ইতিহাস

ডঃ কুদরত ই খুদা ও তার জীবন

ডঃ কুদরত ই খুদা ও তার জীবন- Neon Aloy

ডঃ কুদরত ই খুদা একাধারে বাংলাদেশের বিশিষ্ট রসায়নবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং একজন শিক্ষাবিদ। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী, আলোর পথের দিশারী। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি।

কুদরত ই খুদার জন্ম ১৯০০ সালের ১ লা ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের মাড়্গ্রামে, তার নানাবাড়ীতে। তার জন্ম হয়েছিলো রক্ষণশীল এবং সেই সাথে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তার বাবা খোন্দকার আব্দুল মুকিত এবং মা ফাসিয়া খাতুন। জনাব আব্দুল মুকিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পাশ করেন। কিন্তু তিনি চাকরি না করে পরিবারের ইচ্ছায় ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করেন।

কুদরত ই খুদার প্রথম শিক্ষাস্থান ছিল মক্তব। কিন্তু সেখানে বেশীদিন টিকতে পারেননি। হাফেযের নির্মমতার জন্য। কুদরত ই খুদা একদিন মক্তবে গিয়ে দেখেন তার সহপাঠীকে ঝুলিয়ে রেখে শাস্তি প্রদান করছে স্বয়ং হাফেজ। সেই শাস্তি পদ্ধতি তার শিশুমনে এতই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যে তিনি আর মক্তবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শেষে পরিবারের শত চেষ্টাতেও তাকে মক্তবমুখী করা যায় নি। মক্তবের পাট চুকিয়ে তাকে তার বড় মামার কাছে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে তিনি উডবার্ন এম.ই. স্কুলে ভর্তি হন। বাংলার প্রচলন না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে উর্দুতে শিক্ষাচর্চা করতে হয়।

স্কুলে থাকা অবস্থায় একাধিকবার তিনি বিভিন্নরকম বৃত্তি পেয়েছেন। তারপর তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে মেধা তালিকায় প্রথম দশের মধ্যে থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ডঃ কুদরত ই খুদার পরবর্তী গন্তব্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ। রসায়নশাস্ত্রের প্রতি তার ভালবাসা এবং দখল উভয়ই ছিল অসাধারণ। কথিত আছে অধিকাংশ সময়েই তাকে ল্যাবরেটরিতে কাটাতে দেখা যেতো। অবশেষে ১৯২৫ সালে রসায়নে ১ম বিভাগ পেয়ে এম.এস.সি. পাশ করেন, তার ফলাফলের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে পুরস্কৃত করেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাড়ার পরেই তার কর্মজীবন শুরু হয় আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রভাষক হিসেবে। কর্মররত অবস্থাতেই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ পেয়ে লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি ডি.এস.সি. ডিগ্রীর জন্য অধ্যাপক থর্পের অধীনে গবেষণা করেন। অবশেষে ১৯২৯ সালে তিনি আকাঙ্খিত ডি.এস.সি. লাভ করেন।

ডঃ কুদরত ই খুদা ১৯২৯ সালে দেশে ফিরে আসেন। এ সময় তার অধ্যাপক বর্মনের সাথে পরিচয় হয়। অধ্যাপক বর্মনের উৎসাহেই কুদরত ই খুদা প্রেমচাদ-রায়চাদ বৃত্তির জন্য থিসিস সাবমিট করেন এবং যথারীতি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৩১ সালে তিনি আবার শিক্ষকতা শুরু করেন তার সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯৩৬ সালে তিনি প্রোমোশন পেয়ে বিভাগীয় প্রধান পদে উন্নীত হন। ১৯৪২ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের একান্ত অনুরোধে কুদরত ই খুদা ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। সফলতার সাথে সেখানে দায়িত্ব পালন করে ১৯৪৬ সালে পুনরায় কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রত্যাবর্তন করেন।

দেশভাগের পর কুদরত ই খুদা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এসে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জনশিক্ষা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর পাকিস্তান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। ওখানে চাকরির নির্ধারিত মেয়াদ ফুরোনোর আগেই ইস্তফা দিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ১৯৬৩ সালে তিনি তার বর্ণাঢ্য চাকরিজীবনের ইতি টানেন। একই বছর তিনি বাংলা কেন্দ্রীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন।

কুদরত ই খুদা ইংল্যান্ডে থাকাকালীন অবস্থায় Stainless Configuration of Multiplanmet Ring নিয়ে গবেষণা করেন। বহু নামকরা জার্নালে তার তার লেখা প্রকাশিত এবং প্রশংসিত উভয়ই হয়েছিলো। দেশে ফিরে তার উল্লেখযোগ্য গবেষণা – মৃত্তিকা, কাঠকয়লা, পাট, লবণ ইত্যাদি। ডঃ কুদরত ই খুদা এবং তার সহকর্মীদের মোট আঠারোটি আবিষ্কারের পেটেন্ট ছিল। তন্মধ্যে পাটকাঠি থেকে রেয়ন, পাটকাঠি থেকে কাগজ, গুড় থেকে মল্ট ভিনেগার আবিষ্কার উল্লেখযোগ্য।

দেশ স্বাধীনের পূর্বে পাকিস্তান সরকার এবং দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ সরকার তাকে অসংখ্য পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছে। তার মধ্যে একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার ( মরণোত্তর ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার পাকিস্তান সরকার তাকে তঘমা ই পাকিস্তান, সিতারা ই ইমতিয়াজ সহ ইত্যাদি সম্মানে ভূষিত করে।

দেশ স্বাধীনের পর কুদরত ই খুদার প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল শিক্ষা কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া। স্বাধীন দেশের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করা। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই প্রণিত সুপারিশমালা অনুযায়ী ডঃ কুদরত ই খুদাকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট নাম এটি প্রকাশিত হলেও পরবর্তী সময়ে কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশন নামেই বেশী খ্যাত হয়।

কুদরত ই খুদার লেখা বইগুলো হচ্ছেঃ

১। বিজ্ঞানের সরস কাহিনী
২। বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী।
৩। বিজ্ঞানের সূচনা
৪। জৈব রসায়ন ( চার খন্ডে সমাপ্ত )
৫। পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা
৬। পরমাণু পরিচিতি
৭। বিজ্ঞানের পহেলা কথা
৮। যুদ্ধোত্তর বাংলার কৃষি ও শিল্প
৯। বিচিত্র বিজ্ঞান
১০। পবিত্র কুরআনের পূত কোথা
১১। অঙ্গারী জওয়ারা।

এছাড়াও তিনি দেশ স্বাধীনের পূর্বে ১৯৬৩ সালে পুরোগামী বিজ্ঞান ও দেশ স্বাধীনের পর বিজ্ঞানের জয়যাত্রা নামে দুটি সাময়িকী সম্পাদনা করেন ।

১৯৭৭ সালের এই দিনে অর্থাৎ ৩রা নভেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। আজকে বাংলাদেশের এই সূর্য সন্তানের ৪০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নিয়ন আলোর পক্ষ থেকে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

Most Popular

To Top