ইতিহাস

জনতার জীবন বড়, নাকি নেতার নীতি?

জনতার জীবন বড়, নাকি নেতার নীতি?- Neon Aloy

জুলাই ১৩, ১৯৯৪।
হাভানা, কিউবা

রাত তিনটার দিকে অন্ধকারের আড়াল নিয়ে একটা টাগবোটে উঠে পড়েছে সত্তর জন মানুষ। এদের মধ্যে, নারী আছে, পুরুষ আছে, আছে একেবারে কচি-কাচ্চা বাচ্চারাও। যে টাগবোটটাতে তারা উঠেছে সেটিকে মাত্র কিছুদিন আগে সংস্কার করা হয়েছে। এই টাগবোটটার নাম ট্রেসে দে মারজো। এদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংগোপনে দ্বীপরাষ্ট্র ছেড়ে আমেরিকায় পৌঁছানো। মুক্ত পৃথিবীতে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া। যে বন্দি এবং মানবেতর জীবন এখানে কাটাচ্ছে তারা, সেটার জন্য নব্বই মাইলের উত্তাল সাগর পাড়ি দিতেও আপত্তি নেই তাদের।

এই পরিকল্পনা যার মাথা থেকে এসেছে, তার নাম এডুয়ার্ডো সুয়ারেজ এসকুইভেল। ডাক নাম এডি। এডি পেশায় একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী। এর আগে বেশ কয়েকবারই সে কিউবা থেকে পালানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হতে পারেনি। এডির ভগ্নীপতি ফিডেনসিও র‍্যামেল প্রিয়েটো হাভানা বন্দরের অপারেশনের দায়িত্ব আছে। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বন্দরে কাজ করছে সে। এডি একে রাজি করায় বোটের অধিনায়ক হিসাবে কাজ করানোর জন্য। প্রিয়েটোর কারণে টাগবোটের কাছে পৌঁছানোও সহজ হয়ে গেলো এডির জন্য। কিউবার সমস্ত নৌকার মালিক রাষ্ট্র। এডির বন্ধু রাউল মুনোজ এক সময় ট্রেসে দে মারজোর পাইলট হিসাবে কাজ করতো। এই মুহূর্তে অন্য একটা টাগবোটের পাইলট হিসাবে কাজ করছিলো সে। তাকে ট্রেসে দে মারজোর এই পলায়ন যাত্রায় পাইলট হতে রাজি করিয়ে ফেলে এডি। পুরো পরিকল্পনা সফল করতে আরো কয়েকজন মানুষ জড়িয়ে পড়লো এডির সাথে।

শুরুতে পঞ্চান্ন জন লোক পালানোর কথা ছিলো। ভাগে ভাগে এরা এসে পৌঁছায় টাগবোটের কাছে। কিন্তু, এডিদের অবাক করে দিয়ে আরো কিছু সংখ্যক লোক হাজির হয়ে যায় সেখানে। এরাও পালাতে ইচ্ছুক কিউবা থেকে। সবাইকে চুপিসারে টাগবোটে ওঠানোর পর, ঠিক তিনটা পনেরো মিনিটে ট্রেসে দে মারজো যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে।

ট্রেসে দে মারজো যাত্রা শুরু করার সাথে সাথেই আরেকটা টাগবোট ধাওয়া করা শুরু করে একে। প্রথমে একে কোনো একটা ডকের দিকে নেবার চেষ্টা করা। সেটাতে ব্যর্থ হয়ে, একে ধাক্কা দিয়ে বন্দরের মুখের প্রবাল প্রাচীরের উপর এনে ফেলার চেষ্টা চালায়। ট্রেসে দে মারজোর ক্রুরা দক্ষতার সাথে এই হামলা এড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। বন্দর থেকে বের হয়ে খোলা সাগরে চলে আসে ট্রেসে দে মারজো। ঠিক তখনই অন্ধকার ফুড়ে বের হয়ে আসে আরো দুটো বিশালদেহী টাগবোট। স্টিলের বডি এদের। সাথে নিয়ে এসেছে ওয়াটার ক্যানন। ভীতা হরিণীর মতো ছুটে চলা ট্রেসে দে মারজোকে হাউন্ডের মতো ধাওয়া করতে থাকে সবগুলো টাগবোট এক সাথে। হোস দিয়ে উচ্চ চাপের পানি ছিটাতে থাকে নতুন দুটো টাগবোট ট্রেসে দে মারজোর উপর। খোলা সাগরে প্রায় সাত মাইল চলে এসেছে ট্রেসে দে মারজো। তাকে থামাতে না পেরে এর গায়ে ক্রমাগত ধাক্কা দিতে থাকে। ট্রেসে দে মারজো তার পলায়ন যাত্রা থামিয়ে দেয়। আত্মসমর্পণের সংকেত পাঠায়। এই সংকেতকে উপেক্ষা করে যায় টাগবোটগুলো। ওয়াটার কামানের স্প্রে এবং ধাক্কা দেওয়া দুটোই চলতে থাকে সমানে। ট্রেসে দে মারজো সিদ্ধান্ত নেয় এসওএস পাঠানোর। কিন্তু, ওয়াটার স্প্রের কারণে ইলেকট্রিকাল যন্ত্রপাতি সব বিকল হয়ে যাওয়াতে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এর মধ্যেই কিউবার কোস্ট গার্ডের একটা বোট হাজির হয়। কিন্তু, সেটা এই আক্রমণকে না ঠেকিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে থাকে।

ধাক্কায় ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বয়স্করা বাচ্চাদের নিয়ে আসে ডেকে। তাদের দেখিয়ে জীবন ভিক্ষা চাইতে থাকে তারা। বাচ্চাদের দেখানোর পরেও ওয়াটার স্প্রে করা থামে না। এর আঘাতে ডেকের উপর এদিক ওদিক ছিটকে পড়তে থাকে সবাই। কারো কারো হাত থেকে বাচ্চা ছুটে গিয়ে খোলা সাগরে পড়ে যায়।

ডেক থেকে পালিয়ে নিচের মেশিন রুমে আশ্রয় নিতে থাকে সবাই। কিন্তু, সেখানেও আরেক বিপদ। ক্রমাগত ধাক্কায় ট্রেসে দে মারজোর তলা ফুটো হয়ে পানি ওঠা শুরু করেছে তখন। শেষ ধাক্কাটা দিতে এগিয়ে আসে পোলারগো ৫ নামের টাগবোট। জোর এক ধাক্কায় ট্রেসে দে মারজোকে ডুবিয়ে দেয় পোলারগো।

অনেকেই সাথে সাথে ডুবে যায় সাগরে। কেউ কেউ নানা জিনিস ধরে ভেসে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কোনো কোনো মা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায় দুই হাতে বাচ্চাদের ধরে ভাসিয়ে রাখতে। মৃত্যুমুখী মানুষের চিৎকার, হাহাকার, কান্না আর আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে ফ্লোরিডা প্রণালী। চার চারটে বোটের কেউ সামান্যতম চেষ্টা করে না এদের বাঁচানোর। এর পরিবর্তে টাগবোটগুলো এদেরকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। উদ্দেশ্য বড় বড় ঢেউ তৈরি করা, যাতে যারা ভেসে আছে কোনোক্রমে তারাও যেন ডুবে যায়। ডুবন্ত মানুষেরা কাতর মিনতি জানাতে থাকে তাদের বাঁচানোর জন্য। পরিবর্তে টাগবোট থেকে উচ্চ হাস্য ভেসে আসে। একটাতো ভাসমান লোকদের উপর দিয়েই নিজেকে চালিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। ভাগ্যক্রমে আঘাত থেকে বেঁচে যায় ভেসে থাকা অসহায় মানুষগুলো।

সবাই হয়তো তখনই ডুবে মরে যেতো। এদের ভাগ্য ভালো। ঠিক ওই সময় একটা গ্রিক জাহাজ এগিয়ে আসছিলো হাভানা বন্দরের দিকে। গ্রিক জাহাজকে দেখে আক্রমণ বন্ধ করে টাগবোটগুলো। ভাসমান মানুষদের আদেশ করে কোস্ট গার্ডের বোটের দিকে এগিয়ে যেতে। একত্রিশ জন কোস্ট গার্ডের বোটে উঠতে সক্ষম হয়। বাকিদের কোনো হদিস পাওয়া যায় না।

সকালে এদের নিয়ে আসা হয় হাভানার কাছের ন্যাভাল বেজে। এক রুমে আটকে রাখা হয় পুরুষদের। অন্য রুমে নারী এবং শিশুদের। বিকালের দিকে নারী এবং শিশুদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু, পুরুষদের নিয়ে যাওয়া স্টেট সিকিউরিটির হেড অফিসে। এদের সবাইকেই নানা মাত্রার ডিটেনশনে পাঠানো হয়।

বহির্বিশ্বে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র। কিন্তু, কিউবান সরকার সব সমালোচনাকে উড়িয়ে দিতে থাকে নানা ধরনের ব্যাখ্যা এনে, পুরো বিষয়টা মশকরা করে, কিংবা এন্টি সোশালিস্টের এই হঠকারী কাজের জন্য দায়ী করে। অগাস্টের পাঁচ তারিখে তিন ঘণ্টার এক বক্তৃতায় ফিডেল ক্যাস্ট্রো প্রকাশ্যেই এই আক্রমণকারীদের যথোপযুক্ত আচরণ এবং দেশপ্রেমের প্রশংসা করেন এবং বলেন যে, বোটটা ডুবে যাক, সেটা এরা কেউই চায়নি। এই আক্রমণের দলনায়ক যে ছিলো, তার নাম হেসুস গনজালেজ। একে সরকার হিরো অব দ্য কিউবান রিভুলেশন পদক দিয়ে সম্মানিত করেছিলো।

১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব হিউম্যান রাইটস অব দ্য অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস সংক্ষেপে ওএএস এই ঘটনার উপর স্পেশাল একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে তারা এই ঘটনার জন্য এবং পূর্ব-পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জন্য কিউবান সরকারকে দায়ী করে।

এডির এই পালানোর পরিকল্পনা গোয়েন্দা মারফত খবর পেয়ে গিয়েছিলো কিউবান সরকার। কিন্তু, তারা এটাকে ঠেকানোর পরিবর্তে এডিকে এগিয়ে যেতে দেয় ট্রেসে দে মারজোকে চুরি করে পালানোর প্রচেষ্টায়। খোলা সাগরে এডিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে, এটাই ছিলো পরিকল্পনার অংশ। এতে করে ভবিষ্যতে যারা পালাতে চায়, তাদের জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি যাবে, এটাই ভেবেছিলো তারা। সরকারের সংশ্লিষ্টতা এড়ানোর জন্য বেসামরিক বোট ব্যবহার করা হয় ট্রেসে দে মারজোকে আক্রমণের জন্য। যে কারণে উদ্ধারের সময়ও শুধু মাত্র কোস্ট গার্ডের বোটকেই ব্যবহার করা হয়েছিলো।

ওএএস তার রিপোর্টে লিখেছে, “the attack against defenseless civilians was planned, orchestrated and directed by the Communist Party and State Security with the direct participation of both.”

এই হচ্ছে কিউবান স্বর্গরাজ্য, ফিডেল কাস্ট্রোর বিপ্লবের স্বপ্নভূমি।

Most Popular

To Top