নাগরিক কথা

ঢাবি-বুয়েট জটিলতা এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্যবিকৃতি

নোয়াম চমস্কির ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ নামে একটা চমৎকার বই আছে। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন, গণমাধ্যম কিভাবে সত্যকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারে বিচিত্র উপায়ে, সমাজের শক্তিকাঠামোর সাথে এর সুসম্পর্ক কিভাবে সত্য খবরের বদলে বায়াসড খবর উৎপাদন করতে প্রণোদনা দেয়।

গত তিনদিনে এই বিষয়টি নিজের চোখে দেখেছি। এই ক্যাম্পাস অঞ্চলে পেশীশক্তির একমাত্র উৎস ঢাবি। সাংবাদিকেরা তাই ঢাবি’র সেই আক্রমণকারী সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে কিছু লিখতেই পারেন না, তাদের হাত কাঁপে, তাদের মন কাঁপে, তাদের আত্মা কাঁপে।

বুয়েট ক্যাম্পাসে ঢাবি’র জহুরুল হক হলের সশস্ত্র ছাত্রদের আক্রমণের পর, প্রতিটা সংবাদমাধ্যমে আজগুবি সব কাহিনীর জন্ম দেয়া হয়েছে। যুগান্তর এর দাবি, পলাশীর মোড়ে রুটি খাওয়া নিয়ে সংঘর্ষ, আবার অন্যদের দাবি গাঁজা ভাগাভাগি করা নিয়ে ‘সংঘর্ষ’। এরপর আরেকজন সাংবাদিক প্রসব করলেন ‘ইমরান’ নামে একজনকে অপহরণ করা হয়েছে এই সংক্রান্ত একটি ঘোড়ার ডিম। তবে সবচাইতে বড় ডিমটি পেড়েছেন সেই সাংবাদিক, যিনি একটি প্রেমিক যুগলকে ঘটনার কারণ উল্লেখ করে একটি চমৎকার শেক্সপিয়ারীয় ক্লাসিক রচনা করেছেন।

আজকে বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রায় দেড়-দুই হাজার ছাত্রছাত্রীর সমাবেশে অনেক সাংবাদিক এসেছিলেন। তাদের প্রত্যেককে দীর্ঘ সময় জুড়ে ঘটনার বিস্তারিত জানানো হলো, সিসিটিভি ফুটেজ দেয়া হলো, আমাদের দাবিগুলো জানানো হলো। বাড়িতে ফিরে তাদের অনেকেই আগের মতো অশ্বডিম্ব প্রসব শুরু করলেন। চ্যানেল আই হেডলাইন স্ক্রল করলো, ক্যাম্পাসে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের দাবিতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন। ডেইলি স্টার নিজস্ব কায়দায় জানালো, ইমরান নামে কাকে যেন তিতুমির হলে আটকে রাখা হয়েছিল, তাই সংঘর্ষের সূচনা। কেউ কেউ এটাকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বলেও দাবী করলো। অথচ তারা নিজেরাই চাক্ষুষ দেখেছিল, এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, তাদের হাতে সেদিনের ঘটনার সকল প্রমাণও তুলে দেয়া হয়েছিল।

গতকাল একটি প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকের সাথে আমার অনলাইনে তর্ক হয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তিনি দাবি করেন, এখানে কাটছাট হয়েছে, ইমরান এর ঘটনা এখানে নাই। জানতে চাইলাম, ইমরান কে? তার পুরো নাম বা তার পরিচয় কেন পাওয়া যাচ্ছে না? তাকে কেন আটক করা হলো? তাকে কি এখানে ট্যাগ দেয়া যায়? তার বক্তব্য কি? উনি বললেন, না তাকে ট্যাগ দেয়া যাচ্ছে না বিশেষ কারণে। তার পুরো নামও তিনি বলতে পারলেন না। কিন্তু ইমরানের সাথে নাকি তার কথা হয়েছে। তাহলে কি সেই কথা, কে কবে কখন তাকে আটক করেছে? আমাদের প্রতিটা হলে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো, তিতুমির হলের প্রতিটা উইং-এ দুইটা সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো। কেউ সকালবেলায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেও সেইটা রেকর্ড হয়ে থাকে। আসলেই। আর কোথাকার কোন ইমরানকে হলে আটকে রাখা হয়েছে, সেইটার কোন রেকর্ড নাই? সিসিটিভি নেন, দেখান যে এইখানে কিছু হয়েছে। আর তাকে কেন আটকে রাখা হবে, সে কি করেছে? বুয়েটের ছেলেপিলের ঘাড়ে কয়টা মাথা যে ঢাবি’র একটা ছেলেকে আটকাবে? ভয়ডর তো আছে নাকি ভাই?

উনি এড়িয়ে যান। বলেন যে চূড়ান্ত আগের দিন বৃহস্পতিবার কোন এক ঘটনার কারণে নাকি তাকে পরদিন আটক করা হয়েছে। এইবার তাকে আবার ধরি, বৃহস্পতিবার বিকেলে ওভার ব্রিজের উপর থেকে কয়েকজন ড্রাগ এডিক্টকে নেশা করা থেকে উঠিয়ে দেয়া হয়। সেই ড্রাগ এডিক্টরা সেইদিনই সদলবলে ফিরে এসে আমার ছোট ভাইদের মারে, আমার এক ব্যাচমেটকে মেরে তার সাইকেল ও মোবাইল ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এদের বিরুদ্ধে পরে মামলা হয়েছে। আমি বলি, ইমরান কি তাহলে তাদের সাথে ছিল? তাহলে তো মামলায় তার নামও যোগ করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ইমরানের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হোক। এইবার সাংবাদিক ভাইটি আবার পিছলা খান এবং বলেন, বৃহস্পতিবারের ঘটনা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাচ্ছেন না। শুনে হাসি লুকাতে পারলাম না।

আবারো বললাম, ইমরানের বক্তব্য প্রকাশ করা হোক। কিন্তু উনি সেইটাও বলতে পারেন না। বললাম, তর্কের খাতিরে ধরে নেই ইমরানকে কেউ আটক করেছিল, কিন্তু সময়টুকু বলেন, পুরো কাহিনীটুকু বলেন কিভাবে কে কেন তাকে আটক করেছিল। উনি তাও বলতে পারেন না। বললেন আরেকদিন বলবেন। উনি সাংবাদিক, রিপোর্ট লিখেছেন পেটমোটা, অথচ রিপোর্ট লেখার আগে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট কারো সাক্ষাৎকার নেন নাই। যারা আহত তাদের জিজ্ঞেস করেন নাই কেন তারা মার খেয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখার পর ও তার মনের সন্দেহ কাটে না কিন্তু ইমরান নামে যেই অশ্বডিম্বের অস্তিত্বই প্রমাণ করতে পারছেন তাকে নিয়ে শোনা গল্পগুজব নিয়ে তিনি একদম নিঃসংশয়।

কিছুক্ষণ পরে, চক্ষুলজ্জার খাতিরেই বোধকরি, কমেন্ট ডিলিট দিয়ে তিনি পলায়ন করলেন। এই হচ্ছে আমাদের সাংবাদিকদের অবস্থা। এই হচ্ছে তাদের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নিদর্শন। তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যেই আমরা চেঁচাই। এই সাংবাদিকদের অধিকাংশই ঢাবি’র। বিশেষত, ক্যাম্পাস সংবাদদাতা প্রত্যেকেই ঢাবি’র সাংবাদিক সমিতির। ক্যাম্পাসের কয়েকটা গুণ্ডার বিরুদ্ধে কলম ধরার সৎসাহস তারা রাখেন না, উনারা নাকি সত্যের পথের নির্ভীক পথিক। নিজের চোখে দেখলাম এই কয়দিন, খবর কিভাবে ম্যানিপুলেট করে, কৃত্রিম খবর- অসত্য খবর প্রোপাগান্ডা উৎপাদন করা হয় দিস্তায় দিস্তায়। এক ক্লাসমেট হাহুতাশ করছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে এলিট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হয়েও আমরা একটা অপরাধের বিচার চাইতে পারছি না, সত্যকে প্রকাশ করতে পারছি না, তখন বাংলাদেশের আর বাকি সাধারণ মানুষদের অবস্থা কি? দৈনিক ১৮ পাতার এই যে মোচ্ছব, এতে কয়টা বাক্য সত্য আর কয়টা বাক্য এইরকম ম্যানিপুলেটেড? কয়টা ইউনিকর্ণের কেচ্ছা আর কয়টা অশ্বডিম্ব?

এত বছর ধরে শ্রদ্ধা পুষে রাখা একটা পেশার প্রতি সকল শ্রদ্ধা নিমিষে উবে গেল, সাংবাদিকদের অপেশাদার আচরণে।

চমস্কি তোমায় সেলাম!

পাদটীকা ১ঃ

গত ২৬ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার দুপুরে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস সংলগ্ন পদচারী সেতু(ওভারব্রিজ) থেকে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্তকে উঠিয়ে দেয় এবং ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বলে। এই মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে বুয়েট কর্মচারী কোয়ার্টারের বাসিন্দা রাজু, নকীব, ফয়সাল, শুভ এবং এদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্রকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় একই দিন বিকেল বেলায় সেই মাদকাসক্তরা সদলবলে ক্যাম্পাসে অবস্থানরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণ চালায়। তাদের অতর্কিত আক্রমণে নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল দ্বিতীয় বর্ষের সাজ্জাদ বন্ধন, পুরকৌশল প্রথম বর্ষের মীর মোহাম্মদ তৌসিফ, একই বিভাগের প্রথম বর্ষের মাসুম বিল্লাহ ও ফারদিন, পানিসম্পদ বিভাগের প্রথম বর্ষের জ্যোতির্ময় হালদার, যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রথম বর্ষের নাজিবুল বাশার রাহাত ও তাকরীম প্রিয়ম আহত হয়। পরবর্তীতে রাত দশটার সময় আক্রমণকারীরা পুনরায় ফিরে আসে এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ফজলুল হক অভি কে মারধোর করে এবং তার বাইসাইকেল ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় বুয়েট প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে মামলা দায়ের করে।

এর পরদিন, ২৭ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা ৮টার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রাবাস ‘শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’ থেকে প্রায় ৩০-৪০ জন সশস্ত্র ছাত্র পলাশী থেকে ঢুকে বুয়েট শহীদ মিনারসহ পুরো বুয়েট ক্যাম্পাসে বিনা উসকানিতে অতর্কিতে হামলা চালায়। এই সময় তারা ক্যাম্পাসে অবস্থানরত নিরপরাধ ছাত্রদেরকে বেধড়ক মারধোর করে। এইসময় আক্রমণকারীদের হাতে রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প, ক্রিকেট ব্যাট ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়। তাদের আক্রমণে যন্ত্রকৌশল দ্বিতীয় বর্ষের অর্ণব চক্রবর্তী সৌমিক, চতুর্থ বর্ষের তুরাস হক পিয়াল, যন্ত্রকৌশল বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আবু মুসা আবদুল্লাহ সৌরভ, একই বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আতিকুল ইসলাম, পুরকৌশল চতুর্থ বর্ষের দিব্য মণ্ডল, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী শামীম হাসান, কেমিকৌশল তৃতীয় বর্ষের অভিষেক মুহুরী এবং দ্বিতীয় বর্ষের সাদমান গুরুতর আহত হয়। বুয়েটের লোগো সম্বলিত টিশার্ট গায়ে থাকায় শেরেবাংলা হলের একজন ক্যান্টিন বয়কেও তারা গুরুতর আহত করে। আহতদের মধ্যে দিব্য মণ্ডলকে স্কয়ার হাসপাতালে এবং অন্যদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে সাদমান এর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আহতদের সকলেই বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত রয়েছে।

পাদটীকা ২ঃ

সেই সাংবাদিক ভদ্রলোক পুনরায় যোগাযোগ করেন এবং জানালেন, তার আগের বক্তব্যে ভুল তথ্য ছিল । ‘ইমরান’ নামে কাউকে তিতুমির হলে আটকে রাখা হয়নি । নতুন রিপোর্টে সংশোধন করেই লিখেছেন। তার সংশোধনের ইচ্ছা কে সাধুবাদ জানাই, এবং প্রত্যাশা করি আরো অজস্র সাংবাদিক যারা লিখে গেছেন বিভ্রান্তিকর তথ্য, তারা নিজেদের একপেশে তথ্য সংশোধন করে সত্যকে উপস্থাপন করবেন সাহসিকতার সাথে ।

লেখকঃ
শাঈখ আল মাহমুদ বনি,
বুয়েট শিক্ষার্থী।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top