টুকিটাকি

এ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্সঃ অপরিবর্তনীয় অতীত কিংবা একটি দৃষ্টিভঙ্গির গল্প

এ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্সঃ অপরিবর্তনীয় অতীত কিংবা একটি দৃষ্টিভঙ্গির গল্প

১৯৭৪ সালের বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, তার ছোঁয়া লেগেছে ১৭ বছরের এক উগ্র কিশোরের গায়েও। কিশোর মোহোসেন নিজেকে পৃথিবীর পরিবর্তনের এক হাতিয়ার মনে করে, উচ্ছেদ করতে চায় ইরানের ক্ষমতাসীন শাহকে। ফ্যানাটিকাল এক ইসলামি গ্রুপের সমর্থক হিসেবে হাজির হয় মিছিলে, পুলিশরা সেখানে বাধা দেয়। মনে মনে সেই কিশোর ভাবে পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিবে, সেটা দিয়ে যুদ্ধ করবে ইরানের শাহ’র বিরুদ্ধে। এই উদ্দ্যেশ্যে নিজের কাজিন প্রেমিকাকে পাঠিয়ে দেয় মিরহাদি তাইয়েবি নামের এক যুবক পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্য, যাতে মোহোসেন গিয়ে তাইয়েবিকে আক্রমন করতে পারে। কিন্তু আনাড়িভাবে বানানো পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, মিরহাদির সাথে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মোহোসেন তাকে ছুড়ি মেরে বসে।

পুলিশ ধরে নিয়ে যায় মোহোসেনকে, আহত তাইয়েবি বেঁচে যাওয়ায় ফাঁসির হাত থেকে রেহাই পেলেও যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় তার। পরে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের সময় মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসে মুক্ত হয়ে।

এটি কোনো বানানো কল্প-কাহিনী নয়, বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্রকার মোহোসেন মাখবালাফের নিজের জীবনের কাহিনী এটা।

মোহোসেন মাখমালবাফ

মোহোসেন মাখমালবাফ: নির্বাসিত চলচ্চিত্রকার
আসলে চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টের চেয়ে কোনো অংশে কম নাটকীয় নয় মহসিন মাখবালাফের জীবন। ইরানের এক সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নিলেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য ধারার মানুষ। অল্প বয়সে স্কুল থেকে ড্রপআউট হন,যুক্ত হন এক ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে। যোগ দেন শাহবিরোধী আন্দোলনে এবং এরপর ছুরিকাঘাতের মামলায় জেল হয়ে যায়। এরপর জেল থেকে বের হয়ে মাখবালবাফ সিনেমা বানানোতে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে বানানো তার ছবিগুলো অনেক বিখ্যাত হয়। পরে ২০০৫ সালে আহমেদিনিজাদ ক্ষমতায় আসলে মোহোসেন মাখবালাফকে দেশত্যাগ করে প্যারিসে আশ্রয় নিতে হয়। এতকিছুর পরেও থেমে নেই তার ছবি তৈরির কাজ।

মোহোসেন মাখমালবাফ

কেন এই আত্মকথা বানানো?
পুলিশকে ছুরি মারার ঘটনার প্রায় বিশবছর পরে মাখবালফ ১৯৯৪ সালে “সালাম সিনেমা” নামে একটি সিনেমা বানাতে যাচ্ছিলেন। সিনেমার জন্য উন্মুক্ত অডিশনের ব্যবস্থা করলেন তিনি এবং সেখানে অডিশন দিতে হাজির হয় মিরহাদি তাইয়েবি।

মিরহাদি তাইয়েবি

তবে মিরহাদি তাইয়েবি এখন আর পুলিশে চাকরি করেননা, অবসরে গিয়ে শখের সিনেমা অভিনেতা হিসেবে কাজ করছেন। তাকে তাকে মাখবালফের অতীতে কথা মনে এসে যায়, সেইদিন যদি তাইয়েবিকে ছুরিকাঘাতের অপরাধে জেল না হতো তবে হয়তোবা দুজনেরই জীবন অন্যরকম হতো। তিনি নিজেদের সেই অতীতকে আবার খুঁড়ে আনার জন্য সেই কাহিনীর উপরে সিনেমা বানাতে আগ্রহী হন। এভাবেই শুরু হয় “এ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্স”এর পথচলা।

এ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্স

আত্মকথা নাকি অন্যকিছু
আত্মকথার মত করে মাখবালফ সিনেমাটি বানাতে পারতেন, কিভাবে ঘটনা ঘটেছিল তার প্রায় হুবহু বর্ণনা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেভাবে সিনেমা বানাননি, বানিয়েছেন নিউরিয়ালিসমের সুত্র ধরে।

ইরানীয়ান সিনেমা সবসময়ই আলাদা, তারা দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাগুলোকে প্রতিফলিত করে সিনেমার পর্দায়। ইরানি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বা আত্মকথাগুলো এই নিয়ম মেনে এক একেকটা হয়ে উঠে ফিকশন কাহিনীর মত। এ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্স সিনেমাটিও তার ব্যাতিক্রম নয়।

অতীতকে বর্তমানের ফ্রেমে বন্দী করা
মাখবালাফ তার “এ মোমেন্ট অফ ইনোসেন্স” এ চেয়েছেন একই ঘটনার প্রতি দুজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু আলাদা হতে পারে তা দেখাতে। সময়ের সাথে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন এবং অতীতের স্মৃতিকে ফুটিয়ে তোলার কাজে এই সিনেমাটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটি যেন জীবনের একটি ঘটনার চিত্রায়ন নয়, বরং অতীতের ঘটনাটিকে চিত্রায়িত করতে বর্তমানে কি করতে হয়েছে তার ছবি। এখানে মাখবালফ এবং তাইয়েব দুজনেই নিজ নিজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিজেদের আত্মকথা বানানোর জন্য।

সিনেমার শুরুতে তাইয়েবকে দেখা যায় মাখবালফের বাসায় গিয়ে মাখবালফের মেয়ে হানার কাছে তার বাবার ফিল্মে সে কাজ করতে পারবে কিনা তা জানতে। পরবর্তীতে মাখবালাফ এবং তাইয়েবির দেখা হয়, মাখবালাফ নিজের আত্মকথা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরপরে দুইজনকেই দেখা যায় নিজ নিজ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য উপযুক্ত অভিনেতা খুঁজতে। মাখবালাফ নিজের চরিত্রে তার মতই এক দুরন্ত এবং উগ্র কিশোরকে বেছে নেন। কিন্তু তাইয়েব যখন পুলিশের চরিত্রে অধিকতর পৌরুষ সম্বলিত একজনকে বেছে নেন, তখন মাখবালফ এতে আপত্তি জানান এবং তিনি এই চরিত্রে আরেকজন তুলনামুলকভাবে দুর্বল ব্যাক্তিত্বের একজনকে কাস্টিং করেন।

মাখবালফের কাজিন প্রেমিকার চরিত্রটি করার জন্য কাকে বাছাই করবেন বুঝে উঠতে না পেরে সেই কাজিনের বাসায় দুজনে হাজির হন। সেদিনের সেই কিশোরি কাজিনটি এখন এক পুরোদস্তুর গৃহিণী এবং সন্তানের জননী। অতীতের সেই ঘটনা নিয়ে কাজিনটি বিব্রত এবং অনুতপ্ত, নিজের সম্মানের হানি ঘটবে এমন কিছুই সে করতে চায়না আর। মাখবালাফ তার কাজিনের কিশোরী মেয়েটিকে আত্মকথায় কাজিনের চরিত্রে অভিনয় করতে বলে, কিন্তু মহিলা প্রথমদিকে মেয়েকে দিতে রাজি হয়না।

এদিকে সিনেমা বানাতে গিয়ে মাখবালাফ এবং তাইয়েব দুজনেই যখন নিজ নিজ চরিত্রের অভিনেতাদের ঘটনা বর্ণনা করতে যায়, অনুভব করে যে সেই সময় কেন এই কাজ করেছিল তার নির্দিষ্ট মানসিক কারণ তাদের মনে নেই। দুজনেই শুধুমাত্র ঘটনাটি এবং তার চারপাশের পরিবেশ সম্পরকেই শুধু ধারণা করতে পারছিল।

নিজেদের অতীত নিয়ে ভাবতে বসে বিপ্লবী হয়ে সারা পৃথিবী বদলে দেওয়ার চিন্তা যে কতটা ছেলেমানুষী ছিল তা মনে করে মাখবালাফের হাসি পায়। আবার তাইয়েবেরওমনে হয় যে শাহ্‌র বেতনভুক্ত কর্মচারী না হলে হয়তোবা তার জীবন অন্যরকম হতো, বিদ্রোহে হয়তো সেও যুক্ত হতে পারতো।

অতীতের সাথে বর্তমানের তুলনামুলক চিন্তা এই সিনেমাটিতে বারবার উঠে এসেছে। সিনেমার জন্য বিশবছর আগের পোশাক বানাতে গিয়ে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হওয়া, কিংবা যেই বিপ্লব নিয়ে দুজনের এত কাহিনী তা নিয়ে বর্তমানের তরুণদের নির্লিপ্ততা সবই তাদের দুজনকে একই সাথে চিন্তিত করে তুলে। তাইয়েব স্বীকার করে যে মাখবালাফের কাজিন প্রেমিকার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল, কিন্তু লজ্জায় সে কোনোদিন বলতে পারেনি। তাই তাইয়েবকে দেখা যায় পুলিশের চরিত্র রুপদানকারী যুবককে মাখমালবাফের কাজিন প্রেমিকাকে কিভাবে ফুল দেওয়া যায় তা শেখাতে। বাস্তব জীবনে যে কাজটা লজ্জায় কোনোদিন করতে পারেননি তা এই যুবককে দিয়ে করাতে চায় তাইয়েব। একথা শুনে মাখমালাবাফ সহানুভূতি দেখায় তাইয়েবকে।

এভাবে মাখবালাফ এবং তাইয়েব দুজনেই আবিষকার করে যে বিশ বছর পূর্বে তারা পরস্পর সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে থাকলেও আজকে তারা পরস্পরের অনুভূতিগুলোর প্রতি সমব্যাথী।

পরে তাদের আত্মকথামুলক সিনেমাটির মুল দৃশ্য অর্থাৎ ছুরিকাঘাতের দৃশ্য ধারণ করার সময় এসে যায়। কিন্তু তাইয়েব এবং মাখবালাফের বাস্তব কাহিনীর বদলে আসে এক নতুন কাহিনী। সেই দৃশ্যে ছুরিকাঘাতের বদলে দেখা যায় যে কিশোর মাখমালবাফ এবং যুবক তাইয়েবি একহাঁতে রুটি এবং অন্যহাতে ফুল নিয়ে কাজিন প্রেমিকার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

সিনেমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই চিরন্তন সত্যের কথা “অতীতকে আপনি বদলাতে পারবেন না কিন্তু ভবিষ্যতকে বদলানোর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার হাতেই”।

১৯৯৭ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত ৭৮ মিনিটের এই সিনেমাটিকে রাজনৈতিক কারণে ইরানে নিষেধাজ্ঞা জারী করে রাখা হয়। তবে বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এই সিনেমাটি প্রশংসা এবং পুরস্কার পায়। সময়ের সাথে সাথে চিন্তার পরিবর্তন, অতীতের স্থিরতা কিংবা ভবিষ্যতের সংবেদনশীলতা দেখতে চাইলে এই সিনেমাটি অবশ্যই দেখতে হবে আপনাকে। আপনারো হয়তোবা নিজের অতীতের কোনো ঘটনার কথা ভেবে মনে হবে যে, নাহ! আমি যদি এই কাজটা না করতাম তবে জীবন হয়তো অন্যরকম হলেও হতে পারতো।

Most Popular

To Top