নাগরিক কথা

আমরা ডাক্তার পিটানো বীর বাঙালি

আমরা ডাক্তার পিটানো বীর বাঙালি

জাতি হিসাবে বাঙালিরা ‘বীর’, এর যথার্থ প্রমাণ বাঙালিরা একবারই দেখাইতে পারিয়াছিলো, সেইটা ১৯৭১। ইনডিভিজুয়ালি ইহাদেরকে আমার তেমন বীরপুরুষ বলিয়া মনে হয় না, একেকজন একেক ধান্ধায় মাতিয়া থাকে। তবে বাঙালিরা বিভিন্ন মতাদর্শের ও ধান্ধার হইলেও এরা এক হয় একটা ইস্যুতে, সেইটা হইলো “ডাক্তার প্যাঁদানীতে”। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে সব ইঁদুর যেমন তার পিছনে হাঁটা দিয়াছিলো, ঠিক তেমনি অমুক জায়গায় ডাক্তার পিটানো হইবে- হ্যামিলনের বাঁশির এই সুর শুনিলে পিল পিল কইরা লোকজন ডাক্তার পিটাইতে হাজির হইয়া যায়।

লেটেস্ট আপডেট হইলো- গতকাল ডি.এম.সি.র মত জায়গায় বীর বাঙালির কিছু সদস্য আসিয়া তাহাদের বীরত্বের কিছু নমুনা দেখাইয়া গিয়াছেন। চিকিৎসক নামক এক সর্বংসহা প্রজাতির কয়েকজনকে সুন্দরমত বানানো হইয়াছে, একজনের হস্তখানিও ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইয়াছে। ক্লাস চলাকালীন অবস্থায় রুমে ঢুকিয়া, বেদম পিটুনিতে এদের পড়ালেখার খায়েশও মিটাইয়া দেওয়া হইয়াছে।

ডি.এম.সি.র মত জায়গায় যদি এই ধরণের ঘটনা ঘটিয়া যায় তবে সারা দেশে প্রতিদিন যে ১০-১২ টা ডাক্তার পাবলিকের প্যাঁদানিতে মরিয়া যায়না, তাহাতেই আমাদের দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করা উচিত।

পেটে খাইলে নাকি পিঠে সয়। চিকিৎসকরা মাইর না হয় খাইলো, পেটে দানাপানি কেমন পড়ে?

ঘটনা হইলো গিয়া কয়দিন আগে দুপুরে মতিঝিল হইতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে যাইব বলিয়া বাসা থাইকা বাহির হইলাম। জ্যামে ত্যক্তবিরক্ত হইয়া ‘পাঠাও’ সার্ভিস এর মাধ্যমে হোন্ডায় বসিয়া রওনা দিলাম। চালক হোন্ডা চালাইতেছেন, পায়ে বারবার কি যেন খোঁচা লাগে, লক্ষ্য করিতে গিয়া দেখি চালক সাহেবের পকেট থাইকা Stethoscope উঁকি মারিতেছে।

বুঝেন দেহি অবস্থাটা! পেটে দানাপানি কেমন পড়িলে একজন তরুণ চিকিৎসক নিজের হোন্ডা লইয়া ভাড়ায় চালাইতে নামিয়া যায়।

কয়দিন ধরিয়া ফেসবুকে একটা বিজ্ঞাপন ভাসিয়া বেড়াইতেছে। ডাক বিভাগের একখান বিজ্ঞাপন, হেতেরা খন্ডকালীন ডাক্তার নিয়োগ দিতে ইচ্ছুক, মাসে নাকি সর্বসাকুল্যে ৮,০০০ টাকার বেশী দিবার পারিবে না।এইবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৮০,০০০ ছাত্রছাত্রী অংশ নিয়াছিলো, যাহারা চান্স পায় নাই তাহাদের শুভকামনা জানাইতেছি।

খন্ডকালীন বা পূর্ণকালীন যাহাই হোক না কেন, একজন চিকিৎসককে ৮০০০ টাকা সাধিতে চাওয়া যে কতবড় অন্যায় সেটা যাহারা দিনরাত পানি করিয়া চিকিৎসক হইয়াছেন তাহারাই ভালো বুঝিবেন। ডাক বিভাগের লোকজন থাপ্পড়টা কিন্তু সব চিকিৎসককে সমানভাবেই দিয়াছেন।

যাহাই হোক, দোয়া করিতেছি, যিনি এই বিজ্ঞাপন ছাপতে দিয়াছেন, তাহার পরিবারের কেউ একজন চিকিৎসক হইয়া এই ৮,০০০ টাকার চাকরীটা করিবেন। আমীন।

Let me give you an interesting information: আমার খালারও একখান পার্টটাইম ড্রাইভার রহিয়াছে। মাসে তাহাকে ৬,০০০ টাকা দেওয়া হয়, তবে যেদিন গাড়ি চালাইতে আসে সেদিন তাহাকে খাওয়া দাওয়ার টাকাও দেওয়া হয়, সর্বসাকুল্যে ৮০০০ টাকাই পড়ে।

মাইর গেলো, পেটের দানাপানিও গেলো, মানসম্মান এর কি দশা?

এক বিশিষ্ট সেলিব্রেটির লেখা নজরে আসিলো। উনি নিজে চিকিৎসক হইয়া বলিতেছেন-‘ ডাক্তারি বিদ্যা মুখস্থ বিদ্যা, ছ্যাঁ, ছ্যাঁ, এতে মেধা যাচাই হয় নাগো।’

সাধারণ লোকজন এই কথা ভালো খাইলো, বলিয়া উঠিলো “ঠিকই তো, আমাদের মেধা কম কিসে, মেডিকেলে না হয় চান্সটা পাই নাই, যে জটিল সাবজেক্টে পড়ি সেখানে কত গভীরভাবেই না মাথাটা খাটাইতে হয়।”

সেলিব্রেটিকে বলিঃ ‘মেধা তবে কিসে যাচাই হয়?’

একজন সার্জন যখন সার্জারি করেন তখন উনি জানেন যে কতক্ষণের মাঝে ঐ অপারেশনটি তাহাকে শেষ করিতে হইবে, এর বেশী সময় নিলে কি কি সমস্যা হইতে পারে। অপারেশনের সময় বিভিন্ন ইমার্জেন্সি সিচ্যুয়েশন অ্যারাইজ করিতে পারে, সেগুলো একেকজন সার্জন তাহার ব্রেন খাটাইয়া একেকভাবে সমাধান করিয়া থাকেন। একজন মেডিসিন স্পেশালিষ্ট চিন্তা করেন, যে লোকটি তাহার সামনে বসিয়া আছে তাহার কি কি ডিজিজ হইতে পারে, কোনটার সম্ভাব্যতা বেশী, কেন অন্যটি হইবে না, কোন কোন পরীক্ষা দিলে রোগটি ধরা দিবে, চিকিৎসা দেবার কি কি অপশন আমার হাতে রহিয়াছে, সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এই রোগীর জন্য কোন অপশনটা উপযুক্ত, এই চিকিৎসায় রোগীটার কি কি ক্ষতি হইতে পারে, কিভাবে সায়েন্টিফিক্যালি সেগুলা সামাল দেয়া যায়। এইগুলান মুখস্থবিদ্যা?

ডাক্তারি পাশ করিয়া ডাক্তারি না করিলে,”ডাক্তারি মুখস্থবিদ্যা” এইসব আজগুবি কথা মাথায় আসিতেই পারে, তাহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। সমস্যা হইল গিয়া তিনি চিকিৎসক হইয়া অযৌক্তিক কথা কইয়া আমাদের বারোটা বাজাইতেছেন।

মাইর গেলো, দানাপানি গেলো, এক অপাংক্তেয় চিকিৎসক আমাদের বাঁশও দিয়া দিলেন। আচ্ছা, বাইরের লোকজনের অবস্থাটা কি? তাহারা চিকিৎসককে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

সাধু শিক্ষকরা কয়দিন আগে প্রশ্নপত্রে ছাপাইয়া দিলেন, আমরা নাকি লোভী চিকিৎসক। তাহারা ক্লাসে না পড়ানোয় কোচিং এ যে ছাত্রছাত্রী খুশি মনে পড়তে আসে তাহাদেরকে নিজের পকেটের টাকা দিয়া তেনারা মনে হয় লেবেন্চুস খাওয়ান।

কয়দিন আগে কিছু ছাগল ম্যা ম্যা করিয়া কহিলেন, ‘পেটে বাচ্চা রাখিয়া পেট সেলাই হইয়াছে, ইহা আবার কেমন ডাক্তারি? ‘

কেহ এক্সপার্ট অপিনিয়নের তোয়াক্কা করিলেন না, গর্জে উঠিলেন, আজ চিকিৎসক শালার একদিন কি আমার একদিন।

বাঁশের কেল্লা টাইপ এক পেইজে এই ঘটনা ফলাও করিয়া প্রকাশ করা হইলো, এর সাথে জুড়িয়া দেয়া হইলো, ‘কইনচেন দেহি, কেন এই অপচিকিৎসা? নিশ্চয়ই এরা সারারাত ট্যাকার জইন্যে সিজার করে, তাই এ অবস্থা। খ্যাঁক, খ্যাঁক, হি হি’

একজন চিকিৎসক তো ডি.সি.র বাসায় তাহাকে দেখতে যান নাই বলিয়া ও.এস.ডি. খাইলেন।

এইসব যখন চলিতেছে তখন পত্রিকা মারফত জানিতে পারিলাম স্বর্গ হইতে এই ধরাধামে কিছু দেবতা মনুষ্য বেশে পদার্পণ করিয়াছেন। মানুষকে সেবার উদ্দেশ্যে চিকিৎসকের রূপ ধরিয়া তাহারা ইন্ডিয়া থাইকা বাহির হইয়া সর্বপ্রথম বাংলাদেশের দিকে তাহাদের নেকনজর সম্প্রসারিত করিয়াছেন।

এত বড় খবর কি প্রচার না করিলে হয়? এতে পাপ হয় না? কাজেই কয়েকটি পত্রিকা গত কয়েকবছর ধরিয়া বিনামূল্যে তাহা প্রচার করিবার মহান দায়িত্ব নিলেন।

এ পত্রিকা মারফত চিকিৎসকরূপী ইন্ডিয়ান দেবতারা আমাদের জানাইলেনঃ “আইসো, আইসা ফ্রি চিকিৎসা লইয়া যাও, তাহার পরে প্রয়োজন হইলে ইন্ডিয়া যাইতে হইতে পারে, তখন কিরাম সিরাম খরচ হইবে তাহা ঠিক বলিতে পারি না, ঠাওরও করিতে পারি না। তবে আমরা নির্লোভ, নিরামিষাশী, আমরা ভন্ড, এ্যা ইঁয়ে, আমরা ‘দন্ড’, মানে ধারক, মানে সুচিকিৎসা ও সততার ধারক।”

একটা সাইডটক করিয়া লই। ঐদিন আমার এক কলিগ বলিয়া উঠিলো, ‘এক কাজ করিলে কেমন হয়? যেভাবে এদেশের লোকেরা আমাদের মারে তাহাতে আমরা সবাই ননক্লিনিক্যাল সাইডে চলিয়া যাই। ইন্ডিয়ান ডাক্তাররা ক্লিনিক্যাল সাইডটা দেখুক।’

মনে মনে ভাবিলাম খারাপ হয় না, পরিপূর্ণভাবে এই ইন্ডিয়ান ভন্ডগুলো কয়েকদিন এদেশে ডাক্তারি করুক, এদেশের লোকদের ধোলাই যখন এরা খাওয়া শুরু করিবে তখন ‘হে রাম! বাংলাদেশীরা ল্যাংটা দুষ্টু পুটু ‘ বলিয়া এমনিতেই নিজের দেশে ফেরত যাইবে।

লেখাটা শেষ করি, কতটুকু ব্যথা নিয়ে উপরের লেখাগুলো লিখেছি সেটা যারা বুঝবার তারা ঠিকই বুঝবে। মূল কথায় আসি,

এদেশে এখন সত্যিকার অর্থেই চিকিৎসা দেবার মত আর কোন পরিবেশ নেই। যেদেশে প্রতিনিয়ত চিকিৎসক পেটানো হয় এবং তার কোন বিচার হয় না, যেদেশে সেই দেশের চিকিৎসকে মানসিক ও আর্থিকভাবে হেয় করা হয়, সামাজিক মাধ্যমে কুৎসা রটনা করা হয়, যেদেশের লোক মায়ের চেয়ে মাসীর দরদকে বড় করে সর্বদা ইন্ডিয়া, সিঙ্গাপুরের গুণগান গায়, সেদেশে চিকিৎসকরা কিভাবে তাদের চিকিৎসাসেবা অব্যহত রাখবে? কয়দিন রাখা সম্ভব?

ইদানিং একটা কথা খুব শুনছি, “সুবোধ, তুই পালিয়ে যা”। কে এই কথার উদ্ভাবনকারী, সেটা আমি জানি না, তবে অনেক চিকিৎসকই বর্তমান ঘটনাগুলোর পরম্পরায় নিজেদের ইনডিকেট করে এই শ্লোগানটা বেশ ব্যবহার করছেন। তবে এখন আমি আর এই শ্লোগান ব্যবহার করার পক্ষপাতী নই, সুবোধের এখন মরে যাওয়াই ভালো।

‘ যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ আমার অত্যন্ত পছন্দের একটি গান, কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়শই গুণগুনিয়ে গানটির কয়েকটি কলি গাওয়া হয়।দেশে চিকিৎসকদের সাথে আজ যা আচরণ করা হচ্ছে, তাতে আমি নিশ্চিত, এই বাংলার কিছু চিকিৎসক সন্তান ধীরে ধীরে এই দেশকে মন থেকে বিদায় জানাবে। যারা থাকবে তাদের কেউ না কেউ প্রতিনিয়ত মার খাবে, হয়ত মারাও যাবে, এই বাংলার জনপদে হয়ত তাদের পদচিহ্ন আর কোনদিনও পড়বে না।

এই বঙ্গসন্তানরা এদেশ ছেড়ে চলে যাক বা মার খেয়ে মারা যাক, তাদের পদচিহ্ন এ বাংলাতে নাইবা পড়ুক, ঘাটে তাদের খেয়াতরী নাইবা চলুক, কিন্তু পরপারে থেকেও এরপর একটা বিষয় আমাদের খুব জানতে ইচ্ছা করবে,

‘কেমন আছে আমার বাংলার মানুষগুলো? ভালো তো? অন্যরা এখন তাদের চিকিৎসা ঠিকমত করছে তো? বৃষ্টিভেজা বর্ষার রাতে জোনাকির আলো যখন নিভু নিভু করে জ্বলে আর নিভে সে অনিন্দ্যসুন্দর ভয়ঙ্কর রাত্রিতে কখনো কি এরা আমাকে, আমাদেরকে একবারও মনে করে? আমরা কি এদের জন্য কিছুই করিনি?’

Most Popular

To Top