ইতিহাস

গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম

গণহত্যা, প্রোপ্যাগান্ডা এবং দৈনিক সংগ্রাম- Neon Aloy

প্রথম পর্ব

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দশক থেকে শেষ দশক পর্যন্ত – আর্মেনিয়া থেকে শুরু করে নাৎসি জার্মানি, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ), বসনিয়া, কম্বোডিয়া হয়ে রুয়ান্ডা পর্যন্ত – পৃথিবী এত বেশী সিস্টেমেটিক হত্যাযজ্ঞ দেখেছে এবং এত অধিক সংখ্যক প্রাণহানি হয়েছে যে, গত শতাব্দীকে ‘রক্তাক্ত শতাব্দী’ বললে অত্যুক্তি হবে না। শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ‘genocide’ বলতে একটা নতুন শব্দ তাই প্রবর্তন করতে হয়। এই গণহত্যা কখনো হুট-হাট করে ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটা সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফসল হয়ে থাকে। কোন একক প্রভাবকের দ্বারা কখনোই এটা প্রভাবিত হয় না, একটি সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামোগুলোও বেশ প্রভাব রাখে এতে। গণহত্যা চলাকালীন সময়ে হত্যাযজ্ঞে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে, গণহত্যার তীব্রতা বাড়াতে এবং গণহত্যাকে বৈধতা দিতে আক্রমণকারীর প্রয়োজন পড়ে ব্যাপক প্রোপ্যাগান্ডার। এই প্রোপ্যাগান্ডার ধরণ এবং মাত্রা সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। তবুও, তাদের মধ্যে কতক সাধারণ মিল লক্ষ্য করা যায় সবসময়। জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রগতির সাথে সাথে গণহত্যা এবং তাতে প্রোপ্যাগান্ডার ব্যবহারেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের সংগঠিত গণহত্যায় পাকিস্তানিদের সহযোগী গোষ্ঠীর মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এর অবদান কেমন ছিল এবং গণহত্যার তীব্রতা বাড়াতে তাদের ভূমিকা কতটুকু ছিল, তাই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। শুরুতেই, তাই, সংক্ষেপে গণহত্যা এবং প্রোপ্যাগান্ডা বিষয়ে কিছু আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে, উদাহরণস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং রুয়ান্ডার ঘটনার দিকে আলোকপাত করা হয়েছে।

গণহত্যা

লিও কুপার তাঁর বইয়ের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘গণহত্যা’ শব্দ আমাদের জন্যে নতুন হলেও অপরাধটা পুরনো। আসলেও তাই; মানব ইতিহাসে প্রচুর পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনার উপস্থিতি থাকা স্বত্বেও একে আলাদা কোন শব্দে চিহ্নিত করা হয় নি এতদিন। রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে তাঁর বইতে প্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন, অনেকটা হোমিসাইড, এথনিসাইড এর মতো করে [1]। Homo মানে মানুষ এবং তাই হোমিসাইড মানে নরহত্যা (একজনকে হত্যা), আবার অন্যদিকে Geno মানে গোষ্ঠী, তাই জেনোসাইড মানে গোষ্ঠীসহ হত্যা। পরবর্তীতে, বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বহু আলাপ আলোচনার পর জাতিসংঘের ‘গণহত্যা অধিবেশন’ ১৯৪৮ সালে গণহত্যার আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, অবশ্য ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও শেষ হয়ে গিয়েছে। সেখানে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে গণহত্যার সংজ্ঞা দেয়া আছে [2]।

‘genocide means any of the following acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnic, racial or religious group, as such:

(a) Killing members of the group;
(b) Causing serious bodily or mental harm to members of the group;
(c) Deliberately inflicting on the group conditions of life calculated to bring about its physical destruction in whole or in part;
(d) Imposing measures intended to prevent births within the group;
(e) Forcibly transferring children of the group to another group.’

উপরোক্ত সংজ্ঞাতে দুটি উপাদান আছে, এক, বাহ্যিক উপাদান (মানে কোন কোন কাজ করলে গণহত্যা হবে) এবং দুই, অন্তর্গত উপাদান (হত্যার উদ্দেশ্য, হত্যার মাত্রা এবং রক্ষিত গোষ্ঠী)। সংজ্ঞার এই দুই উপাদানের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রচুর আলোচনা, সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন, লেমকিন প্রথমেই যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন সেখানে দুটো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছিল, প্রথমত, তিনি একটা রাষ্ট্রের ভেতরে সবগুলো গোষ্ঠীকেই (racial, religious, political and other) রক্ষা করতে চেয়েছিলেন এবং দ্বিতীয়ত, তিনি সাংস্কৃতিক গণহত্যার কথাও বলেছিলেন [3]। কিন্তু অধিবেশন যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে সেখানে রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র চারটা দলকে (national, ethnic, racial, religious group) অন্তর্ভুক্ত করে। এমনকি প্রথমে যে খসড়া দেয়া হয়, সেখানেও রাজনৈতিক দল অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আরো অনেকের প্রবল আপত্তির কারণে, প্রচুর তর্ক বিতর্কের পর, এটা বাদ দেয়া হয়[4] । রাজনৈতিক দলকে ‘রক্ষিত গোষ্ঠী’ হতে বাদ দেয়ার সমালোচনা এখনো চলছে, কেননা, যে কোন রাজনৈতিক দলের উপরও আক্রমণ হতে পারে। পূর্বে ধর্ম-বর্ণ-জাতি গোষ্ঠীর উপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে সেটা রাজনৈতিক দলের উপর হতেও পারে – এমন আশঙ্কাও অনেকদের মধ্যে ছিল। এছাড়া, প্রতিটা গণহত্যার মধ্যেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। তাই, বর্তমানে অনেক গবেষকই যখন ‘গণহত্যা’র সংজ্ঞা দাড় করান তারা সেখানে এই অন্তর্ভুক্তিটা করে নেন।

একইভাবে অধিবেশনে সাংস্কৃতিক গণহত্যা বা এথনোসাইডের প্রসঙ্গেও প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হয়। প্রথম যে খসড়া উত্থাপন করা হয়, সেখানে মূলত তিন ধরণের গণহত্যার কথা উল্লেখ ছিল[5] । এক, ‘শারীরিক’ গণহত্যা (হত্যা করা), দুই, ‘জৈবিক’ গণহত্যা ( জন্মদানে বাধা দেয়া) এবং তিন, ‘সাংস্কৃতিক’ গণহত্যা। সাংস্কৃতিক গণহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল, কোন গোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ভাষা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, নিজস্ব ভাষার প্রকাশনার প্রচারে বাধা দেয়া, এবং সে গোষ্ঠীর স্কুল কলেজ, লাইব্রেরী, জাদুঘর ইত্যাদি ধ্বংস করা[6]। খসড়ায় ‘সাংস্কৃতিক’ গণহত্যার এই অন্তর্ভুক্তিও বিতর্কের জন্ম দেয়। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, এখানে গণতন্ত্রের পতাকাবাহী ইউরোপীয় দেশগুলো এই অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে এবং সোভিয়েত ব্লক অন্তর্ভুক্তির পক্ষে রায় দেয়। ইউরোপিয়ানরা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেননা, উপনিবেশায়নের মাধ্যমে তারা সকলেই সাংস্কৃতিক গণহত্যা চালিয়েছেন এশিয়া ও আফ্রিকায়। যার ফলে, সাংস্কৃতিক গণহত্যা বাদ পড়ে যায় সংজ্ঞা থেকে, যদিও নিদর্শনস্বরূপ (যেমন, পাঁচ নম্বর পয়েন্ট) কিছু ছিটেফোঁটা রয়ে যায়। ​

হত্যার উদ্দেশ্য এবং হত্যার মাত্রা নিয়েও প্রচুর আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের পর অবশেষে এই সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। যদিও, এই সংজ্ঞার কিছু সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, তবু প্রায় সকলেই এটাকে গ্রহণ করেছেন এবং এখন পর্যন্ত এর ভিত্তিতে গণহত্যাকে চিহ্নিত করা হয়। যেমন লিও কুপার বলেন, যদিও পুরোপুরি একমত না, তবু আমি কনভেনশনে দেয়া গণহত্যার সংজ্ঞাকেই মেনে নেব। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে গবেষকরা গণহত্যার যে ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন, এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছেন তার কয়টা দেখা যাক [7]।

Genocide is the deliberate destruction of physical life of individual human beings by reason of their membership of any human collectivity as such. – Peter Drost (1959)

Genocide is a structural and systematic destruction of innocent people by a state bureaucratic apparatus. …Genocide represents a systematic effort over time to liquidate a national population, usually a minority…[and] functions as a fundamental political policy to assure conformity and participation of the citizenry. – Irving Louis Horowitz (1976)
Genocide is the deliberate destruction, in whole or in part, by a government or its agents, of a racial, sexual, religious, tribal or political minority. It can involve not only mass murder, but also starvation, forced deportation, and political, economic and biological subjugation. Genocide involves three major components: ideology, technology, and bureaucracy/organization – Jack Nusan Porter

Genocide occurs when a state, perceiving the integrity of its agenda to be threatened by an aggregate population—defined by the state as an organic collectivity, or series of collectivities—seeks to remedy the situation by the systematic, en masse physical elimination of that aggregate, in toto, or until it is no longer perceived to represent a threat. – Mark Levene (2005)

Genocide is sustained purposeful action by a perpetrator to physically destroy a collectivity directly or indirectly, through interdiction of the biological and social reproduction of group members, sustained regardless of the surrender or lack of threat offered by the victim. – Helen Fein

Genocide is a form of one-sided mass killing in which a state or other authority intends to destroy a group, as that group and membership in it are defined by the perpetrator. – Frank Chalk and Kurt Jonassohn

ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রয়, রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তির কারণে, এই শেষোক্ত সংজ্ঞাকেই যথাযথ বলে মনে করেন[8]। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, বর্তমানে অনেক গবেষকই তাদের প্রদত্ত সংজ্ঞাতে রাজনৈতিক দলকেও ‘রক্ষিত গোষ্ঠী’তে রেখেছেন, তার প্রমাণ উপরেই দেখা যাচ্ছে। উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে, যেমন, আক্রমণকারী, আক্রান্ত গোষ্ঠী, হত্যার উদ্দেশ্য, হত্যার মাত্রা এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আক্রমণকারী কাউকে যখন আক্রমণ হত্যা করবে শুধুমাত্র সে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে, আংশিক কিংবা পুরোপুরি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে, পরিকল্পিত উপায়ে তখনই আমরা একে গণহত্যা বলবো। বিশেষ করে, জ্যাক নুসান পোর্টার গণহত্যার তিনটা উপাদানের কথা বলেন: মতাদর্শ, প্রযুক্তি এবং আমলাতন্ত্র/সংগঠন। উল্লেখ্য, আক্রমণকারী হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র কিংবা এর উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অবশ্য, আক্রমণকারী সর্বদাই যে রাষ্ট্রীয় সরকার কিংবা তার সামরিক বাহিনীই হতে হবে তাও না, ন্যাটো’র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও আক্রমণকারী হতে পারে। গণহত্যার সংজ্ঞায় আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে in whole or in part অংশ; এর অর্থ সেইসব মানুষের সংখ্যার কোন নিম্ন সীমা নেই, যাদের ওপর এই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

তবে, গণহত্যার সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা পাওয়া যায় সাহিত্যের মধ্যেই। হোমারের ইলিয়ডে এগামেমনন যে আদেশ দেন –

We are not going to leave a single one of them alive, down to the babies in their mother’s wombs – not even they must live. The whole people must be wiped out of existence, and none be left to think of them and shed a tear’ – সেখানে পাওয়া যায় গণহত্যার সবচেয়ে প্রকৃত সংজ্ঞা।

সামাজিক, অর্থনৈতিক কাঠামোসহ অনেক প্রভাবকই গণহত্যাকে প্রভাবিত করে থাকে। বিশেষ করে, বহুরূপী সমাজের (plural society) সাথে গণহত্যার বেশ একটা সম্পর্ক দেখা যায়। সমাজের এই বহুরূপ ধর্মের ভিন্নতা, ধর্মের ভেতরে মতাদর্শের ভিন্নতা, মুখের ভাষার ভিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক বিচিত্রতা সহ আরো অনেক কারণেই হয়ে থাকে। তার মানে এই না যে, সমাজে একাধিক জাতি গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকলেই সেখানে গণহত্যা হবে; তবে, প্রতিটা গণহত্যায় সমাজের এ বিভক্তির প্রভাব টের পাওয়া যায়। আসলে, বিষয়টাকে ‘প্লুরাল সোসাইটি’ বললে ভুল বলা হবে। এখানে একাধিক জাতি গোষ্ঠীর উপস্থিতির চেয়ে তাদের মধ্যে বিরাজমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যই গণহত্যার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এমনকি জাতি ধর্ম বর্ণভেদে শিক্ষাক্ষেত্রেও বৈষম্য দেখা যায়। কখনো কখনো এই ধরণের সমাজে বিভিন্ন জাতি ধর্ম ও বর্ণের মানুষদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ থাকে। তবে, এই বৈষম্য তৈরি করার মাধ্যমে আধুনিক কালের সমাজে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সহাবস্থান ধ্বংস করে তাদেরকে মুখোমুখি করে দেয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছে ‘উপনিবেশায়ন’। গণহত্যা গবেষক লিও কুপার তো বলেই ফেলেন, উপনিবেশায়নই হচ্ছে ‘প্লুরাল সোসাইটি’র স্রষ্টা[9]।

উপনিবেশায়ন বলতে আমরা সাধারণত বুঝি কোন রাষ্ট্র অথবা কোন জাতিগোষ্ঠী কর্তৃক অন্য কোন রাষ্ট্র অথবা জাতিগোষ্ঠীকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পদানত ও নিয়ন্ত্রণ করে সেখানকার ভূমি ও সম্পদ লুটে নেয়া। ব্রিটিশদের ভারত শাসন এর জলজ্যান্ত প্রমাণ। শুধু যে সামরিক বা রাজনৈতিক কর্তৃত্বই স্থাপন করা হয় তা না, সেই সাথে যুক্ত হয় জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্প, মানে মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশ, যেখানে বিভিন্নভাবে উপনিবেশিত রাষ্ট্র বা জাতি সম্পর্কে ‘হীনমন্যতার আত্মপরিচয় গড়ে তোলা হয়’[10]। উপনিবেশিক শক্তি তার এই শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে, তাই, আশ্রয় নেয় ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির। উপনিবেশিত সমাজের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে, যেন উপনিবেশ বিরোধী কোন সংগ্রাম গড়ে উঠতে না পারে, নিজেদের ফায়দা ইচ্ছেমতো তুলে নেয়াটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। আমাদের আলোচনার জন্যে এটা বুঝা জরুরী কারণ, দেখা যায় যে, আধুনিক যুগে সংঘটিত অধিকাংশ গণহত্যায় যে দুটো দল মুখোমুখি হয়ে থাকে কিংবা হয়েছে, মানে আক্রমণকারী ও আক্রান্ত, তাদের মধ্যকার বিবাদের মূল উৎসস্থল সবসময় উপনিবেশ আমলেই নিহিত। এবং ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির কারণে উপনিবেশিক শক্তির হাতেই এই বিবাদের সূচনা হয়ে থাকে।

১৯৬৭ সালে, ভিয়েতনামে যুদ্ধের সময়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত গণ-আদালতে ‘গণহত্যা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন গত শতাব্দীর আরেক দিকপাল জাঁ পল সাত্রে। সেখানে তিনি উপনিবেশায়নকে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র সাথে তুলনা করে বলেছিলেন, এটা শুধু নিছক বিজয় নয়, এটা সাংস্কৃতিক গণহত্যা। স্থানীয় সমাজের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যকে পরিকল্পিত উপায়ে ধ্বংস না করে বিজেতারা কখনো উপনিবেশ করতে পারে না[11]।

এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন ইরেনে ভিক্তোরিয়া মাসিমিনো। তিনি আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি দে লোমাস দে সামোরা’র আইনের শিক্ষক এবং গণহত্যার বিচার ও আইন বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। উপনিবেশের সাথে গণহত্যার এই সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘গণহত্যা বিষয়ে বিশেষভাবে কাজ করার জন্য আমি বিভিন্ন দেশের গণহত্যা সম্পর্কে গবেষণা করেছি। বিশেষ করে বিশ শতকে বিশ্বে ঘটে যাওয়া গণহত্যাগুলোর বিষয়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক বিষয় উপনিবেশবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যার পরিণতিতে পরবর্তী সময়ে গণহত্যা ঘটেছে। বাংলাদেশেও সেরকম হয়েছে’[12]।

যেহেতু, গণহত্যা এককভাবে পরিচালিত হয় হয় না, হয় সম্মিলিতভাবে, তাই, তাদের কৃতকর্মকে বৈধতা দেয়ার জন্যে একটা নির্দিষ্ট আদর্শ আমদানির প্রয়োজন পড়ে । তা না হলে, তারা নিজেদের কাছেই একজন সাধারণ খুনি কিংবা সাধারণ চোর বলে প্রতীয়মান হবে, যা আপাতদৃষ্টিতে তাদের জন্যে হজম করা কঠিন। এ কারণে, ‘মতাদর্শিক বৈধতা’ গণহত্যার প্রয়োজনীয় পূর্ব-শর্ত। এই মতাদর্শের জন্যে সবচেয়ে কার্যকর তত্ত্ব হচ্ছে, আক্রমণকারীদের মাথায় এমন ছবি ঢুকিয়ে দেয়া যেন তারা ভুলে যায় আক্রান্তরাও তাদের মতো মানুষ। অন্যভাবে বলতে গেলে, আক্রান্তের মনুষ্যত্বকে সরাসরি অস্বীকার করতে হবে। এটাকেই বলা হচ্ছে Dehumanization; বাংলায় একে ‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’ কিংবা ‘অমানবীকরণ’ বলা যেতে পারে। আরো খোলাসা করে বললে, ভিক্টিমকে মানুষের পর্যায় থেকে একেবারে প্রাণী কিংবা বস্তুর স্তরে নামিয়ে আনা। গণহত্যার সময়ে যেভাবে যান্ত্রিক উপায়ে মানুষকে হত্যা করা হয়, সেটা শুধু ঘৃণা থেকেই ঘটে না বরং, আক্রমণকারীরা আক্রান্তদের মানবিক বৈশিষ্ট্য কিংবা গুরুত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করে। ‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’ মানুষের সহিংসতার বিপক্ষে দাঁড়ানোর সাধারণ নৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও নস্যাৎ করে ফেলে। ‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’কে, তাই, অনেকেই denial of identity and community হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন[13]।

আক্রান্তদেরকে মানব কাতার হতে বের করে দেয়ার এই প্রক্রিয়ায় ‘প্রাণিজগৎ’কে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। তাদেরকে সাপ, ইঁদুর , তেলাপোকা , গরিলা ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। স্থানভেদে প্রাণীদের নাম পরিবর্তিত হয়। প্রাণী নির্বাচনের বেলায় ওই প্রাণীগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয় যেগুলো সাধারণত গৃহপালিত কিংবা সে সমাজে উপকারী কিংবা পছন্দের। ভয়ংকর অথবা যে প্রাণীগুলোকে সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে, আক্রান্তদের জন্যে সেগুলোই নির্বাচন করা হয়। এছাড়া, কিছুটা নমনীয় হলেও, আক্রান্তদের সম্পর্কে এমন এক ছবি আঁকা হয় যেখানে তাদেরকে অসৎ, নোংরা এবং অহংকারী হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়।

‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’র মতাদর্শের আরেক উৎসস্থল হচ্ছে ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ। কেননা, আক্রমণকারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থানুসারে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসী এবং কাফের ভেদ তুলে দেয়। হিন্দু-মুসলমান, মুসলমান-খ্রিস্টান, খ্রিষ্টান-ইহুদি ইত্যাদি ভেদ তুলে শুধুমাত্র ধর্মের নামে গণহত্যার প্রচুর নজির ইতিহাসে রয়েছে। ভারত উপমহাদেশ এর সাক্ষী, বিশেষ করে বাংলাদেশ।

এর পাশাপাশি ‘রোগ’, যেগুলো আরোগ্য, ভয়াবহ, কিংবা সার্জারির প্রয়োজন পড়ে, সেগুলো দিয়েও ‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’র প্রক্রিয়া কাজ করে। রাজনৈতিক উপমা হিসেবে রোগের নাম ব্যবহৃত হওয়ার প্রচলন আছে সবখানেই। তন্মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত রোগের নাম হচ্ছে ‘ক্যান্সার’। যেহেতু, ক্যান্সার থেকে মুক্তির কোন পথ নেই, সেহেতু, একে চিরদিনের জন্যে বিদায় করে দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

এছাড়াও, আছে প্রগতি ও সারভাইভাল অব দ্যা ফিটেস্ট তত্ত্ব; উপনিবেশায়নের জন্যে উপনিবেশিক যে যুক্তি দেখাতো অনেকটা এর মতোই। ‘ওরা’ অন্ধকারে আছে, তাই তাদেরকে আলোতে ও প্রগতির পথে নিয়ে আসা আমাদের জন্যে কর্তব্য। আমরা মহান, তাই পৃথিবীকে শাসন করাও আমাদের কর্তব্য। এখানে শুধুমাত্র তারাই বেঁচে থাকবে যারা যোগ্যতর। জার্মানির নাৎসি আমলই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে, ‘ওরা’, ‘আমরা’ খুব গুরুত্বপূর্ণ! ‘তুমি’ ‘আমি’ দিয়ে গণহত্যা হয় না। এর জন্যে প্রয়োজন ‘ওরা’ ‘আমরা’র মতো সম্মিলিত প্রয়াস।

হারবার্ট সি ক্যালমেন বলেন, একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যখন গণহত্যার শিকার হয় অবশ্যই তখন এর কোন না কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অথবা পরিস্থিতিগত কারণ থাকে। কিন্তু, তাই বলে এটা বলা যাবে না যে, তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে তাদের কৃতকর্মের জন্যে। কিংবা এরা নিরাপত্তার জন্যে হুমকিস্বরূপ তাই হত্যা করা হচ্ছে, এটাও বলা যাবে না। মূলত, তারা আক্রমণের শিকার হন কোন বৃহৎ পলিসির কারণেই; সে পলিসি বাস্তবায়নের জন্যেই সে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। তাই, লিও কুপার বিভিন্ন গণহত্যা পর্যালোচনা করে জানান যে, সবগুলোই মূলত ক্ষমতা কাঠামোর সাথে জড়িত এবং সবগুলোই ‘essentially political struggle’[14] .

কিছু সংখ্যক দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ ব্যতীত সমাজের অধিকাংশ মানুষই নিরীহগোছের এবং শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানে বিশ্বাসী। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সে বিশ্বাসমত শান্তিতে বসবাস করতে পছন্দ করে এবং করেও থাকে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, যে কোন গণহত্যা কিংবা দাঙ্গার মুহূর্তে সেই শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোর একাংশই সহিংস হয়ে ওঠে এবং নিজেদের প্রতিবেশীদের রক্তেই নিজের হাত রঞ্জিত করে। তাদের এই আমূল পরিবর্তনের মূল কারণ উপরে উল্লিখিত ‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’র মতাদর্শই। আবার এই মতাদর্শ সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন প্রোপ্যাগান্ডা।

প্রোপ্যাগান্ডা

প্রোপ্যাগান্ডা বার্তা উপস্থাপনের একটি নির্দিষ্ট ধরণ যেখানে শুধুমাত্র তথ্য পরিবেশনের পরিবর্তে বরং জনগণের মতামত ও আচার-আচরণকে প্রভাবিত করা হয়। Britannica Encyclopedia এর মতে, এটা হচ্ছে, ‘dissemination of information—facts, arguments, rumors, half-truths, or lies—to influence public opinion.’ বর্তমানে এই শব্দটা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হলেও, এর মূল অর্থ নেতিবাচক ছিল না। সহজ অর্থে, যা প্রচার করা হবে কিংবা ছড়িয়ে দিতে হবে তাই প্রোপ্যাগান্ডা (to propagate)। ১৬২২ সালের দিকে তৎকালীন পোপের নেতৃত্বে কার্ডিনালদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়, খ্রিষ্টীয় মতবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে। কমিটির নাম ছিল Congregatio de Propaganda Fide, যার অর্থ হচ্ছে Congregation for Propagating the Faith (বিশ্বাস প্রচারের জন্যে ধর্মসভা)। মূলত, এর থেকেই প্রোপাগান্ডা শব্দের উৎপত্তি; কিন্তু, তখনো এখনকার মত ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ অর্থে তা ব্যবহৃত হত না।

অবশ্য, বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রোপাগান্ডার অর্থ ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক জগতে ঢুকে পড়ে। নিদর্শনস্বরূপ, কিছু সংজ্ঞা দেখা যেতে পারে।

Merriam-Webster অভিধানে প্রোপাগান্ডার তিনটা সংজ্ঞা দেয়া আছে:
• A congregation of the Roman curia having jurisdiction over missionary territories and related institutions
• The spreading of ideas, information, or rumor for the purpose of helping or injuring an institution, a cause, or a person
• Ideas, facts, or allegations spread deliberately to further one’s cause or to damage an opposing cause; also :a public action having such an effect

অক্সফোর্ড অভিধানেও একইভাবে প্রোপাগান্ডার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, Information, especially of a biased or misleading nature, used to promote a political cause or point of view।

অর্থাৎ, বর্তমানে প্রোপ্যাগান্ডা মানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পক্ষপাতদুষ্ট অর্ধসত্য/মিথ্যে সংবাদ পরিবেশন করে জনগণকে প্রভাবিত করা; মানে একধরনের ধাপ্পাবাজি করা। আধুনিক প্রোপ্যাগান্ডার ইতিহাস বেশি দূরবর্তী নয়; ধরে নেয়া হয় যে, একে সর্বাধিক সফলভাবে প্রথম কাজে লাগায় ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইলসন প্রশাসন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সে সময়টাতে মার্কিন সাধারণ জনগণ তখন প্রচণ্ড যুদ্ধবিরোধী, ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ এই মনোভাবে বিশ্বাসী । অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধের প্রতি ভীষণ দায়বদ্ধ, তাই আশ্রয় নেয় প্রচারমাধ্যমের। মাত্র ছয়মাসের মাথায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, সেই শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোই হয়ে ওঠে প্রচণ্ড যুদ্ধবাজ। তারা জার্মানদেরকে ধ্বংস করে দিতে চায়, পৃথিবীটাকে যুদ্ধের মাধ্যমে রক্ষা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। প্রচারণার এই যে ব্যবহার শুরু হল তারপর সেটা কমিউনিস্ট বিরোধিতায় কাজে লাগানো হয়। এমনকি, এখনও মধ্যপ্রাচ্যের যে কোন দেশ দখলের পূর্বে নিজের জনগণের কাছে এই কাজের বৈধতা পাওয়ার জন্যে সম্মতি উৎপাদনে প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়। কোন দেশকে আক্রমণ করতে চাইলে প্রথমেই ‘Appeal to fear’ মতবাদকে ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ, সেই দেশ আমেরিকার অস্তিত্বের জন্যে হুমকিস্বরূপ, তাই ওদের পূর্বে আমাকেই আক্রমণ করা উচিত। নোয়াম চমস্কি অবশ্য বর্তমানে প্রচলিত গনতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে এই ‘প্রোপাগান্ডা’কেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, Propaganda is to a democracy what the bludgeon is to a totalitarian state [15]। উল্লেখ্য, ১৯১৭ সালে উইলশন প্রশাসন যে নতুন পথের সৃষ্টি করেন তার সবচেয়ে বড় ব্যবহার কিন্তু মাত্র কিছুদিন পরে হিটলারই করেছেন।

নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড এস হারম্যান প্রোপাগান্ডার একটি মডেল হাজির করেছেন আমাদের সামনে, তাঁদের বিখ্যাত ‘সম্মতি উৎপাদন: গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ গ্রন্থে। তাঁরা দেখিয়েছেন, আমেরিকা চালিত বিভিন্ন যুদ্ধের সময় অথবা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সময় মার্কিন সংবাদসংস্থাগুলোর ভূমিকা কি থাকে এবং কোন সুরে ও কাদের সুরে তারা ‘নিরপেক্ষতা’র খুঁটি ধরে প্রোপ্যাগান্ডা ছড়ায়। এমন না যে, মিডিয়া ভুল তথ্য দিচ্ছে, বরং সে সঠিক তথ্যই দিবে। কিন্তু, কোনটাকে গুরুত্ব দিতে হবে আর কোনটাকে গুরুত্ব দিতে হবে না, সেটা ঠিক করে দেয়া হবে। পত্রিকার কোন অংশে কতটা জায়গা জুড়ে খবর প্রকাশিত হবে, হেডলাইন কেমন হবে, ঘটনার বর্ণনা কেমন হবে, এসব দিয়েই ‘গুরুত্ব’র মাত্রা ফুটিয়ে তোলা হয় সাধারণত। চমস্কি ও হারম্যান দেখিয়েছিলেন কিভাবে শুধুমাত্র খবর পরিবেশনে ভাষা ব্যবহার করেও, লঘু সংবাদকে গুরুত্বপূর্ণ করা হয়ে থাকে। তাদের প্রদত্ত মডেলে পাঁচটি ফিল্টারের কথা উল্লিখিত হয়, যাদের সম্পর্কে বলা হয়, ‘সংবাদের কাঁচামালকে অনিবার্যভাবেই, প্রকাশযোগ্য হওয়ার জন্যে, একে একে ফিল্টারগুলো অতিক্রম করতে হয়’। এই ফিল্টারগুলো আবার সরকারি ভাষ্য ও সমাজের এলিট শ্রেণীর মুনাফার দিকে দৃষ্টি রেখেই ‘filtration’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে[16]।

প্রোপাগান্ডার সর্বাধিক ব্যবহার ঘটে দুটো ক্ষেত্রে, এক জন-সংযোগ এবং দুই, যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধকালীন সময়ে ‘প্রোপ্যাগান্ডা’ যুদ্ধের একটা কৌশল হিসেবে কখনো কখনো উপস্থিত হয়; এর প্রমাণ পাওয়া যায় সান জু’র বিখ্যাত ‘দ্যা আর্ট অব ওয়ার’ বইতে। সেখানে বলা হয়, ‘সকল যুদ্ধের ভিত্তিই প্রতারণা। তাই, যখন আঘাত করতে সক্ষম, তখন দেখাতে হবে অক্ষম; যখন শক্তি প্রদর্শন করতে হবে, তখন দেখাতে হবে নিষ্ক্রিয়; যখন আমরা কাছাকাছি তখন শত্রুকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আমরা দূরে; যখন আমরা দূরে, তখন তাকে বিশ্বাস করাতে হবে আমরা কাছাকাছি’। এতো গেলো শুধুমাত্র যুদ্ধকালীন সময়ে শত্রু শিবিরের জন্যে প্রচারণা। পাশাপাশি যুদ্ধ কিংবা দাঙ্গাতে এই প্রোপ্যাগান্ডা আরো শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে হাজির হয় অন্য ক্ষেত্রে: পূর্বোল্লিখিত ‘মনুষ্যত্বচ্যুতি’র প্রচার। বিভিন্ন শব্দ, বাক্য, ছবি ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জনগণের মনের মধ্যে শত্রু সম্পর্কে ভ্রান্ত ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়। শত্রুর কাঁধে এমন কিছুর দায়ভার চাপিয়ে দেয়া হয়, যার জন্যে আদৌ সে দায়ী নয়। প্রতিটা প্রচারণাতেই নিজের জনগণের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করতে হয় যে, শত্রুপক্ষ দ্বারা কোন অবিচার সাধিত হয়েছে, যদিও অধিকাংশ সময় সে অভিযোগ কাল্পনিক কিংবা কোন একটা নির্দিষ্ট ঘটনার অর্ধ-সত্য বা বিকৃত তথ্য হয়ে থাকে।

বদরুদ্দীন উমর ১৯৭০ সালে লিখিত এক প্রবন্ধে কথা বলেছিলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে প্রচার মাধ্যমসমূহের ভূমিকা প্রসঙ্গে। সেখানে তিনি ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ এমন উন্মত্ত হয় কেমন করে?’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন কিভাবে জনমত গঠিত হয় তার উপর নির্ভর করে। সেখানে তিনি কয়টা উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, ‘উচ্চ-মধ্যবিত্ত স্বার্থপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলিই অধিকাংশ সংবাদপত্র এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যমসমূহের সমর্থক, মালিক এবং নিয়ন্ত্রেতা। এজন্য এগুলির মাধ্যমে শুধু দাঙ্গার ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রেই উচ্চমধ্যবিত্ত স্বার্থ সূক্ষ্মভাবে রক্ষার ব্যবস্থা হয়। এজন্যই দেখা যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্ষেত্রে দেশের সকল সংবাদপত্রের ভূমিকা এক হয় না, কোন কোন সংবাদপত্র হয়তো দাঙ্গা মনোবৃত্তির বিরোধিতা করে, কিন্তু জনমত গঠনে তাদের প্রভাব অন্যগুলির তুলনায় থাকে অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক দুর্বল।’[17]

প্রোপ্যাগান্ডার জন্যে যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহৃত হয় তন্মধ্যে “Ad nauseam” এবং “Appeal to fear” খুবই প্রচলিত এবং কার্যকর। “Ad nauseam” হচ্ছে যে কোন তত্ত্ব বারেবারে প্রচার করা যেন সেটা মিথ্যে হলেও জনসাধারণের কাছে সত্য বলেই মনে হয়। মূলত রেডিও পত্রিকা এই তত্ত্ব প্রচারের গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকে। “Appeal to fear” হচ্ছে এমন সব তত্ত্ব ও তথ্য জনগণের সামনে প্রচার করা তারা যেন প্রতিপক্ষের ব্যাপারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং এটা সফল হয়ে গেলে শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোও নিজেদের জান ও মাল রক্ষার্থে ‘Self-defense’ করতে উদ্ধত হয় যা পরিশেষে তাদেরকে ভয়ংকর খুনি বানিয়ে দেয়। গণহত্যাসহ যে কোন ধরণের দাঙ্গাতে এই শেষোক্ত পদ্ধতি খুবই কার্যকর, কেননা, ‘if this is done successfully, honest people will take whatever measure thy think necessary for legitimate self – defense’[18]।

সব দেশে সবসময় যে একইভাবে প্রচারণা বা প্রোপ্যাগান্ডা চালানো হয় তাও না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে প্রোপ্যাগান্ডার মাধ্যম ও ধরণেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেমন, এককালে পোস্টার, লিফলেট ছিল প্রোপ্যাগান্ডার মাধ্যম, কিন্তু রেডিও টেলিভিশন আগমনের পরে এরাই হয়ে গিয়েছে মূল মাধ্যম। আবার, বর্তমানে, সোশাল মিডিয়া মানে ভার্চুয়াল জগত হয়ে গিয়েছে প্রোপ্যাগান্ডার মাধ্যম। বর্তমানে মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত এই সময়ে আসলে শাসকগোষ্ঠী আমাদের মনোজগতকেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন মাধ্যমে; কখনো খবরের মাধ্যমে, কখনো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের কার্য হাসিলের জন্যে জনগণের অংশগ্রহণ কামনা করে, কিংবা জনগণের সম্মতি আদায়ের দরকার পড়ে (কেননা, জনগণ বিদ্রোহ করতে পারে) তখনই আশ্রয় নেয় ব্যাপক প্রোপাগান্ডার! গণহত্যার ক্ষেত্রেও যে প্রোপ্যাগান্ডা মাধ্যমের আশ্রয় নেয়া হয় সেটাও সময়ে সময়ে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় পোস্টার লিফলেটের আধিক্য ছিল, পরবর্তীতে সেখানে স্থান নিয়েছে রেডিও – টেলিভিশন এবং এখন আছে সোশ্যাল মিডিয়া।

এটা সত্যই যে, গণহত্যা কিংবা যে কোন দাঙ্গার মূল পরিকল্পনা তৈরি হয় মূলত নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ দ্বারা, সাধারণ জনগণের একাংশের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয় সেটার বাস্তবায়নের জন্যে কিংবা তীব্রতা বাড়ানোর জন্যেই। জনসাধারণকে তাই প্রভাবিত করার জন্যে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে তখন প্রোপ্যাগান্ডা। প্রিন্ট মিডিয়া, রেডিও, টেলিভিশন, লিফলেট, পোস্টার, সভা সমাবেশের বক্তৃতা তাই প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে গণহত্যায়। তার মানে এই না যে প্রোপ্যাগান্ডার কারোনেই গণহত্যা সঙ্ঘটিত হচ্ছে, বরং গণহত্যার পরিকল্পনা সুচারুভাবে বাস্তবায়িত করতে ও তীব্রতা বাড়াতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। গণহত্যাকালীন সময়ে প্রচারিত এই প্রোপ্যাগান্ডাকে Hate propaganda বলেও সম্বোধন করা হয় [19]। অন্যভাবে এটাকে ঘৃণাত্মক কথন (Hate Speech) বলাও হয়ে থাকে। মিডিয়াকে ব্যবহার করে কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো; যা কিনা গণহত্যায় উস্কানিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। এটাও মনে রাখতে হবে, জাতিসংঘের অধিবেশন অনুযায়ী, গণহত্যায় উস্কানি প্রদানও শাস্তিযোগ্য অপরাধ[20]। তবে, প্রোপাগান্ডা, ঘৃণাত্মক কথন এবং উস্কানি (Incitement) খুব পাশাপাশি শব্দার্থ তৈরি করলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ঘৃণাত্মক কথন একধরণের উত্তেজনামূলক ভাষা, প্রায়শই অপমানজনক ও নিন্দনীয়, যা কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে প্রচার করা হয়ে থাকে। সেটাতে সহিংসতার আহ্বান থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। অন্যদিকে, প্রোপ্যাগান্ডা হচ্ছে পক্ষপাতদুষ্ট খবরে প্রচার করে জনগণকে প্রভাবিত করা। এই কথন (speech) কিংবা প্রোপ্যাগান্ডা গণহত্যায় উস্কানি তৈরি করছে কি না তা প্রসঙ্গ এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। কোন পরিস্থিতিতে, কি প্রসঙ্গে এবং কাদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে তা বুঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে নিচের মন্তব্যটা গুরুত্বপূর্ণ,

Certain utterances achieve terrifying power, in the right context. In a climate of ethnic animosity, statements of ethnic pride are indistinguishable from insults against one’s opponents. And the converse is also true: Even the most hateful or inciteful speech remains benign, if it has no audience or if its audience is firmly and explicitly determined to keep the peace [21].

পূর্বেই বলেছি গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার জন্যে দরকার সু সংগঠিত ক্ষমতা কাঠামো এবং অধিকাংশ সময় রাষ্ট্রই সে কাজ করে থাকে। প্রোপ্যাগান্ডার ব্যাপক ব্যবহার ছাড়াও গণহত্যা সংঘটিত হতে পারে, কিন্তু সাংগঠনিক ক্ষমতা কাঠামো ব্যতীত এটা সম্ভব না। এছাড়া, ঘৃণ্য কথনের প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে একটা সমাজের আর্থ সামাজিক অবস্থার উপর। যে সকল সমাজে stratified hierarchy, tenuous rule of law, state-sponsored violence, impunity, or widespread corruption বিদ্যমান, সেখানে ঘৃণ্য কথন খুব সহজেই সহিংসতার জন্ম দেয়[22]।

 

তথ্যসূত্র:

[1] Kuper, Leo, 1981, Genocide Its Political Use in the Twentieth Century, Yale University Press
[2] Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide
[3] Eng, Kok-Thay, Redefining Genocide, Genocide Watch. http://www.genocidewatch.org/redefininggenocide.html
[4] Kuper, 1981
[5] Ibid
[6] Any deliberate act committed with the intent to destroy the language , religion, or culture of national, racial or religious group of the ground of the national or racial origin or religious belied of its members such as: 1) Prohibiting the use of the language of the group in daily intercourse or in schools, or the printing and circulation of publications in the language of the group; 2) Destroying or preventing the use of libraries, museums, school, historical monuments, places of worship or other institutions’ and objects of the group. (Source – Leo Kuper, Genocide, 1981)
[7] Jones, Adam (2006), “Chapter 1: The Origins of Genocide” (PDF), Genocide: A Comprehensive Introduction
[8] Arundhati Roy, Listening to Grasshoppers
[9] Kuper, 1981
[10] সৈয়দ নিজার, (২০১৭), ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন ও সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা, চৈতন্য
[11] On Genocide, Jean Paul Sartre, November 1967
[12] কামাল আহমেদ, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬, গণহত্যা অস্বীকারের পেছনে থাকে রাজনীতি, প্রথম আলো
[13] Kuper, 1981
[14] Kuper, 1981
[15] Chomsky, Noam, Media control: the spectacular achievements of propaganda.
[16] CHOMSKY, NOAM, and EDWARD S. HERMAN. MANUFACTURING CONSENT The Political Economy of the Mass Media. New York: Pantheon Books, 2002.
[17] বদরুদ্দীন উমর, ১৯৯৩, ধর্ম, রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা
[18] The Rwandan Genocide: How It Was Prepared, A Human Rights Watch Briefing Paper, April 2006
[19] Dictionary of Genocide
[20] The following acts shall be punishable: (a) Genocide; (b) Conspiracy to commit genocide; (c) Direct and public incitement to commit genocide; (d) Attempt to commit genocide; (e) Complicity in genocide. (Source – Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide)
[21] Hate speech and Group Targeted Violence The Role of speech in Violent conflicts
[22] Ibid

Most Popular

To Top