বিশেষ

উনি ‘লিঙ্কন’ নাকি ‘লুইস’?

উনি 'লিঙ্কন' নাকি 'লুইস'?

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সংশোধনী

প্রথম অনুচ্ছেদ:

দাসত্ব বা অনৈচ্ছিক দাসত্ব শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। কৃত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে পুরোপুরিভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও দাসত্ব ঘটলে তা আদলতের এখতিয়ারে পরিণত হবে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ:

এই সংশোধনী আইনটি যথাযথভাবে বলবৎ করতে কংগ্রেসের ক্ষমতা থাকবে।

উপরের লাইনগুলাই  আমেরিকার সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী। যা আমেরিকার ১৬তম  রাষ্ট্রপতি জন আব্রাহাম লিংকনের স্বপ্রচেষ্টায় উত্থাপিত হয় (রিপাবলিকান)। ১৮৬২ সালের ১৯ জুন প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন ‘দাসপ্রথাবিরোধী ঘোষণা’ জারির মাধ্যমে আমেরিকার দক্ষিণাংশের কনফেডারেশন রাজ্যগুলোর দাসদের দাসত্ব মোচন করেন।

১৮৬৩ সালে তিনি এক সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলোপ করেন। যেটা সিনেটে পাশ হয় এপ্রিলের ৮ তারিখ ১৮৬৪ সালে এবং হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ এ পাশ হয় জানুয়ারি ৩১, ১৮৬৫ সালে। যেখানে সংশোধনীর জন্য মোট ভোট জমা হয় ১১৯। ৫৬ ভোট আইনটির বিপক্ষে ছিল আর ৫৫ ভোট আইনটির পক্ষে ছিল। যেখানে পরবর্তীতে স্পীকার মি. স্কাইলার কোলফ্যাক্স সহ আরো একজনের পার্শ্বভোটের ধরুন ৫৭ ভোট জমা হয় সংশোধনীর পক্ষে এবং এরই মাধ্যমে হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টে সংশোধনী টি পাশ হয়ে যায়।

যেই সংশোধনীকে ধরা হয় মানব ইতিহাসের এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া এক সংশোধনী এবং আমেরিকার গৃহযুদ্ধ পরবর্তী শান্তিকালীন এক বড় পদক্ষেপ। বিরোধী প্রধান নেতা পেনডেলটন সহ আরো অনেক বাঘা বাঘা নেতাও অনেক চেষ্টা করেও সংশোধনী আটকাতে পারে নি। ৪ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ লেগে থাকার অন্যতম এক কারণ ছিল নিগ্রোদের জাতিগত ভাবে সমপর্যায়ে না আনা,তাদের সাধারণ মানুষের অধিকার না দেওয়া।

তখন  অনেক নেতা, সাধারণ  মানুষ ভাবতো নিগ্রো সৃষ্টিকর্তার নিকৃষ্ট সৃষ্টি এবং তারা এই জন্যে সৃষ্টিকর্তাকেও ঘৃণাও করতেন। শ্বেতাঙ্গদের সবসময় ভয় হতো নিগ্রোরা মানুষের অধিকার পেলে তাদের দাসত্ব করবে কে? তাদের ভয় ছিল এরা যখন আমেরিকান সাধারণ মানুষের কাতারে চলে আসবে তখন যদি আবার গণতান্ত্রিক ধারায় এরা এমপি হয়ে যায়! তাহলে কি হবে? এই কালো লোকগুলি বুঝি আমাদের সাথে সংসদে একসাথে বসবে!
ঘৃণ্য শ্বেতাঙ্গরা এইসব কল্পনাও করতে পারতো না, কারণ তাদের মনে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য ছিল শুধুই  ঘৃণা।

আর ঘৃণার সেই মূল শক্তিকেই ১৩তম সংশোধনী ধ্বংস করে দেয় ।যেটা সম্ভব হয় প্রেসিডেন্ট  লিংকন, তার দল এবং তাদের মিত্র পার্টির নেতাদের কারণে।

এই ১৩তম সংশোধনী, আব্রাহাম লিংকনের ১৮৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন কিছু কাজ এবং পরিবারের সাথে তার কেমন সম্পর্ক। সেসব সত্য কাহিনী কেন্দ্র করে ২০১২ সালে হলিউডে নির্মিত হয়  ‘Lincoln’ চলচ্চিত্র। যেখানে দেখানো হয় আমেরিকা এবং আমেরিকানদের প্রতি লিংকনের ভালোবাসা। দেখানো হয়েছে,  কৃষ্ণাঙ্গ সহ সব জাতির প্রতি তার মন-মানসিকতা। তিনি তার স্ত্রী, তার সন্তানদের সাথে কিভাবে কথা বলতেন, কিরূপ আচরণ করতেন তাও সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। লিংকন সাহেব ছিলে উদার গণতন্ত্রমনা এক মানুষ যিনি তার পরিবারেও সেই গণতান্ত্রিক মতবাদ প্রকাশ করেছেন। যেমন মুভি চলাকালীন একসময় তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার সময় তিনি স্পষ্ট করে বলেন,

‘তোমার সিদ্ধান্ত তুমি নিবে, আমার সিদ্ধান্ত আমি নিবো আর সন্তানদের সিদ্ধান্ত তাদের ই নিতে দাও’।

গণতন্ত্র নিয়ে তার বিখ্যাত  মতবাদ ‘ডেমোক্রেসি ইজ দ্যা গভর্নমেন্ট অফ দ্যা পিপল, বাই দ্যা পিপল, ফর দ্যা পিপল’ বিভিন্ন দেশের  পাঠ্যবইয়ে গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা হিসেবে পরিচিত। ১৮৬৫ সালের ১৫ ই এপ্রিল রোজ শুক্রবার উইকিসবুথ নামের এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন  জগদ্বিখ্যাত এই মানুষটি।

চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক ‘Lincoln’ মুভির পর্দার পিছন এবং সামনের তারকাসহ মুভির আদ্যোপান্ত বর্ণনা –

Directed by: Steven Spielberg
Screenplay by: Tony Kushner
Based on Team of Rivals: The Political Genius of Abraham Lincoln by Doris Kearns Goodwin.
Starring: Daniel Day-Lewis, Sally Field, David Strathairn, Joseph Gordon-Levitt, James Spader, Hal Holbrook,Tommy Lee Jones
Music: by John Williams
Cinematography: Janusz Kamiński
Edited: by Michael Kahn
Running time:150 minutes
Budget : $65 million
Box office : $275.3 million

এই বিখ্যাত মুভিতে লিংকন চরিত্রে অভিনয়  করেছেন ‘বিল দ্যা বুচার’ খ্যাত অস্কারজয়ী অভিনেতা  ড্যানিয়েল ডি লুইস।
আমি কিছু কথা বলতে চাই উনার ব্যাপারে। মন আমার আনচান আনচান করছে কিছু লেখার জন্য। কারণ আমার এই রিভিউ লেখার পিছনে একমাত্র কারণ এই মানুষটা।

আমি নিয়মিত মুভি দেখি। বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিন ই। বিশ্বের বিভিন্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ডেডিকেটেড অভিনেতার অভাব নেই। হলিউড  তো সে কথার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলা চলে। এত এত অভিনেতা থাকতে আমি কেনো তাকে নিয়ে এত এত বলতেছি।

আমি একজন অভিনেতাকে তখনই ১০ এ ১০ দেই এবং আমার অন্তরে জায়গা দিয়ে ফেলি যখন দেখি ওই অভিনেতা পর্দায় তার চরিত্রকে পুরোপুরি বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তুলছে। শুধু আমি না, দর্শক বলেন বা সমালোচক বলেন সবাই এই মতবাদে বিশ্বাসী। ড্যানিয়েল ডি লুইস সেক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল। শুধু সফল ই বলব  না, তিনি যখন পর্দায় হাজির হন মনে হয় না তিনি অভিনেতা লুইস। মনে হয় কখনো তিনি গ্যাংস অফ নিউইয়র্কের ঘাড় ত্যাড়া ‘বিল দ্যা বুচার। কখনো মনে হয় দেয়ার উইল বি ব্লাড মুভির আত্মপ্রত্যয়ী, কর্মঠ, পাষাণ, নির্দয় সেই ‘ড্যানিয়েল প্লেইনভিউ’। কখনো মনে হয় ইন দ্যা নেম অফ দ্যা ফাদার মুভির বিনাদোষে ১৫ বছর হাজত খাটা, বাবা হারানো, পাহাড়সম দুঃখে টলে না যাওয়া সত্যিকারের ‘গ্যারি কোনলন’। আবার কখনো মনে হয় মাই লেফট ফুটের শারীরিক প্রতিবন্ধী ‘ক্রিস্টি ব্রাউন’।
আর ‘লিংকন’ মুভিতে তো স্বয়ং আব্রাহাম লিংকনের অবতারে হাজির হয়েছেন তিনি। চরিত্রের এত গভীরে ঢুকে যাওয়া এইরকম অভিনেতা গুনলে হয়তোবা তার মত দুচার জন পাওয়া যাবে। তিনি তার মুভিতে অভিনয় শিল্পের বিখ্যাত কলা ‘মেথড এক্টিং’ প্রয়োগ করেন। জেনে রাখা ভালো ‘মেথড এক্টিং’ বলতে ,কোন চরিত্রকে বাস্তবিকভাবে উপস্থাপনের জন্য শারীরিক, মানসিক এবং আবেগের পরিবর্তনকে বোঝায়। কাজের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া এমন ডেডিকেশন কেউ দেখাতে পারবে কি না জানা নেই আমার।

‘লিংকন’ মুভিতে তার সাথে আরো ছিলেন স্ত্রী ম্যারি লিংকন চরিত্রে স্যালি ফিল্ড এবং আব্রাহাম লিংকনের ছেলে রবার্ট লিংকন চরিত্রে জোসেফ গরডন লেভিট । এছাড়া বাকী কলাকুশলী সবাই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এই মুভির পরিচালক আমাদের সবার প্রিয় স্টিভেন স্পিলবার্গ সাহেব।

কিছু বলার আছে ? ‘One of the best director ever made in the history of world cinema’, মুভি নিয়ে কারো সাথে আলাপ করার সময় আমি স্পিলবার্গ নিয়ে প্রায়ই এই উক্তিটি করি। কেন করি নিম্নে তার মুভির লিস্টগুলো দেখলেই বুঝবেন। যারা তাকে চিনেন তাদেরকে চিনিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনই নেই। আমাদের ভাগ্য যে আমরা আমাদের যুগে এমন একজন পরিচালকের দেখা পেয়েছি। আমরা  আলফ্রেড হিচকক, স্ট্যানলি কুব্রিককে যুগে ছিলাম না কিন্তু আমরা স্পিলবার্গের যুগে আছি।

তাঁর বিখ্যাত কিছু মুভির মধ্যে আছে –
E.T. the Extra-Terrestrial (1982), Jaws (1975),Schindler’s List (1993), Saving Private Ryan (1998), Close Encounters of the Third Kind (1977), Raiders of the Lost Ark (1981), Minority Report (2002), Catch Me If You Can (2002), A.I. Artificial Intelligence (2001), Munich (2005), Indiana Jones and the Last Crusade (1989), Bridge of Spies (2015), War of the Worlds(2005), The Lost World: Jurassic Park(1997), Jurassic Park(1993), War Horse (2011),The Terminal(2004)।

আমি তার অন্য কাজেগুলোর ব্যাপারে কথা বলব না। শুধু লিংকন মুভি আমি যতক্ষণ দেখেছি ততক্ষণ মনে হয় আমি ১৮৬৫ সালেই আছি। কস্টিউম, সেট, মেকআপ সবকিছুর সামঞ্জস্যে যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা ছিল চোখ জুড়ানো এবং মন ভোলানো। নিখুঁত কাজ বুঝি এমন ই হয়। গল্প নেওয়া হয়েছে Doris kearns goodwin -এর বায়োগ্রাফি বই ‘Team of rival: the political genius of Abraham Lincoln’ থেকে। যেটাকে চিত্রনাট্যে রূপান্তর করেছেন টনি কুশনার। টনি কুশনারও তার চিত্রনাট্যের জন্য বাহবা প্রাপ্য।

‘লিংকন’-কে শিকাগো সান-টাইমসের রজার এবার্ট ৪/৪ দিয়ে মন্তব্য করেছেন

“The hallmark of the man, performed so powerfully by Daniel Day-Lewis in Lincoln, is calm self-confidence, patience and a willingness to play politics in a realistic way.”

৮৫ তম অস্কারে ‘লিংকন’ ১২ টি নমিনেশিনের মধ্যে দুইটিতে অস্কার নিজের করে নেয়। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ক্যাটাগরিতে ‘ড্যানিয়ে ডি লুইস’ তৃতীয়বারের মত এবং বেস্ট প্রোডাকশন ডিজাইনে রিক কার্টার এবং জিম এরিকসন অস্কার লাভ করে।
গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা, ক্রিটিক্স চয়েস এওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার নিজের করে নেন লুইস।

David Denby, Stephen Holden, Mick LaSalle, Lisa Schwarzbaum, David Edelstein, Betsy Sharkey, Christopher Orr, Michael Phillips, A.O. Scott, Roger Ebert, Mike Scott, James Berardinelli -সহ আরো অনেক চলচ্চিত্রবোদ্ধারা ‘লিংকন’ মুভিটিকে তাদের দেখা ‘টপ টেন লিস্ট’-এর মধ্যে রেখেছেন।

লেখার পরিশেষে এসে বলব,
অনেকেই আব্রাহাম লিংকন নিয়ে পড়েছেন বা তাঁর ব্যাপারে শুনেছেন। তিনি কেমন হয়তোবা কল্পনাও করেছেন কিন্তু দেখতে পারেন নি। তাদের বলছি, যদি আপনার কল্পনাকে বাস্তবে দেখতে চান তাহলে অবশ্যই এই ‘মাস্টারপিস’ মুভিটি দেখতে হবে। আশা করি বিনোদনের সাথে আপনি অবশ্যই ইতিহাস নিয়েও কিছু ধারণা পাবেন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top