নাগরিক কথা

তৃতীয় বিশ্বের দেশ উন্নত বিশ্বের স্বল্পমূল্যের গবেষণার ক্ষেত্র

তৃতীয় বিশ্বের দেশ; নাকি উন্নত বিশ্বের স্বল্পমূল্যের গবেষণার ক্ষেত্র

আমি যখন নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ি, তখন হঠাৎ করে সোয়াইন ফ্লু নামের এক ভাইরাসবাহিত রোগের আবির্ভাব। টিভি-পত্রিকায় সোয়াইন ফ্লু নিয়ে, এর মহামারী পরিণাম নিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই রোগে আক্রান্তদের ভয়াবহ অবস্থা এইসব কিছু নিয়ে প্রত্যেকদিন অনেক লেখালেখি হত। প্রায়ই সেখানে বলা হত যে, উন্নত বিশ্বের মত দেশগুলোতে অনেক কষ্টে হাই-হাইজিন আর কোয়ারেন্টাইন মেইনটেইন করে এই রোগকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের মত গরীব জনবহুল দেশগুলোতে গেলে সোয়াইন ফ্লু তো নিমিষেই সবাইকে কাত করে ফেলবে।

বাংলাদেশে আর ভারতেও এই রোগে আক্রান্ত কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু অতটা প্রভাব ফেলতে পারেনি সোয়াইন ফ্লু। আর এতে কেউ এদেশে মারা গিয়েছে এমন প্রমাণও তেমন পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে খবর আসলো, উন্নত দেশগুলো নাকি সোয়াইন ফ্লুর ভ্যাক্সিন তৈরি করে আমাদের দেশে সাহায্যের জন্য এগুলো ফ্রি পাঠিয়ে দিয়েছে এবং সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিনামুল্যে এই ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে। যখন টিকা দিতে যাব, তখন আমার এক আত্মীয় বলল যে এসব নাকি আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য দেওয়া হচ্ছেনা বরং বিদেশি দেশগুলো আমাদের মত গরীব দেশের মানুষের উপর ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল চালাচ্ছে। এই ভ্যাক্সিন নিয়ে আমাদের দেশের মানুষদের উপর কেমন সাইডইফেক্ট হয়, তা দেখে নিজের দেশে ভ্যাক্সিন ব্যাবহার করবে। কিন্তু উনার কথায় আমরা তেমন কান না দিয়ে খুশি মনে সোয়াইন ফ্লুর ফ্রি ভ্যাক্সিন দিয়ে নিজেদের বাড়ি এসে গেলাম।

এরপর ভার্সিটিতে উঠে মেডিক্যাল সাইন্স নিয়ে পড়ার সুবাদে মাঝে-মাঝে অনলাইনে বিদেশী কিছু জার্নাল পড়তাম। তেমনই এক জার্নালে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নত দেশগুলোর ভ্যাক্সিন, ফ্রি চিকিৎসা সহ নানারকম প্রজেক্টের কথা এবং তার অধিকাংশই যে বিভিন্ন ওষুধ-ভ্যাকসিনের ট্রায়াল তা পড়লাম। এরপর ইন্টারনেটে আরো একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম এসব বিষয়ে।

অসদুপায়ে বিভিন্ন ড্রাগ টেস্টের কারণে ঝড়ে যাচ্ছে প্রাণ

বিশ্বের যত ওষুধ-ভ্যাক্সিন এসবের অধিকাংশই ইউরোপ-আমেরিকার মত দেশে বিভিন্ন ফারমাসিউটিক্যাল ল্যাবে বা সরকারি গবেষণাগারে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে তৈরি করা হয় এবং পরবর্তীতে সারা বিশ্বে এদের নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রয় করা হয়।
যেকোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বাজারে আনার আগে যাচাই করে নিতে হয় মানবশরীরে এটির প্রভাব নিয়ে, তাই আপনার সেটা জীবদেহে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এজন্য গবেষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের সাথে ফিজিক্যালি এবং জেনেটিকালি অনেকাংশে মিল আছে এমন প্রাণী যেমন-খরগোস, গিনিপিগ, ইঁদুর, বাঁদর ইত্যাদি ব্যাবহার করে থাকেন গবেষণার কাজে। এইসব প্রাণীদের ব্যাবহার নিয়েও পশু অধিকার রক্ষাকারী ব্যাক্তিরা আন্দোলন করে থাকেন। এখন গবেষণার ফলাফল তো মানুষের সাথে অনেকাংশে মিল থাকা প্রাণীদের উপর করা হলো, কিন্তু বাস্তবে মানুষের উপর তো করা হল না।মানুষের উপর ওষুধ-ভ্যাক্সিনের প্রভাব সম্পরকে ১০০ ভাগ নিশ্চিত না হয়ে আমাদের দেশে হয়তোবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারজাত করা যায়, কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকাতে তেমন করা সম্ভব না। সেখানে ওষুধ-ভ্যাক্সিনের সাইডইফেক্টে অসুস্থ ব্যাক্তি ক্ষতিপূরণ চেয়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করবেনা এবং একবার যদি আদালতে কোম্পানি দোষী সাব্যস্ত হয় তবে তাদের লাইসেন্স থেকে আরম্ভ করে সব কিছু বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে, সাথে মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ তো আছেই।

এজন্য বিদেশী ফারমাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওষুধ সেদেশের বাজারে আনে। এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পশু-পাখিদের নাহয় সহজে পাওয়া গেলো, কিন্তু মানুষ পাওয়া যাবে কোথা থেকে? কারণ বিজ্ঞানের সংবিধানে মানুষের অনুমতি ব্যতিত তাদেরকে গবেষণার গিনিপিগরূপে ব্যাবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ আর ইউরোপ আমেরিকার মত দেশগুলোতে তো মানুষকে এভাবে ব্যাবহার করা কল্পনার বাইরে। তাছাড়া এমন মানুষরূপী গিনিপিগ লাগবে যারা কখনো ঐসব ওষুধ কিংবা ভ্যাক্সিন ব্যাবহার করেনি, যারা সহজলভ্য, এসব ট্রায়াল নিয়ে যাদের মনে তেমন সন্দেহ হবে না এবং সর্বোপরি সন্দেহ হলেও আইনের বেড়াজালে ঐ বড়লোক কোম্পানিকে আটকানোর সামর্থ্য থাকবেনা। এতসব শর্ত মেনে মানুষরূপী গিনিপিগ কি এত সহজে পাওয়া যাবে? তাহলে উপায় কি?

উপায় তো আছে হাতের কাছেই, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষরা আছে না! তারা সবরকম শর্ত তো ভালোভাবেই পূরণ করতে পারে। তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর মানুষদের জীবন বাঁচানোর ওষুধের-ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল দেওয়ার জন্য তো এরাই সবচেয়ে উপযুক্ত। উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা এমনিতেই ভালোনা, এর উপর যোগ হয়েছে দারিদ্র্যতা এবং দুর্নীতি। তারপরও খড়ের গাদার মধ্যে সূচের মত কয়েকজন সৎ মানুষ আছে যারা এসব কিছু নিয়ে একটু হলেও চিন্তা করেন, এমন মানুষদের জন্য আই-ওয়াশরুপে আছে নানা রকম বেসরকারি স্বাস্থ্য-প্রকল্প যার আওতায় বিনামূল্যে চিকিৎসা, ভ্যাক্সিন সহ নানা রকম সুযোগ-সুবিধা তো আছেই। এখন আমি কয়েকটা কেস নিয়ে বলব,

১)ইন্ডিয়াতে ওরাল ক্যান্সারের ট্রায়ালঃ

ড্রাগঃ Nondihydroguaiaretic acid (NDGA)
স্পন্সরঃজন্স হপকিন্স হাস্পাতাল
রিসারচ অর্গানাইজেশনঃ Regional Cancer Treatment Centre
এখানে ওরাল ক্যান্সারের জন্য ভর্তি হওয়া ২৬ জন নারীর উপর এই নতুন ড্রাগটির ট্রায়াল করা হয়, অথচ মহিলাদের এই ট্রায়াল সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি এবং তখনো এই ড্রাগটির ল্যাবরেটরির প্রাণীর উপর ট্রায়াল শেষ হয়নি। ঐ ২৬ জন মহিলার মধ্যে ২ জন মারা যান। এছাড়া ৬০ বছর বয়সী এক মহিলার উপর এই ওষুধ ৪ ডোজ দেওয়া হয়, ৫ম ডোজ দেওয়ার আগেই মহিলার অবস্থা সঙ্গিন হয়ে যায় কিন্তু তিনি কোনোমতে বেঁচে যান। এইসব ঘটনা যখন মিডিয়াতে জানাজানি হয়ে যায় তখন সামান্য ছয় মাসের জন্য গবেষণাটা স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এই বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় তার রিপোর্ট কখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। জন হপকিন্স হাসপাতাল শুধুমাত্র এই রিসার্চে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কোনো ফিউচার মানব রিসার্চের সাথে জড়িত না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

২)উগান্ডাতে HIV ট্রায়াল

ড্রাগঃ Nevirapine
স্পন্সরঃ Boheringer Ingelheim(BI),NIH-USA
উগান্ডাতে ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সেখানকার কয়েকজন গর্ভবতী মহিলাদের উপর তাদের অজ্ঞাতসারে মার কাছ থেকে সন্তানে এইচআইভি সংক্রমণের উপর কিছু ট্রায়াল চালানো হয়। কিন্তু সেই ট্রায়ালের ফলাফল সংরক্ষণ এবং রোগীদের উপর ওষুধের সাইড ইফেক্ট পর্যবেক্ষণে প্রচুর গাফিলতি করা হয়, এমনকি ট্রায়াল করা মহিলাদের মধ্যে ১৪ জন মহিলার মৃত্যুর খবর লিপিবদ্ধ করা হয়নি। উক্ত ড্রাগটির মার্কেটার এবং ট্রায়ালটির অডিটকারি কোম্পানি Boheringer Ingelheim(BI) আমেরিকার ন্যাশনাল হেলথ ইন্সটিটিউটকে বলে উক্ত গবেষণার প্রারম্ভিক রিপোর্টটি নষ্ট করে ফেলতে যেন তা আমেরিকার ফুড এবং ড্রাগ অথরিটির পুনরায় অডিটে ধরা পরে না যায়।
পরবর্তীতে ২০০২ এ এই বিষয়ে জানাজানি হলেও তেমন কোনো উল্ল্যেখযোগ্য শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়নি কাউকেই।

৩) নাইজেরিয়াতে ট্রভাফ্লক্সাসিন ট্রায়াল

ড্রাগঃ Trovafloxacin
স্পন্সরঃ Pfizer
১৯৯৬ তে নাইজেরিয়ার “কানো” এলাকায় মেনিনজাইটিস এর আউটব্রেক হয় এবং তার কয়েক সপ্তাহ পরে ফিজার ফারমাসিউটিক্যাল কোম্পানি এসে হাজির হয়। তারা এখানে এসে আক্রান্ত শিশুদের উপর কোনো রকম বিজ্ঞপ্তি বা কনসেন্ট ফর্ম পূরণ করা ছাড়াই মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের উপর ‘ট্রভাফ্লক্সাসিন’ নামক নতুন এন্টিবায়োটিকের ট্রায়াল চালায়। ট্রায়াল করা ১৯০ জনের মধ্যে ৫ জন শিশু মারা যায় এবং বাকিরা ব্রেইন ড্যামেজ এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়।
আমেরিকাতে ২০০১ সালে ফিজার ফার্মার বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং এই মামলা নিয়ে দুই দেশের আদালতে নানারকম ঝামেলার পর ২০০৭ সালে নাইজেরিয়ার ফেডারেল গভার্মেন্ট এই ফিজার কোম্পানির নামে ৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করে। পরে ২০০৮ সালে নাইজেরিয়ার কোর্ট ফিজারের তৎকালীন আট জন ডিরেক্টরের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

আজ শুধু এই কয়েকটার কথা লিখলাম, কারণ লিখতে গেলে এমন উদাহরণ অসংখ্য বের হবে। এরকম আরো অনেক ট্রায়াল এক্সপেরিমেন্ট এর কথা ইন্টারনেটে ভুরি-ভুরি দেওয়া আছে, আপনারা চাইলেই দেখতে পারবেন।
এমন অমানবিক কাজ করা বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন আছে, ঠিক তেমনি ভালো কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। অনেক বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা, এনজিও, দাতা প্রতিষ্ঠান স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে নিঃস্বার্থে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাই সবাইকে একই কাতারে রেখে খারাপ বলা আমার উদ্দ্যেশ্য নয়। আমার এই লেখার উদ্দ্যেশ্য হল ফ্রিতে চিকিৎসা হোক বা এই সংক্রান্ত যা কিছুই হোকনা কেন, দয়া করে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নিয়ে তারপর যেকোন সেবা নিন। ফ্রি তে কিছু পাওয়ার লোভ যেন আমাদের অন্ধ করে না দেয়।

Most Popular

To Top