নাগরিক কথা

আমাদের সমাজ কেন এমন ধর্ষণপ্রবল?

আমাদের সমাজ কেন এমন ধর্ষণপ্রবল?

দুই চারদিন পরপরই আমাদের সংবাদ এবং সামাজিক মাধ্যম সরগরম হয়ে ওঠে কোনো না কোনো ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে। আজ তনু ধর্ষিতা হচ্ছেতো, কাল হচ্ছে পুজা। পরশুদিন নাম না জানা অন্য কোনো তরুণী। পাঁচ বছরের শিশু থেকে শুরু করে পঞ্চাশ বছর বয়সের নারী, কেউ-ই নিরাপদ নয় এখন বাংলাদেশে। প্রতিটা নারীকে এখানে দিন পার করতে হয় ধর্ষণের আশংকা এবং আতঙ্ক মনের মধ্যে পুষে রেখে। এটা যে কী পরিমাণ একটা যন্ত্রণা, সেটা নারীরা ছাড়া আর কেউ পুরোটা বুঝবে না। একটা সমাজে, যেখানে নারীর কোনো নিরাপত্তা নেই, সেই সমাজে বসবাস করাটা শুধু অসহনীয় নয়, বিপদজনকও বটে। আজকে অপরিচিত কারো এই করুণ দশা হয়েছে, কাল যে আমার বা আপনার বোনের, কিংবা আমাদের মেয়ে সন্তানদের একই দশা হবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এই নিশ্চয়তা যে নেই, সেটা বাংলাদেশের প্রতিদিনের সংবাদপত্রে চোখ বুলালেই চোখে পড়ে। পত্রিকার পাতা ভর্তি থাকে ধর্ষণের রগরগে খবর দিয়ে। কোথাও একা কোনো ধর্ষণকারী ধর্ষণ করেছে কাউকে, কোথাও বা কোনো নারী শিকার হয়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণের। ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই নারীর জন্য অপেক্ষা করছে ধর্ষণ। এই ধর্ষক যে শুধু অপরিচিত পুরুষ হবে, তাও নয়। পরিচিত পুরুষ, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যের কেউ-কেউও ঝাঁপিয়ে পড়ছে একাকী কোনো নারীর ওপর, সুযোগ পেলেই। এই সব ধর্ষণের আবার বেশিরভাগই পত্রিকার পাতায় আসে না। ধর্ষিতা নারীরা সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে চেপে যায় তাদের নির্যাতনের কথা। এদের অনেকে পুলিশের কাছে যেতেও দ্বিধাগ্রস্ত এবং ভীত-সন্ত্রস্ত। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মতো এর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ধর্ষণপ্রবল। এদের হাত থেকেও নারীরা রক্ষা পায় না। ইয়াসমিন তার প্রমাণ।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সমাজ এমন ধর্ষণপ্রবল কেন? কেন দুই লিঙ্গের মধ্যে একটা এমন আক্রমণাত্মক, আর অন্যটাকে তার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত? ধর্ষণের ভয় মনের মাঝে নিয়ে প্রতিমুহূর্তে চলতে হয় দ্বিতীয় লিঙ্গকে। রাত তো বাদই দিলাম, দিনের আলোও নিরাপদ নয় তার জন্য। তার গতিবিধি সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় প্রবল ভয়ে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকারটুকু পর্যন্ত তার নেই। হিংস্র পশুর কারণে এরকম নিরন্তর ভয়ে একমাত্র বনের নিরীহ পশু-পাখিরাই বসবাস করে। আমাদের সমাজে হিংস্র পশু নেই, সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে একদল হিংস্র পুরুষ মানুষ। আর এদের ভয়ে নারী সর্বদা আতঙ্কিত, জড়সড়। নিরন্তর ধর্ষণ ভীতির মধ্যে বসবাস করতে হয় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা নারীকেই।

ধর্ষণ আসলে কমবেশি সব সমাজেই বিদ্যমান। এর নষ্ট জন্ম সেই অনাদিকালে। যার রূপ আমরা দেখি পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যেও। গ্রিক পুরান থেকে শুরু করে ভারতীয় পুরান, সব জায়গাতেই ধর্ষক দেবতাদের জয়জয়কার। পরাশর, জিউস, এরা সব একেকজন ধর্ষণে পটু দেবতা। আজকের দিনে এই ধর্ষক দেবতাদের জায়গা নিয়ে নিয়েছে বীরপুঙ্গব পুরুষেরা। আমেরিকা বলেন, ইউরোপ বলেন, কিংবা আমাদের বাংলাদেশ বলেন, কোথাও নারী মুক্তি পাচ্ছে না ধর্ষণের হাত থেকে। তবে, এর মাঝেও কোনো কোনো সমাজ আছে, যেখানে ধর্ষণের মাত্রা কম। কোনো কোনো সমাজ আছে যেখানে ধর্ষণের পরিমাণ প্রবল। বাংলাদেশ এই দ্বিতীয় গোত্রের মাঝে পড়ে। ধর্ষণের মাত্রার এই কম-বেশি হওয়াটা নির্ভর করে সংস্কৃতির উপর। কোনো কোনো সমাজের সংস্কৃতি ধর্ষণকে নিরুৎসাহিত করে, আবার কিছু কিছু সমাজের সংস্কৃতি একে অনুপ্রাণিত করে, উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশেও যে ধর্ষককে ভালো চোখে দেখে হয়, তা নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে ধর্ষকের সাথে সাথে ধর্ষিতাকেও সেই অপরাধ করার উস্কানিদাতা হিসাবে অনেক সময় চিহ্নিত করা হয়। ধর্ষণের জন্য কখনো দায়ী করা হয় তার পোশাককে, কখনো না বা দায়ী করা হয় তার চালচলন, কখনো বা দায়ী করা হয় তার অসময়ে ঘরের বাইরে আসাকে। বিচার-সালিশ বসলে, ধর্ষকের সাথে সাথে ধর্ষিতারও বিচার হয়ে যায় প্রায়শই।

পুরুষ কেন নারীকে ধর্ষণ করে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন পণ্ডিত ব্যক্তিরা বহু আগে থেকেই। সামাজিক বিজ্ঞানের বহু শাখার বহু বিদগ্ধ ব্যক্তি এ নিয়ে নানা গবেষণা করেছেন এবং শেষমেশ এটাই বলেছেন যে, ধর্ষণের জন্য একক কোনো কারণ দায়ী নয়, বরং অনেকগুলো কারণ একত্রিত হয়েই ধর্ষণের মতো নোংরা অপরাধটা সংঘটিত হয়ে থাকে।

এর মধ্যে নারীবাদী লেখকরা ধর্ষণের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত। ব্রাউন মিলার ধর্ষণের স্বরূপ দেখাতে গিয়ে দাবি করেন যে, প্রকৃত ধর্ষণকারী কোনো ব্যক্তি নয়, প্রকৃত ধর্ষক হচ্ছে পিতৃতন্ত্র। তাঁর মতে ধর্ষণ পিতৃতন্ত্রের জন্যে দরকার, কেননা ধর্ষণ পিতৃতন্ত্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ নয়, ধর্ষণ পিতৃতন্ত্রকে বিপন্ন করে না; বরং কাজ করে পিতৃতন্ত্রের সেনাবাহিনীর মতো। নারীবাদীদের এই বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্ষণ হচ্ছে কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি, যা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উৎসাহ প্রদান করে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতাত্ত্বিক পেগি রীভস স্যানডে তাঁর ‘দ্য সোশিও কালচারাল কন্টেক্স অব রেপ: এ ক্রস কালচারাল স্টাডি’ গবেষণা গ্রন্থে এই দৃষ্টিভঙ্গির একটা পরীক্ষা চালান। পেগি ১৫৬টা ট্রাইবাল সমাজের উপর গবেষণা চালান এবং আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করেন যে, এ সমাজগুলোতে ধর্ষণ নেই, বা থাকলেও তা একেবারেই সামান্য, বিরলই বলা চলে। পেগির মতে ধর্ষণমুক্ত সমাজগুলো, যে সমাজগুলোতে ধর্ষণ রয়েছে তার থেকে পুরোপুরিই আলাদা ধরনের। যে সমাজগুলোতে ধর্ষণ বিদ্যমান, সেগুলো মূলত পুরুষ আধিপত্যবাদী সমাজ এবং চরম বিশৃঙ্খলাময় সন্ত্রাসমৃদ্ধ সমাজ। অন্যদিকে ধর্ষণমুক্ত সমাজগুলোতে নারী-পুরুষের সমতা অনেক বেশি এবং নারী এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি অধিক শ্রদ্ধা বিরাজমান সেখানে। পেগি এই উপসংহারে পৌঁছান যে, পুরুষ প্রকৃতিগতভাবেই আক্রমণাত্মক, কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু কিছু সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য পুরুষের এই আক্রমণাত্মক রূপকে আরো বিকশিত হতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

পেগির গবেষণার সূত্র ধরেই বলি, বাংলাদেশের সমাজ থেকে যতোদিন পর্যন্ত না এই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা দূর হবে, যতোদিন পর্যন্ত না লিঙ্গভিত্তিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যতদিন পর্যন্ত না নারীর প্রতি পুরুষের শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাবে, যতোদিন পর্যন্ত না শ্রেণী বৈষম্যের মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, ততোদিন পর্যন্ত ধর্ষণকে সমাজ থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। পুরো সমাজকে ধর্ষণপ্রবন মানসিকতায় রেখে, দুই চারজন ধর্ষককে কঠোর শাস্তি দিয়ে সাময়িক উপশম হয়তো হবে, সার্বিক অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। দুইদিন পরেই অন্য কোনো নারী ধর্ষিত হবে অন্য কোনো পরিস্থিতে, অন্য প্রেক্ষাপটে।

তাই আসুন, আমরা পুরুষেরা মনের ভিতরে জেঁকে বসা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকে না বলি, নারীকে মানুষ হিসাবে সমান সম্মান এবং মর্যাদা দিতে শিখি। সামান্য এইটুকু দিতে জানলেই, ধর্ষণবিহীন সমাজ গড়ে তোলাটা কঠিন কোনো কাজ না।

Most Popular

To Top