নাগরিক কথা

ভুল থেকে কি কিছুই শিখছি না আমরা?

ভুল থেকে কি কিছুই শিখছি না আমরা?

ভুল বা অতীত ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার যে একটা ব্যাপার আছে, সেটা খুব সম্ভবত জাতিগতভাবেই আমাদের মাথায় কাজ করেনা – অথবা আমরা ইচ্ছে করেই কোন ধরনের শিক্ষা আমাদের ভুল বা ক্ষতি থেকে নেই না। ইচ্ছে করলে আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর অনেক গুলো উদাহরণ দেয়া যায়, দেয়া যাবে কিন্তু তাতে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে বলে মনে হয়না, তাই শুধু একটি উদাহরণ দেই।

১৯৭১ এর ১৪ই ডিসেম্বর নিশ্চিত পরাজয় জেনেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসররা কেন খুঁজে খুঁজে আমাদের জাতির সূর্য সন্তানদের নিয়ে হত্যা করেছে সেটা বোঝেন নিশ্চই। পাকিস্তানীরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, আমাদের সেই সূর্য সন্তানেরা বেঁচে থাকলে এই দেশটার দাঁড়াতে কোন সময়ই লাগবেনা, যতই তারা ব্রীজ – কালভার্ট উড়িয়ে দিয়ে থাকুক না কেন। তাই যুদ্ধ শেষ করবার আগে, তারা শেষ করে দিতে চেয়েছিল আমাদের শিক্ষিত সমাজকে – গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড, তাই নয় কি?

তারপরও যারা বেঁচেছিলেন, তাদের অনেকের ঐকান্তিক ভালোবাসা আর প্রচেষ্টায় একটা সময় পর্যন্ত আমরা আমাদের শিক্ষার মান – দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিসঠান গুলোর মান কিছুটা ধরে রাখতে পেরেছিলাম। কিন্তু, সেই কাল আমরা পেরিয়ে এসেছি বহুদিন আগেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনায় যারা বিস্মিত হচ্ছেন, তাদের কাছে জানতে চাই – কেন এত বিস্মিত হচ্ছেন? এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিল না?

প্রায় ২৫ বছর আগেই ঢাকা শহরের স্কুলে শিক্ষকদের মুখে যেসব ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক কথা শুনেছি (নিশ্চিত এখন সেইসব শুনলে আমার বাচ্চাকে সেইসব শিক্ষকদের কাছে পড়তে দিতাম না।) সেই হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা আরো আগেই ঘটার কথা ছিল। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো কেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে অক্সফোর্ড এর মত বিশ্ববিদ্যালয়কে অপমান করা হয়, সেটা আমার বোধগম্য নয়। অক্সফোর্ড অনেক দূরের কথা – এই সেদিন লন্ডন শহরের বুকে গড়ে উঠা অনেক অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান মান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন নেই, অন্য সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো আরো দূরের হিসাব।

আজ পর্যন্ত আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার একটা সমন্বয় করতে পারিনি, সেশনজট আর প্রশ্নপত্র ফাঁসকে তো আমরা একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি। বিভিন্ন অজুহাতে টিএসসি ৮টার পর বন্ধ ঘোষণা, সর্বশেষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের এমন প্রশ্ন তৈরী- এগুলো তো আসলে একদিনের বানানো জিনিস না।

এগুলো হলো যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, অযোগ্য – লোভী ব্যাক্তিদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা আর যোগ্য – প্রাপ্য ব্যাক্তিদের যথাযথ সম্মান না দেয়া – এগুলো সবকিছুর যোগফলই হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ৪১ আর ৭৬ নম্বর প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলো দেখে হতবাক না হলেও ভীত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আমাদের আছে। উগ্র সাম্প্রদায়িক – লোভী – প্রায় মনুষত্বহীন একটা প্রজন্ম আমাদের সবার অলক্ষ্যে আমাদের সামনে প্রায় দাঁড়িয়ে গিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রের বর্তমান ধারা আরো কিছু সময় অব্যাহত থাকলে, জাতি হিসাবে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত হওয়ার অনেক বড় কারণ থেকে যায় – সেটা জনে জনে বুঝিয়ে বলার আর প্রয়োজন পড়েনা। তারচেয়েও বড় কথা একটি সমাজের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা যখন, এমন উগ্র চিন্তা ভাবনার প্রশ্ন তৈরী করেন তখন বুঝতে হবে এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো, এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের নীতি নির্ধারকদের কোন অর্থবহ এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আছে কিনা কারো সেটা জানা নেই। না থাকারই কথা, কারণ তাদের বেশীরভাগের সন্তানই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ালেখা করে না – তাই এই শিক্ষা ব্যবস্থা উচ্ছন্নে গেলেও তাদের কোন মাথা ব্যাথা দেখা যায় না। শুনেছি আফ্রিকা মহাদেশের কোন এক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ দরজায়,

“একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য অ্যাটমিক বম্ব বা লং-রেঞ্জ মিসাইল লাগে না। এদুটোর চেয়েও অনেক শক্তিশালী উপায় হলো শিক্ষার মানকে নামিয়ে দেওয়া এবং নানারকম দুর্নীতি অবাধে চলতে দেওয়া”

 কথাটি লেখা আছে।

এই লাইনগুলোই কি আমাদের বর্তমান সমাজের সাথে মানিয়ে যাচ্ছে না? একটি দেশের শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই এত এত সমস্যার পাহাড়ের মাঝেও আশার আলো যে একেবারেই নেই, তা কিন্তু না। আসলে ত্রুটিগুলো এত বেশী আর ভয়ংকর যে, সেগুলো এখন আর ” চোখে পড়া” র মত বিষয়ে নেই বরং সেগুলো এখন চোখে ভিতরেই বসবাস করে – আর তাই সেগুলো নিয়ে আক্ষেপ, হতাশা, আলোচনা – সমালোচনাতে সবার অংশগ্রহণটাই বেশী থাকে। কিন্ত সেই যে বললাম, এত এত হতাশার মাঝেও ক্ষীণ আশার আলো এখনো আছে।

বিদেশের মাটিতে আমাদের অনেক বড় বড় সাফল্য বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ত্রুটি আমাদের প্রতিভাগত নয় – সেটা বেশ ভালো পরিমাণে আমাদের দেশে আছে। এখন কেবলমাত্র সেই প্রতিভাগুলো বিদেশের মতো সুযোগ সুবিধা – সাপোর্ট দিয়ে নিজেদের শিক্ষাঙ্গন থেকে ফুটিয়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। এই সরকার বছরের শুরুতেই বাচ্চাদের হাতে বই তুলে দেয়ার মতো চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারছে, সেটা একটা ভালো কিছুর শুরু। তারপর শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেটের পরিমাণ আরো অনেক বাড়ানো যেতে পারে, ওপেন বুক পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে, প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে ( যদিও সেই মাত্রার খুব বেশী শিক্ষক আমাদের আছে বলে মনে হয় না।)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটা হচ্ছে শিক্ষক দের রাজনীতির গুটি হিসাবে ব্যবহার না করা এবং এমন সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ডের সাথে শিক্ষাঙ্গনে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করে দেখা যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠান, সরকার, বিভিন্ন সংস্থাগুলোর পাশাপাশি এমন সাম্প্রদায়িকতা রুখতে পারিবারিক শিক্ষার একটা বিশাল গুরুত্বও এখানে রয়েছে, সেটাও দেশের নাগরিক হিসাবে – মানুষ হিসাবে আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না। এই ধ্বংস প্রক্রিয়া একদিনে শুরু হয়নি, তাই শেষও একদিনে সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার যদি যথা সম্ভব এই বিষয়গুলো এগিয়ে নিয়ে যায়, তারপরের সরকার হয়তো বাকী ধাপগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে, মনে রাখা দরকার আমাদের হাতে সময় খুব কম, মেরুদন্ড একবার ভেঙ্গে গেলে – আর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো আর সম্ভব হবেনা।

তবে আশার আলোটুকু অন্তত জাগ্রত থাকুক আমাদের মাঝে, আশাতেই যে বেঁচে থাকা।

Most Popular

To Top