শিল্প ও সংস্কৃতি

ক্ষণজন্মা একটা ব্যান্ড রেইজ এগেইন্সট দ্যা মেশিনের গল্প

ক্ষণজন্মা একটা ব্যান্ড রেইজ এগেইন্সট দ্যা মেশিনের গল্প

সময়টা ১৯৯১ সাল, যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসে “লক আপ” নামে একটা ভেংগে যাওয়া ব্যান্ডের গিটারিস্ট টম মোরেলো একটা ক্লাবে যেতো যেখানে “ইনসাইড আউট” নামে আরেক ভেংগে যাওয়া ব্যান্ডের মেম্বার “জ্যাক ডে লা রোচা” নামে একজন র‍্যাপার ফ্রিস্টাইল র‍্যাপ করতো। তার র‍্যাপের লিরিক্সে মুগ্ধ হয়ে টম নিজেই জ্যাকের কাছে গিয়ে তাকে নিয়ে একটা ব্যান্ড খোলার প্রস্তাব দেয় এবং জ্যাক তাতে রাজি হয়। এরপর টম “গ্রেটা” ব্যান্ডের ড্রামার ব্র‍্যাড উইল্ক যে কিনা টমের আগের ব্যান্ড লক আপের জন্য একবার অডিশন দিয়েছিলো ড্রামার হিসেবে, তাকে ঠিক করে টম এন্ড জ্যাকের নতুন ব্যান্ডের ড্রামার হিসেবে এবং শেষে বেজিস্ট হিসেবে টিম কমারফোর্ডকে তারা নেয় যে কিনা জ্যাকের শৈশবের বন্ধু এবং জ্যাকের সাথে আগে একসময় “জুভেনাইল এক্সপ্রেশন” নামে একটা ব্যান্ডে প্লে করতো।

এই চারজন নিয়ে শুরু হয় একটা কিংবদন্তীতুল্য র‍্যাপ এবং নু-মেটাল ব্যান্ড “রেইজ এগেইনস্ট দ্যা মেশিন” এর পথচলা!
এই রেইজ এগেইনস্ট দ্যা মেশিন ব্যান্ডের নামকরণটা আসলে জ্যাকের ইনসাইড আউট ব্যান্ডের “রেইজ এগেইনস্ট দ্যা মেশিন” নামের একটা অমুক্তিপ্রাপ্ত গানের নাম থেকে করা হয়।

‘রেইজ এগেইন্সট দ্যা মেশিন’ এর ব্যান্ড মেম্বারস

কিন্ত, এতোকিছুর মধ্য যা এই ব্যান্ডটাকে এতোটা অপ্রতিম এবংকিংবদন্তীতুল্য করে তোলে তা হচ্ছে এদের মিউজিক স্টাইল এবং লিরিক্স!
এদের সিংহভাগ লিরিক্স এবং গান হচ্ছে তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক,সামরিক, প্রশাসনিক এবং সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে ব্যান্ডমেম্বারদের বিপ্লবী বা বিদ্রোহী মনোভাব সেই সমস্যাগুলোর প্রতি যা সহজেই শ্রোতাদের মন জয় করে নেয় যেহেতু ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে “People react toward something which they feel close to” এবং এভাবেই শুরু হয় তাদের জনপ্রিয়তা প্রাপ্তি!
তাদের প্রথম এলব্যামের নাম ব্যান্ডের নামই দেয় তারা “রেইজ এগেইনস্ট দ্যা মেশিন” যা ব্যান্ডের যাত্রা শুরুর পরের বছর ১৯৯২ এর ৩ নভেম্বর বের হয়! এটা Billboard Heart-seekers chart এ প্রথম এবং Billboard 200 chart এ ৪৫তম হয়! “ইভেল এম্পায়ার” নামে এদের দ্বিতীয় এলব্যাম বের হয় ১৯৯৬ সালে। “দ্যা ব্যাটল অফ লস এঞ্জেলেস” নামে তৃতীয় এলব্যাম বের হয় ১৯৯৯ সালে এবং সর্বশেষ অ্যালবাম “রেনেগ্যাডেস” বের হয় ২০০০ সালে যা ছিলো পুরোটা বিভিন্ন আরটিষ্টের বিভিন্ন গানের তাদের(রেইজ এগেইনস্ট দ্যা মেশিন) করা কভার করা গানের এলব্যাম!

রেইজ এগেইন্সট দ্যা মেশিন ব্যান্ডের কিছু মজার তথ্য,

১.
তাদের প্রথম এলব্যামের গান “নো ইউর এনিমি” তে দুইজন গেস্ট আর্টিস্ট ছিলো, ভোকালে জ্যাকের সাথে ছিলো প্রোগ্রেসিভ মেটাল ব্যান্ড “টুল” এর ভোকাল ম্যানার্ড জেমস কিনান আর ড্রামে রক ব্যান্ড “জেনস এডিশন” এর ড্রামার স্টেফেন পারকিন্স ছিলো ট্র‍্যাসক্যান পারকাশনে।

২.
তাদের প্রথম এলব্যামের কভার আর্টে যেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দাহিত হচ্ছিলো, সেটা একটা “পুলিৎজার প্রাইজ” জেতা ছবি ছিল। এই ভিয়েতনামিজ সন্ন্যাসী “থিচ কুয়াং ডুক” নিজেকে নিজে দাহিত করে স্ব-বলি হিসেবে প্রাইম মিনিস্টার “নিগো ডিহ” এর বিরুদ্ধ এ আন্দোলন চলাকালীন সময়ে। টম জিনিসটা এভাবে ব্যাখ্যা করে যে, তাদের মিউজিকের আইডিয়া ছিলো যে সেগুলো তাদের মিউজিসিয়ান এবং সক্রিয়তাবাদী কর্মী হিসেবে বিশ্বে ঘটা বিভিন্ন ঘটনার উপর অদম্য মতপ্রকাশ করবে এবং এই ছবিতে এই সন্ন্যাসী নিজেকে স্ব-বলি দেয় তার নিজস্ব বিশ্বাসগুলোর জন্য যেটা আমাদের কাছে মনে হয়েছে ছবিটায় সেই ন্যায়পরায়ণতা এবং বিরোধী ক্ষমতা ফুটে উঠেছে যেটা আমাদের গানগুলোয় আমরা ফুটে তুলাতে চেষ্টা করি।

৩.
“Tire me” এবং “Guerilla Radio” গান দুটোর জন্য যথাক্রমে ১৯৯৭ এবং ২০০১ সালে এরা ২টা গ্র‍্যামি এওয়ার্ড জিতে।

৪.
গিটারিস্ট টম মোরেলো একজন এক্সোটিক ড্যান্সার ছিলো একসময় এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ল’(আইন) থেকে পাশ করে।

৫.
১৯৯৯ সালে আরএটিএম তিনশ জন পুলিশ অফিসার্স এর জন্য ডোনাট অর্ডার করে যারা তাদের নিরাপত্তা দিয়েছে একটা আউটডোর শোতে ম্যাসাচুসেটে।

৬.
১৯৯৩ সালে ফিলাডেলফিয়ার লোলাপালুজা তারা সবাই মুখে শুধুমাত্র একটি কাপড় রেখে উলঙ্গ অবস্থায় স্টেজে উঠে। তাদের বুকে রঙ দিয়ে “PRMC” বর্ণগুলো লেখা ছিলো।

৭.
১৯৯৭ সালে ব্যান্ডটির সব আয় বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাকে যেমন U.N.I.T.E. , Women Alive and the Zapatista Front for National Liberation.” দান করে

৮.
তাদের ১৯৯৯ সালের এলব্যাম “দ্যা ব্যাটল অফ লস এঞ্জেলেস” ১ নাম্বার সেলিং এলব্যাম হয়েছিলো ৪৫০০০০ কপি বিক্রি করে প্রথম সপ্তাহেই এবঙ তারপর ডাবল প্লাটিনাম হয়েছিলো।

৯.
১৯৯৯ সালে বের হওয়া হলিঊডের সিনেমা দ্যা ম্যাট্রিক্সে এই ব্যান্ডের করা গান “Wake Up” ফিচারড হয় সাউন্ডট্র্যাক হিসেবে।

১০.
মাত্র ১৩ বছর বয়সে টম মোরেলো প্রথম ব্যান্ডে জয়েন করে। সেই ব্যান্ডটা প্রধানত “Led Zeppelin” এর বিভিন্ন গান কভার করতো।

তাদের বের করা চার চারটা এলবামই ভক্তদের মনে ভীষনরকমের সাড়া জাগায় এবং চারটা এল্ব্যাম দিয়েই তারা “লেজেন্ডারি হল ওফ ফেম” তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়ে নেয়।
কিন্তু, দুঃখের কথা হলেও সত্য যে ব্যান্ডটা যখনই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পোঁছে, তখনই তাদের ভোকাল জ্যাক ঘোষনা দের ব্যান্ড ছাড়ার আর এভাবেই ব্যান্ডটা ভেঙ্গে যায় আসল আরএটিএম। জ্যাক যাবার পরে ভোকালিস্ট ছাড়া ব্যান্ড যখন অচল হয়ে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে, তখন বাকি তিনজন সদস্য টম, টিম আর ব্র্যাড সিদ্ধান্ত নেয় আর মিডিয়াকে জানায় তারা নতুন ভোকালিস্ট খুজে ব্যান্ড চালাবে। “সাইপ্রেস হিল” এর “বি-রিয়েল” সহ অনেক নামী-দামী ভোকালিস্টই অডিশন দেয় কিন্তু টমরা আরেকটা র‍্যাপার চাচ্ছিলো না জ্যাকের মতো।তারা তাদের জনরা চেঞ্জ করতে চাচ্ছিলো এবং তখনই সাউন্ডগার্ডেনের এক্স ফ্রন্টম্যান “ক্রিস কর্নেলের” সন্ধান পায় আর তার সাথে টমদের তিনজনের কেমিস্ট্রি ভালো জমায় নতুন ব্যান্ড গঠিত হয় যার নামকরন করা হয় “অডিওস্লেভ” আর এভাবেই শুরু হয় তিনজন আরএটিএম ব্যান্ডের সদস্য আর একজন সাউন্ডগার্ডেন মেম্বার নিয়ে আরেক জনপ্রিয় হার্ড এবং অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ড অডিওস্লেভের পথযাত্রা।

যদিও পরে সেটা আবার রিইউনাইটেড হয়েছিলো রেইজ এগেইন্সট দ্যা মেশিন ব্যান্ডটা কিন্তু আগের মতো আর সারা জাগায়নি ভক্তদের মনে আর খুব কম সময় একটিভ ছিলো। ২০০৭ থেকে ২০১১ মাত্র চার বছর একটিভ ছিলো তারা।
এভাবেই এক ব্যান্ড ভেঙ্গে আরেক ব্যান্ডের জন্ম হয় বিভিন্ন দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে আর এভাবেই শেষ হয় রেইজ এগেইন্সট দ্যা মেশিনের পথযাত্রা আর তাদের গল্প।

তথ্যসূত্রঃ Rage Against the Machine

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top