি নি। দ্বিতীয়বার যেতে হল প্রেক্ষাগৃহে । আবার দিলাম ‘ডুব’। এবারের বিলোকন আরো খড় দৃষ্টিতে। দুইবারে যা দেখলাম এবার তা বলার পালা।

সবার প্রথমে গল্পের প্রসঙ্গে আসি। “ডুব” সিনেমায় যে গল্পটি বলা হয়েছে তা একজন বাবার গল্প। গল্পটা এমন গল্প একে একেবারে অসাধারণ একটা গল্প যেমন বলা যাবে না আবার সরাসরি সাধারণ গল্পের কাতারে একে দাঁড় করালে নেহায়েত অবিচারই হবে বটে। সে বিবেচনায় এই সিনেমার গল্পটিকে সাধারণভাবে অসাধারণ (ordinarily extraordinary) কিংবা অসাধারণভাবে সাধারণ (extraordinarily ordinary) বলা যেতে পারে। আর এই গল্প বলতে গিয়ে পরিচালক জীবন আর সিনেমা, কল্পনা আর বাস্তবতা এক সাথে এক ফ্রেমে এনে বেঁধেছেন। নান্দনিক এই গল্পটি দেখার সময় একজন দর্শক হিসেবে আমার গল্পে অতিরঞ্জন যেমন চোখে পড়েনি তেমনি কোথাও রঙচটা কিংবা বিবর্ণও মনে হয়নি। একে বারে পরিমাণ মত দেয়া হয়েছে সব। পরিচালকের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের উজার করে দিয়েছেন পর্দায় থাকা সিনেমার শিল্পীরা।

ব্যক্তিগত ভাবে আমার সবচেয়ে উজ্জ্বল মনে হয়েছে নুশরাত ইমরোজ তিশাকে। নির্দ্বিধায় ইরফান খান একজন গুনী অভিনেতা। এই নিয়ে দ্বিমত পোষনণ করার কিছু নেই। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের সকলেই ইরফান খানের অভিনয়ের জাত চেনেন। কিন্তু “ডুব” সিনেমায় সেই ইরফান খানের অভিনয়েই আমার কিছুটা গোলোযোগ ছিল বলে মনে হয়েছে। খুব নিবিড় ভাবে নিরীক্ষণ করলেই, কেবল একজন দর্শকের নিকট “ডুব” সিনেমায় ইরফান খানের অসহায়ত্ব প্রতীয়মান হবে। ভাষাই এর পেছনে মূল হেতু বলে আমার মনে হয়েছে। তার সুদক্ষ অভিনয় আর শিল্পকুশল অভিব্যক্তির মিশেল তার অসহায়ত্বের জায়গাগুলো আঁচ করতে দেয়নি। সব ধরণের চরিত্রে সাবলীল যে ইরফান খানকে আমরা দেখে অভ্যস্থ “ডুব” সিনেমায় সে সাবলীলতার কিছুটা অপ্রতুলতা থাকলেও তার অভিনয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার কোন কমতি ছিল না। এই।

সিনেমায় স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের আরো দুটি নাম হল রোকেয়া প্রাচী আর পার্ণো মিত্র। রোকেয়া প্রাচী অনেক দিনের সুপরীক্ষিত অভিনেত্রী। তাকে নিয়ে কিছু বলার নেই। দুবাক্য বলতে চাই পার্ণো মিত্রকে নিয়ে। সত্যি বলতে এই সিনেমা দেখার পর পার্ণো মিত্রকে নতুন ভাবে জানলাম। পর্দায় তার উপস্থিতির ব্যাপ্তিকাল খুব বেশি সময় না হলেও সময়ের তিনি সদ্ব্যবহারই করেছেন বলতে হবে। অন্যান্য ছোট ছোট চরিত্রগুলোতে যারা অভিনয় করেছেন সবার অভিনয়েই পটুতা উল্লেখ করার মতন।

মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর সিনেমায় ঢাকাকে বরারবই অচেনা মনে হয়। ব্যত্যয় ঘটেনি ডুবেও। সাথে সিনেমার লোকেশন গুলোর সৌন্দর্য আলোচনার বাহিরে রাখা হবে গুরুতর অন্যয়।
“ডুব” সিনেমার গান নিয়ে বলা হয়েছে বলার বাকি আবহ সঙ্গীত বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ে। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ভাল খারাপ দিক আমি কিছু বলবো না, শুধু বলবো এই সিনেমার “আহারে জীবন” গানটি যেমনি ভাবে কলিজা শীতল করেছে তেমনি সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সময়ে সময়ে কলিজার ঠান্ডা-গরমের দায় নিয়েছে ঠিক যেন এয়ার কন্ডিশনারের মতন।

পরিচালকের অন্যান্য সিনেমার গুলোর মতন এই সিনেমাতে নিজস্বতা বজায় রেখেও যুক্ত করেছেন নতুন নতুন মাত্রা। ‘ডুব’ সিনেমার একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল নিঃশব্দের শব্দ। সিনেমার অনেকটা জায়গা ছিল যেখানে কোন সংলাপ রাখা হয়নি, তারপরে সে দৃশ্যগুলোতে যে অন্তহীন গভীরতা ছিল তা আঁচ করতে একটু মাথা খাটাতেই হবে।

সিনেমা গতি নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই তবে সিনেমার চিত্রনাট্য নিয়ে এক দুটি কথা না বললেই নয়। সিনেমাটির চিত্রনাট্য নিয়ে আরেকটু বোধ হয় কাজ করার দরকার ছিল। এতে করে চিত্রনাট্য আরেকটু দৃঢ় হতে পারেতো। তবে আমার সিনেমার চিত্রনাট্যটিকে কখনো কখনো দুর্বোধ্য মনে হয়েছে কিন্তু দূর্বল মনে হয়নি।

সব মিলিয়ে ‘ডুব’ আমার কাছে গুণকীর্তন করার মতন উচ্চমার্গীয় মনে হয়নি সত্যি কিন্তু দুইবারই দেখার সময় ভাল লেগেছে।

পরিশষ্ট
কিছু কিছু গান আছে, সে গানগুলো কেবল লাউডস্পিকার দিয়ে শুনতে ভাল লাগে। আবার এমনও কিছু গান আছে যেগুলো হেডফোনে শুনলে যতটা ভাল লাগে স্পিকার কিংবা লাউডস্পিকারে শুনলে ভালোলাগার সে অনুভূতি কাজ করে না। ‘ডুব’ তেমনি হেডফোনের শোনা গানের মত একটা সিনেমা। যতটা না পর্দায় চোখ রেখে দেখতে হবে তার চাইতে বেশী অনুভব করতে হবে।
ডুব অনুভব করে দেখুন। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করুন ভাল লাগবে সিনেমাটি। ভাল লাগার মতই হয়েছে সিনেমাটির গল্প।

পুনশ্চ
‘ডুব’ সিনেমাটি হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক কিনা, এই বিষয় নিয়ে বাদানুবাদ রয়েছে। আমি বলবো যে আমি সিনেমা হলে হুমায়ূন আহমেদের বায়োগ্রাফি দেখতে যাই নি। আমি একটি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। আমি হুমায়ূন আহমেদের জীবনীর সাথে সিনেমাটির গল্পটিকে তুলনা করলে মিল হয়তবা পেতাম । কিন্তু তুলনা করার দরকারটা কি?

Most Popular

To Top