ফ্লাডলাইট

ব্যালন ডি ওর: ফুটবলারদের স্বপ্নের পুরষ্কার

ব্যালন ডি ওর: ফুটবলারদের স্বপ্নের পুরষ্কার

“ব্যালন ডি ওর” ব্যক্তিগত অর্জনে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক অ্যাওয়ার্ড। ফুটবল বিশ্বের সব বাঘা প্লেয়াররা যাদের শৈল্পিক প্রদর্শনের মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করে, যাদের অবদানে দেশ অথবা ক্লাব জিতে শিরোপা, তাদের বিশেষ সম্মান প্রদর্শনে এবং শ্রেষ্ঠত্বের অর্জন হিসেবে দেওয়া হয় এই পুরষ্কার।

“ব্যালন ডি ওর” শব্দটি ফরাসি শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ “সোনার বল”। এই পুরষ্কার দেওয়া হয় ফ্রেন্স ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক। ১৯৫৬ সাল থেকে এই পুরষ্কার দেওয়া শুরু হয় এবং এটি এখন অব্দি চলছে। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে দামি অ্যাওয়ার্ড এর মধ্যে এটি একটি। যদিও ২০১০ সালে ফিফা এবং ফ্রেন্স ফুটবলের মধ্যে একটি চুক্তি হয় যেখানে ব্যালন ডি ওর কে ফিফা ব্যালন ডি ওর করা হয়। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল ৬ বছর যা ২০১৬ সালে শেষ হয়। এই অ্যাওয়ার্ডটি “ফিফা প্লেয়ার ওফ দা ইয়ার” হিসেবেও পরিচিতি পায়। তবে ২০১৬ সালে চুক্তি শেষ হওয়ার পর এবং এই অ্যাওয়ার্ড এর ইতিহাসের কথা ভেবে এই অ্যাওয়ার্ডকে আবার ব্যালন ডি ওর এ প্রত্যাবর্তন করা হয়।

এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় পুরুষ খেলোয়াড়কে যে তার অনবদ্য খেলায় সবাইকে বিষ্মিত করেছে বছর জুড়ে। আসলে অ্যাওয়ার্ডটির সৃষ্টি হয়েছিল শুধু ইউরোপিয়ানদের জন্য। ১৯৯৫ সালে তা ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোতে খেলা প্লেয়ারদের জন্য বর্ধিত করা হয় তবে ২০০৭ সাল থেকে বিশ্বের সকল প্লেয়ারদের জন্য তা উন্মুক্ত করা হয়।

ব্লাকপুলের স্টানলি ম্যাথিউস ছিলেন ব্যালন ডি ওর এর প্রথম বিজেতা। ১৯৯৫ সালের পূর্বে ইংলিশ মিডিয়াতে “ইউরোপিয়ান প্লেয়ার অফ দা ইয়ার” নামেই পরিচিত ছিল। এসি মিলানের জর্জ উইহ ছিলেন প্রথম আফ্রিকান যিনি এই ট্রফি জিতেন। এর দুই বছর পর রোনালদো (ফেনোমেনন) ছিলেন প্রথম সাউথ আমেরিকান প্লেয়ার যিনি এই অ্যাওয়ার্ড জিতেন । বিশ্বের ৩জন প্লেয়ার যাদের ৩বার এই অ্যাওয়ার্ড জিতার কৃতিত্ব রয়েছে। তারা হলেন জোহান ডি ক্রইফ,অ্যাজাক্সের এবং বার্সার ; মিশেল প্লাতিনি জুভেন্তাসের এবং মার্কো ভেন বাস্তেন, মিলানের। একমাত্র ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রিয়াল মাদ্রিদ এবং লিওনেল মেসি, বার্সেলোনার ৫বার এই ট্রফি জিতার কৃতিত্ব রয়েছে। জাতীয় দলগুলোর মধ্যে জার্মান প্লেয়াররা সর্বাধিক ব্যালন জয় করেন। আর ক্লাবগুলোর মধ্যে এই রেকর্ডটি বার্সেলোনার।

এছাড়াও একটি স্পেশাল ব্যালন ডি ওর “সুপার বালন ডিওর” দেওয়া হয় আলফ্রেডো ডি স্টেফানো কে। ১৯৮৯ সালে যখন ফ্রেন্স ফুটবলের এক ভোটিং এ সে জোহান ক্রইফ আর মিশেল প্লাতিনিকে ছাড়িয়ে যান। এর এক দশক পর ফ্রেন্স ফুটবল পেলেকে Football player of the Century ঘোষনা করে এটি করা হয় প্রাক্তন ৩৪ জন ব্যালন ডি ওর জয়ী ফুটবলারদের নিয়ে । ৩৪ জনের মধ্যে ৩০ জন ভোট দেন। এই মহান ফুটবলারদের মধ্যে স্ট্যানলি ম্যাথিউস, ওমর সিভরি আর জর্জ বেস্ট ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন এবং লেভ ইয়াশিন মারা যান। প্রত্যেক ভোটারকে এসময় ৫টি ভোট দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয় যেখানে তারা ৫ পয়েন্টের জন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করতে পারেন । এই ভোটাভোটিতে ১৭ জনের ভোটে সেরা ফুটবলার হিসেবে মনোনীত হন পেলে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যারডোনা ছিল তার চেয়েও অর্ধেকেরও বেশি ভোট কম।

২০১৬ সালে ব্যালন ডি ওর ৬০ তম বার্ষিকীতে ফ্রেন্স ফুটবল একটি লিস্ট বের করে যেখানে ১৯৯৫ সালের পূর্বের ইউরোপ বর্হিভুত প্লেয়ারদের ব্যালন ডি ওর দিয়ে সম্মানিত করা হয়। কারন সেই সময় শুধু ইউরোপিয়ানরা এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত ছিলেন। ১৯৯৫ সালের পূর্বের ৩৯ টি ব্যালন ডিওর এর মধ্যে ১২টি এই সময় প্রদান করা হয়। যার মধ্যে ৭টি পেলে ১টি ম্যারডোনা আর ১টি রোমারিও জিতেন।

বিজয়ী বছাই প্রক্রিয়া

প্রাথমিক লিস্ট
ফিফা ফুটবল এক্সপার্টদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সেরা প্লেয়ারদের এই লং লিস্ট তৈরী করা হয়।

ভোটিং প্রক্রিয়া
সাধারনত ফিফার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশের ক্যাপ্টেন,কোচ আর জার্নালিস্টদের ভোটে এই প্লেয়ারদের রেটিং করা হয়। । ভোটের পয়েন্ট হয় তিনটি পজিশনের ভিত্তিতে। অর্থ্যাৎ ১ম পজিশন, ২য় পজিশন, ৩য় পজিশন। ১ম পজিশনে সিলেক্টকারী পায় ৫ পয়েন্ট, ২য় পজিশনে ৩পয়েন্ট এবং ৩য় পজিশনে ২ পয়েন্ট পায়। এরপর একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা হয় যেখানে বিশাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বের ফুটবল সুপরস্টারদের আমন্ত্রন করে বিজয়ীদের পুরষ্কার দেওয়া হয়।
ব্যালন ডি ওর বিজয়ী ফুটবলার এবং তাদের ক্লাবের লিস্ট (১৯৮০ – বর্তমান):-

১৯৮০-কার্ল হেইন্জ রোমারিন্জ, বায়ার্ন
১৯৮১- কার্ল হেইন্জ রোমারিন্জ, বায়ার্ন
১৯৮২-পাউলো রসি, জুভেন্তাস
১৯৮৩- মিসেল প্লাতিনি, জুভেন্তাস
১৯৮৪-মিসেল প্লাতিনি,জুভেন্তাস
১৯৮৫-মিসেল প্লাতিনি,জুভেন্তাস
১৯৮৬-ইগোর বেলানভ,ডাইনামো
১৯৮৭-রুড গাল্ট,মিলান
১৯৮৮-ভেন বাস্টেন,মিলান
১৯৮৯-ভেন বাস্টেন,মিলান
১৯৯০- লুথার ম্যাথিউস,ইন্টারন্যাপোনাল
১৯৯১- পিটা পাপিন, মার্সেলিই
১৯৯২- ভেন বাস্টেন,মিলান
১৯৯৩- রবার্তো বাজিও, জুভেন্তাস
১৯৯৪- রিসাতা স্টোরিসকার্, বার্সেলোনা
১৯৯৫-জর্জ উইহ, মিলান
১৯৯৬-ম্যাথিয়াস সামার,বুরুশিয়া ডর্খমুন্ড
১৯৯৭-রোনালদো, ইন্টারন্যাপোনাল
১৯৯৮- জিদান,জুভেন্তাস
১৯৯৯- রিভালদো,বার্সেলোনা
২০০০- ফিগো,রিয়াল
২০০১- ওয়েন,লিভারপুল
২০০২- রোনালদো,রিয়াল
২০০৩- পাভেল নাদভেদ,জুভেন্তাস
২০০৪-আন্দ্রে সিভাচেনকো,মিলান
২০০৫- রোনালদিনহো,বার্সেলোনা
২০০৬- ফ্যাবিও কযানিভেরো,রিয়াল
২০০৭- কাকা,মিলান
২০০৮ রোনালদো,ম্যান ইউ
২০০৯-মেসি,বার্সেলোনা
২০১০-মেসি,বার্সেলোনা
২০১১-মেসি,বার্সেলোনা
২০১২-মেসি,বার্সেলোনা
২০১৩- রোনালদো,রিয়াল মাদ্রিদ
২০১৪-রোনালদো,রিয়াল মাদ্রিদ
২০১৫ -মেসি,বার্সেলোনা
২০১৬-রোনালদো,রিয়াল মাদ্রিদ
২০১৭-রোনালদো,রিয়াল মাদ্রিদ

 

বিশ্বের বেস্ট ফুটবলার এর স্বীকৃতি হল এই ব্যালন ডি ওর। ফুটবলাররা বছর জুড়ে তাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে, দেশ ও ক্লাবের হয়ে ট্রফি জিতার প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকে। এই প্রচেষ্টারই ক্ষুদ্র স্বীকৃতি হল ব্যালন ডি ওর। যা তাদের নিজেদের ছাপিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা দিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর।

Most Popular

To Top