ফ্লাডলাইট

আর্সেন ওয়েঙ্গারঃ ফুটবলের একজন বুড়ো প্রফেসরের গল্প

চার্লস আর্নেস্ট ওয়েঙ্গার: একজন বুড়ো প্রফেসরের গল্প

কোচ!!! এখানে তো ফেলনা। নিশ্চয়তা! সেইটা আবার কি? ট্রফি এনে দিতে পারলে থাকো, নাহলে টাটা বাই বাই। এমনই এক কঠিন পরিস্থিতির মাঝে কোচিং করাতে হয় প্রিমিয়ার লিগের কোচদের। আর এমন দুঃসহ পরিস্থিতির মাঝেই টানা একুশ বছর ধরে একটি দলের দাগআউটে টিকে আছেন যিনি, তিনি “দ্যা প্রফেসর” খ্যাত আর্সেন চার্লস আর্নেস্ট ওয়েঙ্গার, সংক্ষেপে আর্সেন ওয়েঙ্গার।

আর্সেন ওয়েঙ্গার

১৯৯৬ সালের কথা। তখন সেপ্টেম্বর মাসের শেষ প্রায়। আর্সেনাল ফ্যানদের কপালে তখন চিন্তার রেখা বিরাজ করছে, কে হবেন দলের পরবর্তী কান্ডারী? আগের কোচ ব্রুচ রিওচ সদ্যই চাকরিচ্যুত হয়েছেন ক্লাব ভাইস চেয়ারম্যান ডেভিড ডেইনের সাথে সম্পর্কের টানাপড়ার জন্য। নতুন কোচ হবার দৌড়ে সব চেয়ে বেশী যার নাম শোনা যাচ্ছিল তিনি বার্সা কোচ ও লিজেন্ড ইয়োহান ডি ক্রুইফ। বার্সার দায়িত্ব থেকে মাত্রই নিজেকে ছাড়িয়েছেন তিনি। সমর্থকরাও তাকে নিয়ে ইতিমধ্যে নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছে। এরই মাঝে হঠাৎই জাপান ফেরত জনৈক ভদ্রলোক আর্সেন ওয়েঙ্গারকে ক্লাবের নতুন কোচ হিসেবে ঘোষনা করে আর্সেনাল ম্যানেজম্যান্ট। চারদিকে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়, তোলপাড় তাকে নিয়ে, কে এই আর্সেন ওয়েঙ্গার?

’কেই বা এই আর্সেন ওয়েঙ্গার?’ – প্রশ্নটা যেমন ছিল ইংলিশ মিডিয়ার, তেমনিভাবে ছিল অগনিত আর্সেনাল ভক্তরও। এতবড় একটা ক্লাবের চাপ ঠিকমতো নিতে পারবে তো তিনি। সন্দেহটা সবার মতই তৈরী হয়েছিল টিম লিডার টনি অ্যাডামসের মনেও,

“এই ফরাসী ভদ্রলোকের আদৌ কতটুকু ফুটবল জ্ঞান আছে। তার চশমা দেখে তো তাকে মাস্টারি করেন বলে মনে হয়। …ইংরেজিটাও কি ঠিকঠাক বলতে পারেন তো ?”

সকল সমালোচনা আর সন্দেহের জবাব ম্যাচ ফলাফলে দিয়েছিলেন আর্সেন ওয়েঙ্গারের। তার অধীনে প্রথম ম্যাচটা যখন ব্লাকবার্ন রোভার্সের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতে আর্সেনাল, তার পর থেকে আপনা-আপনিই বন্ধ হতে থাকে সব সমালোচনাকারীর মুখ। আর যারা তার সমালোচনা করছিল, পরের বছর লীগ জেতার পর তারাই তার প্রশংসা আর জয়গানে মেতে ওঠে ।

আর্সেন ওয়েঙ্গারের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২২ শে অক্টোবর, ফ্রান্সের আলসেশ প্রদেশের রাজধানী স্ট্রাসবার্গে। বাবা আলফোনস ওয়েঙ্গার ছিলেন স্থানীয় একটি ফুটবল ক্লাবের কোচ। আর্সেন ওয়েঙ্গারের ফুটবলের হাতেখড়িটা হয়েছিল তার বাবার হাতেই। ছোটবেলায় বাবার সাথেই ক্লাবে গিয়ে খেলতেন, অনুশীলন করতেন। বাবার হাত ধরে প্রায়ই বুন্দেসলীগার ম্যাচ দেখতে যেতেন। ফুটবলের প্রতি তখনই তার আলাদা একটা টান সৃষ্টি হয় তার। কে জানত তার টানটাই তাকে অমর করে রাখবে।

ফুটবল দল পরিচালনার প্রতি আর্সেন ওয়েঙ্গারের আগ্রহটা হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। গুনটা তিনি পেয়েছিলেন বাবার কাছ থেকে। ছোটবেলায় বাবার ক্লাবে খেলার সময় নিজে নিজেই প্রায়ই হয়ে যেতেন মাতব্বর। সতীর্থ খেলোয়াড়দের কৌশলগতভাবে প্রস্তুত করার দায়িত্বটা নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। তার বাল্য ক্লাবসতীর্থ ক্লদ বলেন,

“আর্সেন কখনও আমাদের দলের অধিনায়ক ছিল না। তবে দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নিতে ভুল হোত না তার। ‘তুমি এটা করো’, ‘তুমি ওটা করো’। যেন সে-ই ছিলো আমাদের লিডার।”

আর্সেনালের ইতিহাসের সব থেকে গৌরবময় অধ্যায়টা রচিত হয় আর্সেন ওয়েঙ্গারের হাত ধরেই। আরও দুই সিজন পরে। ২০০৩-০৪ মৌসুমে কোন ম্যাচ না হেরে আর্সেনালকে ‘ইনভিনসিবল’ লিগ শিরোপা জেতান ওয়েঙ্গার। যা ইংলিশ লিগে এর আগে আর কেউ কখনও করে দেখাতে পারেনি, পারবে কিনা তাও সন্দেহ। অপরাজিত থাকার ব্যাপ্তিটা অবশ্য আরও বড় ছিল, রেকর্ডটা ছিল টানা ৪৯ ম্যাচ। ঐ বছর আর্সেন ওয়েঙ্গার আর্সেনালকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। সত্যিকার অর্থেই অপরাজেয় একটা দল গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

’ইনভিনসিবল’ প্রসঙ্গে আর্সেন ওয়েঙ্গার তখন বলেছিলেন,

“কোন সন্দেহ নেই গোটা মৌসুম অপরাজিত থাকাটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবোজ্জল এবং গুরুত্বপূর্ন অর্জন। আপনি চ্যাম্পিয়ন হলেও একদিন না একদিন অন্য কেউ এসে জায়গাটার দখল নেবে। গোটা মৌসুম অপরাজিত থাকার স্বপ্নটা তাই দেখেছি আমি। কারণ এ জায়গাটায় সবাই উঠতে পারেনা, এই অর্জনটা লেজেন্ডারী।”

’ইনভিনসিবল’ সিজনের পর পরই আর্সেনাল পুরোপুরি মনোনিবেশ করে নতুন স্টেডিয়াম ‘এমিরেটস’ তৈরীর কাজে। যার কারনে ওয়েঙ্গারকে ছেড়ে দিতে হয় তার সেরা প্লেয়ারদের অনেককেই। তবে এরপরও বড় কোন ধস নামেনি তাদের পারফর্মেন্সের ধারাবাহিকতায়। বরং ২০০৫-০৬ মৌসুমে আর্সেনালকে তিনি নিয়ে যান উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। যদিও বার্সেলোনার সাথে ২-১ গোলে হেরে প্রথমবারের মতো ইউরোপ সেরা হওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হয়।

২০০৪ সালের পর থেকে আর্থিক সঙ্কটে পড়ে আর্সেনাল। পরবর্তীতে এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠলেও ফিরে আসেনি আর্সেন ওয়েঙ্গারের সেই সোনালী সময়গুলো। গত ১৩ বছর পার হয়েছে আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর ছুয়ে দেখা হয়নি প্রিমিয়ার লিগের রুপালী ট্রফিটি একবারও। তবে এই সময়টাতে এতসব বাধা-বিপত্তি, সসমস্যার পরও অবিশ্বাস্যরকম ধারাবাহিক ছিলো আর্সেনাল। যার পুরো কৃতিত্ব আর্সেন ওয়েঙ্গার নিজেরই। দীর্ঘদিন লিগে টানা টপ ফোরে সিজন শেষ করে দলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলানোর অনন্য কৃতিত্ব গড়েছেন তিনি।

গত ২১ বছরে আর্সেন ওয়েঙ্গারের কখনোই খুব দুঃসহ সিজন কাটেনি। প্রতিটা সিজনেই তিনি লিগ শেষ করেছেন সেরা চার/পাঁচের মধ্যে থেকে। এটাই আর্সেন ওয়েঙ্গারের সব থেকে বড় জাদু, বিশ্বের সব থেকে কম্পিটিটিভ লিগেও চমৎকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এমন ধারাবাহিকতা আর কারও নেই বললেই চলে। এই ধারাবাহিকতা নিয়ে তার ভাষ্যটা এমন, “জয় তো অনেকেই পায়, তবে একটা স্টাইল বজায় রেখে যারা জিততে পছন্দ করে, তাদের দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হই, আমি তাদেরই অনুসারী। যদি একজন ভক্ত সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবে – আহা। আজ আর্সেনালের ম্যাচ; হয়তো অসাধারণ কিছু দেখা যাবে। তাহলেই আমার দায়িত্ব পালন সার্থক। যদি ম্যাচটা জিতে নিই, তাহলে খুব ভালো। কিন্তু তা না হলেও ন্যূনতম ধারাবাহিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মজাটা সবাই যেন পায়।”

স্ত্রী অ্যানির সাথে আর্সেন

আজ থেকে ২১ বছর আগের কথা যখন আর্সেন ওয়েঙ্গার আর্সেনালের দায়িত্ব গ্রহন করেন। তার স্ত্রী অ্যানিকে বলেছিলেন,এইতো যাচ্ছি ৫ বছরের জন্য। কথা দিচ্ছি শুধু ৫ বছরই থাকব। তারপর সব ছেড়ে ছুড়ে অবসর নিয়ে চলে আসব, শুধুই তোমার কাছে। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় তিনি আসতে পারেননি। পারেননি আর্সেনাল ক্লাবটির প্রতি ভালোবাসায়। কিন্তু সেই অ্যানি। ওয়েঙ্গারের অপেক্ষায় পার করল ১৯ টি বছর, তারপর তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এখন ফুটবলই তার একমাত্র সঙ্গী। এই ফুটবলকে আকড়ে ধরেই বেঁচে আছেন তিনি।

আলফোনস ওয়েঙ্গার ছোটবেলায় দল সামলানোর যে বীজটি রোপন করেছিলেন, সময়ের বিবর্তনে তা এখন আরও পরিণত। ফুটবলে ওয়ঙ্গার এখন এক অনন্য নাম। “দি কনস্ট্যান্ট ওয়ান” এখন শুধু কোচই নন, একজন ফুটবল দার্শনিকও। আর্সেন ওয়েঙ্গার নামটি ফুটবলেরই ওপর নাম হয়ে গেছে। যেন একই সুতোয় বাঁধা দু’টি প্রাণ।

Most Popular

To Top