ইতিহাস

ইন্দিরা গান্ধীঃ ভারতের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী

ইন্দিরা গান্ধীঃ ভারতের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী- নিয়ন আলোয়

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইন্দিরা গান্ধী। সেই সাথে তিনি আজ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের প্রথম এবং একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী। ইন্দিরা গান্ধী বিখ্যাত নেহেরু পরিবারের সন্তান। আজকে ৩১ শে অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী হত্যার ৩৩ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৮৪ সালের এইদিনে নিজ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী।

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। জওহরলাল নেহেরুর পিতার নাম মতিলাল নেহেরু। মায়ের নাম স্বরূপ রানি। পেশায় মতিলাল নেহেরু একজন একজন আইন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এলাহাবাদে স্থানান্তর হওয়ার পর মতিলালের মনে কংগ্রেসের রাজনীতি দাগ কাটে। তিনি তার এক ছেলে জওহরলাল ও দুই মেয়ে লক্ষ্মী ও কৃষ্ণাকে পাশ্চাত্য সংস্কার শেখাতেন পাশাপাশি দেশী সংস্কারের শিক্ষাও দিতেন। পনেরো বছর বয়সে মতিলাল তার ছেলেকে পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দেন, সে যুগের ধনী পিতার মত। “সে যুগের ধনী পিতার মত” বলা হয়েছে কারণ সে সময় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল সব পিতারই ইচ্ছা ছিল তার সন্তানকে পড়াশোনার জন্য বিলেতে পাঠানোর। ইংল্যান্ডে গিয়ে জওহরলাল কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে ন্যাচার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে তার মনে সমাজতন্ত্র গভীর আঁচড় কাটে। ভারত প্রত্যাবর্তনের পর তিনি ১৬ বছয় বয়সী কমলা কাউলকে বিয়ে করেন। বিয়ে করার সময় জওহরলাল নেহেরুর বয়স চিল ২৭ বছর। ঠিক একবছরেই পরে কমলা কাউলের গর্ভে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীর জন্ম হয়। জওহরলাল তার পিতার মত নিজেকেও আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পিতার পথ অনুসরণ করেই পুত্র কংগ্রেসের রাজনীতিতে প্রবেশ করে। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জওহরলাল তার আরাম আয়েসের জীবন ত্যাগ করেন। ১৯৪৭ সালের পনেরোই আগস্ট তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন।

নেহেরু পরিবার যেহেতু আগে থেকেই রাজনীতির সাথে সম্পৃকত সেহেতু ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীর রাজনীতিতে আসা কোন বিস্ময়ের বিষয় ছিল না। ইন্দিরা তার পিতার মত নিজেও গান্ধীজির আদর্শ দ্বারা প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত ছিলেন। পড়াশোনা করার সময় ইন্দিরাকে বিভিন্ন জায়গাতে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। এলাহাবাদ, পুনে ঘুরে অবশেষে বোম্বাই এর এক স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর তিনি শান্তিনিকেতনে চলে যান। সেখানে রবিঠাকুরের সাহচর্যে বেশ কিছু দিন কাটান। ইন্দিরার প্রিয়দর্শিনী নামটাও রবিঠাকুরেরই দেওয়া। শান্তিনিকেতনেও বেশী দিন থাকা হয়নি। অসুস্থ মা কমলা কাউলকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য সুইজারল্যান্ড যেতে হয়। ১৯৩৬ সালে তার মাতৃবিয়োগ ঘটে। তারপর তিনি অক্সফোর্ডের সামারভিল কলেজে পড়তে গেলেন। কিন্তু কিছু শারীরিক অসুস্থতার জন্য পড়া শেষ করতে পারেননি। অক্সফোর্ডে পড়াকালীন সময়ে তিনি ফিরোজ গান্ধী নামক একজনের প্রেমের পড়েন। ফিরোজ গান্ধীর জন্ম বোম্বেতে হলেও তার পরিবার ছিল পারস্য থেকে আগত এবং জরস্ত্রিয়ান ধর্মের অনুসারী। ঘটনাচক্রে ফিরোজ গান্ধী আর ইন্দিরা পড়াশোনার জন্য সামারভিল কলেজে একই সময় অবস্থান করছিলেন। ইন্দিরা তার পিতা জওহরলালকে তাঁদের প্রণয়ের কথা জানালে অন্য ধর্ম বলে প্রথমে আপত্তি করলেও, পরে মেনে নেন। ফলশ্রুতিতে ১৯৪২ সালে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ে হয় হিন্দু শাস্ত্রমতে। ফিরোজ গান্ধীকে বিয়ে করার পরেই ইন্দিরা তার পারিবারিক পদবী নেহেরু ছেড়ে গান্ধী পদবি গ্রহণ করেন।

১৯৩৮ সালে ইন্দিরা গান্ধী আনুষ্ঠানিক ভাবে কংগ্রেসের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৪৭ সালে ইন্দিরার পিতা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ইন্দিরা তার পিতার ছায়াসঙ্গী হয়ে গেলেন। বলতে গেলে অঘোষিত সহকারি।
১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী বাহাদুর শাহ এর মৃত্যুর পরে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইন্দিরা গান্ধী আবার সরকার গঠন করেন। ১৯৭১ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল । ১৯৮০ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয় কংগ্রেস এবং আবার প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকারিত করেন ইন্দিরা গান্ধী।

তুখোড় রাজনীতিবিদ হিসেবে বিশ্ব রাজনীতি পরিমন্ডলে সুখ্যাতি ছিল ইন্দিরা গান্ধীর। কিন্তু কিছু ভুল এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য তাকে করুণ মৃত্যু বরণ করতে হয়।

শিখ ও হিন্দুদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস অনেক পুরোনো কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৮৪ সালে সে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মাত্রা পূর্বের যেকোন সময়ের তীব্রতা ছাড়িয়ে যায়। সে সময় শিখ জঙ্গিদের প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর জিরো টলারেন্স নীতি ছিল। তাই ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে সেনাবাহিনী অমৃতসর ( শিখদের সবচেয়ে পবিত্র মন্দির ) মন্দিরে শিখ জঙ্গিদের নিশ্চিহ্ন করতে হামলা চালায়। হামলায় কমপক্ষে একশো মানুষ নিহত হয়। শিখরা তাঁদের সবচেয়ে পবিত্র মন্দির সেনাবাহিনীর হামলা চালানোর কারণে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং সবচেয়ে বড় বিষয় ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি তাঁদের মনে তীব্র ঘৃণার জন্ম নেয়। ক্রোধের আগুনে জ্বলতে থাকে প্রতিটি শিখ। চারদিকে ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার হুমকি আসতে থাকে। তবে তাতেও যে ইন্দিরা গান্ধী খুব একটা বিচলিত ছিলেন না, তা সে সময়ে তার দেওয়া সাক্ষাৎকার দেখে বোঝা যায়। তবে ভারতের নিরাপত্তা পরিষদ ঝুঁকি এড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষীদের মধ্য থেকে শিখ দের সড়িয়ে দিতে চাইলেও ইন্দিরা গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইন্দিরা গান্ধীর আদেশে অপারেশন ব্লু স্টার চলাকালীন “স্বর্ণমন্দির” নামে পরিচিত শিখদের সর্বোচ্চ তীর্থ “হরমন্দির সাহিব”-এ সেনা অভিযানের প্রতিশোধরূপে তাঁকে হত্যা করে বলে ধারণা করা হয়।

৩১ শে অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবন ১ নং সফদর জং রোডে ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার উস্তিনেভ আসেন একটি ডকুমেন্টারী বানাতে। শ্যুটিং এর সময় ইন্দিরা গান্ধী যখন বাগানে হাঁটছেন এমন তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বেয়ান্ত সিং (শিখ) তার সাইড আর্ম থেকে পরপর তিনটি গুলি ছোড়ে প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে। ইন্দিরা গান্ধী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর সতসওয়ান্ত শিং স্টেন গান থেকে ৩০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এই ঘটনা ঘটার ছয় মিনিট পরে বর্ডার পুলিশ রমেশ শিং ও রাম শরণ অন্য একটি কক্ষে নিয়ে বেয়ান্ত শিং কে গুলি করে হত্যা করে এবং সতসওয়ান্ত সিং কে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর ১০ ঘন্টা পর দূরদর্শন টেলিভিশন চ্যানেলের উপস্থাপিকা তার হত্যার সংবাদ পাঠ করেন।

৩ রা নভেম্বর ইন্দিরা গান্ধীর শেষকৃত্যের পর শিখবিরোধী অভিযান নতুনমাত্রা পায়। এ সময় দাঙ্গায় প্রায় তিন হাজার শিখ প্রাণ হারায় এবং লাখ খানেক শিখ ঘরবাড়ি হারায়। এই দাঙ্গায় ভারতীয় প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল বিশেষ করে দিল্লি পুলিশ এবং সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর কথা বেশী শোনা যায়।

Most Popular

To Top